বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আলতাফ: বাঙালি ইতিহাসসচেতন নয়—এ কথা প্রায়ই বলা হয়। সেই বাস্তবতায় ইতিহাসকে আশ্রয় করে উপন্যাস লিখলেন আপনি, ছয় খণ্ডে বাঙালির জাগরণের কালপর্ব লিপিবদ্ধ করলেন কাহিনির বাতাবরণে, এর কারণ কী? লেখার প্রেরণাই–বা কোথায় পেয়েছিলেন?

আনিস: বাঙালির ইতিহাস বাংলা ভাষায় লেখা হয়নি, কারণ ১৮০০ সালের আগে তো গদ্য লেখা হতো না বললেই চলে। বিদেশিরা বরং এই অঞ্চলের ইতিহাস লিখে রেখে গেছেন। বাংলা ভাষায় ইতিহাসের উপাদান খুঁজতে হলে খুঁজতে হবে প্রাচীন ও মধ্যযুগের সাহিত্য থেকে, যা পদ্যে লেখা। তাতে উপাদান মিলবে কিছু কিছু, কিন্তু তা তো ইতিহাস নয়। বঙ্কিমচন্দ্র দুঃখ করে বলেছিলেন, ‘সাহেবেরা যদি পাখী মারিতে যান, তাহারও ইতিহাস লিখিত হয়, কিন্তু বাঙ্গালার ইতিহাস নাই।’

২০০৯ সাল থেকে আমি এই সিরিজের কাজ শুরু করি। ২০১০ ও ২০১১–এর বিভিন্ন ঈদসংখ্যায় তা একটু একটু করে বেরোতে থাকে। আমি কেন এই লেখা লিখতে শুরু করলাম? প্রথমত একটা আক্ষেপ থেকে। আমি দেখি যে আমরা আমাদের স্বাধীনতার ইতিহাস বর্ণনা করি এইভাবে: ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তানি বাহিনী ঘুমন্ত বাঙালির ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়ল। বাঙালিরা শুরু করল প্রতিরোধ। শুরু হলো মুক্তিযুদ্ধ। ভারত আমাদের সমর্থন দিল। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বরে পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পণ করল। অর্থাৎ মুক্তির বহু বছরের সংগ্রামটাকে আমরা সীমায়িত করে ফেললাম যুদ্ধে। ওয়ারফেয়ার। ব্যাটেল। কিন্তু এক দিনে তো যুদ্ধ বাধেনি। শুধু যুদ্ধ করেও আমরা জিতিনি। যুদ্ধের ভেতরে ছিল আরও নানা যুদ্ধ। ভারত তো বটেই, আমেরিকা, সোভিয়েত ইউনিয়ন, চীন—কত দেশ জড়িয়ে পড়ল। তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ—আণবিক যুদ্ধ হতে যাচ্ছিল বাংলাদেশের মুক্তিকে ঘিরে। বঙ্গবন্ধু সারাটা জীবন সংগ্রাম করলেন। এটা কি বিস্ময়কর নয় যে, যে বাঙালি মুসলমানরা ছিল পাকিস্তান আন্দোলনের সংখ্যাগরিষ্ঠ শক্তি, ১৯৪৮ সালেই তারা রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন শুরু করল! মুসলিম লীগ দ্রুত জন–অপ্রিয় হয়ে উঠল। এটা কেন হলো? কীভাবে হলো? শেখ মুজিব কেন সেই সময়েই জনপ্রিয় হয়ে উঠলেন। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের আগে আছে কয়েক দশকের সংগ্রাম। সেই সংগ্রামের কাহিনি আমি বলতে চেয়েছি।

আলতাফ: কলকাতার গড়ে ওঠা বা বাংলার সন্ধিক্ষণ সময়পর্বকে উপজীব্য করে বৃহৎ ক্যানভাসে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় লিখেছিলেন সেই সময়, প্রথম আলো পূর্ব–পশ্চিম। এই তিন উপন্যাসে তিনি ওই অঞ্চলের গ্র্যান্ড ন্যারেটিভ ব্যবহার করেছেন। অন্যদিকে আপনিও নিজের উপন্যাসধারায় ব্যবহার করলেন পূর্ব বাংলার বাংলাদেশ হয়ে ওঠার গ্র্যান্ড ন্যারেটিভ। তবে আপনার ন্যারেটিভের গাঁথুনি সুনীলের থেকে ভিন্ন—এ ব্যাপারে কী বলবেন?

আনিস: আমি গ্র্যান্ড ন্যারেটিভ ব্যবহার করিনি। একটা ন্যারেটিভ তৈরি হচ্ছিল, সংগ্রামকে যুদ্ধ বলবার, যেটা ১৯৭৫ থেকে ১৯৯৬—এমনকি ২০০৭ পর্যন্ত কায়েম ছিল, আমি সেটাকে চ্যালেঞ্জ করতে চেয়েছি। ওই ন্যারেটিভওয়ালারা এখনো সক্রিয় আছেন আর ন্যারেটিভটাও জীবিত আছে—ডান-বাম উভয় পক্ষেই। আমাদের উচ্চমন্য চীনপন্থী মার্ক্সবাদীরা কখনোই শেখ মুজিবকে মেনে নেননি! বাংলাদেশের মানুষ ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ—এত বড় বিপ্লব ঘটাতে পেরেছে, পাটচাষির ছেলেমেয়েরা শহরে পড়তে এসে এই সব কাণ্ড ঘটাল, এর কোনো বুদ্ধিবৃত্তিক ন্যারেটিভ আমরা তৈরি করতে পারিনি বললেই চলে। আমাদের তেমন কোনো স্কলারলি লেখা নেই, ইনটেলকচুয়াল ব্যাখ্যা নেই। নাকউঁচু মার্ক্সবাদীরা এত বড় ঘটনাকে কেবল তাচ্ছিল্যের চোখেই দেখে এসেছে, ভানুর সেই কৌতুকের মতো, আমি তো মনে মনে ভাবছি, দেখি না ব্যাটা কী করে? কার্ল মার্ক্সের কবরে কার্ল মার্ক্সের প্রবাদপ্রতিম কথাটা লেখা আছে, দার্শনিকেরা এতদিন জগৎটাকে ব্যাখ্যা করেছেন, আসল কথা হলো, জগৎটাকে বদলে দেওয়া। শেখ মুজিব এবং পূর্ব বাংলার মানুষ তাদের অবস্থাটাকে কেবল ব্যাখ্যা করেননি, বদলে দিয়েছেন। ব্যাখ্যাকারেরা এর ব্যাখ্যা করা ছেড়ে দিয়েছেন, কারণ তাতে গোপালগঞ্জের আদালতের কর্মচারী শেখ লুৎফর রহমানের পোলার কৃতিত্বের কথা এসে পড়ে। আমি তাত্ত্বিক নই, সৃজনশীল লেখক। আমার কাজ সৃষ্টি করা। আমি গল্প বলেছি। চরিত্র, সংলাপ, কর্ম, দৃশ্য, পরিস্থিতির বর্ণনা দিয়েছি।

সুনীলের সেই সময় দারুণ। চমৎকার। পূর্ব–পশ্চিম–এর একাত্তরের বিবরণ আমাদের এত চেনা যে মায়ের কাছে মামাবাড়ির গল্প বলার মতো লাগে। তবে কোনো সন্দেহ নেই যে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের এই কাজগুলো আমাকে সাহস দিয়েছে যে না, এটা করা যায়। বাস্তব চরিত্র নিয়ে ফিকশন লেখা যায়। কিন্তু আমাদের আসল গুরু হলেন তলস্তয়। যিনি নেপোলিয়নকে চরিত্র বানিয়ে ওয়ার অ্যান্ড পিস লিখে রেখে গেছেন। তাতে পাতার পর পাতা তত্ত্ব আলোচনা করেছেন আবার দলিল-দস্তাবেজ হুবহু তুলে দিয়েছেন। উপন্যাসের ধারণক্ষমতা অসাধারণ। বহু কিছু ঢুকিয়ে দেওয়া যায় এখানে।

default-image

আলতাফ: উপন্যাসধারায় বাংলা রূপকথায় পরিচিত চরিত্র ব্যাঙ্গমা–ব্যাঙ্গমিকে বারবারই চরিত্র হিসেবে উপস্থাপন করেছেন আপনি। আপনার উপস্থাপিত চরিত্র হিসেবে তারা ত্রিকালদর্শী। ফলে দেখা যাচ্ছে, বিভিন্ন উত্তুঙ্গ মুহূর্তে এই ব্যাঙ্গমা–ব্যাঙ্গমি উপস্থিত হয়ে ইতিহাস বয়ানের পাশাপাশি কখনো কখনো তা ব্যাখ্যা করছে। এমনকি ভবিষ্যৎও তারা বলে দিচ্ছে। এই কৌশলের আশ্রয় নিলেন কেন?

আনিস: কয়েকটি কারণে। প্রথমত, আমি আমাদের রূপকথা উপকথার ব্যাঙ্গমা–ব্যাঙ্গমির গল্প শুনে ও পড়ে বড় হয়েছি। রাজপুত্র গাছের নিচে শুয়ে আছে, ডালে বসে ব্যাঙ্গমা–ব্যাঙ্গমি বলছে, রাজপুত্রের এখন কী করা উচিত। আমি এখানে ঐতিহ্যের দ্বারস্থ হয়েছি।

দ্বিতীয়ত, আমি লিখছি ফিকশন। উপন্যাস। আমাকে তো কাহিনি বলতে হবে ক্রিয়েটিভ ওয়েতে। আমি বলে দিলাম, অমুক গ্রন্থে এটা ছাপা হয়েছে, বলে বিশাল উদ্ধৃতি দিলাম—এটা তো মহিউদ্দিন আহমদ বা সৈয়দ আবুল মকসুদ তাঁদের ননফিকশন বইয়ে করবেন। আমি তাহলে ঔপন্যাসিক হিসেবে ক্রিয়েটিভিটি কী দেখালাম! অন্যদিকে, ইতিহাসে যা ঘটছে, তা বললেই আমার চলছে না, সেই সব ঘটনার নিজস্ব ব্যাখ্যা–বিশ্লেষণ যদি না দিই, তবে উপন্যাস লেখার তো কোনো মানেই হয় না। আবার এটাকে আমি প্রবন্ধের বই না বানিয়ে উপন্যাসই বানাতে চাই। তখন ব্যাঙ্গমা–ব্যাঙ্গমি আমার বড় কাজে লেগেছে।

তিন নম্বর উপকারিতাটা হলো, ছয়টা বইয়ের মধ্যে বিনিসুতোর মালাটা গাঁথছে ব্যাঙ্গমা–ব্যাঙ্গমি। এখন আমি এই ছয়টা বইকে একসঙ্গে করে একটা অখণ্ড যারা ভোর এনেছিল বই প্রকাশ করতে চাই। যেমনটা আছে তলস্তয়ের ওয়ার অ্যান্ড পিস–এ। বুক ওয়ান বুক টু থেকে বুক সিক্স একসঙ্গে করেছেন তিনি। আমি বুক ওয়ান থেকে বুক সিক্স একখানে করব। শেষে একটা এপিলগ যোগ করে দেব। পৃষ্ঠাসংখ্যায় তো অন্তত এটা ওয়ার অ্যান্ড পিস–এর সমান বা বড় হবে। ওয়ার অ্যান্ড পিস ১২০০ পৃষ্ঠার বেশি, আমারটা ১৮০০ পৃষ্ঠার বেশি হবে, রয়্যাল সাইজে ১২০০ পৃষ্ঠার বেশি হবে।

জাতীয় অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক একটা কথা বলতেন। উপন্যাস লিখলে লেখো বড়, মোটা। যাতে পুকুরে ঢিল ছুড়ে দিলে একটা বড় অভিঘাত সৃষ্টি হয়, ঢেউ জাগে। আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যারও বারবার বলেছেন, আনিস, এক বইমেলায় তিনটা উপন্যাস না লিখে তিনটাকে একসঙ্গে করে একটা বই লেখো। তিনটা বইয়ের কাহিনির একটা সংযোগসূত্র দাও। তাহলেই হয়ে যাবে। উপন্যাসে এটা করা যায়। বাংলাদেশের একজন লেখক ১২ বছর ধরে একটা বই লিখে গেল, ২০০০ পৃষ্ঠা লিখল, এই প্রয়াস ব্যর্থ হলেও তো একটুখানি সহৃদয়তা দাবি করতে পারে, কী বলেন...হা হা হা।

আলতাফ: যারা ভোর এনেছিল প্রকাশিত হয়েছিল ২০১২–তে। আর রক্তে আঁকা ভোর বের হলো ২০২১ সালে। মাঝখানে পার হয়েছে দীর্ঘ ৯ বছর। আপনার এই সময়ের ভ্রমণটি কেমন ছিল?

আনিস: ভালো না। খুব কষ্টকর। খুব কষ্টকর। উপন্যাস লেখা মানে প্রতিটা অক্ষরের সঙ্গে একবিন্দু রক্ত চলে যাওয়া। শারীরিক পরিশ্রমের ব্যাপার। আর আমি যেহেতু ইতিহাস–আশ্রয়ী উপন্যাস লিখছি, শত শত বই আমাকে পড়তে হচ্ছে, মানুষের সঙ্গে কথা বলতে হচ্ছে, পত্রপত্রিকা ও ইন্টারনেট ঘাঁটতে হচ্ছে, ইউটিউব ভিডিও দেখতে হচ্ছে—মানে কাজটা অমানুষিক পরিশ্রমের হয়ে উঠছে।

বইটা লেখা শুরুর আগে আমি আনিসুজ্জামান স্যারকে ফোন করি। তাঁকে প্লট বলি। জিজ্ঞেস করি, ভয়ে লিখব নাকি নির্ভয়ে লিখব। তিনি বলেছেন, নির্ভয়ে লিখবে। মতি ভাই আমাকে বলেছেন, তুমি কোনো মিথ্যা কথা লিখো না। এখানে ফিকশনের বানানো সংলাপ বা বানানো চরিত্রের কথা হচ্ছে না, তিনি বলছেন, ঐতিহাসিক তথ্য বিকৃত না করার কথা। আমি নিজে কনভিন্সড না হলে কোনো তথ্য পরিবেশন করিনি। যেখানে পরস্পরবিরোধী তথ্য আছে, ফয়সালা করতে পারছি না, ব্যাঙ্গমা–ব্যাঙ্গমির মুখে দুটোই পরিবেশন করে রেখেছি।

লেখক–গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ ভাইকে আমি কতবার ফোন করেছি! শেখ রেহানা আপার কাছ থেকে কত ছোট ডিটেইল জানতে চেয়েছি। সিমিন হোসেন রিমি আপাকে অসংখ্যবার ফোন করেছি! এবিএম মূসা ভাই এলেই আমি সেই সময়ের গল্প শুনতে চাইতাম।

আলতাফ: এটা লিখতে গিয়ে কী কী চ্যালেঞ্জ অনুভব করেছেন? ইতিহাসভিত্তিক উপন্যাস, বিশেষত যেসব উপন্যাস ইতিহাসের ন্যারেটিভকে আশ্রয় করে তৈরি হয়, সেই ধরনের আখ্যান লেখার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা ও চ্যালেঞ্জগুলো কী কী বলে আপনার মনে হয়?

আনিস: চ্যালেঞ্জটা হলো, লেখার করণকৌশলগত চ্যালেঞ্জ। আর্টের চ্যালেঞ্জ। তথ্যের প্রাচুর্য এবং তথ্য পরিবেশনের অপরিহার্যতা যখন সামনে চলে আসে, তখন আপনি সেটাকে কীভাবে গল্পে রূপান্তরিত করে নেবেন, সেই কাজটা করা দুরূহ হয়ে পড়ে। আপনি তো গল্প বলছেন, ব্যাপারটাকে গল্প হতে হবে—প্রবন্ধ না, সংবাদপত্র না, উপসম্পাদকীয় না, স্মৃতিকথা না। সত্য বলতে কী, আমার শ্বাসরোধ হয়ে আসতে শুরু করে। কেন আমি এটা লিখতে শুরু করেছিলাম? বানিয়ে তো আমি বেশ গল্প বলতে পারি। মুখে মুখে গল্প বানানোই আমার কাজ এবং তা ভীষণ আনন্দদায়ক। এর বদলে কেন আমি ইতিহাস ঘাঁটতে গেলাম! উফ্​! কী দরকার ছিল নিজেকে এত কষ্ট দেবার?

একটা কথা বলি, আমি লিখেছি নতুন প্রজন্মের জন্য, গবেষকদের জন্য না। পণ্ডিতদের জন্য না। তারা বাংলাদেশের হয়ে ওঠার গল্পটা শুনবে, এটা ভাবতেই আমার ভালো লাগে।

আলতাফ: রক্তে আঁকা ভোর–এর মধ্য দিয়ে একটা লম্বা ভ্রমণ শেষ হলো আপনার। এরপর কী লিখবেন?

আনিসুল: এখন তো আমি সেই সময়, সেই স্থান, সেই সব মানুষের ঘেরাটোপে আর বন্দী না। আমি মুক্ত। এখন আমি স্বাধীনভাবে গল্প লিখব। রোজই তো প্রায় লিখি। কিশোর আলোর হাসির গল্প, অন্যআলো ডটকমে লেখকদের যত ঘটনা, নানা কিছু তো লিখেই চলেছি। একটা ওয়েব সিরিজ লেখার বায়না নিয়ে বসে আছি, কথাখেলাপি হয়ে আছি, ওটা এবার দিতেই হবে।

সাক্ষাৎকার থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন