ভুতুড়ে চিঠি

রিকার্ডো ম্যারিনোর জন্ম ১৯৫৬ সালে আর্জেন্টিনার বুয়েন্স এইরেসে। একাধারে লেখক, সাংবাদিক ও চিত্রনাট্যকার। তবে শিশুসাহিত্যের জন্যই তিনি সবচেয়ে সমাদৃত। কাজ করেছেন আর্জেন্টিনার প্রথম সারির শিশুতোষ পত্রিকায়। লিখেছেন শিশুদের টেলিভিশন অনুষ্ঠানের চিত্রনাট্য। ২০০৮ সালে প্রকাশিত আর্জেন্টিনার ছয়টি ডাকটিকিটে উঠে আসে রিকার্ডো ম্যারিনোর গল্প ‘ভুতুড়ে চিঠি’। ১৯৮৭ সালে প্রকাশিত রিকার্ডোর পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর পোকা বইয়ে গল্পটি আছে।

অনুবাদ: নিজাম বিশ্বাস

অলংকরণ: প্রথম আলো

সবকিছু এত দিন ঠিকঠাকই চলছিল। ঘরে ঘরে চিঠি বিলি করে আসছিলেন ডাকপিয়ন ডন ফ্রাঙ্কো হাপাগার। বুড়ো খুব রসিক। তাই সবাই তাঁকে ভালোবাসে। কিন্তু আজকাল কী যে হয়েছে, কেউ আর তাঁকে পছন্দ করছে না। চিঠি বিলি করার সময় আগের মতোই তিনি রঙ্গ-রসিকতা করেন, কিন্তু লোকেরা মুখ ভার করে থাকে। মুখ ভার করে থাকার যথেষ্ট কারণ অবশ্য আছে। কদিন ধরে লোকে চিঠির খাম খুলে মহা বিরক্ত! কী সব আবলতাবল লেখা, ভুতুড়ে সব চিঠি। এই তো সেদিন ডোনা পালোমা একটি চিঠি পেল—

প্রিয় পালোমা,

জানতে চেয়েছ কেমন আছি! আমি শুধু ভালোই নয়, অনেক ভালো আছি। চেয়ার, খাট আর মেঝেতে গড়াগড়ি খেয়ে দিব্যি সুখে দিন কেটে যাচ্ছে। কুকুর ইবিলিয়াকে আলু কেনার জন্য মঙ্গল গ্রহে পাঠাই। সে যেতেই চায় না। ফ্রিজ থাকায় বড় উপকার হয়েছে। ইবিলিয়া তোমার দেওয়া জামা পেয়ে খুব খুশি হয়েছে।

ইতি
তোমার চাচাতো বোন ভেরা

চিঠি পড়ে আগামাথা কিছুই বুঝল না ডোনা। কুকুর ইবিলিয়া আবার এল কোত্থেকে? ভেরার তো কুকুর নেই। আছে শুধু বিড়াল। তার ওপর আবার কুকুরের জন্য জামা!

গত সপ্তাহে ইরাসমোর কাছে আরেকটি ভুতুড়ে চিঠি এল—

প্রিয় টিচার,

শুধু ‘হ্যালো’ বলার জন্য চিঠি লিখলাম। তোমাকে ১৭ লিটার গরুর খাঁটি দুধ আর ৫০ ডজন মোটাতাজা ইঁদুর পাঠাব।

ইতি
ডন হুলিওর বিড়াল

আর গতকাল ডোনা রোজিতাকে চিঠিতে কে যেন কবিতা লিখে পাঠাল—

প্রতিদিন দেখি তোমাকে
কী সুন্দর তোমার মুখ,
তুমি খুব সুন্দর, রোজিতা,
তোমায় দেখে পাই সুখ।

রোজিতা খুবই গম্ভীর মানুষ। এমন চিঠি পড়ে ভীষণ চটেছেন। বুড়ো ডাকপিয়ন ডনকে ডেকে বললেন, ‘না, এভাবে আর চলতে পারে না। এর একটা বিহিত করতেই হবে।’

আজকাল কী যে হয়েছে, কেউ আর তাঁকে পছন্দ করছে না। চিঠি বিলি করার সময় আগের মতোই তিনি রঙ্গ-রসিকতা করেন, কিন্তু লোকেরা মুখ ভার করে থাকে। মুখ ভার করে থাকার যথেষ্ট কারণ অবশ্য আছে। কদিন ধরে লোকে চিঠির খাম খুলে মহা বিরক্ত! কী সব আবলতাবল লেখা, ভুতুড়ে সব চিঠি।
রিকার্ডো ম্যারিনো (১৯৫৬-)
সংগৃহীত

ডন এতক্ষণে বুঝতে পারলেন, লোকেরা কেন তাঁকে দেখলে ইদানীং মুখ ভার করে থাকে। কিন্তু কী যে করবেন, বুঝতে পারছেন না! এভাবে আর কত দিনই-বা চলতে পারে। কপালে তাঁর চিন্তার ভাঁজ পড়ে। রাতে ঘুম নেই। অবশেষে একজন গোয়েন্দার পরামর্শ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন ডন।

গোয়েন্দার ঘরের দরজায় ছোট সাইনবোর্ডে গুটি গুটি করে লেখা, ‘ফ্রাস কিটো, গোয়েন্দা, মূল্য যাচাই করে নিন, বুড়োদের জন্য ছাড় আছে।’

দরজায় দুবার কড়া নাড়লেন ডন। ভেতর থেকে গোয়েন্দা কিটোর গলা শোনা গেল, ‘আসুন।’

ডন ভেতরে ঢুকলেন। সমস্যার কথা বলতে গিয়ে আমতা আমতা করতে লাগলেন। তাঁর মুখ থেকে কথা কেড়ে নিয়ে গোয়েন্দা কিটো বলতে শুরু করলেন, ‘আপনি ভুতুড়ে কিছু চিঠি নিয়ে সমস্যায় আছেন। আপনার নাম ডন ফ্রাঙ্কো হাপাগার। আপনার বয়স ৬১ বছর ২ মাস এবং আপনি এই পাড়ার ডাকপিয়ন। কিন্তু আপনি নির্দোষ।’

গোয়েন্দার কথা শুনে ডন অবাক। এই না হলে গোয়েন্দা। কোথায় কোন সমস্যা, সব তাঁর জানা। গোয়েন্দা কিটো কথা বলেই যাচ্ছিলেন, ‘এসব ভুতুড়ে চিঠি যে পাঠাচ্ছে, সে আশপাশেই আছে। হয়তো এমন জায়গায় লুকিয়ে আছে, যা আমরা ভাবতেই পারছি না।’ তারপর ডনকে চারটি খাম আর তিনটি কলা নিয়ে ডাকবাক্সের কাছে অপেক্ষা করতে বললেন গোয়েন্দা।

একজন গোয়েন্দার পরামর্শ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন ডন। গোয়েন্দার ঘরের দরজায় ছোট সাইনবোর্ডে গুটি গুটি করে লেখা, ‘ফ্রাস কিটো, গোয়েন্দা, মূল্য যাচাই করে নিন, বুড়োদের জন্য ছাড় আছে।’ দরজায় দুবার কড়া নাড়লেন ডন। ভেতর থেকে গোয়েন্দা কিটোর গলা শোনা গেল, ‘আসুন।’

কিটোর কথামতো চারটি খাম আর তিনটি কলা কিনলেন ডন। তারপর যে ডাকবাক্স থেকে ভুতুড়ে চিঠিগুলো পাচ্ছিলেন, তার সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। অল্প সময়ের মধ্যেই গোয়েন্দা ফ্রাস কিটোও এসে পৌঁছালেন। তাঁকে চেনাই যাচ্ছে না। গায়ে রেইনকোট। হাত দুটো পকেটে। কোমরের বেল্টে একটা চাবি আর মুখে পাইপ। কিটো বললেন, ‘চারটি খাম আর তিনটি কলা এনেছেন তো?’

হাতের খাম আর কলা দেখালেন ডন।

কিটো বললেন, ‘ডাকবাক্সের ভেতরে একটা খাম আর একটা কলা ফেলুন।’

ভয়ে ভয়ে ডাকবাক্সের ভেতরে প্রথমে একটা খাম, তারপর একটা কলা ফেললেন ডন। গোয়েন্দার মতলবটা ঠিক ধরতে পারছেন না তিনি। পাঁচ মিনিট পর কিটো দ্বিতীয় খাম ও কলাটি ডাকবাক্সে ফেলতে বললেন। তা-ই করলেন ডন। আবার পাঁচ মিনিট পর তৃতীয় খাম ও কলাটা ফেলতে বললেন। আবারও তা-ই করলেন ডন। আবার পাঁচ মিনিট পর গোয়েন্দা কিটো বললেন, ‘এখন খুব কঠিন পর্ব এসে গেছে। চতুর্থ খামটি এবার ফেলুন।’ তারপর ডাকপিয়নকে ইশারা করে বললেন, ‘কলা নয়, শুধু খাম।’

ডন তা-ই করলেন। কয়েক সেকেন্ড যেতে না যেতেই ডাকবাক্সের ভেতর থেকে ভেসে এল অদ্ভুত একটা শব্দ। কে যেন মহাবিরক্ত হয়ে বলল, ‘কলা কোথায়? কলা নেই কেন?’ এই কথা শোনামাত্র কোমরে ঝোলানো চাবি দিয়ে ডাকবাক্সটি খুললেন গোয়েন্দা কিটো। তারপর ভেতরে হাত ঢুকিয়ে বললেন, ‘এবার তোমাকে পেয়েছি, বাছাধন।’

ততক্ষণে ডাকবাক্সের আশপাশে লোকজন জড়ো হয়ে গেছে। ডাকবাক্সের ভেতর থেকে একটা বানরকে বের করে আনলেন গোয়েন্দা কিটো! তারপর সবার উদ্দেশে বললেন, ‘এর নাম কিকো। এ কিন্তু যে–সে বানর নয়, রীতিমতো লেখালেখি জানা বানর। এক বছর আগে এক সার্কাস থেকে ও পালিয়েছিল। ওকে খোঁজা হচ্ছে।’

তারপর বানরটার হাত ধরে কিটো বললেন, ‘চলো, শো শেষ করতে হবে।’