এক বাঙালির বিশ্ববীক্ষা

গ্রাফিকস: প্রথম আলো

রেনেসাঁস ছিল ইউরোপীয় ইতিহাসের এক যুগান্তকারী আন্দোলন। এর মাধ্যমে মানবতাবাদ, বিজ্ঞানমনস্কতা ও শিল্প-সাহিত্যের নবজাগরণ ঘটেছিল। ফলে মধ্যযুগের ধর্মকেন্দ্রিক চিন্তা থেকে বেরিয়ে এসে মানুষ নিজেকে ও জগৎকে নতুনভাবে অনুধাবন করতে শেখে। রেনেসাঁসের মৌল চেতনা ছিল মানবমুক্তি, যুক্তিবাদ ও সৃজনশীলতার স্বাধীনতা। এই রেনেসাঁস-চেতনার প্রতিফলন আমরা ভারতীয় উপমহাদেশে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চিন্তা ও সৃষ্টিতে স্পষ্টভাবে দেখতে পাই। রবীন্দ্রনাথ ছিলেন একাধারে কবি, দার্শনিক, শিক্ষাবিদ ও সমাজসংস্কারক। তাঁর রচনায় ব্যক্তিস্বাধীনতা, মানবতাবাদ, প্রকৃতিপ্রীতি ও বিশ্বমানবতার ধারণা বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে। ইউরোপীয় রেনেসাঁস যেমন মানুষের আত্মমর্যাদা ও বুদ্ধিবৃত্তিক স্বাধীনতাকে জাগ্রত করেছিল, তেমনি রবীন্দ্রনাথ ভারতীয় সমাজকে কুসংস্কার, সংকীর্ণতা ও জড়তার বিরুদ্ধে সচেতন করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ ছিলেন ভারতীয় রেনেসাঁসের অন্যতম প্রধান ধারক ও বাহক।

ইউরোপের রেনেসাঁসের তুলনায় বাংলার রেনেসাঁস খণ্ডিত ও অসম্পূর্ণ হলেও তাতে তার ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক মূল্য বিন্দুমাত্র ক্ষুণ্ন হয় না। ভৌগোলিক ও সামাজিক পার্থক্য সত্ত্বেও এই দুই রেনেসাঁস একই মানবতাবাদী ধারায় প্রবাহিত। যে মানবমন্ত্রে লেওনার্দো দা ভিঞ্চি, মিকেলাঞ্জেলো, কোপারনিকাস ও গ্যালিলিও বিজ্ঞান ও শিল্পে নবদিগন্ত উন্মোচন করেছেন, যে মন্ত্রে মার্লো ও শেক্সপিয়ার মানুষের অন্তর্জগৎ অনাবিষ্কৃত রেখেছেন, সেই একই মন্ত্র বাংলায় রামমোহন রায় ও ডিরোজিও, বিদ্যাসাগর ও মধুসূদন, বঙ্কিমচন্দ্র ও রবীন্দ্রনাথকে উদ্বুদ্ধ করেছে। গ্যেটে যে পথের পথিক ছিলেন, রবীন্দ্রনাথও সেই পথেই মানবমুক্তির সাধনা করেছেন। এই রেনেসাঁস-চেতনার মূল কথা—মানুষই সর্বোচ্চ সত্য। মানবতাবাদী মন্ত্রের সর্বশ্রেষ্ঠ সাধক হিসেবেই রবীন্দ্রনাথ বাংলার রেনেসাঁসের শ্রেষ্ঠতম সৃষ্টি। কৃতী প্রাবন্ধিক রাজীব সরকারের রেনেসাঁস ও রবীন্দ্রনাথ গ্রন্থটি রবীন্দ্রনাথের এই রেনেসাঁসচেতনার এক উজ্জ্বল ও প্রামাণ্য দলিল।

রেনেসাঁস ও রবীন্দ্রনাথ
রাজীব সরকার

প্রকাশক: কথাপ্রকাশ
প্রথম প্রকাশ: ফেব্রুয়ারি ২০২৩
প্রচ্ছদ: সব্যসাচী হাজরা
মূল্য: ২৫০ টাকা
পৃষ্ঠা: ১০৪

গ্রন্থটির ১০টি অধ্যায়ের প্রথম দুটি বাদে প্রতিটি অধ্যায়ের শিরোনামেই রয়েছে রবীন্দ্রনাথের উপস্থিতি। প্রথম দুটি অধ্যায়ের শিরোনাম যথাক্রমে ‘ইতালীয় রেনেসাঁস ও বাংলার রেনেসাঁস: একটি তুলনামূলক পর্যালোচনা’ এবং ‘রেনেসাঁস ও বাংলা সাহিত্য’। প্রথম অধ্যায়ে ইতালীয় রেনেসাঁস ও বাংলার রেনেসাঁসের মধ্যে সাদৃশ্য ও বৈসাদৃশ্যের তুলনামূলক বিশ্লেষণ উপস্থাপিত হয়েছে। দ্বিতীয় অধ্যায়ে রেনেসাঁসের প্রভাবে আধুনিক বাংলা সাহিত্যের উদ্ভব, বিকাশ ও চেতনাগত রূপান্তরের স্বরূপ উদ্‌ঘাটন করা হয়েছে। এতে লেখক স্পষ্ট করেছেন যে রেনেসাঁস কেবল একটি ঐতিহাসিক ঘটনা নয়, এটি আধুনিক বাংলা সাহিত্যের বৌদ্ধিক ভিত্তি ও সৃজনশীল গতিপথ নির্মাণকারী এক অপরিহার্য শক্তি। তিনি লিখেছেন, ‘ধর্মীয় কুসংস্কার ও অলৌকিক বিশ্বাস থেকে মুক্ত হওয়ার প্রেরণা জুগিয়েছিল রেনেসাঁস। এর প্রত্যক্ষ প্রভাব দৃশ্যমান আধুনিক বাংলা সাহিত্যে। রামমোহন, বিদ্যাসাগর, বঙ্কিম, মাইকেল, ডিরোজিও, অক্ষয় দত্তের রচনাবলির একটি বড় অংশজুড়ে রয়েছে যুক্তিবাদী ও মানবমুখীন জীবনধারা।’

‘রবীন্দ্রনাথের রামমোহন মূল্যায়ন’ প্রবন্ধে লেখক দেখিয়েছেন রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টিতে রামমোহন ছিলেন ভারতবর্ষকে বিশ্বচেতনার সঙ্গে যুক্ত করার অগ্রদূত। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের মধ্যে সেতুবন্ধ রচনা করে তিনি বাঙালি সমাজে রেনেসাঁসের বোধ জাগ্রত করেন। পাশ্চাত্য আধুনিকতাকে গ্রহণ করলেও তিনি প্রাচ্যের ঐতিহ্য বিসর্জন দেননি; বরং উভয়ের সমন্বয়ে জ্ঞান ও মুক্তবুদ্ধির নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, ‘অধুনাতন কালে দেশের মধ্যে যাঁহারা সকলের চেয়ে বড়ো মনীষী, তাঁহারা পশ্চিমের সঙ্গে পূর্বকে মিলাইয়া লইবার কাজেই জীবনযাপন করিয়াছেন। তাহার দৃষ্টান্ত রামমোহন রায়।’

ইউরোপীয় ও বাংলার রেনেসাঁসের মানবতাবাদী ধারাকে গভীর বোধ, প্রামাণ্য বিশ্লেষণ ও সুসংহত ভাষায় উপস্থাপন করেছে। রবীন্দ্রনাথকে কেন্দ্র করে রামমোহন, বিদ্যাসাগরসহ বাংলার রেনেসাঁস-মননের ধারাবাহিক বিকাশ এখানে স্পষ্টভাবে উদ্ভাসিত। গ্রন্থটি বাঙালির বুদ্ধিবৃত্তিক ইতিহাস অনুধাবনের এক গুরুত্বপূর্ণ স্মারক।

‘রবীন্দ্রনাথের চোখে বিদ্যাসাগর’ শীর্ষক অধ্যায়ে প্রাবন্ধিক যুক্তিসিদ্ধ বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন: বহুমাত্রিক প্রতিভার অধিকারী বিদ্যাসাগরের প্রধান পরিচয়—তিনি একান্তই একজন রেনেসাঁস মানব। ইহজাগতিক দৃষ্টিভঙ্গি, যুক্তিবাদী ও বিজ্ঞানমনস্ক শিক্ষা, নারীশিক্ষার বিস্তার, অলৌকিকতা-বর্জিত পাঠ্যক্রম, জ্যোতিষশাস্ত্রের পরিবর্তে জ্যোতির্বিদ্যার প্রচলন, আধুনিক গদ্যরীতির নির্মাণ, সমাজসংস্কার ও বিধবাবিবাহের মতো সাহসী উদ্যোগ—সবকিছুতেই ইউরোপীয় রেনেসাঁসের আদর্শ প্রতিফলিত। চারিত্রিক দৃঢ়তা ও মানবমুখিনতা তাঁর কর্ম ও চিন্তাকে অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দেয়। রবীন্দ্রনাথের বিদ্যাসাগর-মূল্যায়নে এই সকল গুণ স্পষ্টভাবে উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে, যেখানে বিদ্যাসাগর কেবল একজন ব্যক্তিমাত্র নন, বরং এক জীবন্ত মানবতাবাদী।

রাজীব সরকারের রেনেসাঁস ও রবীন্দ্রনাথ গ্রন্থটি ইউরোপীয় ও বাংলার রেনেসাঁসের মানবতাবাদী ধারাকে গভীর বোধ, প্রামাণ্য বিশ্লেষণ ও সুসংহত ভাষায় উপস্থাপন করেছে। রবীন্দ্রনাথকে কেন্দ্র করে রামমোহন, বিদ্যাসাগরসহ বাংলার রেনেসাঁস-মননের ধারাবাহিক বিকাশ এখানে স্পষ্টভাবে উদ্ভাসিত। গ্রন্থটি বাঙালির বুদ্ধিবৃত্তিক ইতিহাস অনুধাবনের এক গুরুত্বপূর্ণ স্মারক। রেনেসাঁস-চেতনা ও রবীন্দ্রনাথ-ভাবনা বোঝার ক্ষেত্রে এই বই পাঠকের দৃষ্টিকে আরও প্রসারিত করবে।