শাহ আবদুল করিম প্রথম জীবনে উজ্জীবিত হয়েছিলেন বাউলঘরানার গানের পাশাপাশি গণমানুষের শিকড়ে প্রোথিত গান—গণসংগীত দ্বারা। ক্রমে তা বিকশিত হয় লোকায়ত অভিজ্ঞতার আলোকে। ক্রমে জীবনে অঙ্গীকৃত হয়ে যায় লোকায়ত অঙ্গীকার। ‘গণ’ ও ‘বাউল’ গানই যার অন্যতম মাধ্যম। বাউলঘরানার অন্যান্য শিল্পীর চেয়ে আবদুল করিমের শিল্পীসত্তা ও শিল্পসৃষ্টি স্বাতন্ত্র্যিক ঐশ্বর্যে এবং বৈশিষ্ট্যে তাৎপর্যময়।
বাঙালির বাউল–ঐতিহ্য যথাযথভাবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে লালনের গানের মধ্য দিয়ে। বাউল–ঐতিহ্যের সাধনাকে ও চৈতন্যকে ধারণ করেছেন শাহ আবদুল করিম। অবশ্য এর জন্য সামাজিক বিরূপের যে প্রতিবেশ, তার সম্মুখীন হতে হয়েছে তাঁকে। লড়াইও করতে হয়েছে। বিরূপ পরিপার্শ্বের সীমাবদ্ধতাকে কাটিয়ে ওঠার ক্ষেত্রে সাম্প্রদায়িকতাকে মাড়িয়ে যেতে হয়েছে তাঁকে—স্বপ্নকে লালন করতে হয়েছে। বাউল–ঐতিহ্যের মতো তাঁকে দেহসাধনাকে কেন্দ্রে রেখেই গান লিখতে হয়েছে। তবে এর বাইরেও অন্যান্য ধারার গান লিখেছেন। যেমন ‘পীর-মুর্শিদ স্মরণ’, ‘বিচ্ছেদ’, ‘মনঃশিক্ষা’, ‘নিগূঢ় তত্ত্ব’ প্রভৃতি।
সুমনকুমার দাশ লোকসংস্কৃতি গবেষক, লোকসংস্কৃতিবিদ। যতীন সরকার তাঁকে ‘মৃত্তিকা-সংলগ্ন বুদ্ধিজীবী’ বলেছেন। বাংলা একাডেমি থেকে ২০২৩ সালে ফোকলোর পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। ২০১৫ সালে প্রথমা প্রকাশন থেকে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর লেখা গ্রন্থ ‘শাহ আবদুল করিম জীবন ও গান’। তিনটি অধ্যায়ে আয়োজন করা হয়েছে গ্রন্থটি। প্রথম অধ্যায়ে শাহ আবদুল করিমের ‘জীবন’শীর্ষক আলোচনা করেছেন সুমনকুমার দাশ।
শাহ আবদুল করিমের জন্ম ১৯১৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি, ধল গ্রামে। গ্রামটির অবস্থান বৃহত্তর সিলেটের বর্তমান সুনামগঞ্জ জেলার দিরাই উপজেলায়। বার্ধক্যজনিত রোগে মৃত্যুবরণ করেন ২০০৯ সালের ১২ সেপ্টেম্বর। ১৯৫৭ সালের দিকে তিনি ধলগ্রাম ছেড়ে পাশের পাড়া উজানধলে বসতি স্থাপন করেছেন। তাঁর বাবার নাম ইব্রাহিম আলী, মায়ের নাম নাইওরজান বিবি।
করিমের বাল্যকালের দুটি পর্যায়। এক. ১০ বছর পর্যন্ত তিনি তাঁর দাদার ছোট ভাইয়ের সংসারে ছিলেন। দুই. তাঁর দাদার মৃত্যুর পর বাবার সংসারে প্রচণ্ড অভাব-অনটনের জন্য স্কুলে না গিয়ে গ্রামে রাখালের কাজে যোগ দেন মাত্র দুই টাকা মাসিক বেতনে। ভাটির অঞ্চলে বর্ষায় রাখালের কাজ না থাকায় করিম ধলবাজারের একটি মুদিদোকানেও চাকরি করেছেন।
সুমনকুমার দাশ করিমের গণসংগীত নিয়ে শুধু আলোচনাই করেননি, বিশ্লেষণও করেছেন। শাহ আবদুল করিমের গানে স্বদেশ–চেতনা এবং গণমানুষের জাগরণ ঘটানোর যে উদ্দীপনা, তা নতুন তাৎপর্য পায় করিমের গণসংগীতে।
বাল্যকালে তাঁর অক্ষরজ্ঞানের সঙ্গে পরিচয় ঘটেছিল বিশেষ প্রতিবেশে। যৌবনে পা রাখার পর কীভাবে সংগীত তাঁকে সাধনার পথে অগ্রসর করে তার বিবরণও রয়েছে। করিম যে দেশ ছাড়িয়ে বিদেশের মাটিতেও তিনবার আমন্ত্রিত হয়ে সুনাম অর্জন করেছিলেন, তারও বর্ণনা করেছেন লেখক। তিনি ‘লোকসংগীত’–এর ক্ষেত্রে গৌরবময় অবদান ও কীর্তির স্বীকৃতিস্বরূপ ২০০১ সালে একুশে পদকে ভূষিত হন।
শাহ আবদুল করিম জীবন ও গান
সুমনকুমার দাশ
প্রকাশক: প্রথমা প্রকাশন
প্রথম প্রকাশ: নভেম্বর ২০১৫
পঞ্চম মুদ্রণ: মে ২০২৩
প্রচ্ছদ ও অলংকরণ: অশোক কর্মকার
পৃষ্ঠা: ১৬০
মূল্য: ৪০০ ৳
প্রথম স্ত্রী তালাকপ্রাপ্ত হওয়ার পর দ্বিতীয়বার বিয়ে করেন। দ্বিতীয় স্ত্রীর সরলা নাম অবশ্য তারই দেওয়া। দ্বিতীয় বিয়ের ১৬ বছর পর সরলার গর্ভে জন্ম নেন নূরজালাল (বাবুল)। বাউলপন্থার সাধনার কারণে শাহ আবদুল করিম সন্তান নিতে চাইছিলেন না। তিনি সংগীত সাধক করমউদ্দিন এবং বাউলসাধক রশিদ উদ্দিনের কাছে দীক্ষা নেন। তাঁর গানের সৃষ্টিকে তিনি ধরে রেখেছেন কয়েকটি গানের সংকলনের মধ্য দিয়ে। গানের সংকলনভুক্ত বইগুলো হচ্ছে ‘আফতাব সঙ্গীত’ (১৯৪৮), ‘গণসঙ্গীত’ (১৯৫৭), ‘কালনীর ঢেউ’ (১৯৮১), ‘ধলমেলা’ (১৯৯০), ‘ভাটির চিঠি’ (১৯৯৮), ‘কালনীর কূলে’ (২০০১) ও ‘শাহ আবদুল করিম রচনাসমগ্র’ (২০০৯)।
শাহ আবদুল করিম গণসংগীত ও লোকসংগীত (বাউলগান) উভয় ধারায় নিজেকে সৃষ্টিশীল রেখেছিলেন। খ্যাতির প্রারম্ভিক কালে উভয় ধারার গীতিকার ও শিল্পী হলেও তিনি খ্যাতির শীর্ষে পৌঁছেছেন বাউলসাধক ও বাউলশিল্পী হিসেবে। তবে তাঁর সৃষ্টিতে বৈচিত্র্য রয়েছে।
শাহ আবদুল করিমের সৃষ্টিকে আবিষ্কার, তার জন্য যথাযথ ক্ষেত্রসমীক্ষা, শাহ আবদুল করিমের সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে তাঁর দর্শনকে খুঁজে নেওয়া, এই কাজও সহজসাধ্য নয়। এর জন্য প্রয়োজন নিজের গাটের টাকাপয়সা খরচ করে সৃষ্টিকারীর সান্নিধ্য লাভ এবং সেই সান্নিধ্য পাওয়ার মুহূর্তগুলোর ভেতর এবং বাইরের আর গণগীতিকার ও বাউলসাধকের ঘরানা সম্পর্কে অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে জ্ঞান লাভের পর মেধা ও মনন খাটিয়ে অনুপুঙ্খ বিশ্লেষণ। এই কাজ করার ক্ষেত্রে অগ্রগণ্য নামটি এসে যায় সুমনকুমার দাশের।
সুমনকুমার দাশ এই গ্রন্থের প্রথম অধ্যায়ে শাহ আবদুল করিমের ‘জীবন’শীর্ষক আলোচনা করেছেন, যা ওপরের অংশে আমার আলোচনা রয়েছে। তিনি দ্বিতীয় অধ্যায়ে শাহ আবদুল করিমের ‘সৃষ্টি’ নিয়ে অনুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করেছেন। সুমনকুমার দাশ এই পর্বে, অর্থাৎ শাহ আবদুল করিমের ‘সৃষ্টি’ নিয়ে বিশ্লেষণ পর্বে শুধু তত্ত্বগত বা পারিপার্শ্বিক বিশ্লেষণই নয়, নানান তথ্য প্রদানের দায়িত্বও পালন করেছেন। এ ক্ষেত্রে ‘আফতাব সঙ্গীত’–সম্পর্কিত গ্রন্থের তথ্যগত দিকটিই প্রধান। কারণ, এই গ্রন্থ করিমের কাছেও নেই। কোনো গবেষকও খুঁজে পাননি।
সুমনকুমার দাশ করিমের গণসংগীত নিয়ে শুধু আলোচনাই করেননি, বিশ্লেষণও করেছেন। শাহ আবদুল করিমের গানে স্বদেশ–চেতনা এবং গণমানুষের জাগরণ ঘটানোর যে উদ্দীপনা, তা নতুন তাৎপর্য পায় করিমের গণসংগীতে।
বাউল সাধনার গানের গ্রন্থ ‘কালনীর ঢেউ’। এ ছাড়া ‘কালনীর কূলে’ গ্রন্থটিতেও বাউল আঙ্গিকের একাধিক গান রয়েছে। বাউলগানে মানবতাবাদ, সৃষ্টিকর্তা সম্পর্কে বা সৃষ্টির অস্তিত্ব সম্পর্কে প্রথাগত ধারণার বাইরে সত্য উদ্ঘাটনের স্বরূপকে করিম যে বাস্তবসত্য রূপে প্রতিভাত করেছেন এ সম্পর্কে যথার্থ মূল্যায়িত হয়েছে।
করিমের সামগ্রিক জীবন ও সৃষ্টির গভীর উপলব্ধিকে গবেষকের বোধগম্যতায় বিশ্লেষায়িত করেছেন সুমনকুমার। এই কর্মযজ্ঞে যে শাহ আবদুল করিম–সম্পর্কিত দীর্ঘদিনের প্রস্ততি এবং অন্বেষা, অনুসন্ধান ও আবিষ্কারের ফসল, তা সার্থক।
সুমনকুমার দাশ বিভিন্ন তত্ত্বের পৃথক পৃথক গানের বিশ্লেষণ করেছেন যথার্থভাবে। বিশ্লেষণে এসেছে মুর্শিদ ভজনার নির্দিষ্ট রীতিনীতি, গুহ্যতত্ত্ব, দমসাধনা প্রভৃতি। করিমের দমসাধনা–বিষয়ক একাধিক গান রয়েছে। গুরুই যে বাউলসাধনার যাবতীয় ক্রিয়াকলাপের নির্দেশক, তা করিমও যথার্থভাবে গুরুত্ব দিয়েছেন, উপলব্ধি করেছেন। এ ক্ষেত্রে করিমের দমসাধনা–বিষয়ক একটি গান তুলে ধরা হলো, ‘এ কূল সে কূল দুজাহানে/ তরে যাবে নামের গুণে/ টের পেয়েছে আশেকগণে/ কোন কূলে খেলে মৌলা॥/ মুর্শিদের আওয়াজের বলে/ বালকের ক্বলব খোলে/ দমের কোঠায় চাবি দিলে/ দেখবে রে নুরের খেলা॥/ বন্দী হয়ে মায়াজালে/ ভবের জনম যায় বিফলে/ বাউল আবদুল করিম বলে/ ভরসা মুর্শিদ মৌলা॥’
‘ধলমেলা’ (১৯৯০), শাহ আবদুল করিমের ১৯৪ পঙ্ক্তির সুদীর্ঘ গানের একটি পুস্তিকা। অবশ্য ‘ধলমেলা’র আগে ও পরে আরও দুটি গানসংকলিত। এই পুস্তিকায় করিমের ধলমেলার গানের মধ্য দিয়ে উঠে এসেছে ‘বর্তমানের চালচিত্র এবং সমৃদ্ধ অতীতের বয়ান’।
‘শাহ আবদুল করিম রচনাসমগ্র’ প্রকাশিত হয়েছে ২০০৯ সালে। সমগ্রটির সংকলন ও গ্রন্থন করেছেন শুভেন্দু ইমাম। এই গ্রন্থেরও আলোচনা করেছেন সুমনকুমার দাশ। তৃতীয় অধ্যায়ে শাহ আবদুল করিমের ৫০টি গান সংকলিত হয়েছে। এ ছাড়া পরিশিষ্ট হিসেবে তাঁর জীবনপঞ্জি, সুমনকুমার দাশের গ্রহণ করা শাহ আবদুল করিমের একটি সাক্ষাৎকার ও জীবনবৃত্তান্তমূলক টীকা সংযোজিত হয়েছে, যা খুবই প্রাসঙ্গিক।
শাহ আবদুল করিম গণগীতিকে জীবনসংগ্রামে ও বাউলগীতিকে সাধনা হিসেবে গ্রহণ করেছেন, যার কেন্দ্রে রয়েছে মানবিক মূল্যবোধ। তাই তাঁর গানে গানে মানবিক ভাষা রূপ লাভ করেছে মানুষ–সম্পর্কিত নির্যাসের ভেতর দিয়ে। ‘শাহ আবদুল করিম জীবন ও গান’ গ্রন্থে করিমের সামগ্রিক জীবন ও সৃষ্টির গভীর উপলব্ধিকে গবেষকের বোধগম্যতায় বিশ্লেষায়িত করেছেন সুমনকুমার দাশ। তার এই কর্মযজ্ঞে যে শাহ আবদুল করিম–সম্পর্কিত দীর্ঘদিনের প্রস্ততি এবং অন্বেষা, অনুসন্ধান ও আবিষ্কারের ফসল, তা সার্থক।