default-image
বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ঔপন্যাসিক মনিকা আলীর সঙ্গে আলাপন। সম্প্রতি বাংলাদেশে এসেছিলেন ব্রিক লেনখ্যাত বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ঔপন্যাসিক মনিকা আলী। প্রথম আলোর সঙ্গে অন্তরঙ্গ আলাপনে তিনি জানালেন নিজের লেখালেখি, মা–বাবা এবং বাংলাদেশ সম্পর্কে তাঁর অনুভবের কথা। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মশিউল আলম

জন্ম
মনিকা আলীর জন্ম ঢাকা শহরে, ১৯৬৭ সালে। বাঙালি পিতা ও ইংরেজ মায়ের ঘরে জন্ম নেওয়া মনিকা ১৯৭১ সালে মাত্র সাড়ে তিন বছর বয়সেই তাঁদের সঙ্গে লন্ডনে পাড়ি জমান। তাঁর পূর্বপুরুষদের ভিটা ছিল ময়মনসিংহ এলাকায়।

পড়াশোনা
লন্ডনে প্রথমে বোল্টন স্কুল, পরে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শন, রাজনীতি ও অর্থনীতি বিষয়ে পড়াশোনা করেন মনিকা।

লেখালেখি
২০০৩ সালে তাঁর প্রথম উপন্যাস ব্রিক লেন প্রকাশ পাওয়ার পরই সাড়া পড়ে গিয়েছিল। স্বল্পশিক্ষিতা অল্পবয়সী বাঙালি মেয়ে নাজনিনের বয়স্ক এক প্রবাসীকে বিয়ের পর লন্ডনে এসে জীবন যাপন করতে হয়—তার অনুপুঙ্খ চিত্র ভিনদেশি পাঠকের মন কেড়ে নেয়। উপন্যাসটি পরে ম্যান বুকার পুরস্কারের সংক্ষিপ্ত তালিকায়ও স্থান করে নিয়েছিল। ২০০৭ সালে এটি অবলম্বনে একটি চলচ্চিত্র নির্মিত হয়। এ ছাড়া মনিকা আলী লিখেছেন আরও তিনটি উপন্যাস—অ্যালেনটেজো ব্লু (২০০৬), ইন দ্য কিচেন(২০০৯) ও আনটোল্ড স্টোরিজ (২০১১)।

পরিবার
মনিকা আলী বর্তমানে দক্ষিণ লন্ডনে তাঁর স্বামী ব্যবস্থাপনা পরামর্শক সাইমন টোরান্স ও দুই সন্তান ফেলিক্স আর সুমিকে নিয়ে বসবাস করছেন।

৭ নভেম্বর ২০১৯। ঢাকার বাংলাডেমি প্রাঙ্গণে সকাল ১০টা থেকে শুরু হয়েছে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় আন্তর্জাতিক সাহিত্য উৎসব ‘ঢাকা লিট ফেস্ট’। পৃথিবীর পাঁচ মহাদেশ থেকে এসেছেন সাহিত্য ও শিল্প-সংস্কৃতিজগতের বিশিষ্ট লোকজন। শিল্প-সাহিত্যের প্রতি অনুরক্ত লোকজনের সমাগম ঘটেছে যথেষ্ট, তবে একুশের বইমেলার মতো ভিড় নেই। আবহাওয়া সুন্দর, হেমন্তের প্রীতিকর রোদঝলমলে দিন।

এখানে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ ঔপন্যাসিক মনিকা আলীকে খুঁজে পেতে কষ্ট হলো না। ভাস্কর নভেরা ভবনের দোতলার ক্যাফেটেরিয়ার পুব পাশে কাচের জানালার ধারে একটি লম্বা সোফায় বসে তিনি গল্প করছেন তাঁর পাশে বসা এক ইউরোপীয় চেহারার মধ্যবয়সী ভদ্রলোকের সঙ্গে। সম্ভাষণের পর নিজের পরিচয় জানিয়ে তাঁর পাশের আরেকটি সোফায় বসেই আলাপ শুরু করে দিলাম, কারণ কতক্ষণ সময় পাওয়া যাবে তা নিশ্চিত নয়।

‘আপনি তো ঢাকার মেয়ে, কত বছর পর এলেন বাংলাদেশে?’ আমি মনিকা আলীকে বললাম।

তাঁর ছিপছিপে লম্বাটে মুখমণ্ডলে স্মিত হাসি ফুটে উঠল; ‘বহু বছর পর’ বলে একটু থামলেন; একটু বিব্রত মনে হলো তাঁকে। বললেন, ‘আমি বাংলাদেশ ছেড়ে গেছি সেই ১৯৭১ সালে, তখন আমার বয়স মাত্র সাড়ে তিন বছর। তাহলে বুঝতেই পারছেন, এখন আমার বয়স কত।’ এবার একটু থামলেন, তারপর পাশে বসা সেই ভদ্রলোককে দেখিয়ে বললেন, ‘মাই হাজব্যান্ড।’ ভদ্রলোকের সঙ্গে আমার হাসিমুখ চোখাচোখি, হ্যান্ডশেক এবং ‘নাইস টু মিট ইউ’ বিনিময় হলো। তারপর আবার মনিকা আলীর দিকে তাকালাম; চোখেমুখে হাসিটা অটুট। তাঁর অনুমতি নিয়ে আমার মোবাইল ফোনের ভয়েস রেকর্ডার অন করলাম। বাঙালি বাবা ও ইংরেজ মায়ের সন্তান মনিকা বললেন, মা-বাবার সঙ্গে সেই ১৯৭১ সালে ঢাকা ছেড়ে চলে যাওয়ার পর এই তাঁর প্রথমবারের মতো বাংলাদেশে আসা হলো। যেন বা আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হলো আমাদের কথোপকথন।

মশিউল আলম: বাংলাদেশের প্রায় এক কোটি মানুষ এখন পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে স্থায়ীভাবে বসবাস করে। তাদের মধ্যে কিংবা তাদের সন্তান-সন্ততির মধ্যে সাহিত্যিক হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছেন এমন মানুষের সংখ্যা খুবই কম। আর মনিকা আলীর মতো কথাসাহিত্যিক মাত্র একজনই, যাঁর প্রথম উপন্যাস ম্যান বুকার পুরস্কারের সংক্ষিপ্ত তালিকায় স্থান পেয়েছিল। এটা কীভাবে সম্ভব হলো? মানে, কীভাবে আপনি লেখক হলেন?

মনিকা আলী: লেখক হওয়ার অনেক আগে আমি পাঠক হয়েছি। ছেলেবেলা থেকেই অনেক পড়ি আমি; হাতের কাছে যা পাই তা–ই পড়ি। আমি এখনো নিজেকে মূলত পাঠকই মনে করি।

মশিউল: কিন্তু শুধু পাঠক তো আপনি নন। প্রথম উপন্যাস ব্রিক লেন প্রকাশিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে লেখকদের সারিতে আপনার জায়গা পাকা হয়ে গেছে। সালমান রুশদির মতো বড় বড় লেখক-সমালোচক ব্রিক লেন–এর প্রশংসা করেছেন। আর ম্যান বুকার পুরস্কারের সংক্ষিপ্ত তালিকায় স্থান পাওয়ার ফলে প্রচুর আলোচনা প্রকাশিত হয়েছে ব্রিক লেন নিয়ে।

মনিকা: তা ঠিক। ব্রিক লেন অনেক প্রশংসা পেয়েছে; অনেক বিশিষ্ট ও গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্য সমালোচক বইটির আলোচনা–সমালোচনা লিখেছেন। অবশ্য সেটা বহু বছর আগের কথা।

মশিউল: ব্রিক লেন পড়ে আমার মনে হয়েছে, যে লেখকের প্রথম উপন্যাসই এমন নিখুঁতভাবে লেখা, নিশ্চয়ই তাঁর প্রস্তুতি চলেছে অনেক দিন ধরে এবং প্রস্তুতিটা খুব সিরিয়াস...

মনিকা: (হাসি) আমি দর্শন, রাজনীতি আর ইতিহাসের ছাত্রী ছিলাম। সাহিত্য লেখার প্রাতিষ্ঠানিক প্রস্তুতি বলতে আমার কিচ্ছু নেই। সাহিত্য পড়েছি, এখনো পড়ি। পড়তে পড়তেই লেখার ভাবনাটা এসেছে। আর আমি লন্ডনে যেসব মানুষকে দেখেছি, মানে বাংলাদেশ থেকে যাওয়া মানুষদের জীবনযাপন, তাদের জীবিকার সংগ্রাম, সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না দেখতে দেখতে মনে হয়েছে, লেখা যায় এবং হয়তো আমার লেখা উচিত। কারণ, তাদের নিয়ে অনেক গল্প বলার আছে...

মশিউল: ব্রিক লেন–এর প্রধান চরিত্র নাজনিনের জন্ম ১৯৬৭ সালে। আপনার জন্মও ১৯৬৭ সালে...

মনিকা: (হেসে) কিন্তু নাজনিনের সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক নেই।

মশিউল: ময়মনসিংহের মেয়ে নাজনিনকে আপনি পেয়েছেন কোথায়? উপন্যাসটা লেখার আগে, কিংবা লেখার সময় কি ময়মনসিংহ গিয়েছিলেন?

মনিকা: না। নাজনিন চরিত্রটা জন্ম নিয়েছে আমার কল্পনায়। তার বাড়ি বাংলাদেশের ময়মনসিংহে। আমার বাবার দেশ সেটা। বাবার কাছে ময়মনসিংহ, সেখানকার মানুষ ও প্রকৃতি সম্পর্কে অনেক গল্প শুনেছি আমি। তাঁর মুখে গল্প শুনতে শুনতেই বড় হয়েছি। ব্রিক লেন উপন্যাসের কিছু গল্প আমি পেয়েছি সরাসরি আমার বাবার কাছ থেকে। মাক্কু পাগলা নামে একটা চরিত্র আছে; সে সরাসরি আমার বাবার বলা গল্পের একটা চরিত্র। কিন্তু নাজনিন তা নয়; সে আমার কল্পনার ফসল। ১৭-১৮ বছর বয়স পর্যন্ত নাজনিন বাংলাদেশেই ছিল। এরপর বিয়ে হয়েছে এক লন্ডনবাসী বাঙালি ভদ্রলোকের সঙ্গে; তারপর সে স্থায়ীভাবে লন্ডন চলে গেছে। সেখানেই শুরু হয়েছে তার নতুন জীবন, সেই জীবনের সংগ্রাম। যদিও এসবই আমি কল্পনা করেছি, তবু নাজনিনের গল্পের প্রাথমিক উৎস কিন্তু আমার বাবা; তাঁর বলা গল্পগুলো।

মশিউল: কখন আপনি অনুভব করেছিলেন যে নাজনিনের গল্প আপনি লিখতে চান? কখন এবং কেন?

মনিকা: সেটা আসলে ঘটেছিল আমার মায়ের কারণে, অদ্ভুতভাবেই ঘটেছিল সেটা। আমার মা একজন ইংরেজ, তিনি আমার বাবাকে বিয়ে করেন; তিনি ঢাকা আসেন, এ দেশের ভাষা জানতেন না; এখানকার মানুষ, তাদের সংস্কৃতি, ধর্ম—সবকিছুই ছিল তাঁর অচেনা। আমার বাবা ছাড়া এ দেশের আর একজন মানুষকেও তিনি জানতেন না। তিনি ছিলেন সম্পূর্ণভাবে স্থানচ্যুত। তাঁর সেই স্থানচ্যুতি, সেই বিচ্ছিন্নতার অনুভূতির গল্পগুলো তিনি আমাকে বলতেন; ঠিক নেতিবাচকভাবে নয়; তাঁর স্থানচ্যুত, বিচ্ছিন্ন জীবনের বাস্তবতা, সেই জীবনের সমস্যাগুলো তুলে ধরার জন্য বলতেন। সেই সব গল্প শুনতে শুনতে আমার মনে ও কল্পনায় নাজনিন চরিত্রটা দানা বাঁধতে শুরু করে। আমার মা আমার বাবাকে বিয়ে করে ঢাকায় আসার পর যে স্থানচ্যুতি ও বিচ্ছিন্নতার অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে গেছেন, বাংলাদেশের ময়মনসিংহের মেয়ে নাজনিনও লন্ডনে গিয়ে সেই একই অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়।

মশিউল:নাজনিনের স্বামীর চরিত্রটা আমার বেশ ব্যতিক্রমী মনে হয়েছে। যতদূর জানি, প্রবাসী বাঙালিদের মধ্যে তার মতো সাহিত্যপড়ুয়া মানুষ খুবই কম। যে লোক কথায় কথায় ইংরেজি সাহিত্যের ক্ল্যাসিকগুলো থেকে উদ্ধৃতি দেয়, তার মতো চরিত্র প্রবাসী বাঙালি জনগোষ্ঠীর মধ্যে বিরল। তাকে আপনি কোথায় পেয়েছেন?

মনিকা: এই চরিত্রটা গড়ে ওঠার পেছনে হয়তো আমার বাবার কিছুটা অবদান আছে। বাবা বেশ পড়ুয়া। কিন্তু পড়া ছাড়া আর কোনো দিক থেকে নাজনিনের স্বামীর সঙ্গে আমার বাবার কোনো মিল নেই।

মশিউল: কী নাম আপনার বাবার?

মনিকা: এটা কেউ জিজ্ঞেস করে না। সবাই আমার নামের শেষাংশ আলী থেকে ধারণা করে, আমার বাবা হয়তো কোনো এক আলী। তাঁর পুরো নামটা জানার কৌতূহল বোধ করে না। তাঁর নাম হাতেম আলী। আপনি যদি আমাদের সাক্ষাৎকারে তাঁর নামটা লেখেন, তাহলে তিনি নিশ্চয়ই খুশি হবেন।

মশিউল: কী করতেন তিনি? মানে পেশা কী ছিল?

মনিকা: ঢাকার তেজগাঁও এলাকায় একটা টেকনিক্যাল স্কুল ছিল...

মশিউল: তেজগাঁও পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট?

মনিকা: হ্যাঁ। সেখানকার ইনস্ট্রাক্টর ছিলেন।

মশিউল: আপনার মার সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়েছিল কোথায়?

মনিকা: ঢাকাতেই। আমার জন্মও এখানেই। ১৯৭১ সালে আমরা লন্ডন চলে যাই...

মশিউল: হ্যাঁ, সেটা বলেছেন। আচ্ছা, উপন্যাস লেখার জন্য তো কিছু বাস্তব গবেষণার প্রয়োজন হয়, বিশেষত পাশ্চাত্যের ঔপন্যাসিকেরা সেটা করেন। ব্রিক লেন লেখার সময় কি আপনার মনে হয়নি যে আপনার ময়মনসিংহ যাওয়া প্রয়োজন?

মনিকা: না। সে রকম প্রয়োজন বোধ হয়নি। কারণ, ব্রিক লেন উপন্যাসটা একটা ওয়ার্ক অব ইমাজিনেশন, কল্পনার কাজ। নাজনিনের গল্প, বা লন্ডনের ব্রিক লেন নামের পাড়াটির মানুষগুলোর গল্প—এগুলো কিন্তু সরাসরি তাদের গল্প নয়। তাদের জীবনযাপন দেখে দেখে, তাদের কথা শুনে শুনে তাদের সম্পর্কে আমার মনের মধ্যে গল্প তৈরি হয়েছে, আমি সেই সব গল্প বলেছি। আপনি যদি বলেন আমি লন্ডনে বসবাসরত বাঙালি জনগোষ্ঠীর গল্প বলেছি, তাহলে সেটা পুরোপুরি ঠিক হবে না। তাদের নিয়ে আমার কল্পনায় যে একটা জগৎ গড়ে উঠেছে, সে জগৎ আমি নিজেই গড়ে তুলেছি, সেই জগতের গল্পই লিখেছি। লেখার ক্ষেত্রে আমার প্রধান হাতিয়ার কল্পনা। তবে আমি ব্রিক লেন মহল্লাটা নিয়ে কিছু গবেষণা করেছি; সেখানকার অলিগলিতে ঘুরেছি; পথেঘাটে, দোকানে, উইমেন সেন্টারে গেছি, মানুষের সঙ্গে কথা বলেছি, তাদের গল্প শুনেছি। তবে শেষ পর্যন্ত আমার প্রধান অস্ত্র কল্পনা...

মশিউল: কিন্তু আপনার উপন্যাস বাস্তবধর্মী। বাস্তবের মানুষ, তার দেশ, সমাজ, পরিবার, ভাষা, সংস্কৃতি ইত্যাদি উপন্যাসে এসেছে বাস্তবিক রূপে। যেটাকে বলে রিয়ালিস্টিক ফিকশন, আপনার উপন্যাস তা-ই। কিন্তু ফিকশনের আধুনিক শৈলীতে তো বাস্তবের নানা রূপ যুক্ত হয়েছে; সুররিয়ালিজম, ম্যাজিক্যাল রিয়ালিজম। আপনি কেন প্রথাগত রিয়ালিস্টিক শৈলীটাই বেছে নিয়েছেন?

মনিকা: কারণ, রিয়ালিস্টিক শৈলীতে লিখতে আমি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি। কারণ, এই শৈলীতে গল্প বলতে গিয়ে আমি নিজেও গল্পের লোকজনের সঙ্গে যুক্ত হই। আর আমার মনে হয়, পাঠকও এভাবে যুক্ত হয়ে পড়ে; আমার নির্মিত জগতে তারা যেন বা নিজেদেরও দেখতে পায়; সেই জগতের লোকজনের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, তাদের জীবনের সংগ্রাম, সাফল্য, ব্যর্থতা ইত্যাদির দ্বারা আলোড়িত হয়। বিভিন্ন যুগে সাহিত্যে ফ্যাশনের মতো নানা শৈলী আসে; সেগুলো একেকটা নির্দিষ্ট যুগের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। কিন্তু আপনি যেটাকে কনভেনশাল স্টোরিটেলিং বলছেন, প্রথাগত শৈলী বলছেন, সেই রিয়ালিস্টিক ধারা কিন্তু বহুকাল ধরেই সমান্তরালভাবে আছে; আছে শক্তিশালী ধারা হিসেবে। আমার মনে হয়, পাঠকের মনে অভিঘাত সৃষ্টি করার ক্ষেত্রে রিয়ালিস্টিক শৈলীর ক্ষমতা অসাধারণ।

মশিউল: আপনার চতুর্থ উপন্যাস আনটোল্ড স্টোরিজ-এর প্রথম দুটি বাক্য (সাম স্টোরিজ আর নেভার মিন্ট টু বি টোল্ড। সাম ক্যান ওনলি বি টোল্ড অ্যাজ ফেয়ারি টেলস) পড়ে আমার তলস্তয়ের উপন্যাস আনা কারেনিনার প্রথম দুটি বাক্যের (অল হ্যাপি ফ্যামিলিজ আর অ্যালাইক; ইচ আনহ্যাপি ফ্যামিলি ইজ আনহ্যাপি ইন ইটস ঔন ওয়ে) কথা মনে পড়ে গেছে...

মনিকা: (হাসি) তলস্তয় আমার প্রিয় লেখক; তাঁর আনা কারেনিনা আমার খুবই পছন্দের উপন্যাস। গুস্তাভ ফ্লবেরও আমার খুব পছন্দের লেখক। আপনি যে রিয়ালিজমের কথা বলছিলেন, তার উৎকৃষ্ট দৃষ্টান্ত তলস্তয় আর ফ্লবের। কিন্তু আমার উপন্যাস আনটোল্ড স্টোরিজ আসলে ফ্যান্টাসি, ফেয়ারি টেলের মতো করে বলা গল্প; এটা সেই অর্থে রিয়ালিস্টিক নভেল নয়, যে অর্থে আপনি ব্রিক লেনকে রিয়ালিস্টিক বলছেন।

মশিউল: ব্রিক লেন সম্পর্কে একটা রিভিউতে এ রকম একটা মন্তব্য পড়েছিলাম: ফিকশন যে কাজগুলো সর্বোত্তমভাবে করে, ব্রিক লেন সেসবের অনেকগুলোই করতে পেরেছে। আপনি কী মনে করেন, ফিকশন বা কথাসাহিত্য আসলে কী করে?

মনিকা: আমার মনে হয়, ফিকশন সবচেয়ে ভালোভাবে যে কাজটা করে, তা হলো এমপ্যাথি সৃষ্টি। আপনি যদি উপন্যাসে পাঠককে এনগেইজ করতে সক্ষম হন, যদি তার মনের গভীরে প্রবেশ করতে পারেন, তার মধ্যে সংবেদন সঞ্চার করতে পারেন, তাহলে তার মধ্যে এমপ্যাথি সৃষ্টি হয়, আর এমপ্যাথি হচ্ছে নৈতিকতার সূচনা। সুতরাং আমার কাছে কথাসাহিত্যের উদ্দেশ্য গভীর, সেটা আনন্দ দানের চেয়ে বেশি কিছু। এই কথা বলছি এ জন্য যে উপন্যাসকে আনন্দ দানকারীর ভূমিকাও পালন করতে হয়; কিন্তু আনন্দদান বা বিনোদনই তার প্রধান কাজ নয়...

মনিকা আলী বলে চললেন, তাঁর কথায় ‘এমপ্যাথি’ শব্দটাই ঘুরেফিরে আসছিল; আর আমি ভাবছিলাম, এমপ্যাথির ঠিকঠাক বাংলা প্রতিশব্দ কী হতে পারে। দরদ কিংবা ভালোবাসা অর্থে ‘মায়া’ (মিস্টিসিজমের মায়া নয়)? কিংবা ভ্লাদিমির নাবোকভ যে অর্থে ‘পিটি’ শব্দটা ব্যবহার করেছেন, মনিকা আলীর এমপ্যাথিও সেই ‘করুণা’? ‘এমপ্যাথি’ আর ‘সিমপ্যাথি’ এক জিনিস নয়, সাহিত্য সিমপ্যাথি সৃষ্টি করলেও করতে পারে, তবে তার থেকেও তার বড় কাজ এমপ্যাথি সৃষ্টি করা—এসব যখন ভাবছি, তখন হঠাৎ আমার পাশে এসে দাঁড়ালেন লিট ফেস্টের এক স্বেচ্ছাসেবক কর্মী, ব্যস্তভাবে ঘোষণা করলেন, মনিকা আলীকে এক্ষুণি ছেড়ে দিতে হবে।

কিন্তু আমাদের কথোপকথনের তো একটা পরিণতি টানতে হবে; মনিকার দিকে চেয়ে হাসিমুখ করে বললাম, ‘পরিণত বয়সে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশে এসে আপনার কেমন লাগছে?’

‘খুব ভালো’, ফরসা মুখটা উদ্ভাসিত হলো, ‘এখন মনে হচ্ছে কেন আরও আগে আসিনি। না-আসাটা ঠিক হয়নি।’

‘ব্রিক লেন-এর পর আপনার আরও তিনটে উপন্যাস প্রকাশিত হয়েছে; সেগুলোর কোনোটাতেই বাঙালি বা বাংলাদেশ নেই। আপনি কি বাংলাদেশের মানুষদের নিয়ে আর কিছু লিখবেন না?’

‘অবশ্যই লিখব,’ বলতে বলতে উঠে দাঁড়ালেন মনিকা। লিট ফেস্টের স্বেচ্ছাসেবক কর্মীটি তাঁর দিকে চেয়ে আছেন অধৈর্য ভঙ্গিতে, যেন এক্ষুনি তাঁর হাত ধরে টেনে নিয়ে যাবেন। যেতে যেতে মনিকা বললেন, ‘আমার বাবার দেশ বাংলাদেশ, এই দেশের মানুষ আবার আমার গল্পে আসবে, অবশ্যই। আমিও আবার আসব এ দেশে; বারে বারে, ফিরে ফিরে...।’

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0