ইতিহাসের প্রতি বাংলাদেশের ধন্যবাদপত্র

মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের পক্ষে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেওয়া বিদেশি লেখক, শিল্পী, সাংবাদিক ও বন্ধুদের অবদান নিয়ে একটি বই লিখেছিলেন প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমান। বইয়ের শিরোনাম ‘ভালোবাসায় বাড়ানো হাত’। বইটি নিয়ে ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি (ইউআইইউ) একটি পর্যালোচনা প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছিল। এতে অংশ নিয়েছিলেন ইউআইইউর ইংরেজি বিভাগ, পরিবেশ ও উন্নয়ন অধ্যয়ন (ইডিএস) বিভাগ এবং মিডিয়া স্টাডিজ অ্যান্ড জার্নালিজম (এমএসজে) বিভাগের শিক্ষার্থীরা। ১২ আগস্ট সেই আয়োজনের পুরস্কার বিতরণ করা হয়। প্রতিযোগিতায় দ্বিতীয় হয়েছেন ইউআইইউর মিডিয়া স্টাডিজ অ্যান্ড জার্নালিজম বিভাগের শিক্ষার্থী ফারহানা ফাইজা। অন্য আলোর পাঠকের জন্য বই পর্যালোচনাটি প্রকাশিত হলো।

‘ভালোবাসায় বাড়ানো হাত’ বইয়ের প্রচ্ছদ অবলম্বনেগ্রাফিক্স : প্রথম আলো

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সাধারণত যুদ্ধক্ষেত্রের বীরত্ব, রাজনৈতিক নেতৃত্ব কিংবা গণমানুষের আত্মত্যাগকে কেন্দ্র করেই আলোচিত হয়। কিন্তু এই ইতিহাসের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় রয়েছে—বিদেশি লেখক, শিল্পী, বুদ্ধিজীবী ও মানবতাবাদী মানুষের অবদানের কথা, যাঁরা হাজার মাইল দূরে থেকেও বাংলাদেশের মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। সাংবাদিক ও লেখক মতিউর রহমানের ‘ভালোবাসায় বাড়ানো হাত’ বইটি নতুন আলোয় তুলনামূলকভাবে অনালোচিত সেই ইতিহাস তুলে ধরেছেন।

বইটির সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর বিষয়বস্তুর স্বাতন্ত্র্য। মুক্তিযুদ্ধের সময় বিশ্ববিবেককে জাগিয়ে তুলতে যেসব বিদেশি ব্যক্তি ভূমিকা রেখেছিলেন, তাঁদের অবদানকে লেখক শুধু তথ্যের মাধ্যমে নয়, মানবিক অনুভূতির স্পর্শে উপস্থাপন করেছেন। ফলে বইটি নিছক ইতিহাসগ্রন্থ হয়ে ওঠেনি; এটি হয়ে উঠেছে কৃতজ্ঞতার দলিল, আন্তর্জাতিক সংহতির এক উজ্জ্বল স্মারক। বইটি পড়ার পর আমার মনে হয়েছে, এটি আসলে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নয় বরং ইতিহাসের প্রতি বাংলাদেশের একটি ‘ধন্যবাদপত্র’।

কনসার্ট ফর বাংলাদেশে পারফর্ম করছেন (বাঁ থেকে) তানপুরায় কমলা চক্রবর্তী, সেতারে রবি শঙ্কর, তবলায় আল্লা রাখা এবং সরোদ বাজাচ্ছেন আলী আকবর খান

মতিউর রহমান একজন অভিজ্ঞ সাংবাদিক। সেই অভিজ্ঞতার প্রতিফলন বইয়ের প্রতিটি অধ্যায়ে স্পষ্ট। তথ্য সংগ্রহে তাঁর সতর্কতা, ঘটনার পেছনের প্রেক্ষাপট ব্যাখ্যা করার দক্ষতা এবং ব্যক্তিদের ভূমিকা মূল্যায়নের নিরপেক্ষতা পাঠককের মনে আস্থা জোগায়। বইয়ের পাতায় আমরা দেখতে পাই এমন কিছু মানুষের কথা, যাঁরা বাংলাদেশের নাগরিক ছিলেন না, কিন্তু মানবতার দায়বদ্ধতা থেকে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কলম ধরেছিলেন, শিল্প সৃষ্টি করেছিলেন, জনমত গড়ে তুলেছিলেন কিংবা সরাসরি সহায়তার হাত বাড়িয়েছিলেন।

এই বই পড়তে গিয়ে সবচেয়ে বেশি যে অনুভূতিটি জাগ্রত হয়, তা হলো বিস্ময়। কারণ, আমরা উপলব্ধি করি, একটি জাতির স্বাধীনতার সংগ্রাম কখনো একক কোনো ভূখণ্ডের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানোর সাহস পৃথিবীর নানা প্রান্তের মানুষকে এক সুতোয় বেঁধে ফেলে। লেখক সেই বৈশ্বিক মানবিক সংযোগের গল্পগুলো এমনভাবে তুলে ধরেছেন, যা পাঠককে শুধু তথ্য দেয় না, ভাবায়ও।

ভাষার দিক থেকেও বইটি উল্লেখযোগ্য। মতিউর রহমানের গদ্য সহজ, প্রাঞ্জল ও সংযত। তিনি অপ্রয়োজনীয় আবেগের আশ্রয় নেননি, আবার শুষ্ক তথ্যের ভারেও বইকে ক্লান্তিকর করে তোলেননি। ফলে ইতিহাস ও সাহিত্য এই দুই ধারার একটি সুন্দর সমন্বয় সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে বিভিন্ন ব্যক্তি ও ঘটনার বর্ণনায় তাঁর ভাষা পাঠকের চোখের সামনে সময়টিকে জীবন্ত করে তোলে।

বইটির আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো এতে সংযোজিত আলোকচিত্রমালা। ছবিগুলো কেবল লেখার অলংকার নয়; বরং ইতিহাসের নীরব সাক্ষী। একটি ছবি যেখানে হাজার শব্দের সমান শক্তিশালী, সেখানে এই আলোকচিত্রগুলো পাঠককে সরাসরি ১৯৭১-এর বাস্তবতার সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়। বইয়ের ঘটনাগুলো পড়ার সময় যে অনুভূতি তৈরি হয়, ছবিগুলো সেই অনুভূতিকে আরও গভীর ও জীবন্ত করে তোলে। বিশেষ করে বিদেশি বন্ধুদের কার্যক্রম, বিভিন্ন ঐতিহাসিক মুহূর্ত এবং মানবিক সহমর্মিতার দৃশ্যগুলো পাঠকের মনে দীর্ঘস্থায়ী ছাপ ফেলে। মনে হয়েছে, লেখক শুধু ইতিহাস লেখেননি; ইতিহাসের মুখও আমাদের সামনে তুলে ধরেছেন। ফলে বইটি পড়া যেমন একধরনের বৌদ্ধিক অভিজ্ঞতা, তেমনি ছবিগুলো দেখার মাধ্যমে তা পরিণত হয়েছে এক আবেগঘন দৃশ্যমান যাত্রায়।

কনসার্ট ফর বাংলাদেশ-এ গান গাইছেন জর্জ হ্যারিসন ও অন্যরা
ছবি: সংগৃহীত

বইটিতে উল্লিখিত অসংখ্য মানুষের অবদানের মধ্যে কয়েকজনের কথা আমার মনে বিশেষভাবে গেঁথে গেছে। আঁদ্রে মালরোর মানবতাবাদী সংহতি ও নৈতিক অবস্থান, জোয়ান বায়েজের প্রতিবাদী কণ্ঠে উচ্চারিত মানবাধিকারের দাবি, বব ডিলানের গানকে প্রতিবাদের ভাষায় রূপ দেওয়ার অনন্য শক্তি এবং জর্জ হ্যারিসনের বাংলাদেশে মানুষের দুর্দশার প্রতি মানবিক উদ্যোগ আমাকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। তাঁদের প্রত্যেকের ভূমিকা ভিন্ন ছিল, কিন্তু উদ্দেশ্য ছিল এক—বাংলাদেশের মানুষের দুর্দশার কথা বিশ্ববাসীর কাছে পৌঁছে দেওয়া। বইটি পড়তে গিয়ে উপলব্ধি করেছি, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস শুধু যুদ্ধক্ষেত্রের বীরত্বের ইতিহাস নয়; এটি বিবেকবান মানুষেরও ইতিহাস।

তবে বইটির সবচেয়ে গভীর বার্তা নিহিত আছে এর শিরোনামেই ‘ভালোবাসায় বাড়ানো হাত’। এখানে ভালোবাসা কোনো ব্যক্তিগত আবেগ নয়; এটি নিপীড়িত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর নৈতিক শক্তি। লেখক দেখিয়েছেন, ভাষা, সংস্কৃতি কিংবা ভৌগোলিক দূরত্ব মানুষের মানবিক দায়িত্বকে থামাতে পারে না। মুক্তিযুদ্ধের সময়ে বিদেশি বন্ধুদের সহমর্মিতা তারই প্রমাণ।

সব মিলিয়ে, ‘ভালোবাসায় বাড়ানো হাত’ শুধু একটি বই নয়; এটি ইতিহাসের প্রতি দায়বদ্ধতা, মানবতার প্রতি শ্রদ্ধা এবং কৃতজ্ঞতার এক অনন্য দলিল। যাঁরা মুক্তিযুদ্ধকে নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে জানতে চান, আন্তর্জাতিক সংহতির শক্তি বুঝতে চান কিংবা ইতিহাসের আড়ালে লুকিয়ে থাকা মানবিক গল্পগুলো আবিষ্কার করতে চান, তাঁদের জন্য এই বই অবশ্যপাঠ্য। বইটি শেষ করার পর মনে হয়, বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে যেমন বীর মুক্তিযোদ্ধাদের অবদান চিরস্মরণীয়, তেমনি দূরদেশ থেকে ভালোবাসার হাত বাড়িয়ে দেওয়া সেই মানুষগুলোর প্রতিও আমাদের ঋণ অনন্ত।

ভালোবাসায় বাড়ানো হাত

মুক্তিযুদ্ধে বিদেশি লেখক–শিল্পী বন্ধু

লেখক: মতিউর রহমান

প্রকাশক: প্রথমা প্রকাশন

প্রকাশ: মার্চ, ২০২২

পৃষ্ঠা: ১৮৮

মূল্য: ৪৫০ টাকা