জাতির আত্মানুসন্ধানের সাংস্কৃতিক পথরেখা

গ্রাফিকস: প্রথম আলো

বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতির ইতিহাসে আবুল মনসুর আহমদ এক অনন্য নাম। তিনি ছিলেন একাধারে সাহিত্যিক, সাংবাদিক, রাজনীতিবিদ ও আইনজীবী। তাঁর চিন্তার কেন্দ্রবিন্দু ছিল সাহিত্য ও সংস্কৃতি। সমাজজীবনে সাহিত্যের ভূমিকাকে তিনি কেবল নন্দনতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে না দেখে একটি জাতির অস্তিত্ব ও স্বাতন্ত্র্য রক্ষার হাতিয়ার হিসেবেও দেখেছেন। তাঁর কাছে সাহিত্য মানে জীবনঘনিষ্ঠ সৃষ্টিশীলতা, যেখানে কৃত্রিমতা বা অন্তঃসারশূন্য মতাদর্শের স্থান নেই। ইতিহাস, নিকট-ইতিহাস ও প্রত্যক্ষ বাস্তবতাকেই তিনি সাহিত্য ও সংস্কৃতিচিন্তার মাপকাঠি হিসেবে ব্যবহার করেছেন। তাঁর ‘বাংলাদেশের কালচার’ বাংলা মননশীল প্রবন্ধসাহিত্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ, যেখানে লেখক জাতির আত্মপরিচয়, সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য ও সাহিত্যিক দায়িত্ববোধ—এ তিন বিষয়কেই গভীরভাবে অনুসন্ধান করেছেন। গ্রন্থটি এককালের পূর্ব বাংলা থেকে আজকের বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক যাত্রাপথকে ব্যাখ্যা করার প্রয়াস চালায়। লেখকের মূল বক্তব্য—মানুষের বেলায় যা ব্যক্তিত্ব, জাতির বেলায় তা–ই কালচার বা কৃষ্টি। ব্যক্তিত্ব যেমন মানুষকে স্বতন্ত্র করে, তেমনি কালচার একটি জাতিকে অন্য জাতি থেকে আলাদা করে তার পরিচয় ও মর্যাদা নির্মাণ করে।

বইটির প্রবন্ধগুলো, যেমন ‘বাংলাদেশের কালচার’, ‘পাক-বাংলার রেনেসাঁ’, ‘শিক্ষার মিডিয়াম’, ‘আমাদের স্বপ্নের শহীদ মিনার’ কিংবা ‘বাংলাদেশের জাতীয় আত্মা’—সব কটিই একে অপরের সঙ্গে ভাবগতভাবে যুক্ত। এখানে সাহিত্য, ভাষা, শিক্ষা, ধর্ম, গ্রাম-শহর সম্পর্ক—সবই কালচারের আলোকে বিশ্লেষিত হয়েছে।

কালচার (Culture) শব্দের প্রতিশব্দ নিয়ে বাংলা বুদ্ধিজীবী মহলে দীর্ঘ বিতর্ক রয়েছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘কৃষ্টি’ শব্দটিকে বাতিল করেছিলেন। শুধু তা–ই নয়, নীহাররঞ্জন রায়ের ভাষায় তিনি যেন ‘কৃষ্টি’ শব্দের বিরুদ্ধে ‘জিহাদ’ ঘোষণা করেছিলেন। বিপরীতে আবুল মনসুর আহমদ সচেতনভাবেই ‘কৃষ্টি’ শব্দটিকে গ্রহণ করেছিলেন। এটিই কালচারের অধিক নিকটবর্তী। তাঁর মতে, ‘কৃষ্টি’ শব্দটি কর্ষণ বা কাল্টিভেশন অর্থেই কালচারের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ প্রতিশব্দ, যেখানে সংস্কৃতি শব্দটি বরং সিভিলাইজেশনের অনুবাদ হিসেবে বেশি উপযুক্ত।

রবীন্দ্রনাথ যদিও ‘কৃষ্টি’ শব্দটি মানতে চাননি, তাঁর লেখার ভেতর দিয়ে কৃষ্টির ধারণাই প্রতিফলিত হয়েছে।

বইটির প্রবন্ধগুলো, যেমন ‘বাংলাদেশের কালচার’, ‘পাক-বাংলার রেনেসাঁ’, ‘শিক্ষার মিডিয়াম’, ‘আমাদের স্বপ্নের শহীদ মিনার’ কিংবা ‘বাংলাদেশের জাতীয় আত্মা’—সব কটিই একে অপরের সঙ্গে ভাবগতভাবে যুক্ত। এখানে সাহিত্য, ভাষা, শিক্ষা, ধর্ম, গ্রাম-শহর সম্পর্ক এবং রাজনৈতিক আন্দোলন—সবই কালচারের আলোকে বিশ্লেষিত হয়েছে। আবুল মনসুর সাহিত্যের ভূমিকা সম্পর্কে যে ধারণা পোষণ করেন, তা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। সাহিত্য তাঁর কাছে জাতির জীবনবোধ ও সামাজিক অভিজ্ঞতার সর্বোত্তম প্রকাশ। তিনি বিশ্বাস করতেন, সাহিত্যের মাধ্যমেই একটি জাতি নিজেকে চিনতে শেখে এবং রাজনৈতিক মুক্তির পথও সুগম হয়।

বাংলাদেশের কালচার
আবুল মনসুর আহমদ

প্রকাশক: প্রথমা প্রকাশন
প্রকাশ: ডিসেম্বর ২০২৫
প্রচ্ছদ: মাসুক হেলাল
পৃষ্ঠা: ১৯২
মূল্য: ৪২৫ টাকা

বইটি সংগ্রহ করতে চাইলে ক্লিক করুন

গ্রন্থটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো গ্রামকেন্দ্রিক সংস্কৃতির ওপর জোর। আবুল মনসুর মনে করেন, বাঙালি সংস্কৃতির শিকড় গ্রামে প্রোথিত। শহর কখনোই স্বতন্ত্র সংস্কৃতির জন্ম দিতে পারে না; শহর মূলত গ্রামীণ সংস্কৃতির বিস্তৃত রূপ। এ বক্তব্যের মধ্য দিয়ে তিনি শহুরে মধ্যবিত্ত মানসিকতার সমালোচনা করেন, যা গ্রামীণ জীবনকে অবমূল্যায়িত করে তথাকথিত ‘সংস্কৃতিমান’ জীবনকে শহরের একচেটিয়া সম্পত্তি হিসেবে দেখে। তিনি স্পষ্ট ভাষায় লিখেছেন, ‘কালচারের ধারক পাড়াগাঁ’। তাঁর অভিমত, ‘কৃষ্টি সামাজিক ব্যক্তিত্ব। সামাজিকতা পল্লি–জীবনের বৈশিষ্ট্য। এই দিক হইতে কালচারের ধারক ও বাহক পল্লিগ্রাম। শহরে সামাজিক জীবনের অভাব। সেখানে প্রতিবেশিত্ব গড়িয়া উঠিতে পারে না।’

‘বাংলাদেশের কালচার’ বাংলা মননশীল প্রবন্ধসাহিত্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ, যেখানে লেখক জাতির আত্মপরিচয়, সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য ও সাহিত্যিক দায়িত্ববোধ—এ তিন বিষয়কেই গভীরভাবে অনুসন্ধান করেছেন। গ্রন্থটি এককালের পূর্ব বাংলা থেকে আজকের বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক যাত্রাপথকে ব্যাখ্যা করার প্রয়াস চালায়।

পাকিস্তান আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে আবুল মনসুর আহমদের সাংস্কৃতিক চিন্তায় কিছু দ্বন্দ্বও লক্ষ করা যায়। তিনি পাকিস্তান দাবিকে মূলত ‘কালচারাল অটোনমি’র দাবি হিসেবে দেখেছিলেন এবং মুসলমানদের অবস্থানকে সাংস্কৃতিক সংখ্যালঘুর প্রশ্ন হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। একই সঙ্গে তিনি পশ্চিমবঙ্গকেন্দ্রিক সাহিত্য-ভাষাকে পূর্ববঙ্গের মুসলমান সমাজের নিজস্ব কৃষ্টি হিসেবে পুরোপুরি গ্রহণ করতে চাননি। আজকের দৃষ্টিতে এ অবস্থান সীমাবদ্ধ মনে হলেও তখনকার প্রান্তিকতার অভিজ্ঞতা থেকে এটি উঠে এসেছিল—এ কথা অনুধাবন করা জরুরি। তিনি সাম্প্রদায়িক ছিলেন না, জনগণের মুখের ভাষা ও জীবনানুভবকে সাহিত্যের কেন্দ্রে আনার পক্ষেই তাঁর অবস্থান ছিল।

সবচেয়ে বড় কথা, বাংলাদেশের কালচার পাঠককে প্রশ্ন করতে শেখায়। বইটির সব মতের সঙ্গে একমত হওয়া সম্ভব নয়। সেটিই স্বাভাবিক। কিন্তু ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের গভীরতা পাঠককে চিন্তাচর্চায় উদ্বুদ্ধ করে। এ বই আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—জাতির আত্মমর্যাদা ও বিশ্বসভায় অবস্থান নিশ্চিত করতে হলে নিজের কৃষ্টিকে চেনা ও লালন করা অপরিহার্য। সেই অর্থে এ বই আজও প্রাসঙ্গিক। এটি আমাদের সাংস্কৃতিক শিকড়ের দিকে ফিরে তাকাতে শেখায় এবং ভবিষ্যৎ নির্মাণের জন্য দৃঢ় চিন্তার ভিত্তি দেয়।