তত্ত্বের পেছনে বিজ্ঞানীদের হাসি-কান্না আর সংগ্রামের ইতিহাস

স্কুলজীবনের শেষের দিকে লুইস হেনরি মর্গানের অ্যানসিয়েন্ট সোসাইটি পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল। বইটি থেকে একটি জিনিস আমি বুঝেছিলাম; একেকটা সাংস্কৃতিক উত্তরণে অসংখ্য মানুষের সংগ্রাম জড়িয়ে থাকে, কোনো একক বা গুটিকয়েক মানুষের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ নয়। পরে জর্জ সার্টনের বিজ্ঞানের ইতিহাস থেকে জেনেছিলাম, একটি সামাজিক শূন্যতায় বিজ্ঞান গড়ে উঠতে পারে না। সে জন্য বিজ্ঞানের প্রতিটি ইতিহাস, এমনকি সবচেয়ে বস্তুনিরপেক্ষ গাণিতিক ইতিহাসেও কিছুসংখ্যক সামাজিক ঘটনা অন্তর্ভুক্ত করতে হয়।

 আবার আমরা জানি যে মহাবিস্ফোরণ তথা মহাবিশ্বের সৃষ্টিমুহূর্তে এতে বিশেষ একটা বৈশিষ্ট্যের উদ্ভব হয়েছে। সেই বৈশিষ্ট্যের মাধ্যমে মানুষ মহাবিশ্বকে পর্যবেক্ষণ ও বোঝার সুযোগ পেয়েছে। মাধ্যমটি হলো বিদ্যুৎ–চুম্বকীয় প্রতিভাস। ফোটন তার বাহক কণা। আবুল বাসারের মহাজাগতিক প্রথম আলো বইটিও লেখা হয়েছে এসব বিষয়কে কেন্দ্র করে।

বইয়ের প্রাক্​–কথনে অধ্যাপক দীপেন ভট্টাচার্য যেমন বলেছেন, এক সেকেন্ডের মধ্যে প্রথম ফোটন কণার সৃষ্টি হলেও মহাবিশ্ব সৃষ্টির পর বস্তুর ঘনত্বে ফোটন কণাগুলো আটক পড়েছিল। ৩ লাখ ৮০ হাজার বছর পর বস্তুর ফোটনগুলো ঘন মেঘ থেকে মুক্ত হয়েছিল। এটাই প্রথম আলো যা মাইক্রোওয়েভ ব্যাকগ্রাউন্ড রেডিয়েশন বা মহাজাগতিক অণুতরঙ্গ বিকিরণ হিসেবে আমরা পর্যবেক্ষণ করি। এই আবিষ্কারের কাহিনি সুবিস্তৃত আকারে বিধৃত হয়েছে আলোচ্য বইটিতে। বইয়ের লেখক আবুল বাসার ইতিমধ্যে স্টিফেন হকিংয়ের বইগুলো অনুবাদ করে সাড়া জাগিয়েছেন, দেশের জনপ্রিয় বিজ্ঞানবিষয়ক মাসিক ম্যাগাজিন বিজ্ঞানচিন্তার নির্বাহী সম্পাদক তিনি।

মহাজাগতিক অণুতরঙ্গ বিকিরণের ঘটনাটি বিজ্ঞানীরা কীভাবে বুঝতে পারলেন, সে কাহিনি বিস্তারিত পরিসরে বইটিতে লেখক বর্ণনা করেছেন। বিশদভাবে লিখেছেন জ্ঞানের এই বিশেষ পর্যায়ে আসার পথে আরও সব আবিষ্কারের গল্পও। লেখক বলেছেন, অক্সিজেনের মতো একটি মৌলের আবিষ্কারের মূল নায়ককে খুঁজতে গিয়ে যেমন আরও অনেক মানুষের অবদান দেখতে পাই, তেমনি মহাজাগতিক পটভূমি বিকিরণের আবিষ্কারের পেছনে কোনো একক ব্যক্তির সাফল্য বা ব্যর্থতা কাজ করেনি। এটা অসম্ভবও বটে। মহাজাগতিক প্রথম আলো আবিষ্কারে বিগ ব্যাং মডেলের বিকাশ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, সংশোধন ও প্রমাণের জন্য ধারাবাহিকভাবে বেশ কিছু তাত্ত্বিক, পরীক্ষামূলক ও পর্যবেক্ষণের ধাপ পার হতে হয়েছে। প্রতিটি ধাপেই রয়েছেন এক বা একাধিক নায়ক। কাউকে একক কৃতিত্ব দেওয়া তাই বেশ কঠিন। লেখক বইটিতে বিষয়টি অনুধাবন করানোর জন্য বেশ কয়েকটি ধাপকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করেছেন। যেমন একঘেয়ে ভুতুড়ে হিসহিস, দুটি প্যারাডক্স ও আইনস্টাইনের মহা ভুল, হাবলের প্রথম চমক, আইনস্টাইনের হার এবং লেমেত্রি, গ্যামো অ্যান্ড গং, একজন মানব কম্পিউটার, মহাজাগতিক ফসিল, মহাবিশ্বের প্রথম আলো ইত্যাদি দারুণ সব বিষয়।

মহাজাগতিক প্রথম আলো: বিগ ব্যাং ও 

পটভূমি বিকিরণের খোঁজে

আবুল বাসার

প্রকাশক: প্রথমা প্রকাশন, ঢাকা, প্রকাশকাল: সেপ্টেম্বর, ২০২২, প্রচ্ছদ: মাহবুব রহমান, ২৩৯ পৃষ্ঠা, দাম: ৫০০ টাকা।

বইটি পাওয়া যাচ্ছে

prothoma.com এবং মানসম্মত 

বইয়ের দোকানে।

বিজ্ঞানের ইতিহাস হচ্ছে প্রতিটি আবিষ্কার ও উদ্ভাবনের পেছনের যে সুখ-দুঃখ ও সামাজিক কার্যকারণ বিরাজমান, তার বর্ণনা এবং বিশ্লেষণকে তুলে ধরা। তখনই একজন বিজ্ঞানশিক্ষার্থী বুঝতে পারেন, এই আবিষ্কার ও উদ্ভাবনের পেছনে যাঁরা আছেন, তাঁরা আমাদের মতো মানুষ, আমাদের মতোই তাঁদের হাসি-কান্নার অভিজ্ঞতা রয়েছে। পার্থক্য শুধু অভিজ্ঞতাকে বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখা। ওই শিক্ষার্থী তখন বিজ্ঞানের প্রতি নৈকট্য অনুভব করেন।

এই বইয়ে আবুল বাসার জ্যোতিঃপদার্থবিজ্ঞানের আধুনিকতম বিষয়টির সঙ্গে মানুষের পরিচয় করিয়ে দেওয়ার জন্য একটা প্রচেষ্টা নিয়েছেন। বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব নির্মাণের পেছনে হাসি–কান্না আর সংগ্রামের ইতিহাস জানলেই না মানুষ বিজ্ঞানে কৌতূহলী হয়ে উঠবে, ভালোবাসা জন্ম নেবে, গড়ে উঠবে মানবিক সমাজ।