সলিমুল্লাহ খানের জুলাই ও তৎপরবর্তী ঘটনাবলি বিচার

সলিমুল্লাহ খানের বই ‘রতি ও বিরতি’র প্রচ্ছদ অবলম্বনে গ্রাফিকস: প্রথম আলো

‘মার্ক্স বলেছেন, বিপ্লব হলো বিশ্ব-ইতিহাস নামক ট্রেনের ইঞ্জিন। কিন্তু সম্ভবত বিষয়টি ঠিক তেমন নয়; বিপ্লব হলো এই ট্রেনের যাত্রীদের—অর্থাৎ মানবজাতির—ইমার্জেন্সি ব্রেক কষারই এক ঐতিহাসিক প্রচেষ্টা।’ —বাল্টার বেনিয়ামিন

সম্প্রতি সলিমুল্লাহ খানের আত্মভাব গ্রন্থমালা সিরিজের দ্বিতীয় বই রতি ও বিরতি প্রকাশিত হয়েছে। বইটির উপশিরোনাম: ‘সাক্ষাৎকার ২০২৪-২০২৬’। দেখা যাচ্ছে, এর সূচনাবিন্দু ২০২৪, আরও সুনির্দিষ্ট করে বললে, ২০২৪ সালের জুলাই গণ–অভ্যুত্থান। চব্বিশের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের মার্চ অবধি পত্রপত্রিকা, টেলিভিশন ও অন্যান্য মাধ্যমে তাঁর যেসব আলাপচারিতা প্রকাশিত হয়েছে, তারই সংকলন এই গ্রন্থ। ‘মধুপোক’ প্রকাশিত বইটির প্রচ্ছদে শোভা পেয়েছে বিশিষ্ট চিত্রশিল্পী দেবাশিস চক্রবর্তীর একটি চিত্রকর্ম।

সাক্ষাৎকারগুলোকে তিনটি পর্বে ভাগ করা হয়েছে: ‘রতি’, ‘বিরতি’ ও ‘আরতি’। এ ছাড়া ‘সংবর্ধনা’ শিরোনামা অধ্যায়ে রয়েছে কিছু নিবন্ধ ও আলোচনা। সূচিপত্রের এই ভাগ-বাঁটোয়ারা ও নামকরণের মধ্যে প্রোথিত আছে বইটির মর্মবাণীর পদ্ধতিগত প্রক্রিয়া। বাংলা ভাষায় রতি, বিরতি ও আরতি—এই তিনটি শব্দেরই স্ব-স্ব দার্শনিক ও আলংকারিক অর্থ রয়েছে। সংকলিত ১৯টি সাক্ষাৎকারের মধ্যে প্রথম ৯টি রাখা হয়েছে ‘রতি’ পর্বে, ‘বিরতি’ ভাগে ৪টি এবং ‘আরতি’ অধ্যায়ে রয়েছে ৬টি। গ্রন্থটির শেষভাগে যুক্ত করা হয়েছে গণ–অভ্যুত্থানের প্রাক্কালে অধ্যাপক খানের দেওয়া সেই বিখ্যাত বক্তৃতাটি। ধারণা করি, এই সাজসজ্জার এক বিশেষ অর্থ রয়েছে।

এই গ্রন্থে প্রকাশিত সাক্ষাৎকারসমূহ জুলাই-পরবর্তী বাংলাদেশের সামাজিক-রাজনৈতিক বাস্তবতা বোঝার ক্ষেত্রে একটি শক্ত বৌদ্ধিক নির্দেশিকা হিসেবে কাজ করবে বলে মনে করি। এর বাইরে, এ সাক্ষাৎকার সংকলনটির মোটাদাগে তিন ধরনের মূল্য রয়েছে।

প্রথমত, এতে আমরা পাব, ইতিহাসের নিরিখে যাকে বলা হয়, ‘ঘটনার প্রত্যক্ষ মূল্যায়ন’। অধ্যাপক খানের এই সাক্ষাৎকারগুলো মূলত চব্বিশের ৫ আগস্ট থেকে শুরু করে ২০২৬ সালের মার্চ মাস অবধি উদ্ভূত বিভিন্ন ইস্যু ও ডিসকোর্সের তেমনই প্রত্যক্ষ মূল্যায়ন। গণ–অভ্যুত্থানের দিন থেকে শুরু করে গণ–অভ্যুত্থান-উত্তর সময়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পুরো আমলে যে আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক সংকট স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, সেগুলোর সামগ্রিক বিশ্লেষণ ও পদ্ধতিগত বিচারে এই সাক্ষাৎকারগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে ইতিহাসের বিচারে এই সংকলনকে সমসাময়িক সামাজিক-রাজনৈতিক বাস্তবতার এক বহুমাত্রিক পর্যবেক্ষণ বললে অত্যুক্তি হবে না। নতুন সরকার কেমন হবে, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পুনরাবৃত্তি হবে কি না, সরকারের প্রধান কী কী লক্ষ্য থাকা উচিত, সংবিধান সংস্কার নাকি নতুন সংবিধান রচনা, সংস্কার কমিশন, নির্বাচন এবং গণ–অভ্যুত্থান-উত্তর মব সহিংসতা ইত্যাদি প্রতিটি বিষয়ে অধ্যাপক খানের সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ পাওয়া যায়।

সলিমুল্লাহ খানের বই ‘রতি ও বিরতি’র প্রচ্ছদ
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকটি হচ্ছে, সংকলনটির বেশ কিছু সাক্ষাৎকারে অধ্যাপক খান বাংলাদেশের বিদ্যমান মৌলিক কিছু সংকটের কারণ চিহ্নিত করেছেন। বাংলাদেশের রাজনীতি থেকে শুরু করে সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক নানাবিধ সমস্যা নিয়ে তিনি দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন তাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক পদ্ধতির সমন্বয়ে আলোচনা করে আসছেন। তাঁর বেশির ভাগ আলোচনাই এক অর্থে ইতিহাসের সফরনামা, আরেক অর্থে জ্ঞানতাত্ত্বিক ভাবনায় সুবিন্যস্ত।

দ্বিতীয়ত, প্রায় সব কটি সাক্ষাৎকারের আলোচনার বিষয়বস্তু হিসেবে কিছু সাধারণ বিষয় লক্ষণীয়; অর্থাৎ আলোচনাগুলো কিছু ঐতিহাসিক সংকটকে ঘিরেই আবর্তিত। অধ্যাপক খান তাঁর সাক্ষাৎকারগুলোতে এমন কিছু গভীর সংকটকে বারবার গুরুত্বের সঙ্গে উপস্থাপন করেছেন, সাধারণ উপায়ে যেগুলোর সমাধান করা যায়নি বলেই এই জনপদের মানুষকে বারবার এক অসাধারণ পথ অনুসরণ করতে হয়েছে। আর সেই অসাধারণ পথের অপর নাম ‘গণ–অভ্যুত্থান’। সলিমুল্লাহ খানের মতে, ২০২৪ সালের এই গণ–অভ্যুত্থানের নিজস্ব কিছু স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য যেমন রয়েছে, তেমনি ইতিহাসের বৈপ্লবিক ধারা তথা জাতীয় মুক্তির চিরন্তন বাসনার পরম্পরাও এতে গভীরভাবে নিহিত ছিল। চব্বিশ কিংবা অপরাপর অসাধারণ ঘটনাবলির মধ্য দিয়ে একদিকে ইতিহাসের পুনর্জন্ম ও উত্তরাধিকার, অন্যদিকে ইতিহাসের নতুন দুয়ার উন্মোচিত হচ্ছে—সলিমুল্লাহ খানের এই সাক্ষাৎকারসমূহে এই বিষয়টিই বারবার অনুরণিত হয়েছে।

২০২৪ সালের গণ–অভ্যুত্থানের ঐতিহাসিক বিচারে অধ্যাপক খান এই জনপদের দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাস টেনে আনেন। ১৮৫৭, ১৯০৫, ১৯৪৭, ১৯৭১, ১৯৯০ এবং সর্বশেষ ২০২৪-এর গণ–অভ্যুত্থানকে অভিন্ন সূত্রে গেঁথে তিনি এ দেশের মানুষের স্বাধীনতাসংগ্রামের এক গভীর খতিয়ান তুলে ধরেন। তবে ইতিহাসের এই ঘটনাবলি বিশ্লেষণ করতে গিয়ে তিনি কোনো সরলীকরণের পথে হাঁটেননি; বরং দ্বান্দ্বিক পদ্ধতির ওপরই ভরসা রেখেছেন। ঔপনিবেশিক সাংস্কৃতিক রাজনীতি ও ঔপনিবেশিক খাসলতে পূর্ণ রাষ্ট্রীয় কাঠামোর তীব্র সমালোচক হিসেবে তিনি এই গণ–অভ্যুত্থানকে কেন্দ্র করে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আইনের শাসন কিংবা সিভিল সমাজকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে চলে গেছেন ঔপনিবেশিক আমলের গোড়ার দিকে। ইতিহাসচর্চার পাশাপাশি বিশ্বজুড়ে চলমান বৈশ্বিক রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক সংকটকে বিবেচনায় নিয়ে তিনি গণ–অভ্যুত্থান-পরবর্তী দেশের নানাবিধ সংকটের কারণসমূহ উন্মোচন করেছেন। বেশ কিছু সংকটকে তিনি খোদ ‘সংকট’ হিসেবে না দেখে ‘সংকটের আলামত’ হিসেবে দেখেছেন, যে আলামতের ইতিহাস সুদীর্ঘ। আবার সংকট কাটিয়ে উঠতে কোথায় কোথায় পরিবর্তন আনা জরুরি, সে বিষয়েও তিনি স্পষ্ট দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। ফলে একদিকে যেমন গণ–অভ্যুত্থান-পরবর্তী পুরো অন্তর্বর্তীকালীন আমল নিয়ে তাঁর সমসাময়িক মূল্যায়ন পাওয়া যায়, তেমনি নাগরিক অধিকার, সামাজিক সুবিচার, মানবিক মর্যাদা, আইনের শাসন, নির্বাচনী গণতন্ত্র ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির মতো মৌলিক বিষয়গুলোর ওপর এক সুনির্দিষ্ট ঐতিহাসিক পর্যবেক্ষণও এতে ফুটে ওঠে।

তৃতীয়ত, এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকটি হচ্ছে, সংকলনটির বেশ কিছু সাক্ষাৎকারে অধ্যাপক খান বাংলাদেশের বিদ্যমান মৌলিক কিছু সংকটের কারণ চিহ্নিত করেছেন। বাংলাদেশের রাজনীতি থেকে শুরু করে সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক নানাবিধ সমস্যা নিয়ে তিনি দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন তাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক পদ্ধতির সমন্বয়ে আলোচনা করে আসছেন। তাঁর বেশির ভাগ আলোচনাই এক অর্থে ইতিহাসের সফরনামা, আরেক অর্থে জ্ঞানতাত্ত্বিক ভাবনায় সুবিন্যস্ত। জাতীয় জীবনের নানা জটিলতা ও বহুমুখী চ্যালেঞ্জকে সেগুলোর ঐতিহাসিক বিবর্তন এবং জিনিওলজিক্যাল পর্যবেক্ষণের জায়গা থেকে ব্যাখ্যা করার ক্ষেত্রে সলিমুল্লাহ খানের খ্যাতি রয়েছে। ২০২৪ সালের গণ–অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে তাঁর এসব ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের সঙ্গে তিনি বেশ কিছু নতুন চিন্তার সংযোজন ঘটিয়েছেন।

বিগত স্বৈরাচারী শাসনামল নিয়ে সলিমুল্লাহ খানের পর্যালোচনা বেশ বহুমাত্রিক। মুক্তিযুদ্ধের গণ-ইতিহাস তৈরির প্রেক্ষাপট থেকে শুরু করে শাহবাগ ও শাপলাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশে এক যুগের বেশি সময় ধরে চলা যে সাংস্কৃতিক দ্বন্দ্ব, তিনি তার একধরনের তাত্ত্বিক বিহিত করার চেষ্টা করেছেন। স্বৈরাচারী শাসনের অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ এবং একই সঙ্গে পরপর তিনটি জাতীয় নির্বাচনে কারচুপি করে জনগণের রাজনৈতিক অধিকার হরণের বিষয়টিকে অধ্যাপক খান জনগণের সার্বভৌমত্বের চূড়ান্ত অবমাননা হিসেবে গণ্য করেন।

ইতিহাসের ব্যাখ্যা অব্যাহত রাখার পাশাপাশি এই সাক্ষাৎকারগুলোতে তিনি বেশ কিছু তাৎপর্যপূর্ণ পর্যবেক্ষণ হাজির করেছেন। বিশ্বব্যাপী নব্য-উদারবাদী ব্যবস্থার যে আগ্রাসী প্রভাব এবং এর ফলে বাংলাদেশে সৃষ্ট প্রবল সামাজিক বৈষম্য—সেটিকে অধ্যাপক খান একটু ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার আহ্বান জানিয়েছেন। মার্ক্সের তত্ত্বের আলোকেই তিনি মনে করেন, ‘পুঁজির আদিম সঞ্চয়ন’ প্রক্রিয়া বাংলাদেশে স্বৈরাচারী শাসনের জন্ম দিয়েছে। অর্থাৎ উদ্ভাবনী পুঁজি নয়, বরং লুটপাট ও দখলদারত্বের মাধ্যমে যে পুঁজির বিকাশ ঘটে, তা টিকিয়ে রাখার জন্যই প্রয়োজন হয় এক চরম স্বৈরাচারী শাসন।

এ ক্ষেত্রে অধ্যাপক খানের অনন্য পর্যবেক্ষণটি হলো—বাংলাদেশে যেভাবে পুঁজিবাদের বিকাশ ঘটানোর চেষ্টা হয়েছে (যার অপর নাম ‘উন্নয়ন অর্থনীতি’), তার রাজনৈতিক পূর্বশর্তই ছিল স্বৈরাচারী শাসন। আর এই স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে এ দেশের জনগণ ইতিহাসে বারবার বিদ্রোহ করেছে; অধ্যাপক খান ইতিহাসের নানাবিধ দৃষ্টান্ত টেনে এই বিষয়টি স্পষ্ট করেছেন। তবে এই বিদ্রোহ যতটা রাজনৈতিক, কোনো অংশেই তার চেয়ে কম অর্থনৈতিক নয়। কিন্তু বারবার এমন রাজনৈতিক সংগ্রামের পরও গোড়ার সংকটগুলোর সমাধান না হওয়ায় জনগণের গণ–অভ্যুত্থান শেষ পর্যন্ত বিপ্লবে পরিণত হতে পারে না; ফলে বৈপ্লবিক বাসনা পরিণত হয় ‘বেহাত বিপ্লবে’। বিপ্লব অধরাই থেকে যায়। তবে সেই বিপ্লবের মৃত্যু ঘটে না; বরং তা জাতীয় মননের অজ্ঞান স্তরে শায়িত থাকে। ‘জুলাই গণ–অভ্যুত্থান কি গণ–অভ্যুত্থান, নাকি বিপ্লব?’—এই প্রশ্নের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে অধ্যাপক খানকে তাই প্রসঙ্গক্রমে প্রশ্ন তুলতে দেখা যায়: ‘১৯৭১ কি আদৌ বিপ্লব ছিল, নাকি ছিল না?’ যে প্রশ্নের উত্তর তিনি নিজেই দিয়েছেন মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী শাসনামল ও রাজনৈতিক ইতিহাস পর্যালোচনার মাধ্যমে।

বিগত স্বৈরাচারী শাসনামল নিয়ে সলিমুল্লাহ খানের পর্যালোচনা বেশ বহুমাত্রিক। মুক্তিযুদ্ধের গণ-ইতিহাস তৈরির প্রেক্ষাপট থেকে শুরু করে শাহবাগ ও শাপলাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশে এক যুগের বেশি সময় ধরে চলা যে সাংস্কৃতিক দ্বন্দ্ব, তিনি তার একধরনের তাত্ত্বিক বিহিত করার চেষ্টা করেছেন। স্বৈরাচারী শাসনের অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ এবং একই সঙ্গে পরপর তিনটি জাতীয় নির্বাচনে কারচুপি করে জনগণের রাজনৈতিক অধিকার হরণের বিষয়টিকে অধ্যাপক খান জনগণের সার্বভৌমত্বের চূড়ান্ত অবমাননা হিসেবে গণ্য করেন। যেই জনসার্বভৌমত্বের ওপর ভিত্তি করে বাংলাদেশ নামের প্রজাতন্ত্রের উদ্ভব তাকে এবং এর মূল তিনটি নীতি ‘সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার’কে অধ্যাপক খান বাংলাদেশ রাষ্ট্রের রাজনৈতিক অস্তিত্বের ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করেন। গ্রন্থটির তৃতীয় অধ্যায় অর্থাৎ ‘আরতি’ পর্বে তারই প্রতিফলন পাওয়া যায়।

বিপ্লব ইতিহাসের প্রগতিবাদী সরলরৈখিক বাস্তবতার কোনো অনিবার্যতা নয়; বরং অতীতের জুলুম ও বর্বরতার আবরণে ঢাকা অন্ধকার বাস্তবতার সঙ্গে এক চূড়ান্ত ফাটল, এক অভূতপূর্ব বিচ্ছিন্নতা, এক ঐতিহাসিক বিরতি। তাই বোধ করি অধ্যাপক সলিমুল্লাহ খানের এই মূল্যবান সাক্ষাৎকার গ্রন্থের নাম রতি ও বিরতি।

গণ–অভ্যুত্থান ঘটার পর আজ দুই বছরের বেশি সময় অতিক্রান্ত হতে চলেছে। কিন্তু এই অভ্যুত্থানের ফলাফল, রাজনৈতিক দর্শন, বহুমুখী প্রেক্ষাপট, রাজনীতি-অর্থনীতি ও সাংস্কৃতিক ভিত্তি নিয়ে গবেষণা এখনো অব্যাহত রয়েছে বলে বোধ করি। এই গণ–অভ্যুত্থান বাংলাদেশের ঐতিহাসিক ‘মহাঘটনা’ বা ইভেন্ট। যেকোনো ঐতিহাসিক ঘটনা বা ইভেন্টকে ফরাসি দার্শনিক আলাঁ বাদিউ মনে করেন অতীতের জঞ্জাল সাফ করার এক আকস্মিক মুহূর্ত এবং নতুন রাজনৈতিক বাসনার উদ্ভাবনের এক ঐশ্বরিক সুযোগ। অন্যদিকে দার্শনিক স্লাভোয় জিজেকের মতে, ঘটনা বা ইভেন্ট হলো কোনো জাতির ইতিহাসকে খোদ ইতিহাসের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর এক তিক্ত প্রচেষ্টা। অধ্যাপক খানের সাক্ষাৎকারগুলোর বিষয়বস্তু হয়তো বাদিউ বা জিজেকের ঘটনা-তত্ত্বের অধীনে পড়ে না; বরং জার্মান তাত্ত্বিক বাল্টার বেনিয়ামিনের পথ অনুসরণ করে তিনি হয়তো ভিন্ন এক ঘটনা-তত্ত্বের তালাশ করেছেন। এই ঘটনা-তত্ত্বের বিশদ ব্যাখ্যা তিনি গ্রন্থটির দীর্ঘ ভূমিকায় দিয়েছেন—

‘২০২৪ সালের মধ্যভাগ নাগাদ পরাধীনতা-পার বাংলাদেশে যাহা যাহা ঘটিয়াছে তাহা অনেকের চোখেই “ঐতিহাসিক ঘটনা”। এই বছরের ঘটনাধারা নতুন নিয়মের প্রতিষ্ঠা দিতে না পারিলেও পুরাতনের ফাটলটা ভালমতই দেখাইয়া দিয়াছে। ব্যাপ্তি, তীব্রতা এবং তাৎপর্যের বিচারে পঞ্চান্ন বছর আগেকার অসমাপ্ত স্বাধীনতার যুদ্ধ ছাড়া ইহার সহিত তুলনা দিবার মতন বিশেষ ঘটনা আর নাই।’

পুরোনো নিয়ম ধ্বংস ও নতুন নিয়ম প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের ঘটনা নিয়ে একদা জার্মান তাত্ত্বিক বাল্টার বেনিয়ামিন লিখেছিলেন তাঁর ‘থিসিস অন দ্য ফিলোসফি অব হিস্টরি’ প্রবন্ধে। প্রগতির ভাবনায় কলুষিত বিপ্লবের প্রচলিত বাসনাকে সেখানে তিনি প্রখর প্রজ্ঞায় খারিজ করেছিলেন। বিপ্লবকে প্রগতির ঐতিহাসিক চালিকা শক্তি বলে অভিহিত করা বিপ্লবী তত্ত্বের জনক কার্ল মার্ক্সের আপ্তবাক্যটিকে উল্টে দিয়ে তিনি বলেছিলেন, বিপ্লব কোনো চালিকা শক্তি নয়; বরং ‘প্রগতি’ নামক যে ধ্বংসগামী ট্রেনে মানবজাতি চেপে বসেছে, বিপ্লব হলো সেই ধ্বংসের ট্রেনে ইমার্জেন্সি ব্রেক টানার মতোই এক ঘটনা। বিপ্লব ইতিহাসের প্রগতিবাদী সরলরৈখিক বাস্তবতার কোনো অনিবার্যতা নয়; বরং অতীতের জুলুম ও বর্বরতার আবরণে ঢাকা অন্ধকার বাস্তবতার সঙ্গে এক চূড়ান্ত ফাটল, এক অভূতপূর্ব বিচ্ছিন্নতা, এক ঐতিহাসিক বিরতি। তাই বোধ করি অধ্যাপক সলিমুল্লাহ খানের এই মূল্যবান সাক্ষাৎকার গ্রন্থের নাম রতি ও বিরতি।

  • রতি ও বিরতি: সাক্ষাৎকার ২০২৪-২০২৬
    সলিমুল্লাহ খান

    প্রকাশক: মধুপোক
    প্রকাশ: শ্রাবণ ১৪৩৩
    প্রচ্ছদ: দেবাশিস চক্রবর্তীর চিত্রকর্ম অবলম্বনে মো. বজলুর রশিদ
    পৃষ্ঠা: ৪০০; মূল্য: ৯০০ টাকা