নজরদারিশিল্পের বিকাশে ফিলিস্তিনিরা যেভাবে গিনিপিগ

অস্ট্রেলীয় সাংবাদিক ও লেখক অ্যান্টনি লোয়েনস্টাইন ২০ বছরের বেশি সময় ধরে ফিলিস্তিন-ইসরায়েল প্রসঙ্গে লেখালেখি করছেন। ২০২৩ সালের মে মাসে প্রকাশিত হয় এ বিষয়ে তাঁর বই ‘দ্য প্যালেস্টাইন ল্যাবরেটরি: [হাউ ইসরায়েল এক্সপোর্টস দ্য টেকনোলজি অব অকুপেশন অ্যারাউন্ড দ্য ওয়ার্ল্ড]’। নিত্যনতুন অস্ত্র, সামরিক ও নজরদারির সরঞ্জাম উদ্ভাবনের জন্য ইসরায়েল কীভাবে অধিকৃত অঞ্চলের ফিলিস্তিনিদের গিনিপিগ হিসেবে ব্যবহার করছে, সেসবের বিস্তারিত বর্ণনা আছে বইটিতে।

গ্রাফিকস: প্রথম আলো

দক্ষিণ আফ্রিকার একসময়ের রাজনীতিবিদ ও কালোবাজারি অস্ত্রবাণিজ্যবিশেষজ্ঞ সাংবাদিক অ্যান্ড্রু ফাইনস্টাইনকে ২০০৯ সালের প্যারিস এয়ার শোতে প্রবেশের অনুমতি জোগাড় করতে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছিল। বিখ্যাত এই এয়ার শোতে ইসরায়েলের সবচেয়ে বড় প্রাইভেট প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি কোম্পানি এলবিট সিস্টেমসও অংশ নিয়েছিল।

বিদেশি জেনারেল ও সামরিক সরঞ্জাম কেনাকাটাবিষয়ক কর্মকর্তাদের সামনে এলবিটের একটি প্রচারমূলক ভিডিও প্রদর্শিত হয়েছিল, যেখানে আততায়ী ড্রোন দিয়ে ফিলিস্তিনিদের হত্যার দৃশ্য ছিল। অতিথি জেনারেল ও কর্মকর্তাদের কানে কানে ভিডিওর দুর্বোধ্য অংশগুলো বুঝিয়ে দিচ্ছিলেন এক চিত্তাকর্ষক তরুণী আর সম্ভাব্য ক্রেতাদেশের মান্যবর অতিথিরা আহ্লাদে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করছিলেন।

বিশ্বের সবচেয়ে পুরোনো এই মহাকাশ প্রযুক্তি ও অস্ত্র প্রদর্শনীতে কোনো কোম্পানির মারণাস্ত্র প্রচারণার এমন আয়োজন অ্যান্ড্রুর চিন্তাজগতে বড় ধাক্কা দিয়েছিল। ভিডিওটিতে যেসব ফুটেজ দেখেছিলেন, পরে তিনি খতিয়ে জানতে পারলেন, এসব ফুটেজ কয়েক মাস আগে ধারণ করা। ইসরায়েলের হামলার সময় অধিকৃত পশ্চিম তীর ও গাজার ফিলিস্তিনিদের নজরদারি ও হত্যা করতে এসব ড্রোন ব্যবহার করা হয়েছিল। ফুটেজের একটি ড্রোন নিশানায় আঘাত হেনেছিল, এতে এক শিশুসহ কয়েকজন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছিল।

‘দ্য শ্যাডো ওয়ার্ল্ড: ইনসাইড দ্য গ্লোবাল আর্মস ট্রেড’ বইয়ের লেখক অ্যান্ড্রু ফাইনস্টাইন—অ্যান্টনি লোয়েনস্টাইনকে এক আলাপে এসব কথা বলেন। ইসরায়েলের অস্ত্র ও প্রযুক্তিশিল্প এবং সারা বিশ্বে কীভাবে তা বিপণন করা হয়, তার সঙ্গে এভাবেই তাঁর হাতেখড়ি হয়েছিল।

দ্য প্যালেস্টাইন ল্যাবরেটরি বইয়ে ইসরায়েল নিজেদের সামরিক, গোয়েন্দা, নজরদারি এবং সাইবার খাতের ‘জঘন্য’ অভিজ্ঞতা কীভাবে বিশ্বময় রপ্তানি করছে, তা ধাপে ধাপে উন্মোচন করেছেন লোয়েনস্টাইন।

জনসংখ্যার দিক থেকে ইসরায়েল বিশ্বের ৯৭তম দেশ। মানে বেশ ছোট একটি দেশ। কিন্তু অস্ত্র বিক্রির দিক থেকে দেশটি পৃথিবীর নবম বৃহত্তম। বর্তমানে ইসরায়েলের সামরিক শিল্প খাতের বাজারমূল্য প্রায় ১ হাজার ৩০০ কোটি ডলার।
অ্যান্ড্রু ফাইনস্টাইনের বই ‘দ্য শ্যাডো ওয়ার্ল্ড: ইনসাইড দ্য গ্লোবাল আর্মস ট্রেড’–এর প্রচ্ছদ
ছবি: অ্যামাজন.কম

একসময় যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের সর্বশেষ প্রযুক্তি ও অস্ত্রশস্ত্র লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশে পরীক্ষামূলকভাবে ব্যবহার করেছে। পরবর্তীকালে ভিয়েতনাম, আফগানিস্তান, ইরাকসহ আরও কিছু দেশে একই কাজ করেছে ওয়াশিংটন। আর ১৯৪৮ সালে জন্মলগ্ন থেকে ফিলিস্তিনিদের ওপর একই কাজ করে আসছে ইসরায়েল।

১৯৬৭ সালের ছয় দিনের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের পর এর ব্যাপকতা ও ধরনে অভূতপূর্ব পরিবর্তন আসে। কারণ, তখন পশ্চিম তীর, পূর্ব জেরুজালেম ও গাজা দখলের মধ্য দিয়ে তারা কিছু ‘বান্দা’ গিনিপিগ পেয়ে গেছে।

এই তথাকথিত শত্রু জনগোষ্ঠীকে চোখে চোখে রাখতে প্রায় ছয় দশক ধরে নিত্যনতুন নজরদারি ও গোয়েন্দা প্রযুক্তি এবং নির্যাতনের কৌশল ফিলিস্তিনিদের ওপর পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়ে আসছে ইসরায়েল। রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি বেসরকারি কোম্পানিকে এসব কাজে যুক্ত করা হয়েছে।

এসব প্রযুক্তি অন্য যেকোনো দেশের তুলনায় কেন সেরা, তা বিদেশি ক্রেতাদের কাছে তুলে ধরতে অভাবনীয় সব বিজ্ঞাপন ও বিজ্ঞাপনী কৌশলের আশ্রয় নিয়েছে ইসরায়েল। এর মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী প্রচারণাটি হলো আমাদের সব সামরিক সরঞ্জাম ও প্রযুক্তি ফিল্ড-প্রুভেন বা ব্যাটল-টেস্টেড তথা রণক্ষেত্রে সেরা বলে প্রমাণিত।

জনসংখ্যার দিক থেকে ইসরায়েল বিশ্বের ৯৭তম দেশ। মানে বেশ ছোট একটি দেশ। কিন্তু অস্ত্র বিক্রির দিক থেকে দেশটি পৃথিবীর নবম বৃহত্তম। বর্তমানে ইসরায়েলের সামরিক শিল্প খাতের বাজারমূল্য প্রায় ১ হাজার ৩০০ কোটি ডলার।

ইসরায়েলের বৃহত্তর সামরিক ও প্রযুক্তিশিল্প খাত এবং গোয়েন্দা বিভাগ—নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে বছরের পর বছর ধরে নানা ধরনের ‘মিথ’ তৈরি করেছে। সরকারি-বেসরকারি কূটনীতি ও প্রচারণার মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী তা ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।

২০২১ সালের মাঝামাঝি সময়ে ইসরায়েলি কোম্পানি এনএসও গ্রুপের মোবাইল হ্যাকিং প্রযুক্তি পেগাসাসের কেলেঙ্কারি প্রথমবারের মতো ফাঁস হয়। ভারত, সৌদি আরব, মেক্সিকো, হাঙ্গেরি, তুরস্কসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকারবিরোধী নেতা, সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মী বা সরকারি কর্মকর্তাদের ফোনে আড়ি পাতার জন্য এই স্পাইওয়্যার ব্যবহার করা হয়েছে।

অ্যান্টনি লোয়েনস্টাইন ২০ বছরের বেশি সময় ধরে ফিলিস্তিন-ইসরায়েল প্রসঙ্গে লেখালেখি করছেন
ছবি: সংগৃহীত

জামাল খাসোগি হত্যাকাণ্ডেও পেগাসাস স্পাইওয়্যার ব্যবহার করা হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্র, স্পেন ও ফরাসি কর্মকর্তাদের মোবাইল ফোনেও এই প্রযুক্তির মাধ্যমে হানা দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থাও (এফবিআই) পরীক্ষামূলকভাবে কিছুদিন এই প্রযুক্তি ব্যবহার করেছে।

ইসরায়েল বারবার দাবি করে এসেছে, এনএসও গ্রুপ একটি বেসরকারি কোম্পানি। এর সঙ্গে ইসরায়েল রাষ্ট্রের কোনো সম্পর্ক নেই। কিন্তু লোয়েনস্টাইন তাঁর গবেষণায় দেখিয়েছেন, এই দাবি মিথ্যা। ইসরায়েলের প্রায় সব গোয়েন্দা, নজরদারি, সাইবার বা অস্ত্র কোম্পানির মতো এনএসও গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতারাও দেশটির সাবেক সেনা কর্মকর্তা। ইসরায়েলের গোয়েন্দা, প্রতিরক্ষা, স্বরাষ্ট্র, পররাষ্ট্র বিভাগ বা সেনাবাহিনীর সঙ্গে এসব প্রতিষ্ঠানের নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। তারা ইসরায়েলের বৃহত্তর ‘গোয়েন্দা কূটনীতির’ অংশ।

আগেই বলা হয়েছে, ইসরায়েলের রপ্তানি আয়ের উল্লেখযোগ্য একটি অংশ আসে অস্ত্র ও প্রযুক্তি খাত থেকে। কিন্তু বাণিজ্যিক দিকের পাশাপাশি সামরিক, গোয়েন্দা বা নজরদারি সরঞ্জাম রপ্তানির কূটনীতিক দিকটাও ইসরায়েলের জন্য সমান গুরুত্বপূর্ণ। এসব সরঞ্জাম বিক্রির মাধ্যমে ক্রেতাদেশকে ধীরে ধীরে নিজেদের বলয়ে নিয়ে আসে ইসরায়েল। ফিলিস্তিনিদের নিপীড়ন, বিতাড়ন বা ভূমি দখল নিয়ে জাতিসংঘসহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক ফোরামে ক্রেতাদেশ যাতে উচ্চকণ্ঠ না হয়, সেই চেষ্টা করে ইসরায়েল।

এসব কিছুর বাইরে আদর্শিক দিকও আছে। এর উদাহরণ হিসেবে দ্য প্যালেস্টাইন ল্যাবরেটরিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সাম্প্রদায়িক ও কর্তৃত্ববাদী সরকারের সঙ্গে নেতানিয়াহুর সম্পর্ক নিয়ে কিছুটা আলাপ করা হয়েছে। আরেকটি দেশ প্রসঙ্গে একটি পুরোনো উদাহরণও টানা হয়েছে, যা বেশ চমকপ্রদ।

ইসরায়েল বারবার দাবি করে এসেছে, এনএসও গ্রুপ একটি বেসরকারি কোম্পানি। এর সঙ্গে ইসরায়েল রাষ্ট্রের কোনো সম্পর্ক নেই। কিন্তু লোয়েনস্টাইন তাঁর গবেষণায় দেখিয়েছেন, এনএসও গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতারা দেশটির সাবেক সেনা কর্মকর্তা। এবং ইসরায়েল রাষ্ট্রের বৃহত্তর ‘গোয়েন্দা কূটনীতির’ অংশ।

১৯৭৬ সালে ইসরায়েলের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইৎসহাক রাবিন দক্ষিণ আফ্রিকার প্রধানমন্ত্রী জন ভরস্টারকে রাষ্ট্রীয় সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় দক্ষিণ আফ্রিকার এই শ্বেতাঙ্গ বর্ণবাদী নেতা নাৎসিদের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন। সফরে তিনি জেরুজালেমের হলোকাস্ট (ইউরোপে ইহুদি গণহত্যার) স্মৃতিসৌধে গিয়েছিলেন।

ভরস্টারের সফরের কিছুদিন পর দক্ষিণ আফ্রিকার সরকারি বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ‘ইসরায়েল ও দক্ষিণ আফ্রিকার মধ্যে একমাত্র বড় মিল হলো আমাদের উভয় দেশ এমন একটি অঞ্চলে অবস্থিত, যেখানকার চারপাশের কৃষ্ণাঙ্গ মানুষ আমাদের প্রতি শত্রুতাপূর্ণ মনোভাব পোষণ করে।’

অ্যান্টনি লোয়েনস্টাইনের বই ‘‘দ্য প্যালেস্টাইন ল্যাবরেটরি’র প্রচ্ছদ
ছবি: অ্যামাজন.কম

আদর্শগত মিল নেই বা তাৎক্ষণিক কূটনৈতিক সমর্থন পাওয়ার আশা নেই, এমন দেশেও ইসরায়েল সব ধরনের সামরিক ও নজরদারি সরঞ্জাম বিক্রি করে। লোয়েনস্টাইন এমন সব দেশ হিসেবে বাংলাদেশ, ইন্দোনেশিয়া বা ফিলিপাইনের কথা বলেন। এসব দেশের কর্তৃত্ববাদী শাসকেরা বিরোধী নেতা-কর্মীদের তথ্য গোপনে সংগ্রহের জন্য এনএসও না হলেও ইসরায়েলের অন্যান্য কোম্পানির প্রযুক্তি কিনেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

স্বৈরাচারী, কর্তৃত্ববাদী শাসকদের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের গণতান্ত্রিক দেশগুলোও দীর্ঘদিন ধরে নানা ধরনের ইসরায়েলি গোয়েন্দা বা নজরদারি প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। টুইন টাওয়ারে হামলার পর নতুন প্রতিষ্ঠিত যুক্তরাষ্ট্রের হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের সঙ্গে শুরু থেকে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করে আসছে ইসরায়েল।

ইসরায়েলের সেলিব্রাইট কোম্পানির সরঞ্জাম যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় সব অঙ্গরাজ্যের পুলিশ বিভাগের পাশাপাশি অন্যান্য সংস্থাও ব্যবহার করে। কোম্পানিটির মোবাইল ফোনের তথ্য চুরিতে পারঙ্গম বিভিন্ন সামগ্রী ব্যবহারে রাশিয়াও পিছিয়ে নেই। নিজেই শীর্ষস্থানীয় নজরদারি প্রযুক্তি উদ্ভাবনকারী দেশ হওয়া সত্ত্বেও চীনও ইসরায়েলের কিছু কিছু নজরদারি পণ্য কিনে থাকে।

সীমান্তে অভিবাসীর আগমন ঠেকাতে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের ড্রোন, থার্মাল ক্যামেরা, মোশন সেন্সর সিস্টেম, কল নজরদারি, কণ্ঠস্বর শনাক্ত তথ্য বা সিসিটিভির ফুটেজ বিশ্লেষণের প্রযুক্তি ব্যবহার করে। তা ছাড়া সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া বা সীমান্ত প্রাচীর নির্মাণের জন্যও তারা ইসরায়েলি প্রযুক্তি ব্যবহার করে আসছে।

এসব কিছুর অর্থ হলো ফিলিস্তিনিদের দমন–নিপীড়ন, হত্যা ও তাঁদের ভূমি দখলের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাকে আন্তর্জাতিক ব্যবসায় পরিণত করেছে ইসরায়েল। ইরান বা উত্তর কোরিয়ার মতো রাষ্ট্রীয়ভাবে ঘোষিত শত্রুদেশ ছাড়া বিশ্বের বাকি দেশগুলোর যেখানেই সম্ভব হচ্ছে, তথাকথিত এই ব্যাটল-টেস্টেড প্রযুক্তি ও সামরিক সরঞ্জাম বিক্রি করছে ইসরায়েল। এ ক্ষেত্রে অ্যান্টিসেমিটিজম বা ইহুদিবিদ্বেষ কোনো বাধা নয়।

তুরস্ক, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই), বাহরাইন বা মিসরসহ প্রতিবেশী অনেক দেশ ইসরায়েলের সামরিক ও গোয়েন্দা প্রযুক্তি চুপিসারে বা প্রকাশ্যে অনেক আগে থেকে ব্যবহার করছে। ১৯৭০–এর দশকে শাহ মুহাম্মদ রেজা পাহলভির আমলে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি তৈরিতেও সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছিল ইসরায়েল।

লোয়েনস্টাইনের দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের মিনিয়াপোলিসে ২০২০ সালের ২৫ মে জর্জ ফ্লয়েডকে গলায় হাঁটু দিয়ে চেপে ধরে পুলিশ কর্মকর্তা ডেরেক শভিন যে কায়দায় হত্যা করেছিলেন, সেই কায়দাটি ইসরায়েলের উদ্ভাবন। ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) ও পুলিশ সদস্যরা অধিকৃত পশ্চিম তীর এবং পূর্ব জেরুজালেমে ফিলিস্তিনিদের ওপর দশকের পর দশক ধরে কায়দাটি চর্চা করে আসছেন। তা ছাড়া ভারতে মুসলিমদের বাড়িঘর, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বুলডোজার গিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়ার কৌশলও ইসরায়েল থেকে আমদানি করা বলে ধারণা করা হয়।

বিশ্বমোড়ল ও চুনোপুঁটি কর্তৃত্ববাদী সরকারগুলো আন্তর্জাতিক মূল্যবোধ, নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে কীভাবে বর্ণবাদী জায়নবাদী জাতিরাষ্ট্র ইসরায়েলের সঙ্গে হাত মিলিয়ে বিশ্বকে ক্রমে ধর্মীয় উগ্রবাদের লীলাভূমিতে পরিণত করেছে, তার বিষাদময় বর্ণনাও রয়েছে দ্য প্যালেস্টাইন ল্যাবরেটরিতে।

ইসরায়েল একদিকে নিজেদের ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র, আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা, গোয়েন্দা সরঞ্জামের শ্রেষ্ঠত্ব প্রচারের জন্য যুদ্ধক্ষেত্রের সরাসরি ফুটেজ বিক্রেতাদের দেখাচ্ছে। অন্যদিকে বেশির ভাগ পশ্চিমা মূলধারার সংবাদমাধ্যম দশকের পর দশক ইসরায়েলের পক্ষে ভাষ্য তৈরি করে আসছে।

বিশ্বমোড়ল ও চুনোপুঁটি কর্তৃত্ববাদী সরকারগুলো আন্তর্জাতিক মূল্যবোধ, নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে কীভাবে বর্ণবাদী জায়নবাদী জাতিরাষ্ট্র ইসরায়েলের সঙ্গে হাত মিলিয়ে বিশ্বকে ক্রমে ধর্মীয় উগ্রবাদের লীলাভূমিতে পরিণত করেছে, তার বিষাদময় বর্ণনাও রয়েছে দ্য প্যালেস্টাইন ল্যাবরেটরিতে। লোয়েনস্টাইন ইঙ্গিত করেছেন, নব্য-উদারতান্ত্রিক নজরদারি রাষ্ট্র, বহুসাংস্কৃতিক কর্তৃত্ববাদী পুঁজিবাদ, জাতিগৌরবনির্ভর একনায়কতন্ত্রের চলতি যুগের সঙ্গে জায়নবাদী ইসরায়েলের গভীর সম্পর্ক আছে।

অ্যান্টনি লোয়েনস্টাইনের গবেষণা থেকে আল জাজিরা তৈরি করেছে তথ্যচিত্র
ছবি: সংগৃহীত

লোয়েনস্টাইন মনে করেন, বিশ্বে জলবায়ু সংকট, যুদ্ধবিগ্রহ, শরণার্থী ও কর্মসংস্থানের সমস্যা বাড়ছে। দুর্বল হয়ে পড়ছে জবাবদিহিমূলক গণতন্ত্র। কর্তৃত্ববাদী পুঁজিবাদের উত্থানের পেছনে এসব কিছুর বড় ভূমিকা আছে। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে ইসরায়েল আকর্ষণীয় আদর্শ হিসেবে হাজির হয়েছে। অস্থিতিশীল বিশ্বের সংকটগুলোকে পুঁজি করে ইসরায়েলের নিপীড়নমূলক মডেল সারা বিশ্বে দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে। কারণ, সব কর্তৃত্ববাদী সরকার বিরোধীদলীয় নেতা-কর্মী, সমালোচক, লেখক-সাংবাদিক থেকে শুরু করে তথাকথিত অনাকাঙ্ক্ষিত জনগোষ্ঠীকে বা উদ্বাস্তুদের নিয়ন্ত্রণ করতে চায়।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) দ্রুত বিস্তারের সঙ্গে বর্তমানে নজরদারিব্যবস্থা আরও তীব্র হচ্ছে। ওপেনএআই, গুগল ও আমাজন বা চীনের সেন্সটাইম বা ক্লাউডওয়াকের মতো এআই কোম্পানিগুলোর চাহিদা বিশ্বজুড়ে বাড়ছে। লোয়েনস্টাইনের আশঙ্কা, এই পরিস্থিতি থেকে বিশ্ব সহজে নিস্তার পাবে না। কিন্তু একই সঙ্গে গণতন্ত্র ও কর্তৃত্ববাদ বা চরম নজরদারির মাধ্যমে শাসন বেশি দিন টিকতে পারে না বলেও মনে করেন তিনি।

ইসরায়েল নিয়ে লোয়েনস্টাইনের বক্তব্য হলো, ফিলিস্তিনিদের গিনিপিগ বানিয়ে এবং সেই অভিজ্ঞতা লব্ধ জ্ঞান থেকে তৈরি প্রযুক্তি ও অস্ত্র বিদেশে রপ্তানি করে করে ইসরায়েল কীভাবে, কত দিন তথাকথিত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে টিকে থাকবে, তা একটি বড় প্রশ্ন। তাই ইসরায়েল ও তার সমর্থকদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে, তারা কি কূপমণ্ডূক জায়নবাদ আঁকড়ে থাকবে, না উদার ও ন্যায্য দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করবে? বিলাপের মতো শোনালেও এসব কথার ঐতিহাসিক মূল্য আছে।

লোয়েনস্টাইন ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, ইসরায়েল নিজের আচরণ ও প্রতিরক্ষানীতি ঢেলে না সাজালে বিশ্বে তার প্রতি সমর্থনে ভাটা পড়বে। ২২ মাস অতিক্রম হওয়া গাজা যুদ্ধের মধ্য দিয়ে তাঁর সেই ভবিষ্যদ্বাণী সত্য প্রমাণিত হয়েছে। এখন সারা বিশ্বে ইসরায়েলের প্রতি জনসমর্থন ব্যাপক কমেছে, বিক্ষোভ বেড়েছে। নিজেদের কয়েক দশকের ভুক্তভোগীর বয়ান তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ছে। সম্প্রতি ১০ দিনের যুক্তরাষ্ট্র সফর শেষে ইসরায়েলের সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেট সেই কথাই বলেছেন। তাঁর মতে, যুক্তরাষ্ট্রে দীর্ঘদিনের ইসরায়েলের খ্যাতি ‘ধসে পড়ছে’।

লোয়েনস্টাইনের জন্ম ও বেড়ে ওঠা জার্মানি বংশোদ্ভূত অস্ট্রেলিয়ার এক উদার জায়নবাদী পরিবারে। ‘দ্য প্যালেস্টাইন ল্যাবরেটরি’ ২০২৩ সালের মে মাসে লন্ডন ও নিউইয়র্ক থেকে একযোগে প্রকাশ করেছে প্রকাশনা সংস্থা ভার্সো। একই মাসে অস্ট্রেলিয়া থেকে প্রকাশ করেছে স্ক্রাইব। লোয়েনস্টাইনের ওয়েবসাইট থেকে জানা যাচ্ছে, বইটি এরই মধ্যে তুর্কি, আরবি, স্প্যানিশ, সুইডিশ, জাপানি, ইতালি, কোরীয়সহ বিশ্বের অনেক ভাষায় অনূদিত ও প্রকাশিত হয়েছে।