default-image

আপনি শহীদুল জহিরের উপন্যাস ও মশিউল আলমের গল্প অনুবাদ করেছেন আন্তর্জাতিক প্রকাশনার জন্য। বাংলাদেশি কথাসাহিত্যের সঙ্গে পরিচয়ের ইতিবৃত্তটা জানাবেন?

ভি রামাস্বামী: কানাডার টরন্টোয় ‘বাংলা জার্নাল’ নামে একটা পত্রিকা বের করেন ইকবাল হাসনু সাহেব। তিনি তাঁর পত্রিকা আমাকে পাঠিয়ে লিখলেন, শহীদুল জহির নামে একজন ভালো লেখক আছেন, তাঁর লেখা অনূদিত হওয়া উচিত। করাচির আজমল কামাল একটা উর্দু জার্নাল বের করেন। পাশাপাশি ‘সিটি’ নামে দক্ষিণ এশীয় সাহিত্যের একটা জার্নালও বের করেন। তো তিনি বাংলাদেশের সাম্প্রতিক সাহিত্য নিয়ে একটা সংখ্যা বের করবেন। আমাকে বললেন, তুমিও এতে অবদান রাখো। তিনিও আমাকে শহীদুল জহিরের কথা বললেন। আমি তখনো বাংলাদেশি সাহিত্য নিয়ে তেমন কিছুই জানি না। তখন মনে পড়ল ইকবাল হাসনুর কথা, তিনি ১০টা গল্পের কথা বলেছিলেন। এর মধ্যে ঢাকা থেকে বই আনিয়ে দিলেন হাসনু ভাই। এর মধ্যে আমি টানা দুই সপ্তাহ শহীদুল জহিরের লেখায় বাস করছিলাম। প্রথম গল্পটা ছিল ‘কোথায় পাব তারে’। ওই ১০টা গল্পের পর পড়লাম উপন্যাস ‘জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা’ এবং ‘মুখের দিকে দেখি’। জহিরের বেলায় দুই সপ্তাহ আমি তাঁর লেখায় ডুবে ছিলাম। ‘কোথায় পাব তারে’ পড়ার সঙ্গে সঙ্গে মনে মনে অনুবাদ শুরু করে দিলাম। পরে অনুবাদের অনুমতিও পেয়ে গেলাম। ‘কোথায় পাব তারে’র ইংরেজি করলাম ‘হোয়্যার ইজ মাই ওয়ান্ডারার’। চেয়েছিলাম শহীদুল জহিরের ‘জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা’ অনুবাদ করব ঢাকায় বসে। তখন যোগাযোগ হলো ঢাকার অনুবাদক শাহরোজা নাহরীনের সঙ্গে। আমি পড়তে পড়তে অনুবাদ করি না, শুনতে শুনতে অনুবাদ করি।

পড়ে পড়ে অনুবাদ করেন না? এটা কি বাংলায় শিক্ষা না হওয়ার কারণে? বাংলা ভাষার সঙ্গে আপনার আত্মীয়তার যোগ হলো কীভাবে?

রামাস্বামী: না, আমি কান ব্যবহার করি। পড়লেও কানে শুনি। ইংরেজি পড়া নীরবে হয়, কিন্তু বাংলা যখন পড়ি, সেটা মাথায় বাজে। বাংলা পড়ে আমি অভ্যস্ত নই। আমি তামিল কিন্তু পশ্চিম বাংলায় বাস করছি বহিরাগত হিসেবে। ২৫ বছর ধরে আমি আমার বাঙালিকরণ করে চলেছি। একটা সময় আমি তামিল বুদ্বুদে বাস করতাম, তারপর ইংরেজির বুদ্বুদে। আমার বিয়ে হলো বাঙালি নারীর সঙ্গে। আমার আর আমার মতো আরেকজন বাঙালির মধ্যে পার্থক্য হলো, আমার মনের মধ্যে একটা বহিরাগতের বোধ কাজ করে।

বিজ্ঞাপন

ব্রিটেনের ফেলশ ভাষায় একটা শব্দ আছে ‘হিরায়েথ’। এর মানে হচ্ছে এমন এক ঘরের আকাঙ্ক্ষা, যা কখনো ছিল না বা এখন নেই।

রামাস্বামী: ঠিক। আমিও বাংলায় ঘর বলতে যা বোঝায়, তা ইংরেজিতে স্থানের অর্থে বহন করে নিতে চাইছি। আমি নিঘর মানুষ হয়ে ঘরের কথা বলছি। ইংরেজি আমার কাজের ভাষা কিন্তু বাংলা আমার জীবন। কলকাতা শহর আমার শরীরের অঙ্গ। কোন দিন কোন বেলায় হাওয়ায় একটু শীত আছে, আমি গেঞ্জি পরে গেলে সেই রাতে আমার জ্বর আসবে, শরীর সেটা বোঝে। আমি ওই শহরের পোকা। আমার বাংলা, বাংলাদেশ, মুক্তিযুদ্ধের ৫০ বছর, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র—এগুলো আমার রোমান্টিক ভালোবাসা।

কিন্তু আপনি তো দক্ষিণ ভারতের মানুষ। আপনার মা-বাবা তামিলনাড়ু আর কেরালার।

রামাস্বামী: আমি মেকলের সন্তান, যিনি ইংরেজ শাসকদের হয়ে ভারতীয় শিক্ষাব্যবস্থা সাজিয়েছিলেন। ইংলিশ মিডিয়ামে পড়েছি, বাংলা সাহিত্যের খোঁজ করিনি। বাংলার সঙ্গে আমার এখন সৃষ্টিশীলতার সম্বন্ধ। লোকে বলে, এটা কর গাধা। আর আমি বলি, জি হুজুর, করছি। আমি সাহিত্যের লোক নই, আমি ভাষার কুকুর। বাংলাদেশে আসা সে জন্য আমার আরেকটা আনন্দের। বাংলা ভাষা কত রকমের, কত রকমের বুলি ও ডায়ালেক্ট। ২৪ বছর বয়সে বিদেশ থেকে ফেরার পরই বাংলা বুলি আমার ডেভেলপ করল। এর মধ্যে বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের বাংলা শুনে, যাকে বলে শ্রবণের সমাজতত্ত্ব, সেটা ঘটল। সাহিত্যিক কারণে ভাষার ব্যবহারে আমি নেই। আমি শুধু কান দিয়ে শুনে বুঝি, মশাই বলছে কী। ও কি রেগে বলছে, ঠাট্টা করে বলছে, সেটা বুঝে ইংরেজিতে অনুবাদ করব। তো শহীদুল জহির প্রথম গল্প থেকেই আমাকে টেনে নিলেন। তিনিই প্রথম বাংলা লেখক, যাঁকে আমি আনন্দের জন্য পড়েছি।

শহীদুল জহিরের লেখার মাধ্যমে বাংলাদেশের সাহিত্যের জগৎ আপনার সামনে খুলে গেল?

রামাস্বামী: খুলে গেল মানে ইগনাইট করল।

এরপর তো আপনি মশিউল আলমের ‘পাকিস্তান’ গল্পটা অনুবাদ করলেন।

রামাস্বামী: ২০১৯ সালে চট্টগ্রামে গেলে অনুবাদক আলম খোরশেদ ভাই আমাকে একটা বই দিলেন। শিরোনাম দেখে মনে দাগ কাটল। বাড়ি গিয়ে পড়তে শুরু করলাম গল্পটা। ভাবলাম, এটা মজার গল্প। এর অনুবাদ করা উচিত। এর মধ্যে মশিউলের সঙ্গেও যোগাযোগ হলো। এই গল্পটাও হার্পারকলিন্সকে পাঠিয়েছি। তাঁর গল্পে দক্ষিণ এশিয়া, দেশভাগ, সেই রাজনীতিকে আবার ফিরে দেখার ব্যাপার আছে। আমার অন্য সব কাজেও এ বিষয়ের প্রতিফলন আছে। মশিউলের ‘পাকিস্তান’ গল্পে একটা মজার কোয়ালিটি ছিল।

শহীদুল জহিরের সাহিত্যকর্মের বিশিষ্টতা আপনার কাছে কী?

রামাস্বামী: শহীদুল জহির আমার সঙ্গে কথা বলেন খুব ব্যক্তিগতভাবে, তাঁর গদ্যের মাধ্যমে। যেমন অনেক আগে ভারতে আর কে নারায়ণ নামে একজন ইংরেজিতে লিখতেন। তাঁরও একটা কাল্পনিক জগৎ আছে মালগুড়ি নামে; শহীদুল জহিরের ভূতের গলির মতো। প্রতিদিনের মফস্বল জীবনকে খুবই আণুবীক্ষণিক দৃষ্টিতে দেখা আরকি। আমেরিকান একজন লেখক আছেন, ইদ্দিশ ভাষায় লেখেন। আইজাক বাশেভিস সিঙ্গার। ১৯৭৬-এ নোবেল পেয়েছিলেন। তাঁর ‘জিম্পেল দ্য ফুল অ্যান্ড আদার স্টোরিজ’ পড়ে দেখলাম অন্য এক জগৎ আছে সেখানে। লোকেদের জীবনের একটা ‘কোড অব এক্সিসটেন্স’ আছে, যা বাইরের লোকের কাছে অদ্ভুত, হাস্যকর বা আজব মনে হয়। তারপর ধরুন, পর্তুগিজ ঔপন্যাসিক হোসে সারামাগো, তাঁর সবচেয়ে বেশি লেখা আমি পড়েছি। ‘ব্লাইন্ডনেস’ থেকে শুরু করে ‘গসপেল অব জিসাস ক্রাইস্ট’—সব। তাঁর বাক্যের কোনো শেষ নেই, পাতার পর পাতা একটা বাক্য। কোনো ফুলস্টপ নেই। এটা পড়ার পর সাধারণ লেখা পড়া যায় না। এটা যেন প্লে উইথ ওয়ার্ডস, দ্য আর্ট অব স্টোরি টেলিং। শহীদুলের ‘কোথায় পাব তারে’তেও দেখি আস্ত একটা কাল্পনিক জগৎ। ‘যদি’, ‘হয়তো’, ‘বা’, ‘নয়তো’ দিয়ে লেখা। আমার মনে হয়, তিনি ভূতের গলি বা পুরান ঢাকা নিয়ে লিখলেও বিশ্বের জন্য লিখেছেন।

বিজ্ঞাপন

শহীদুল জহির বা সারামাগো কিংবা সিঙ্গার আসলেই কি শব্দের খেলা? ভাষার ভেতরকার অন্তর্যুক্তি, একটা চরিত্রের মানসিক অবস্থা, তার পরিপার্শ্ব দিয়ে গল্প এমনভাবে একটা অঞ্চল ও ভূগোলে নোঙর ফেলে, তার ভেতরে পাতা থাকে ইতিহাস ও বাস্তবতার জাল। এগুলোকে শুধুই কাল্পনিক কিংবা শব্দের খেলা বলা কি ঠিক?

রামাস্বামী: আমি শুধু লেখার ধরনের কথা বলছি। আমি নিশ্চিত, জহির সারামাগো পড়েননি। তাঁর ‘জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা’ লেখার সময়ে সারামাগোর লেখা ইংরেজিতে বেরোয়নি। শহীদুল জহিরের গদ্যের জাদুর ভেতর আপনি যা বললেন, সেই ইতিহাস ও রাজনীতি, তা আছে। পরিকল্পনা ছিল ‘জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা’ অনুবাদ করব। করেছি। বইটা ছোট, তাই আরও কয়েকটা গল্প এক মলাটে থাকবে। বের করবে হার্পারকলিন্স পাবলিকেশনস। আমেরিকান লেখক জেডি স্যালিঙ্গারের মতো তিনি অল্প লিখেছেন, কিন্তু অনেক বড় লেখক। স্যালিঙ্গার বেশি প্রকাশ করেননি, কারণ, সাহিত্যজগতের প্রতি একটা ঘৃণা তৈরি হয়েছিল। পরে তাঁর ছেলে জানাল, তাঁর অনেক লেখা পড়ে আছে দেরাজে। জহিরও অনেক লেখেননি, তাই তাঁকে সামলাতে পারা যায়। তাতে অন্য ভাষার পাঠকও নিবিড়ভাবে তাঁকে জানতে পারে।

বাংলা সাহিত্য তো ভারতীয় সাহিত্যের জায়গা থেকেও আঞ্চলিক সাহিত্য। কিন্তু যখন ইংরেজিতে অনুবাদ করছেন, তখন তা বিশ্বজনীন হয়ে যাচ্ছে, বিশ্বসাহিত্যের অংশ হয়ে যাচ্ছে।

রামাস্বামী: আমি প্রান্তিক সাহিত্যকেই অনুবাদের বিষয় হিসেবে বেছে নিয়েছি। সুবিমল মিশ্র কাকতালীয়ভাবে অনুবাদ করি। করতে করতে ঠিক করি, আমি প্রান্তিক লেখা অনুবাদ করব। এরপর ধরলাম প্রান্তিক মানুষ মনোরঞ্জন ব্যাপারীর ‘চণ্ডাল জীবন’ তিন খণ্ড। এরপর তাঁর ‘আল্লার জমিতে পা’। এরপর উদ্বাস্তু লেখক অধীর বিশ্বাসের লেখা ধরি। আরেকজন পড়ে খুব মজা পেয়েছি, ত্রৈলোক্যনাথের ‘ডমরু চরিত’। এটাও আমি অনুবাদ করছি।

ভারতীয় ইংরেজি সাহিত্য বিষয়ে আপনার মত কী?

রামাস্বামী: ভারতে অনেক নামকরা লেখক ইংরেজিতে লেখেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে ডিসিপ্লিন আছে, পোস্ট কলোনিয়াল রাইটিং, ইন্ডিয়ান রাইটিং ইন ইংলিশ (আইডব্লিউই)। তাঁদের যে লেখা আর ভারতবর্ষের বিভিন্ন ভাষার লেখা একেবারে আলাদা জগৎ। এই দুইয়ের ভাষা, জীবন—সব আলাদা। আমাকে এই ভারতীয় ইংরেজি সাহিত্য একেবারে টানে না। এটা আমার সংস্কার বলতে পারেন।

বাংলাদেশের সাহিত্য সম্পর্কে আপনি উচ্চ ধারণা পোষণ করে কথা বলেন। এই উচ্চাশার ভিত্তি কী?

রামাস্বামী: ভারতের বাংলা ভাষা মরে যাচ্ছে। ধরুন, পশ্চিম বাংলা নেই। তাহলে তো আমাকে বাংলাদেশে আসতেই হবে। ওপরওয়ালার পৃথিবীতে যত বাঙালি আছে, তার বেশির ভাগ বাংলাদেশি বাঙালি ও মুসলিম। সংখ্যাতাত্ত্বিকভাবেই বাঙালি মানে বাংলাদেশি ও মুসলিম। বাংলার গায়ে কোনো ঢিল মারলে তা বাংলাদেশি মুসলিমের গায়ে পড়বে। কলকাতার বুদ্ধিজীবীদের শিকড় বর্ণব্যবস্থার ভেতর। সূক্ষ্ম চোখে তাকালে ধরা পড়ে, সেখানকার বাঙালি সমাজ বর্ণবাদী ব্যবস্থার ওপর প্রতিষ্ঠিত। যে সমাজের শিকড়ই সংকুচিত, তারা আপসপন্থী হবেই, তাদের বিলোপ পেতেই হবে। তাই বলছি, বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বাংলাদেশের মাটিতেই ফলতে থাকবে। এটাই ইতিহাস।

তো, আপনি বাংলাদেশের সাহিত্যকে বাংলা ভাষার সাহিত্যের মূল খাত হিসেবে দেখলেন।

রামাস্বামী: কথাসাহিত্যিক দেবেশ রায় একটা শোকগাথা লিখলেন শহীদুল জহিরের মৃত্যুর পর। সেটা এমন ছিল যে জহির পড়ে তাঁর মনে হয়েছে, একাত্তরের পর বাংলাদেশে সম্পূর্ণ স্বাধীন সাহিত্য তৈরি হয়েছে। লোকেদের সঙ্গে কথা বলে এবং যা পড়েছি তা থেকে মনে হয়, বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে এ দেশের লোকেরা নিষ্ঠা নিয়ে নেয়। পশ্চিম বাংলায় বাংলার গণ্ডি খুব সীমিত। ওখানকার সাহিত্য উচ্চবর্ণ ও তাদের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে পড়ে আছে, তাদের সাহিত্য মাস ফেনমেনার নয়। শহীদুল জহিরের মতো বড় লেখক বের হন এখান থেকে; যাঁর লেখায় ভাষা, দেশ ও ইতিহাস আছে। ওদিকে পশ্চিম বাংলায় বাংলা ভাষা হিন্দি সাম্রাজ্যের দ্বারা চ্যালেঞ্জের শিকার। বাংলা রাজ্যে সব ঘোষণা আসে হিন্দিতে, প্রতিষ্ঠানের সেবা চাইলে সাড়া আসে হিন্দিতে।

বাংলাদেশের সাহিত্য অনুবাদের সময় আপনার প্রেরণা কী ছিল?

রামাস্বামী: কেউ তো ভাবল না বাংলাদেশের ৫০ বছর হলো, এটা একটা পবিত্র মুহূর্ত। এই মাটি থেকে কী সাহিত্য বেরিয়েছে, বাছাই করা ফুল কোনগুলো, তা দুনিয়াকে জানানো দরকার না? অন্য ভাষার মানুষ গণ থেকে জন্ম নেওয়া এই দেশ সম্পর্কে কী জানে? তা কেউ ভাবল না। কলকাতায় আমার অনুবাদের সহযোগী সৃষ্টিদত্ত চৌধুরী, তিনি শওকত আলী অনুবাদ করছিলেন। তিনি আমাকে উপন্যাসের বিষয়টা বললেন, সঙ্গে সঙ্গে সেটা আমার মধ্যে মন্ত্রের মতো কাজ করল। তিনি আমাকে জড়িয়ে ফেললেন। আমার অনুবাদকর্মে মানবিক উষ্ণতা আছে। আমি ৩০ বছর ধরে বলে আসছি বাংলা বুদ্ধিজীবী বা কবির দেশ নয়, এটা কৃষক, জেলে ও কারিগরের দেশ। তো এই উপন্যাসটা আমার বিশ্বাসের বনিয়াদের সঙ্গে যায়। আমরা দুজন শওকত আলীর ‘নাড়াই’ আর ‘প্রদোষে প্রাকৃতজন’ অনুবাদ করছি।

এই অনুবাদগুলো কে প্রকাশ করবে?

রামাস্বামী: শহীদুল জহির বাইরে প্রকাশ করবে হার্পারকলিন্স, বাংলাদেশে করবে সংহতি প্রকাশন। মশিউলের গল্প যে পাকিস্তানি জার্নালে প্রকাশিত হয়, সেখানেই শহীদুল জহিরের ‘ডুমুরখেকো মানুষ’-এর অনুবাদ বেরিয়েছিল। সেটা আবার আরেকজন উর্দু জার্নালে বের করেছেন।

আপনার প্রিয় সাহিত্যিক, প্রিয় লেখক কারা?

রামাস্বামী: গুন্টার গ্রাস, হোসে সারামাগো, রবার্টো বোলানো, কেনজাবুরো ওয়ে। কয়েক বছর আগে একজন ব্রাজিলিয়ান লেখকের নাম জানলাম—গ্রাসিলিয়ানো রামোস। তাঁর উপন্যাসে স্টেইনবেকের ‘গ্রেপস অব র‌্যাথ’-এর মতো বিরান জীবন আছে। ১৯৩০-এর দশকের একজন লেখক ন্যাথানিয়েল ওয়েস্ট। তাঁর প্রিয় উপন্যাসটার নাম ‘দ্য ডে অব লোকাস্ট’। আরও একজন অসাধারণ ঔপন্যাসিক অল্প বয়সে মারা গেলেন, থমাস উলফ। তবে আমি ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্র হয়েও ক্রিটিক্যাল থিওরি বেশি পড়িনি। শীতের দিনে লেপের তলায় বসে দারুণ কিছু পড়ছি, একটা মজার চকলেট খেতে যেমন মজা, তেমনি পড়া আমার আনন্দের উপভোগ, যেন মোরব্বা খাচ্ছি। গ্রাসের ‘টিন ড্রাম’ পড়তে গিয়ে মনে হলো, আচ্ছা এটাকেই বলে সাহিত্য, অন্যগুলো মোরব্বা। তখন মোরব্বা খাওয়া বন্ধ করে সাহিত্য পড়া শুরু করলাম। তবে এখন পড়া ছেড়ে দিয়েছি। মাথায় আর জায়গা নেই। এখন পড়ি না, শুধু অনুবাদ করি।

এবার অনুবাদকর্মের বিষয়ে আসি। একজন ভালো অনুবাদক কী কী বিষয় খেয়াল রাখবেন?

রামাস্বামী: বড় অনুবাদক বড় লেখককে আবার জীবিত করেন। অনুবাদের দুটি অক্ষ আছে। প্রথম হলো অনুবাদ অসম্ভব। দ্বিতীয় হলো অনুবাদ অবশ্যকর্তব্য। এই দ্বিধা নিয়ে অনুবাদককে বাঁচতে হবে। আর যেহেতু অনুবাদ অসম্ভব, সেহেতু সবকিছু মূল ভাষার ওপারে নিয়ে যাওয়া যায় না। সে রকম অনুবাদকের দুঃখ বা কষ্ট হলো, সব অনুবাদ করা যায় না।

বিজ্ঞাপন

অনুবাদক হতে চাওয়া লেখকের কী করণীয়?

রামাস্বামী: অনুবাদক হতে চাওয়া অসাধারণ কথা। পৃথিবীতে অনুবাদক খুব কম। অনুবাদক না হলে পৃথিবী চলবে না। সবাই কি অনুবাদ পারে? আমি জানি না। হয়তো সহায়তা পেলে পারে, হয়তো না। যদি অনুবাদ করতে হয়, তাহলে বসে পড়তে হবে। জাস্ট ডু ইট। করার পর তুমি বুঝবে কী করেছ। বাজে কিছু হলে তা থেকে উত্তরণ ঘটানো তো সম্ভব। অনুবাদ এটিএম মেশিনে কার্ড ঢুকিয়ে টাকা তোলা নয়। এটা মেকানিক্যাল প্রসেস নয়। এটা অর্গানিক প্রসেস, এখানে আবেগ, প্রজ্ঞা—সবই থাকে। আমার বেলায় মাথার পুরো সিস্টেম সেই মুহূর্তের অপেক্ষায় ছিল, যখন আমি অনুবাদ শুরু করলাম। আমি শখের বশে অনুবাদ করি। এটা আমার জীবিকা নয়। সেই অর্থে আমি সৌভাগ্যবান ও প্রিভিলেজড। এটা আমার লেবার অব লাভ। আমার ছেলে মারা যাওয়ার পর অনুবাদই হলো আমার বেঁচে থাকার উপায়। সে সময় আমি একটা ফেলোশিপে ছিলাম আমেরিকায়। আমার অনুবাদে সুবিমলের ‘রামায়ণ চামার’ শেষ হলো আর মৃত্যুসংবাদটি এল। আমি ফিরে এলাম। ২০১৫-তে সন্তানের মৃত্যুর পর যে রকম বিষণ্নতায় ভুগছিলাম, সেটা আমাকে জংলি পশুর মতো খুঁচিয়ে মারল, তখনই অনুবাদে নিজেকে ডুবিয়ে দিলাম। অনুবাদ ছিল ধ্যানের মতো, যেন আর কেউ নেই, কোনো কিছু নেই।

অনুবাদকের কোনো ব্যবহারিক প্রশিক্ষণের ব্যাপার আছে কী?

রামাস্বামী: প্রতিটি শব্দ আমি দেখি, প্রতিটি বাক্য আমি দেখি। আর ওটাকে আমি শুনি মাথায়, যেন কেউ কথাটা বলছে। ওই পরিপ্রেক্ষিতে কী বলছে, তার অভিব্যক্তির ধরন কী? ঠান্ডা লাগছে, কত ঠান্ডা, অনেক ঠান্ডা? অল্প ঠান্ডা? আমাকে শব্দের যথাযথ শেড, যথাযথ সেন্স ধরতে হবে বা বাক্যটা আসলে কী বলছে। তার মূল বিষয়টা কী? বাক্য পড়ে তার কর্তাকে চিনে তারপর ইংরেজিতে আনা। ইংরেজি ভাষার কাঠামো তো আলাদা। আমি ব্যাকরণে গাড্ডু। বিজ্ঞানেও গাড্ডু। ব্যাকরণ আমার কাছে বিরক্তিকর লাগে। কিন্তু অনুবাদককে ব্যাকরণের ভেতর দিয়ে যেতে হয়। আমি তা জানিই না। আমি অনুবাদ করি কান দিয়ে। পুরো জিনিসটা একটা শ্রবণের ব্যাপার। আর অনুভূতিও তো আছে। বাক্যে দুঃখ বা মজা বা যে দুর্গন্ধ আছে, সেটা যেন অনুবাদেও থাকে। বাক্যের দিকে নজর রাখতে হবে। লেখার ভেতরের অর্থের কথাও অনুবাদকের মনে রাখা উচিত। আমি হিটলারের ওপর প্রতিশোধ নিতে তাঁর ভুল অনুবাদ করব না, বরং তিনি যা বলেছেন, হুবহু তা বলা উচিত। লেখায় অনুবাদকের হস্তক্ষেপ করা উচিত নয়।
আমি ‘পারফেক্ট টক্সেট’ নিয়ে কাজ করি আর অনুবাদকেও সেদিকে নেওয়ার চেষ্টা করি। অনুবাদকের স্বাধীনতা আমি নিই না। ইংরেজিতে অসাধারণ দখল আমার। মেকলের বিষফল আমি খেয়েছি; এটা ছিল আমার আক্ষেপ কিন্তু সেটাই আমার জন্য উপহার হয়ে এসেছে। শব্দের ভান্ডার আর কোন জায়গায় কোন শব্দ সবচেয়ে উপযুক্ত, তা বের করতে হয়। আমি প্রথম রাউন্ডে বাংলাটা দেখি, তারপর ইংরেজি করি। সেই প্রথম রাউন্ড খুবই কঠিন আমার মস্তিষ্কের জন্য। মস্তিষ্ককে সম্পূর্ণ বাংলায় ডুবে থাকতে হবে বোঝার জন্য, আর অনুবাদের সময় সম্পূর্ণ ইংরেজিতে ডুবে থাকতে হবে। এখানে মস্তিষ্ককে একই সঙ্গে দুটি কাজ করতে হয় এবং তা করতে গিয়ে শব্দভান্ডার চুপসে যায়। ফলে দ্বিতীয় রাউন্ডে গিয়ে আবার শব্দ খুঁজে পাই। অনুবাদে তাড়াতাড়ি করা খুবই খারাপ। মাইক্রোস্কোপ দিয়ে পড়তে হবে মূলটাকে। মূলভাব, সেন্স—এগুলো ধরতে হবে। ইংরেজির ওপর দখল আর আত্মবিশ্বাস লাগবে।

সাক্ষাৎকার থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন