চেতন-অবচেতনের সীমানা পেরিয়ে

গ্রাফিকস: প্রথম আলো

প্রতিবছর দুজন লেখককে প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক রাবেয়া খাতুনের নামে প্রবর্তিত পুরস্কার দেয় বাংলা একাডেমি। সেই ধারাবাহিকতায় ‘রাবেয়া খাতুন কথাসাহিত্য পুরস্কার ২০২৫’ পেলেন আনিসুর রহমান ও সুব্রত বড়ুয়া।

এবার কথাসাহিত্যিক ক্যাটাগরিতে সিসিফাস শ্রম গল্পগ্রন্থটির জন্য এ পুরস্কার পেয়েছেন আনিসুর রহমান। আর কথাসাহিত্যের সামগ্রিক মূল্যায়নে সুব্রত বড়ুয়াকে পুরস্কার দেওয়া হয়।

নয়টি গল্প অবলম্বনে আনিসুর রহমানের সিসিফাস শ্রম গ্রন্থটি বাংলা সাহিত্যের একালের একটি অনবদ্য সৃষ্টি। প্রতিটি চরিত্র ভিন্ন-ভিন্ন পটভূমিতে বিচিত্র মনস্তত্ত্ব নিয়ে সিসিফাসীয় বিপন্নতাকে ধারণ করে বলেই হয়তো গল্পকার গ্রন্থের নামকরণ করেছেন সিসিফাস শ্রম। তবে প্রায় প্রতিটি গল্পই আমাদের চিরন্তন ও অধুনাতনের এক অদ্ভুত সমান্তরালতার অনুভূতিতে অভিভূত করে—গ্রটেস্কীয় বাস্তবতার আস্বাদ জোগায়, যা আনিসুর রহমানের অন্যতম সাহিত্যিক সফলতা বলে মনে করি।

সিসিফাস শ্রম
আনিসুর রহমান
প্রকাশক: প্রথমা প্রকাশন
প্রকাশ: ফেব্রুয়ারি, ২০২৪
প্রচ্ছদ: মাসুক হেলাল
পৃষ্ঠা: ৮০
মূল্য: ২৫০ টাকা

বইটি সংগ্রহ করতে চাইলে ক্লিক করুন

প্রজন্মান্তর ব্যবধানকে চোখে আঙুল দিয়েও তা প্রজন্ম-পরম্পরার উত্তরাধিকারকে অস্বীকার করে না। ফলে তাঁর গল্পে পূর্বপুরুষের স্মৃতিবিষে আচ্ছন্ন মানুষগুলোকে আমাদের চিরপরিচিত মনে হয়, অথচ সূক্ষ্মরেখায় তারা বর্তমানের একজন হয়ে ওঠে—মহীনের ঘোড়াগুলোর মতো তারা প্রস্তর যুগ থেকে বেরিয়ে এসে একালের পৃথিবীর কিমাকার ডাইনামোর ওপর দিব্যি ঘাস খায়। প্রতিটি গল্পের অভিনব বয়ন-কৌশল প্রচলিত গল্প থেকে তাঁর গল্পকে স্বতন্ত্র করে তোলে আর আমরা ডুবে যাই শালসা-কফ-কলা মেশানো জৈব গন্ধে ভরা এক পরা-মনস্তত্ত্বের অতলে, যেখানে চেতন-অবচেতন প্রতিনিয়ত যাওয়া-আসা করে, বংশগতির মতো পরস্পর মিশে থেকেও যে যার মতো আবার আলাদা হয়ে যায়। প্রেক্ষণ নির্বাচন ও বর্ণন-কৌশলে লেখক প্রতিবার নিজেকে ছাড়িয়ে যান এবং অভিজ্ঞ পাচকের মতো নতুন-নতুন আস্বাদ সৃষ্টি করেন। ‘এপিটাফ’ গল্পটি শুরু হয় ২৫ বছর বয়সী এক যুবকের নিজ মৃত্যুর ঘোষণায় ও তার নিজের সমাধিপ্রস্তর খোঁড়ার মাধ্যমে। আপাত-চমকে যে গল্পটি সীমাবদ্ধ নয়, তা অচিরেই স্পষ্ট হয়, যখন আমরা বুঝতে পারি ওই যুবক বিচ্ছিন্ন নয় তার দাদা কিংবা বাবার হাঁপানি, কাশি, শীতভীতি, যৌন দুর্বলতা, দাম্ভিকতা কিংবা বানরের লেজ বা অর্শ-উত্তরাধিকার থেকে, এমনকি মায়ের মুখের আঁচিল থেকেও। সামূহিক নির্জ্ঞান থেকেও অবধারিতভাবে তার কোনো মুক্তি নেই—এক অদৃশ্য জাদুকরের মতো সে থলি থেকে অসংখ্য মাদুলি আর শিকড়-বাকড়ের মতো প্রতিনিয়ত অবমুক্ত করে চলে যাপিত জীবনের ভয়, ক্লান্তি ও বিবমিষার ভগ্নাংশগুলো এবং সার্কাসের ভয়াবহ উদ্বেগ ও বিপন্নতা নিয়ে চলে তার একান্ত বেঁচে থাকা, যা আসলে কখনোই একান্ত হতে পারে না। তাই সে অতীতের ষড়যন্ত্রের গিনিপিগ না হয়ে বংশপরম্পরার মহান দায়িত্বকে অস্বীকার করে মৃত্যুকে মুক্তির পথ বলে মনে করে এবং স্বভাবতই পূর্বপুরুষের আদালতে তার মৃত্যুদণ্ড ঘোষিত হয়। কিন্তু উত্তরাধিকারের ক্লান্তিকর বেঁচে থাকার অবসান নিশ্চিত করলেও মৃত্যু কি তাকে মুক্তি দেয়, নাকি সেই অনমনীয় অতীতের পুনরাবৃত্তি চলতে থাকে? এই যে সিসিফাস-মানুষ, তার নিয়তি কোনো কালেই বদলায় না, কেবল তার ধরন বদলায়।

এ গ্রন্থের চরিত্রগুলোর চেতনাপ্রবাহের চিত্রণ জীবনানন্দ দাশের কবিতার উপমার মতোই আমাদের স্মৃতি ও অবচেতনার এত গভীরে ঘুরিয়ে নিয়ে আসে যে সে জগতের সঙ্গে লেখকের সত্যিই অন্তরঙ্গতা আছে বলে প্রত্যয় জন্মে, যা খাঁটি লেখার লক্ষণ।

কোনো রকম জোর-জবরদস্তি ছাড়াই লেখক মহান গল্পকারদের মতোই জীবনের একটি ক্লান্তিকর সত্যকে এই যে শাশ্বত করে তুললেন, তা চকিত চমক নয়, বরং লেখকেরও অন্তর্গত রক্তের নিঃসহায়তার সহজাত একটি স্বভাব বলে মনে হয়। কারণ, সিসিফাস শ্রম গল্পের আফসার মিয়া চরিত্রটিও প্রায় একই রকম অসহায় তার অতীতের অনমনীয় অত্যাচারে—যাবতীয় অর্থ-বিত্ত-সুখ-সম্মান সত্ত্বেও তাই সে অবচেতনের আকাশে বিদ্যুৎ চমকে উঠলেই আসন্ন স্মৃতির বৃষ্টির শঙ্কায় কেন্নোর মতো গুটিয়ে যায়—একটি পেলব পয়সার মতো পড়ে রয় আর স্মৃতির বিষ-পিঁপড়াগুলো দখল করে নিয়ে চলে তার সমস্ত অস্তিত্ব। ‘ভ্রষ্ট গণক ও বিকলাঙ্গ তাস’ গল্পেও আমরা দেখি টিয়া পাখিটা একটি একটি করে দুঃস্বপ্নের মতো স্মৃতিগুলো প্রধান চরিত্রের চোখের সামনে মেলে ধরে তাকে বিপন্ন করে তোলে। তখন কথকের মনে হয়, ‘লালমরিচ বিস্ফোরিত হয় বিকট শব্দে। ঝাঁজালো মাশরুম মেঘে নিমজ্জিত, ছিদ্রায়িত আর ছিন্নভিন্ন আমি খসে পড়তে থাকি একটা পাকা পেঁপের অসহায়ত্ব নিয়ে।’ এ দেশের শহরগুলোতে আফসার মিয়া কিংবা এই কথকের মতো স্মৃতিবিষে আচ্ছন্ন অনেক চরিত্র ‘আউটসাইডারে’র মতো ঘুরে বেড়ায়। তাদের একজন হয়েই লেখক সে বিপন্নতাকে প্রকাশ করেন বলেই গল্পগুলো উৎকর্ষ অর্জন করে।

এ গ্রন্থের চরিত্রগুলোর চেতনাপ্রবাহের চিত্রণ জীবনানন্দ দাশের কবিতার উপমার মতোই আমাদের স্মৃতি ও অবচেতনার এত গভীরে ঘুরিয়ে নিয়ে আসে যে সে জগতের সঙ্গে লেখকের সত্যিই অন্তরঙ্গতা আছে বলে প্রত্যয় জন্মে, যা খাঁটি লেখার লক্ষণ। আর অধিকাংশ সময় চেতনাস্রোতের যে গহিনে লেখক আমাদের নিয়ে যান, তা চিরচেনা অথচ চিরদিন দুর্বোধ্য সেই শেওলা জমা পচা-গলা ‘কালেকটিভ আনকনশাস’—আমাদের গ্রাম্যচেতনার জীবাশ্ম-যন্ত্রণা। তাকে কতখানি দূরপ্রসারী, ঘোলা অথচ বাস্তবসম্মত করে তোলা সম্ভব, তা লেখক দেখিয়েছেন ‘১৯৮০’ গল্পে। বিস্মিত হতে হয়, যখন তিনি অসীম সাহস নিয়ে ১৯৮০ সালের যাত্রাশিল্পী জয়নাল ব্যাপারীর দুলদুল ঘোড়াটিকে চেয়ারম্যানের বাড়ির টেলিভিশনের নাটকের ডাকাতদের লক্ষ্য করে ছুটিয়ে দেন। ১৯৮০ সালে সদ্য টেলিভিশনের সামনে বসা মানুষগুলোর অস্পষ্ট চেতনাপ্রবাহের জাল স্বপ্ন বোনা তত সহজ ছিল না। সেই সঙ্গে নতুন কালের আগমনে পুরোনো কালটা কীভাবে জয়নাল ব্যাপারীর মতো অপাঙ্‌ক্তেয় হয়ে উঠল, তা–ও স্পর্শ করে পাঠককে। লেখক এই যে একটা ঘোর লাগা, চেনা অথচ অস্পষ্ট চৈতন্যের পথে পাঠককে সঙ্গে করে নিয়ে ঘুরিয়ে আনেন, তা জাত শিল্পের লক্ষণ।

আনিসুর রহমানের সিসিফাস শ্রম গ্রন্থটি বাংলা সাহিত্যের একালের একটি অনবদ্য সৃষ্টি। প্রতিটি চরিত্র ভিন্ন-ভিন্ন পটভূমিতে বিচিত্র মনস্তত্ত্ব নিয়ে সিসিফাসীয় বিপন্নতাকে ধারণ করে বলেই হয়তো গল্পকার গ্রন্থের নামকরণ করেছেন সিসিফাস শ্রম।

‘আগর আলীর প্রাতর্ভ্রমণ’ গল্পের মধ্য দিয়ে চরিত্রটির চৈতন্যপ্রবাহের ‘ডিটেইলস’ ও তার একান্ত সংলাপগুলো লেখক যে শব্দ-ভাষায় উপস্থাপন করেন, তা সত্যিই সম্ভাবনাময়। লেখকের গল্পরুচির ভেদ লক্ষ করা যায় ‘সেলিব্রেটিং সেঞ্চুরি উইথ আদুরী’, ‘অচেনা মানুষ’ কিংবা ‘মাস্টারপিস’ গল্পে। বদ্রিলার্দ কথিত ‘সিমুলাক্রা’র জীবন্ত দৃষ্টান্ত আমাদের আশপাশে কত সুলভ, তার প্রমাণ মেলে আদুরীর মাধ্যমে। অস্থিসর্বস্ব আদুরী তেতাল্লিশের মন্বন্তর থেকে পপুলার কালচারে এসে বিজ্ঞাপনের ‘জিরো ফিগারে’র মডেল হয়ে কীভাবে পণ্যের প্রোডাকশন বাড়াতে নিজেই প্রোডাক্ট হয়ে যায়, তার একটি চিরন্তন স্যাটায়ারকে লেখক চলিষ্ণু করে তোলেন। সাম্যবাদে বিশ্বাসী এবং নিজেকে নিয়ান্ডারথাল ভাবা অচেনা মানুষটি বস্তিবাসী জাভা মানুষদের সঙ্গে মিশে, নিজের মড়কের মতো প্লেগাক্রান্ত মুখটিকে ঘৃণা করে শেষ পর্যন্ত উপলব্ধি করে যে আসলে সে একাধারে সাম্যবাদী, শোষক এবং শেষ পর্যন্ত ক্রীতদাস। ফলে তার মুক্তি অসম্ভব।

অ্যাবসার্ড আবহে রচিত বিমূর্ত একটি গল্প ‘মাস্টারপিস’, যেখানে বেপরোয়া চালকেরা একেকজন মহান আর্টিস্ট, দুর্ঘটনাগুলো একেকটা কালজয়ী শিল্প আর দুর্ঘটনার ছবিগুলো সংগ্রহকারী কথক কলানুরাগী এবং গোঁফওয়ালা লোকটি শিল্পের জন্য জীবন উৎসর্গকারী আরেক শিল্পানুরাগী, যে পরক্ষণেই গাড়ির নিচে ছিন্নভিন্ন হয়ে একটি মাস্টারপিস বনে যায়। আয়রনি ও স্যাটায়ারকে বিচিত্রভাবে নিরীক্ষার বাসনা আনিসুর রহমানের নানা গল্পে স্পষ্ট চোখে পড়ে। ‘অক্টোবরের শেষ বিকেল’ গল্পটিতে মোবাশ্বের আলীর সময়-সংক্রান্ত দার্শনিক চেতনা ও মনস্তাত্ত্বিক ব্যবচ্ছেদের সূত্রে লেখক প্রথম গল্পের সেই প্রজন্মান্তর ধারণার বিরুদ্ধতা বা ‘অ্যান্টিনেটালিজম’কে আপাত অদ্ভুত চরিত্রটির সংলাপের মধ্য দিয়ে আবার উসকে দেন—‘সন্তানহীন জীবন! দীর্ঘ জীবন পেতে হলে মুছে ফেলতে হবে মস্তিষ্কের অনিবার্য সংকেত। এ এক একান্ত-নিজস্ব ব্যক্তিগত টিকে থাকার যুদ্ধ—প্রকৃতির বিরুদ্ধে, সন্তানের বিরুদ্ধে, প্রজন্মের বিরুদ্ধে, যেখানে পিতৃত্ব-মাতৃত্ব, আবেগ, আলোড়ন, রূপান্তরিত অস্তিত্ব, বংশধারা তুচ্ছ।’ ছোট্ট একটি গল্পগ্রন্থে আনিসুর রহমান তাঁর অভিজ্ঞানকে বিচিত্র নিরীক্ষায় মুদ্রিত করতে সক্ষম হয়েছেন। তাঁর সৃষ্ট চরিত্রগুলো আত্মিক বা শারীরিকভাবে যার যার অবস্থানে সংগ্রামশীল একেকজন সিসিফাস। জাদু ও পরাচর্চা, চৈতন্যপ্রবাহ ও শব্দ-খেলায় আনিসুর রহমান নিজেও পরিশ্রমী ও প্রতিশ্রুতিশীল একজন কথাশিল্পী।