বাংলার প্রত্নসম্পদের অনন্য অনুসন্ধান

গ্রাফিকস: প্রথম আলো

দীর্ঘকাল ধরে প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধান, প্রত্নস্থলগুলোর সরেজমিন পরিদর্শন এবং মাঠপর্যায়ের সুদীর্ঘ অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে আবুল কালাম মোহাম্মদ যাকারিয়া লিখেছেন অসাধারণ একটি বই—বাংলাদেশের প্রত্নসম্পদ। এটি বাংলার প্রত্নতত্ত্ব বিষয়ে অতি মূল্যবান আকরগ্রন্থ, যার জন্য প্রত্নপ্রেমীরা তাঁর কাছে চিরঋণী হয়ে থাকবেন। প্রসঙ্গক্রমে কোথাও কোথাও ভারতীয় প্রতিবেশী রাজ্যগুলোর প্রত্ননিদর্শনের উল্লেখ রয়েছে। তবে বইটিতে মূলত বর্তমানকালের বাংলাদেশের আনাচকানাচে ছড়িয়ে–ছিটিয়ে থাকা নানা ধরনের প্রত্নসম্পদ এবং বিশেষভাবে এই অঞ্চলের প্রাচীন স্থাপত্য–সম্পর্কিত তথ্যাদি নিখুঁতভাবে তুলে ধরা হয়েছে। এসব তথ্যের বিস্তারিত পাণ্ডিত্যপূর্ণ আলোচনা ও বিশ্লেষণ বইটিতে প্রাধান্য পেয়েছে। এ ছাড়া বইটিতে আলোচিত হয়েছে এই অঞ্চলের ভৌগোলিক ও নৈসর্গিক পরিচয়, জনবসতি, সমাজ ও সভ্যতার ইতিহাস এবং আরও বহু চমকপ্রদ বিষয়। বইটিতে বর্ণিত বহু প্রাচীন নিদর্শন ও ঐতিহাসিক ইমারত ইতিমধ্যেই প্রায় বিলুপ্ত হতে চলেছে। আর যেগুলো কোনোক্রমে এখনো টিকে রয়েছে, সেগুলোর কোনো কোনোটা নানা ধরনের অপরিকল্পিত, এলোপাতাড়ি মেরামত ও সংস্কারের ফলে মূল চরিত্র হারিয়ে ফেলছে।

আবুল কালাম মোহাম্মদ যাকারিয়া ব্রিটিশ আমলের শেষ দিকে ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিস (আইসিএস) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে প্রশাসনিক পদে যোগদান করেন। একজন সফল প্রশাসক হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তিনি পুরোনো জমানায় প্রশাসনিক পদে থাকা আমলাদের একটি পাণ্ডিত্যসুলভ ধারা অনুসরণ করে একজন অসাধারণ গবেষক ও লেখক হিসেবে বহুল পরিচিতি পান।

বইটিতে মূলত বর্তমানকালের বাংলাদেশের আনাচকানাচে ছড়িয়ে–ছিটিয়ে থাকা নানা ধরনের প্রত্নসম্পদ এবং বিশেষভাবে এই অঞ্চলের প্রাচীন স্থাপত্য–সম্পর্কিত তথ্যাদি নিখুঁতভাবে তুলে ধরা হয়েছে।

বাংলাদেশের প্রত্নসম্পদ
আবুল কালাম মোহাম্মদ যাকারিয়া

প্রকাশক: প্রথমা প্রকাশন
প্রকাশ: অক্টোবর ২০২৫
প্রচ্ছদ: আনিসুজ্জামান সোহেল
পৃষ্ঠা: ৬৬৪
মূল্য: ২২০০ টাকা

বইটি সংগ্রহ করতে চাইলে ক্লিক করুন

এ ধরনের গবেষণাধর্মী রীতি শুধু মোগল শাসনামলেই নয়, এমনকি পরবর্তী সময়েও আমরা দেখতে পাই। উদাহরণস্বরূপ মালদহ জেলার প্রশাসক জন হেনরি র‍্যাভেনশ উনিশ শতকের মাঝামাঝি গৌড়ের প্রত্নসম্পদ ও শিলালিপি নিয়ে একটি মূল্যবান বই গৌড়, ইটস রুইনস অ্যান্ড ইনস্ক্রিপশনস প্রণয়ন করেন। প্রায় সমসাময়িক সময়ের ঢাকার সিভিল সার্জন জেমস ওয়াইজ এই এলাকার শিলালিপি ও প্রত্নসম্পদ নিয়ে বেশ কিছু লেখালেখি করেন। সেই ধারাবাহিকতা ও পরম্পরার একজন নজিরবিহীন উদাহরণ ছিলেন মোহাম্মদ যাকারিয়া। তাঁর প্রশাসনিক ক্ষমতার সুযোগ–সুবিধাগুলো পুরোমাত্রায় তিনি গবেষণার কাজে লাগাতে পেরেছিলেন এবং ডিস্ট্রিক্ট কালেক্টরেট, মহাফেজখানা ও কোর্ট রেকর্ডরুম ইত্যাদিতে সংরক্ষিত বিভিন্ন রেকর্ড দলিল-দস্তাবেজ তাঁর তত্ত্বানুসন্ধানের কাজে পরিপূর্ণভাব ব্যবহার করেছিলেন।

আরও পড়ুন

মোহাম্মদ যাকারিয়ার আরেকটি সুবিধা ছিল, তাঁর বিভিন্ন ভাষায় অসাধারণ দক্ষতা, ইদানীং যা এই অঞ্চলের গবেষকদের মধ্যে খুঁজে পাওয়া ক্রমে দুষ্কর হতে চলেছে। তিনি খুব ভালো ফারসি জানতেন। এটি তাঁকে তাবাকাতে নাসিরি বইটি বাংলায় অনুবাদ করতে বিশেষভাবে সাহায্য করে। এই অসাধারণ বইয়ের এক জায়গায় তিনি বাংলায় বখতিয়ার খিলজির প্রথম অভিযানের সময়ে লক্ষ্মণ সেনের রাজধানী ও আবাসস্থলের অবস্থান সঠিকভাবে নির্ণয় করার প্রয়াস করেছেন। সেই জায়গা যে মোটেই নদীয়া জেলার কোনো অংশ নয়; বরং চাঁপাইনবাবগঞ্জের নওদাপাড়া নামে একটি স্থান, এই নতুন আবিষ্কারটি বাংলার ইতিহাসচর্চায় নিঃসন্দেহে নতুন মাত্রা যোগ করবে।

ছাত্র থাকাকালে মোহাম্মদ যাকারিয়ার সঙ্গে আমার প্রথম দেখা হয় ঢাকায় বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটিতে। শিলালিপি বিষয়ে আমার আগ্রহ দেখে তিনি সে বিষয়ে আমার সামনে বহু চমকপ্রদ তথ্য তুলে ধরেন। আমাকে তা বিশেষভাবে অনুপ্রাণিত করে। পরবর্তী সময়ে আমি যশোরের বারোবাজারে তাঁর সঙ্গে ঘুরে বেড়ানোর বিরল সুযোগ পাই। তাঁর সঙ্গে বিভিন্ন বিষয়ে আলাপ করে গভীর আনন্দ পাওয়া যেত।

মোহাম্মদ যাকারিয়া ছিলেন একজন নির্মোহ গবেষক। তাঁর লেখায় কোনো রকমের সাম্প্রদায়িকতা বা ধর্মান্ধতার ছোঁয়া ছিল না। ইংরেজির ছাত্র ও প্রশাসনিক দায়িত্বে থাকায় বাংলাদেশের প্রত্নসম্পদকে তিনি ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছিলেন। এটি তাঁর লেখাকে ভিন্নমাত্রা দিয়েছিল।

বখতিয়ার খিলজির প্রথম অভিযানের সময়ে লক্ষ্মণ সেনের রাজধানী ও আবাসস্থলের অবস্থান সঠিকভাবে নির্ণয় করার প্রয়াস করেছেন। সেই জায়গা যে মোটেই নদীয়া জেলার কোনো অংশ নয়; বরং চাঁপাইনবাবগঞ্জের নওদাপাড়া নামে একটি স্থান, এই নতুন আবিষ্কারটি বাংলার ইতিহাসচর্চায় নিঃসন্দেহে নতুন মাত্রা যোগ করবে।
আবুল কালাম মোহাম্মদ যাকারিয়া

মোহাম্মদ যাকারিয়ার লেখা নিঃসন্দেহে উচ্চ মানের হলেও কিছু বিষয়ে ভিন্নমতের অবকাশ রয়েছে। যেমন বইটির ১৮২ পৃষ্ঠায় বর্ণিত ও বহুল প্রচলিত ‘লখনৌতি’ শহরটির শুদ্ধতর বানান লক্ষ্মণাবতী, আরবি ও ফারসি ভাষায় ‘লকহনাওয়াতি’। যদিও ‘লখনৌতি’ নামটি ইতিহাসের বইগুলোতে একেবারে প্রথম থেকেই চালু রয়েছে। আবার ২৮৬ পৃষ্ঠায় একটি আরবি লিপিকলার (ক্যালিগ্রাফিক স্টাইল) নাম ‘নাশখ’ লেখা হয়েছে। ‘নাসখ’ লেখা হলে শুদ্ধতর দেখাত। এগুলোকে মুদ্রণপ্রমাদ বলা হয়তো ঠিক হবে না। সম্ভবত এগুলো বিভিন্নজনের ব্যবহার করা বিভিন্ন রকমের বানানপদ্ধতি।

মোহাম্মদ যাকারিয়ার একটি বড় অবদান হলো, এমন সব প্রাচীন ঐতিহাসিক স্থাপত্য সম্পর্কে আলোকপাত করা, যা বাংলাদেশের প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণাকে একটি নতুন দিশা দেখায়। যেমন বইটির ৪০৫ পৃষ্ঠায় সাতক্ষীরার হাম্মামখানার বিবরণ একটি গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা। বাংলাদেশে হাম্মামখানার নিদর্শন খুবই কম। আমার জানামতে, এ বিষয়ে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য নিদর্শন হলো পাণ্ডুয়ার হাম্মামখানা। লেখক বিভিন্ন জনপদের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলো আলোচনা করতে গিয়ে সে সম্পর্কে প্রচলিত জনপ্রবাদগুলো (উদাহরণস্বরূপ পৃষ্ঠা ১৫৮) তুলে ধরেছেন। এছাড়া ইংরেজি ভাষার বিভিন্ন উৎস থেকে সাহায্য নিতে গিয়ে তিনি সেগুলোর মূল উদ্ধৃতিগুলো বইয়ে দিয়েছেন (উদাহরণস্বরূপ পৃষ্ঠা ২৮, ১৩৪ ও ১৮৮)।

প্রত্নতত্ত্বের ছাত্রছাত্রী, গবেষক ও লেখকদের কাছে বইটি বিশেষভাবে সমাদৃত হবে এবং যুগ যুগ ধরে বাঙালি সাধারণ পাঠকদেরকেও মাতিয়ে রাখবে, এটি আমার দৃঢ় বিশ্বাস। বাংলাদেশের প্রত্নসম্পদ বইটি প্রথমা প্রকাশন নতুনভাবে প্রকাশ করে আমাদের সবাইকে চিরঋণে আবদ্ধ করল।