মঙ্গোলিয়ার লোকগল্প
বিড়াল কেন ‘পটি’ লুকায়
মঙ্গোলিয়ার লোকগল্প ‘বিড়াল কেন পটি লুকায়’ প্রকাশিত হয় ২০২৪ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর প্রথম আলোর শিশুসাহিত্য পাতা গোল্লাছুটে। আজ অন্য আলো অনলাইনের শিশু–কিশোর পাঠকদের জন্য গল্পটি তুলে ধরা হলো। রূপান্তর: নিজাম বিশ্বাস
অনেক দিন আগে ছিলেন এক লামা। (লামা কী, জানো তো? তিব্বতি বৌদ্ধদের ধর্মগুরু।) সারা দিন গভীর ধ্যানে মগ্ন থাকেন লামা। তাঁর আশপাশে সারাক্ষণ ঘুরঘুর করত একটা দুষ্টু বিড়াল। বিড়ালটি একদিন লামার নস্যিদানটি নিয়ে দিল দৌড়। লামাও ছাড়ার পাত্র নন, পেছন–পেছন দৌড়ে গিয়ে বিড়ালকে পাকড়াও করলেন। তারপর দানটি ছিনিয়ে নিলেন বিড়ালের মুখ থেকে। আরেক দিন লামার জপমালা নিয়ে বিড়ালটি ঢুকে পড়ল গর্তে। বিড়ালের লেজ ধরে অনেক টানাটানি করলেন লামা। কিন্তু কিছুতেই গর্ত থেকে ওকে বের করে আনতে পারলেন না। লামাও নাছোড়বান্দা, জপমালা তাঁর ফিরে পাওয়া চাই–ই চাই। টানাটানির চোটে শেষতক বিড়ালের লেজটাই গেল ছিঁড়ে! ‘না, এখানে আর এক মুহূর্তও নয়,’ গজরাতে গজরাতে লামার কাছ থেকে অনেক অনেক দূরে চলে গেল লেজছেঁড়া বিড়াল। হাঁটতে হাঁটতে এসে থামল ইঁদুরদের এক আস্তানায়। গায়ে লামার পোশাক, হাতে জপমালা নিয়ে অবিকল লামার মতোই আসন গেড়ে বসল। বাড়ির মুখে ইয়া বড় এক বিড়াল দেখে ইঁদুরেরা তো ভয়ে জড়সড়।
গম্ভীর গলায় ইঁদুরদের অভয় দিল বিড়াল, ‘ভয় পাস না! আমি লামার বিড়াল। জীব হত্যা করি না। কাছে আয়। তোদের আমি লেখাপড়া শেখাতে এসেছি।’
বিড়ালের লেজ ধরে অনেক টানাটানি করলেন লামা। কিন্তু কিছুতেই গর্ত থেকে ওকে বের করে আনতে পারলেন না। লামাও নাছোড়বান্দা, জপমালা তাঁর ফিরে পাওয়া চাই–ই চাই। টানাটানির চোটে শেষতক বিড়ালের লেজটাই গেল ছিঁড়ে!
লামার বেশভূষা আর মিঠা মিঠা কথায় বিড়ালকে বিশ্বাস করে বসল ইঁদুরেরা। বিড়ালের থাকার জন্য বানানো হলো একটা ঘর।
লেখাপড়া শিখতে রোজ বিড়ালের ঘরে আসতে শুরু করল ইঁদুরেরা।
কদিন পরের কথা। সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে বিড়ালের ঘরের পাশ দিয়েই কোথায় যেন যাচ্ছিল ইঁদুরের রাজা। হঠাৎ দেখে, বিড়ালের ঘরের পেছনে ছড়িয়ে–ছিটিয়ে আছে বিড়ালের পটি। পটির মধ্যে ইঁদুরের হাড্ডিগুড্ডিও দেখা যাচ্ছে!
ইঁদুররাজ আঁতকে উঠল, ‘নিশ্চয়ই আমাদের ধরে ধরে খাচ্ছে ওই পাজি বিড়াল। ওকে আজ হাতেনাতে ধরব। এক্ষুনি ওর গলায় ঘণ্টা বেঁধে আয়।’
আর সব দিনের মতো সেদিনও জপমালা হাতে গভীর ধ্যানে বসল বিড়াল। কয়েকটি ইঁদুর বিড়ালের সামনে গিয়ে বলল, ‘হে মহান লামা, এটা সোনার গয়না, গলায় পরুন।’ এ কথা বলে ঘণ্টাটা ওরা নিজেরাই বিড়ালের গলায় পরিয়ে দিল।
গম্ভীর গলায় ইঁদুরদের অভয় দিল বিড়াল, ‘ভয় পাস না! আমি লামার বিড়াল। জীব হত্যা করি না। কাছে আয়। তোদের আমি লেখাপড়া শেখাতে এসেছি।’
তখনো চোখ বুজে গভীর ধ্যানে মগ্ন বিড়াল। ঘরের বাইরে মন্ত্রী–পারিষদদের নিয়ে দাঁড়িয়ে ইঁদুররাজ। রাজা বলল, ‘আজ পড়া শেষে একজন একজন করে বের হবে।’
যেমন কথা, তেমন কাজ। পড়া শেষে বিড়ালের ঘর থেকে একে একে বের হয়ে আসতে থাকল ইঁদুরেরা। যে–ই না শেষ ইঁদুরটি বের হবে, অমনি বেজে উঠল বিড়ালের গলার ঘণ্টা—টুং টাং টুং! সঙ্গে সঙ্গে রাজাসহ সব ইঁদুর বিড়ালের ঘরে ঢুকে পড়ল। যা ভাবা হয়েছিল, ঠিক তা–ই। খাওয়ার জন্য বেচারা ইঁদুরকে ধরে মুখে পুরেছে দুষ্ট বিড়াল।
রাজা বলল, ‘তোমার পটিতে হাড্ডিগুড্ডি দেখেই বুঝেছিলাম, আমাদের ধরে ধরে তুমি খাও। আমাদের সঙ্গে তুমি বিশ্বাসঘাতকতা করেছ!’
তারপর ইঁদুরেরা দল বেঁধে ঘরবাড়ি ছেড়ে বিড়ালের কাছ থেকে চলে গেল অনেক অনেক দূরে।
বিড়াল মনে মনে ভাবল, ‘ইশ্, পটি যদি মাটির নিচে লুকিয়ে রাখতাম, তাহলে আর কেউ জানতেই পারত না যে আমি ইঁদুর ধরে খাই!’ বলা হয়, তার পর থেকেই পটি করে ঢেকে রাখে বিড়াল।