মন, শরীর ও সম্পর্কের জটিলতা
একটি গল্প পড়ার পর পাঠকের মনে কী থেকে যায়—কাহিনি, চরিত্র, নাকি কোনো প্রশ্ন? সব গল্পের ক্ষেত্রে অবশ্য এর উত্তর এক নয়। কিছু গল্প পড়া শেষ হয় বই বন্ধ করার সঙ্গে সঙ্গে। আবার কিছু গল্প পড়া শেষ হওয়ার পরই যেন এর আসল পাঠ শুরু হয়। বিশ্বজিৎ চৌধুরীর ছোটগল্পের ক্ষেত্রে দ্বিতীয় অভিজ্ঞতাটিই বেশি প্রবল।
তাঁর গল্পে মানুষ আছে, সম্পর্ক আছে, প্রেম আছে, আকাঙ্ক্ষা আছে; আছে সংসারের চেনা ক্লান্তি ও জীবনের নানা অসংগতি। কিন্তু এসব নিছক কাহিনির উপকরণ হয়ে থাকে না। গল্প এগোতে এগোতে পরিচিত বাস্তবতার আড়াল সরিয়ে দেয়। তখন এমন কিছু চোখে পড়ে, যা হয়তো এত দিন চোখের সামনেই ছিল, কিন্তু সেভাবে দেখা হয়নি।
সম্প্রতি পড়লাম তাঁর ছোটগল্পের সংকলন নো আদার চয়েস। বইটিতে রয়েছে ১১টি গল্প। গল্পগুলো পড়তে গিয়ে মনে হয়েছে, লেখক খুব পরিচিত জীবনকেই এমনভাবে দেখেন, যার অনেকটা আমরা প্রতিদিন দেখেও দেখতে চাই না। প্রেম, সম্পর্ক, যৌনতা, দাম্পত্য, আকাঙ্ক্ষা, বঞ্চনা কিংবা সংসারের ক্লান্তি—এসব তাঁর গল্পে এসেছে; কিন্তু নিছক কাহিনির প্রয়োজনে নয়। এসবের মধ্য দিয়ে তিনি মানুষের মনোজগতের কিছু অস্বস্তিকর জায়গা উন্মুক্ত করেছেন। তাই গল্পপাঠ শেষে কিছু প্রশ্ন গলার কাছে ফলার মতো বিঁধতে থাকে।
নো আদার চয়েস নামটিও তাই আমার কাছে বেশ তাৎপর্যপূর্ণ মনে হয়েছে। অন্য কোনো বিকল্প নেই—এই সরল অর্থের বাইরেও যেন নামটির মধ্যে অন্য একটি ইঙ্গিত আছে। মন, শরীর, সম্পর্ক, আকাঙ্ক্ষা ও সংসারের জটিলতা থেকে পুরোপুরি বেরিয়ে যাওয়ার পথ নেই। এগুলোর মধ্যেই আমাদের থাকতে হয়, এগুলোর সঙ্গেই কোনো না কোনোভাবে বোঝাপড়া করতে হয়। হয়তো এটাই ‘নো আদার চয়েস’।
আমরা অনেক কিছুই দেখি না। আবার কিছু জিনিস দেখেও না দেখার ভান করি। নিজের স্বস্তি, সামাজিক সংকোচ কিংবা আত্মরক্ষার জন্য সেটিই হয়তো সহজ। কিন্তু বিশ্বজিৎ চৌধুরীর গল্প সেই সহজ জায়গায় থাকতে দেয় না। তাঁর গল্পের মানুষ ও সম্পর্কগুলো পাঠককে ধীরে ধীরে এমন এক জায়গায় নিয়ে যায়, যেখানে নিজের পরিচিত কিছু অনুভূতিকেও নতুন করে দেখতে হয়।
এ কারণেই নো আদার চয়েস পড়া শেষে বলতে হয়, ‘শেষ হয়ে হইল না শেষ।’ বই বন্ধ করার পরও কিছু চরিত্র, কিছু সম্পর্ক, কিছু ঘটনা এবং কিছু প্রশ্ন মাথায় ঘুরতে থাকে। হয়তো ভালো গল্পের কাজই এমন—সে সব প্রশ্নের উত্তর দিয়ে দেয় না; বরং এমন কিছু প্রশ্ন রেখে যায়, যেগুলো থেকে সহজে বেরিয়ে আসার কোনো ‘অন্য পথ’ থাকে না।
‘পুনরুদ্ধার সংকেত’ গল্পে প্রেমের চেয়ে ঘৃণার বিস্তৃতি যেন বেশি তীব্র হয়ে ওঠে। পড়তে পড়তে মনে হয়, এ কি নিজেরই কথা? যে আমাকে পেয়ে হারিয়েছে কিংবা যার প্রতারণা আমার নরম মনকে কঠিন করে দিয়েছে, সুযোগ পেলে তাকেও কি নিঃসঙ্গতা আর কাঠিন্যের সামনে দাঁড় করিয়ে দিতে ইচ্ছা করে না? গল্পটি পড়তে গিয়ে এমন ব্যক্তিগত অনুভূতি জেগে ওঠে। তারপরই মনে হয়, না, এ তো কেবল গল্প। কিন্তু সেই ‘কেবল গল্প’ই কখন যেন নিজের কোনো অভিজ্ঞতা বা পরিচিত জীবনের সঙ্গে মিশে যায়।
‘তৃষ্ণা’ গল্পে প্রবল হয়ে ওঠে মায়ের জন্য এক শিশুর চিরন্তন আকাঙ্ক্ষা। মাতৃহারা শিশুটির সারল্য গল্পটিকে গভীর আবেগের দিকে নিয়ে যায়। লেখকের বর্ণনাভঙ্গি ও বাক্যের গতি সেই আবেগকে আরও স্পষ্ট করে। কোথাও কোথাও মনে হয়েছে, শুধু পড়ছি না, দৃশ্যগুলো চোখের সামনেই ঘটছে।
‘মাঝে নদী বহে ধীরে’ নিয়ে আসে না-পাওয়ার আক্ষেপ। খুব কাছে পেয়েও প্রিয় মানুষের সঙ্গে তৈরি হয়ে থাকা দূরত্বের যে বেদনা, গল্পটি তারই এক পরিচিত অনুভূতিকে সামনে আনে। ‘স্বপ্নে বা দুঃস্বপ্নে যা ঘটে’ গল্পে এসেছে মানুষের সহজাত যৌনাকাঙ্ক্ষা, যে বিষয় সামাজিক সংকোচে আমরা প্রায়ই আড়াল করে রাখি। আর ‘একটি অবৈজ্ঞানিক চিকিৎসা’য় ভালোবাসার শক্তি হয়ে ওঠে গল্পের কেন্দ্র। প্রেম, আস্থা ও বিশ্বাস কীভাবে প্রতিকূলতার মধ্যেও মানুষকে আশাবাদী করে তুলতে পারে, গল্পটি সেই সম্ভাবনার কথাই বলে।
১১টি গল্পের বিষয় এক নয়, নির্মাণও এক নয়। কোথাও প্রেম ও যৌনতার জটিলতা, কোথাও সম্পর্কের টানাপোড়েন, কোথাও সংসারের ক্লান্তি, আবার কোথাও মানুষের গভীর আকাঙ্ক্ষা ও বঞ্চনা সামনে এসেছে। কিন্তু গল্পগুলোর মধ্যে একটি জায়গায় মিল আছে—লেখক পরিচিত জীবনের এমন কিছু দিক সামনে এনেছেন, যেগুলোর দিকে আমরা সচরাচর তাকাই না।
আমার কাছে মনে হয়েছে, বিশ্বজিৎ চৌধুরীর গল্পের বড় শক্তি এখানেই। তিনি অচেনা কোনো পৃথিবী তৈরি করেন না; বরং চেনা পৃথিবীটাকেই একটু অন্যভাবে দেখতে শেখান। ফলে গল্প পড়তে গিয়ে কখনো অন্য কারও জীবনের দিকে তাকাই, আবার কখনো নিজের ভেতরেও উঁকি দিতে হয়। কখনো মেনে নিতে না পারা সত্যের সামনে দাঁড়াতে হয়, কখনো নিজের এড়িয়ে যাওয়া বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়। সেই অভিজ্ঞতায় অস্বস্তি আছে, আছে একধরনের শ্বাসকষ্টও; অথচ তার মধ্যেই থাকে দুঃখের মতো আনন্দ।
এ কারণেই নো আদার চয়েস পড়া শেষে বলতে হয়, ‘শেষ হয়ে হইল না শেষ।’ বই বন্ধ করার পরও কিছু চরিত্র, কিছু সম্পর্ক, কিছু ঘটনা এবং কিছু প্রশ্ন মাথায় ঘুরতে থাকে। হয়তো ভালো গল্পের কাজই এমন—সে সব প্রশ্নের উত্তর দিয়ে দেয় না; বরং এমন কিছু প্রশ্ন রেখে যায়, যেগুলো থেকে সহজে বেরিয়ে আসার কোনো ‘অন্য পথ’ থাকে না।
নো আদার চয়েস
বিশ্বজিৎ চৌধুরী
প্রকাশক: পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লিমিটেড
প্রকাশ: ফেব্রুয়ারি ২০২৬
প্রচ্ছদ: মানব
পৃষ্ঠা: ১৩৬; মূল্য: ৪০০ টাকা