বাংলা সাহিত্যের কয়েকটি নারীবাদী উপন্যাস

গ্রাফিকস: প্রথম আলো

সাহিত্যের বিস্তীর্ণ কালখণ্ডে নারীবাদী চেতনার বিকাশ কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়; বরং দীর্ঘকালের আর্থসামাজিক বঞ্চনা, কাঠামোগত নিপীড়ন ও ব্যক্তিসত্তার অবদমনের বিরুদ্ধে এটি এক ধারাবাহিক বৌদ্ধিক বিদ্রোহ। ফরাসি দার্শনিক সিমোন দ্য বোভোয়াঁ তাঁর কালজয়ী দ্য সেকেন্ড সেক্স গ্রন্থে বলেছিলেন, ‘কেউ নারী হয়ে জন্মায় না, বরং সমাজ তাকে নারী হিসেবে গড়ে তোলে।’ বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে মেরি ওলস্টোনক্রাফটের আ ভিন্ডিকেশন অব দ্য রাইটস অব উইমেন (১৭৯২) বা দার্শনিক জন স্টুয়ার্ট মিলের দ্য সাবজেকশন অব উইমেন (১৮৬৯) গ্রন্থের মধ্য দিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক নারীবাদের সূচনা হয়েছিল। পাশ্চাত্যের সেই আন্দোলন মূলত আবর্তিত হয়েছিল ভোটাধিকার, আইনি সমতা এবং অর্থনৈতিক স্বাধীনতার দাবিকে কেন্দ্র করে। তবে সমাজবাস্তবতা প্রমাণ করে, কেবল রাজনৈতিক অধিকার নারীকে পরিবার ও সমাজের গভীরে প্রোথিত পরাধীনতা থেকে মুক্তি দিতে পারে না। এর ফলে পরবর্তী সময়ে জন্ম নেয় মার্ক্সবাদী ও র‍্যাডিক্যাল নারীবাদের মতো বহুমাত্রিক তত্ত্ব।

বাংলা সাহিত্য ও সমাজকাঠামোয় নারীবাদের বিবর্তন পাশ্চাত্যের এই রৈখিক ইতিহাস থেকে বেশ ভিন্ন। একে কেবল পাশ্চাত্যের আমদানি করা ধারণা ভাবা ঐতিহাসিকভাবে ভ্রান্ত। প্রাচীন ও মধ্যযুগের সাহিত্যে—ফুল্লরার বারমাস্যা, মৈমনসিংহ গীতিকার অকুতোভয় নারী চরিত্র কিংবা কালীঘাট পটে আঁকা এলোকেশী হত্যার চিত্রে—নারীর সামাজিক অবস্থান ও বঞ্চনার এক সুদীর্ঘ দেশজ ইতিহাস প্রোথিত রয়েছে। উনিশ শতকের বঙ্গীয় নবজাগরণে রাজা রামমোহন রায় বা ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের হাত ধরে সতীদাহ প্রথা রদ ও বিধবা বিবাহের মতো যুগান্তকারী সংস্কার শুরু হয়। তবে তলিয়ে দেখলে বোঝা যায়, তা ছিল মূলত পুরুষতান্ত্রিক কাঠামোর ভেতর থেকেই নারীর প্রতি একধরনের ‘উদারতা’ প্রদর্শন। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বা শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সাহিত্যে সমাজের নিচুতলার নারী, পতিতা ও বিধবাদের প্রতি সহানুভূতি থাকলেও, সম্পূর্ণ স্বাধীন নারীসত্তার নির্মাণ সেখানে সব সময় পূর্ণতা পায়নি। বঙ্কিমচন্দ্রের কৃষ্ণকান্তের উইল উপন্যাসের রোহিণী কিংবা শরৎচন্দ্রের শ্রীকান্ত উপন্যাসের অভয়া চরিত্রগুলো বিদ্রোহের স্ফুলিঙ্গ ছড়ালেও সমাজবাস্তবতার নিরিখে তাদের আত্মপ্রতিষ্ঠার পথ বেশির ভাগ সময়ই রুদ্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

আশাপূর্ণা দেবীর প্রথম প্রতিশ্রুতি থেকে শুরু করে বেগম রোকেয়ার পদ্মরাগ, দিলারা হাশেমের ঘর মন জানালা, মহাশ্বেতা দেবীর হাজার চুরাশির মা হয়ে নাসরীন জাহানের উড়ুক্কু পর্যন্ত উপন্যাসের বিবর্তন বিশ্লেষণ করলে বাঙালি নারীর মনস্তাত্ত্বিক ও সমাজতাত্ত্বিক লড়াইয়ের স্পষ্ট রূপরেখা পাওয়া যায়।

আক্ষরিক অর্থেই বৈপ্লবিক পালাবদল ঘটে তখন, যখন নারীরা নিজেরাই নিজেদের বঞ্চনার ইতিহাস লিখতে শুরু করেন। ১৮৭৬ সালে প্রকাশিত রাসসুন্দরী দাসীর আত্মজীবনী আমার জীবন ছিল সেই অবরুদ্ধ অন্দরমহল থেকে উচ্চারিত প্রথম স্বাধীন স্বর, যেখানে একটি অক্ষর শেখার জন্য একজন নারীর মর্মভেদী হাহাকার লিপিবদ্ধ হয়েছিল। অন্দরমহলের অধিকারহীন অবস্থা থেকে মুক্তির আকাঙ্ক্ষায় শুরু হওয়া এই যাত্রা কালক্রমে পর্যবসিত হয়েছে শারীরিক, মানসিক ও রাজনৈতিক স্বাধিকার অর্জনের তীব্র লড়াইয়ে। আশাপূর্ণা দেবীর প্রথম প্রতিশ্রুতি থেকে শুরু করে বেগম রোকেয়ার পদ্মরাগ, দিলারা হাশেমের ঘর মন জানালা, মহাশ্বেতা দেবীর হাজার চুরাশির মা হয়ে নাসরীন জাহানের উড়ুক্কু পর্যন্ত উপন্যাসের বিবর্তন বিশ্লেষণ করলে বাঙালি নারীর এই মনস্তাত্ত্বিক ও সমাজতাত্ত্বিক লড়াইয়ের স্পষ্ট রূপরেখা পাওয়া যায়।

‘প্রথম প্রতিশ্রুতি’ : অন্দরমহলের নীরব বিদ্রোহ ও আত্মোপলব্ধি

বাংলা কথাসাহিত্যে নারীর শিকল ভাঙার ইতিহাসের কথা বলতে গেলে অবধারিতভাবে আশাপূর্ণা দেবীর প্রথম প্রতিশ্রুতি (১৯৬৪) উপন্যাসের কথা উঠে আসে। বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধের ঔপনিবেশিক ভারতের প্রেক্ষাপটে রচিত এই উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র ‘সত্যবতী’ যেন সমগ্র বাঙালি নারীর সুপ্ত আকাঙ্ক্ষার মূর্ত প্রতীক। আটপৌরে এক গ্রাম্য বালিকা থেকে সত্যবতীর প্রতিবাদী নারী হয়ে ওঠার গল্প কেবল একটি পারিবারিক আখ্যান নয়; এটি অন্দরমহলের ঘুটঘুটে অন্ধকারে শিক্ষার আলো পৌঁছানোর এক ঐতিহাসিক দলিল।

সত্যবতী কোনো প্রাতিষ্ঠানিক নারীবাদের তাত্ত্বিক পাঠ নেয়নি। তার বিদ্রোহ উৎসারিত হয়েছে নিতান্তই নিজস্ব প্রজ্ঞা এবং চারপাশের অমানবিক বৈষম্য দর্শনের মাধ্যমে। পুরুষতান্ত্রিক সমাজের তৈরি করা অলঙ্ঘনীয় নিয়ম—মেয়েরা জোরে হাসবে না, পড়াশোনা করবে না, কেবল সন্তান উৎপাদন ও হেঁশেল সামলাবে—এই শিকলগুলোকে সত্যবতী নিজের সাধারণ বুদ্ধি দিয়ে প্রশ্নবিদ্ধ করে। মেয়ে সুবর্ণলতার ওপর স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির চাপিয়ে দেওয়া অন্যায় মেনে নিতে না পেরে সত্যবতী শেষ পর্যন্ত গৃহত্যাগ করে কাশীবাসী হয়। উপন্যাসের এই চূড়ান্ত পরিণতি প্রমাণ করে, নারীর আত্মমর্যাদার জাগরণ ঘটলে তাকে আর গার্হস্থ্য দাসত্বের মায়াজালে আটকে রাখা সম্ভব নয়। সত্যবতী চরিত্রটি মূলত বাঙালি নারীর মনোজগতে আত্মানুসন্ধানের প্রথম সার্থক বীজ বপন করেছিল।

‘পদ্মরাগ’ : প্রাতিষ্ঠানিক নারীবাদের প্রথম রূপরেখা

বাংলা সাহিত্যে মেয়েদের আত্মনির্ভরশীলতা ও প্রভুত্বমুক্ত স্বাধীন অস্তিত্বের প্রথম সার্থক শিল্পরূপ বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের পদ্মরাগ। ১৯০২ সালে মাত্র বাইশ বছর বয়সে তিনি এর পাণ্ডুলিপি রচনা করেন, যা গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয় ১৯২৪ সালে। সমাজবাস্তবতায় যখন নারীরা আক্ষরিক অর্থেই কঠোর অবরোধ প্রথার (পর্দা) বন্দী, তখন এমন উপন্যাসের আবির্ভাব ছিল এক অভূতপূর্ব বুদ্ধিবৃত্তিক বিস্ফোরণ। রোকেয়া তাঁর সুবিখ্যাত সুলতানাস ড্রিম বা সুলতানার স্বপ্ন গ্রন্থে যে কল্পরাজ্যের (ইউটোপিয়া) চিত্র এঁকেছিলেন, পদ্মরাগ উপন্যাসে এসে তা একটি বাস্তবসম্মত রূপ লাভ করে।

উপন্যাসের যুগান্তকারী দিকটি হলো ‘তারিণী-ভবন’-এর ধারণা। রোকেয়া সমাজদেহের ক্ষতস্থানে কেবল আঙুল নির্দেশ করেই থেমে থাকেননি; দিয়েছেন ব্যাধি নিরাময়ের প্রাতিষ্ঠানিক ইঙ্গিত। তারিণী-ভবন এমন এক আদর্শিক প্রতিষ্ঠান, যেখানে হিন্দু, মুসলিম, খ্রিষ্টান, ব্রাহ্ম–নির্বিশেষে সব ধর্মের অত্যাচারিত ও নিগৃহীত নারী একত্র হয়ে একটি স্বনির্ভর সমাজব্যবস্থা গড়ে তোলে। উষা, হেলেন, সিদ্দিকা—ভিন্ন ভিন্ন প্রেক্ষাপট থেকে আসা এই নারীদের একমাত্র পরিচয় হয়ে ওঠে মানুষ। শেষে এটি কেবল আশ্রয়কেন্দ্র থাকে না, হয়ে ওঠে নারীশিক্ষা, কর্মসংস্থান ও মানসিক বিকাশের ধর্মনিরপেক্ষ মুক্তাঙ্গন।

প্রধান চরিত্র সিদ্দিকার মধ্য দিয়ে নারীজীবনের সার্থকতার সম্পূর্ণ নতুন সংজ্ঞা নির্মাণ করেছেন রোকেয়া। প্রচলিত অর্থে স্বামীর পদসেবা বা গার্হস্থ্য দাসত্বকে সিদ্দিকা দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করে। সে নিজের ব্যক্তিসত্তাকে পুরুষতান্ত্রিক বিবাহের শৃঙ্খলে আবদ্ধ করতে নারাজ। রোকেয়া অত্যন্ত প্রজ্ঞাপূর্ণ কৌশলে দেখিয়েছেন, নারীর পরাধীনতার মূল কারণ ধর্ম নয়; বরং ধর্মের পুরুষতান্ত্রিক ভুল ব্যাখ্যা এবং চরম অর্থনৈতিক পরাধীনতা। সরাসরি ধর্মের মূল ভিত্তিকে আক্রমণ না করে তিনি পুরুষতন্ত্রের শোষণের হাতিয়ারগুলোর বিরুদ্ধে কলম ধরেছিলেন। তারিণী-ভবনের রূপরেখা আসলে আধুনিক উদারনৈতিক নারীবাদের একটি আদি দেশজ রূপ, যেখানে নারী অর্থনৈতিক স্বাবলম্বনের মাধ্যমে নিজের শর্তে বাঁচতে শেখে।

‘ঘর মন জানালা’ : মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন ও মুক্তির রূপক

ষাটের দশকের বাঙালি মধ্যবিত্ত সমাজের মূল্যবোধ, অবদমন এবং মনস্তাত্ত্বিক মুক্তির আকাঙ্ক্ষাকে উপজীব্য করে রচিত দিলারা হাশেমের ঘর মন জানালা (১৯৬৫)। ষাটের দশকে পূর্ব পাকিস্তানে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত মুসলিম সমাজের দ্রুত বিকাশ ঘটছিল। নারীরা ধীরে ধীরে উচ্চশিক্ষার অঙ্গনে প্রবেশ করলেও তাদের মনোজগৎ তখনো ছিল চিরায়ত সংস্কারে আবদ্ধ। এই উপন্যাসের শিরোনামটি নিজেই এক গভীর দার্শনিক রূপক বহন করে। ‘ঘর’ এখানে পুরুষতান্ত্রিক কাঠামোর প্রতীক, যেখানে সুরক্ষিত রাখার অজুহাতে নারীকে আজীবন আবদ্ধ রাখা হয়। ‘মন’ সেই অধরা সত্তা, যা এই শৃঙ্খল মানতে নারাজ। আর ‘জানালা’ হলো মুক্তির পথ বা বৃহত্তর পৃথিবীর সঙ্গে সংযোগের একমাত্র মাধ্যম।

উপন্যাসের কাহিনিতে মধ্যবিত্ত এক নারী চরিত্রের মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন সযত্নে চিত্রিত হয়েছে। চারপাশের সমাজ যখন তাকে কেবল আদর্শ স্ত্রী বা কন্যা হিসেবে দেখতে চায়, তখন তার মনের গহিনে জেগে ওঠে এক স্বাধীন সত্তা, যে জানালা দিয়ে বাইরের আকাশ দেখতে উদ্‌গ্রীব। বিখ্যাত নারীবাদী লেখিকা ভার্জিনিয়া উলফ তাঁর আ রুম অব ওয়ানস ওন গ্রন্থে বলেছিলেন—নিজের ভাবনার জন্য, খোলা আকাশ দেখার জানালা ও একটি নিজস্ব ঘর না থাকলে নারী তার মেধার স্ফুরণ ঘটাতে পারে না। দিলারা হাশেমের লেখায় এ দর্শনেরই শৈল্পিক প্রতিফলন ঘটে।

র‍্যাডিক্যাল নারীবাদের পথে না হেঁটে তিনি অত্যন্ত পরিশীলিত বিশ্লেষণে নারীর পরাধীনতার স্বরূপ উন্মোচন করেছেন। আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত মধ্যবিত্ত নারী অর্থনৈতিকভাবে হয়তো কিছুটা স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে, তবু তার মনোজগৎ এখনো পুরুষতন্ত্রের অদৃশ্য দেয়ালে বন্দী। সমাজের চোখে নিটোল ‘সুখী’ নারীটিও হয়তো ঘরের চারদেয়ালের মাঝে প্রতিনিয়ত অস্তিত্বের সংকটে ভুগছে। এই উপন্যাস পারিবারিক আখ্যান ছাড়িয়ে আধুনিক নারীর আত্মপরিচয় সংকটের এক ধ্রুপদি দলিল হয়ে উঠেছে।

‘হাজার চুরাশির মা’ : মাতৃত্বের রাজনৈতিক রূপান্তর

মাতৃত্বের রাজনৈতিক রূপান্তর ও শ্রেণিসংগ্রাম নারী প্রগতির ধারা কেবল অন্দরমহলের বিদ্রোহে সীমাবদ্ধ থাকেনি। সত্তরের দশকে রচিত মহাশ্বেতা দেবীর হাজার চুরাশির মা (১৯৭৪) উপন্যাসে তা রাষ্ট্রের স্বৈরাচার, পুঁজিপতি সমাজের অবক্ষয় এবং শ্রেণিসংগ্রামের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে যায়। এটি সাহিত্যিক পরিমণ্ডলে মার্ক্সবাদী নারীবাদের এক প্রামাণ্য উদাহরণ।

কেন্দ্রীয় চরিত্র সুজাতা চ্যাটার্জি এক উচ্চ-মধ্যবিত্ত, অভিজাত পরিবারের সুশিক্ষিত গৃহবধূ। স্বামী দিব্যনাথ একজন নারী-লম্পট, চূড়ান্ত সুবিধাবাদী ও অর্থলিপ্সু মানুষ। সমাজের উপরিভাগ এই নৈতিক স্খলনকে পুরুষের স্বাভাবিক অধিকার হিসেবে নির্লজ্জভাবে বৈধতা দেয়। শ্বাসরুদ্ধকর এই ভণ্ড ও ক্ষয়িষ্ণু পরিবেশে সুজাতা নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখে কনিষ্ঠ পুত্র ব্রতীর প্রতি গভীর আত্মিক নির্ভরতায়। সত্তরের দশকের উত্তাল নকশাল আন্দোলনে রাষ্ট্রের পুলিশি দমন-পীড়নে ব্রতী নিহত হলে এবং মর্গে তার পরিচয় নিছক ‘১০৮৪’ সংখ্যায় পর্যবসিত হলে সুজাতার চেনা পৃথিবী সম্পূর্ণ পাল্টে যায়।

এই উপন্যাসে মাতৃত্ব চিরায়ত বাৎসল্য রসে সিক্ত জৈবিক প্রক্রিয়া অতিক্রম করে একটি গভীর রাজনৈতিক চেতনায় উত্তীর্ণ। ব্রতীর মৃত্যুর কারণ খুঁজতে গিয়ে সুজাতার পরিচয় হয় প্রান্তিক প্রতিবাদী নারীদের সঙ্গে। ব্রতীর সহযোদ্ধা সমুর মা কিংবা নন্দিনীর মতো নিম্নবিত্ত লড়াকু নারীদের সান্নিধ্যে এসে সুজাতা উপলব্ধি করে, তার নিজের স্বামী দিব্যনাথ যে শোষক পুঁজিপতি শ্রেণির প্রতিনিধিত্ব করে, ব্রতীরা আসলে তাদের বিরুদ্ধেই লড়াই করছিল। সে বুঝতে পারে, ঘরে স্বামীর পুরুষতান্ত্রিক নিপীড়ন এবং বাইরে রাষ্ট্রের স্বৈরাচার—এ দুইয়ের উৎস একই ক্ষমতা-কাঠামো। একজন সাধারণ, প্রথানুবর্তী গৃহবধূ থেকে রাজনৈতিকভাবে সচেতন দ্রোহী ব্যক্তিতে রূপান্তরিত হয় সুজাতা। মহাশ্বেতা দেবী সুচারুভাবে প্রমাণ করেছেন, প্রকৃত নারীবাদ কেবল ব্যক্তিকেন্দ্রিক অধিকার আদায়ের লড়াই নয়, বৃহত্তর সমাজ পরিবর্তনের রাজনৈতিক সংগ্রামের সঙ্গেও তা নিবিড়ভাবে যুক্ত।

‘উড়ুক্কু’ : ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য ও শরীরী শৃঙ্খল ভাঙার আখ্যান

আশির দশকে নাসরীন জাহানের প্রথম উপন্যাস উড়ুক্কু বাংলা সাহিত্যে এক নতুন মাত্রা যোগ করে। বিশ্বসাহিত্যের জাদুবাস্তবতা (ম্যাজিক রিয়ালিজম) এবং সুররিয়ালিজমের প্রভাব এই উপন্যাসে পরিলক্ষিত হয়, যা তৎকালীন কথাসাহিত্যে ছিল এক যুগান্তকারী সংযোজন। আশির দশকের বাংলাদেশের অবরুদ্ধ সমাজব্যবস্থায় একজন নারীর শরীর ও মনের ওপর পরিবার এবং রাষ্ট্রের যে নিরঙ্কুশ আধিপত্য, লেখিকা তা অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে ব্যবচ্ছেদ করেছেন।

উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র ‘নীনা’। কট্টরপন্থী ও রক্ষণশীল পিতার শাসন নীনার মনোজগতে গভীর ক্ষতের সৃষ্টি করে। পিতৃতন্ত্র কীভাবে ধর্মের মোড়কে একজন কন্যাসন্তানের শৈশব ও কৈশোরকে শ্বাসরুদ্ধকর করে তোলে, নীনার জীবন তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। স্বামী-সংসারে তীব্র অসুখী নীনা শেষ পর্যন্ত বিবাহবিচ্ছেদের মতো একটি দুঃসাহসিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। তৎকালীন সমাজে তালাকপ্রাপ্ত নারীর প্রতি সমাজের যে নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি, নীনা চরিত্রটি তার বিপরীতে দাঁড়িয়ে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যে উজ্জ্বল এক প্রতিবাদী চরিত্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।

উত্তম পুরুষে রচিত এই আখ্যানে বিবাহবিচ্ছেদকে পরাজয় বা ট্র্যাজেডি হিসেবে না দেখিয়ে নিজের সত্তা পুনরুদ্ধার এবং সমাজ-আরোপিত শৃঙ্খল ভাঙার এক ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে তুলে ধরা হয়। উপন্যাসের মূল সুর মুক্তির অনন্ত আকাঙ্ক্ষা। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নিজস্ব পরিচয় নির্মাণের পথে পারিবারিক শাসন, দাম্পত্যের অন্তঃসারশূন্যতা এবং সামাজিক লাঞ্ছনার মতো প্রতিবন্ধকতাগুলো নাসরীন জাহান কাব্যিক গদ্যে তুলে ধরেছেন। জাদুবাস্তবতার আশ্রয় নিয়ে নীনা বারবার তার রূঢ় বাস্তবতা থেকে কল্পনার এক স্বাধীন আকাশে উড়াল দেয়। করুণার পাত্রী থেকে নারীকে—নিজের শরীর, মন ও মুক্তির শর্ত সে নিজেই নির্ধারণ করতে সক্ষম এমন এক সত্তায় পৌঁছে দিয়েছেন লেখক।

আশাপূর্ণা দেবীর প্রথম প্রতিশ্রুতি থেকে নাসরীন জাহানের উড়ুক্কু পর্যন্ত দীর্ঘ যাত্রাপথে বাঙালি নারী নিজস্ব পরিচয় বিনির্মাণে নিরন্তর লড়াই করেছে। প্রথম দিকের লেখিকারা মূলত প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা, অন্দরমহলের কুসংস্কার দূরীকরণ, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ও আইনি অধিকার নিয়ে কথা বলেছেন। পরবর্তী সময়ে সমাজবাস্তবতা পরিবর্তনের পাশাপাশি তা বিস্তৃত হয়েছে মনস্তাত্ত্বিক অধিকার, রাজনৈতিক সচেতনতা এবং ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য ও শরীরী স্বাধিকারের মতো স্পর্শকাতর বিষয়গুলোতে।

ফ্রয়েডীয় মনস্তত্ত্ব থেকে শুরু করে মার্ক্সবাদ—নানা তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে নারীজীবনকে ব্যবচ্ছেদ করেছেন এই লেখিকারা। তাঁরা প্রমাণ করেছেন, নারী চরিত্রগুলো কেবল দয়া বা করুণার পাত্রী নয়; তারা স্বকীয়তা, মেধা, যৌনতা এবং বুদ্ধিবৃত্তিতে সম্পূর্ণ এক স্বাধীন সত্তা। সমাজকাঠামোয় লিঙ্গভিত্তিক বিন্দুমাত্র বৈষম্য যত দিন অবশিষ্ট থাকবে, এই অসামান্য নারীবাদী আখ্যানগুলো তত দিনই প্রাসঙ্গিক থাকবে।