অ্যান সেক্সটনের সাক্ষাৎকার

রুচিই একমাত্র জিনিস যা একজন কবিকে শেখাতে পারেন শিক্ষক

প্যারিস রিভিউর পক্ষে সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেছেন বারবারা কেভলস। দ্য আর্ট অব পোয়েট্র, সংখ্যা ৫২, সামার ১৯৭১–এ প্রকাশিত হয়। সাক্ষাৎকারটি ১৯৬৮ সালের আগস্টের মাঝামাঝি তিন দিন ধরে চলেছিল। এখানে সাক্ষাৎকারের নির্বাচিত অংশ অনুবাদ করা হয়েছে।

অনুবাদ: ঋতো আহমেদ

১৯২৮ সালের ৯ নভেম্বর, অ্যান সেক্সটন ম্যাসাচুসেটসের ওয়েলেসলিতে জন্মগ্রহণ করেন। গারল্যান্ড জুনিয়র কলেজে পড়াশোনা করে ২০ বছর বয়সে একজন বিক্রয়কর্মীকে বিয়ে করেন। বোস্টনে ফ্যাশন মডেল হন এবং সংসারে তাঁর দুই মেয়ের জন্ম হয়। দ্বিতীয় সন্তানের জন্মের পর তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন এবং দুবার আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। বেশ কয়েক বছর মানসিক হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন।

৩০ বছর বয়সে মানসিক স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধারের উপায় হিসেবে অ্যান সেক্সটন লেখালেখি শুরু করেন। প্রতিটি বই প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে অনুদান আর পুরস্কার আসতে থাকে। ১৯৭২ সালে তিনি কোলগেট বিশ্ববিদ্যালয়ে সাহিত্যের ক্রেনশ অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং ১৯৭০ থেকে ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ে সৃজনশীল লেখার অধ্যাপক ছিলেন। তিনি ৪ অক্টোবর ১৯৭৪ সালে আত্মহত্যা করেন।

অ্যান সেক্সটন (জন্ম: ৯ নভেম্বর ১৯২৮—মৃত্যু: ৪ অক্টোবর ১৯৭৪)
ছবি: সংগৃহীত
প্রশ্ন:

কবিতা লেখা শুরু করার সময় আপনার বয়স প্রায় ৩০ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু কেন?

সেক্সটন: ২৮ বছর বয়স পর্যন্ত নিজেকে নিজের মধ্যেই একধরনের কবর দেওয়া ছিল। আমি জানতামই না যে হোয়াইট সস আর বেবির ডায়াপার বানানো ছাড়াও আরও অনেক কিছুই করতে পারি আমি। জানতাম না যে আমার মধ্যে কোনো সৃজনশীল গভীরতা আছে। সাধারণ আমেরিকান ড্রিমের শিকার ছিলাম, বুর্জোয়া, মধ্যবিত্ত স্বপ্নে বিভোর এক নারী। আমি কেবল চাইতাম, জীবনের একটা ছোট্ট টুকরো, বিয়ে, সন্তানধারণ—এই সব। ভেবেছিলাম, যদি দমন করার মতো যথেষ্ট ভালোবাসা থাকে, তাহলে দুঃস্বপ্ন আর ভূতেরা সব পালাবে। আমি আমার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছিলাম প্রচলিত জীবন যাপন করতে। কারণ, আমি এভাবেই বড় হয়েছি, আর আমার স্বামীও আমার কাছে এটাই চাইত। কিন্তু দুঃস্বপ্ন এড়াতে ছোট ছোট সাদা পিকেটের বেড়া তৈরি করা যায় না। আমার বয়স যখন ২৮ বছর, তখনই ফাটল ধরে। আমার একটা মানসিক বিকার শুরু হয় এবং আমি আত্মহত্যা করার চেষ্টা করি।

প্রশ্ন:

আর তখন আপনি নার্ভাস ব্রেকডাউনের পর লিখতে শুরু করেন?

সেক্সটন: এত সহজ নয় ব্যাপারটা। আমি শুরুতেই আমার ডাক্তারকে বলেছিলাম, আমি কোনো কাজের নই, কিছুই করতে পারি না, বোকা। তিনি পরামর্শ দিয়েছিলেন, আমি যেন বোস্টনের শিক্ষামূলক টিভি স্টেশনের প্রোগ্রামগুলো শুনে নিজেকে শিক্ষিত করার চেষ্টা করি। বলেছিলেন, আমার মন পুরোপুরি ভালো। প্রকৃতপক্ষে তিনি আমাকে রোরশ্যাচটেস্ট দেওয়ার পর বলেছিলেন, আমার সৃজনশীল প্রতিভা আছে, কিন্তু সেটা আমি ব্যবহার করছি না। শুনে আমি প্রতিবাদ করেছিলাম, কিন্তু তারপরও আমি সেই পরামর্শ অনুসরণ করি। একদিন রাতে আমি শিক্ষামূলক টেলিভিশনে আইএ রিচার্ডসকে একটি সনেট পড়ে এর রূপ ব্যাখ্যা করতে দেখেছিলাম।

আমার মনে হতো, আমি একজন প্রতিবেদক যে নিজেকে নিয়ে রিসার্চ করছে। হ্যাঁ, এর জন্য কিছুটা সাহসের প্রয়োজন, কিন্তু একজন লেখক হিসেবে বোকা হওয়ার সুযোগ নিতে হবে...হ্যাঁ, বোকা হওয়ার জন্য সম্ভবত সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সাহসের।
অ্যান সেক্সটন

তখন মনে মনে ভাবলাম, আমিও এটা করতে পারব, হয়তো অন্তত চেষ্টা করতে পারি। তাই আমি বসে একটি সনেট লিখলাম। পরের দিন আরেকটি লিখলাম। এভাবেই শুরু। লেখাগুলো দেখে আমার ডাক্তার আমাকে আরও লিখতে উৎসাহিত করলেন। তিনি বললেন, ‘আত্মহত্যা করো না। তোমার কবিতা একদিন অন্য কারও কাছে অনেক অর্থ বহন করতে পারে।’ তাঁর ওই কথাগুলো আমাকে আমার জীবনের উদ্দেশ্য, অর্থাৎ জীবনকে নিয়ে কিছু একটা করার অনুভূতি দেয়। যতই পচা হই না কেন, মনে হয়, আমার জীবনের একটা মহৎ উদ্দেশ্য আছে।

প্রশ্ন:

আপনি কি এর আগে কখনো লিমেরিক লেখেননি?

সেক্সটন: হালকা কিছু পদ লিখেছিলাম—জন্মদিন, বার্ষিকী এসবের জন্য। মাঝেমধ্যে সপ্তাহান্তে ধন্যবাদ জ্ঞাপনের নোট লিখেছিলাম। অনেক আগে হাইস্কুলে কিছু গুরুত্বপূর্ণ লেখাও লিখেছিলাম। তবে আমি কোনো প্রধান কবির সঙ্গে পরিচিত হইনি, এমনকি ছোট কবিদের সঙ্গেও নয়। সেই স্কুলে কেউ কবিতা পড়াত না। আমি সেখানে সারা টিসডেল ছাড়া আর কিছুই পড়িনি। আমি হয়তো অন্য কবিদেরও পড়েছি, কিন্তু আমার মা উচ্চবিদ্যালয় থেকে স্নাতক হওয়ার সময় বলেছিলেন, আমি সারা টিসডেলকে নকল করেছি। অথচ তিন মাস ধরে প্রতিদিন একটি করে কবিতা লিখছিলাম, কিন্তু যখন তিনি এই কথা বললেন, তাঁর সেই বক্তব্যের কারণেই হয়তো...লেখা থামিয়ে দিলাম।

প্রশ্ন:

কেউ কি আপনাকে উৎসাহিত করেনি?

সেক্সটন: সেটা কোনো ম্যাটার ছিল না। মা-ই আমাদের বাড়িতে সব বিল পে করতেন।

প্রশ্ন:

শৈশবের অপরাধবোধ, পিতা–মাতার মৃত্যু, ভাঙন, আত্মহত্যার ভয়াবহতা নিয়ে লেখার জন্য আপনার দক্ষতার প্রশংসা করেছেন কিছু সমালোচক। আপনার কি মনে হয়, মানুষের মানসিকতার অন্ধকার পর্যায়গুলো নিয়ে লেখার জন্য বিশেষ সাহসের প্রয়োজন রয়েছে?

সেক্সটন: অবশ্যই, কিন্তু আমি এসব ব্যাখ্যা করতে করতে ক্লান্ত। এগুলো স্বতঃস্ফূর্ত। পথে সব ধরনের সতর্কীকরণও আছে। যাও—বাচ্চারা—ধীরে। ওখানটা বিপজ্জনক। উত্তরে তোমার জন্য অপেক্ষা করছে সেই মারাত্মক ভয়াবহতা।

প্রশ্ন:

মানুষ আপনাকে আদিম মানুষ বলে। জীবনের বেদনাদায়ক অভিজ্ঞতার এত গভীরে প্রবেশ করা কি এতটাই স্বাভাবিক?

সেক্সটন: আমার ভেতরের একটা অংশ ভীত ছিল, কিন্তু আমার সাহসী অংশটা এগিয়ে যায়। তবু আমি যা করছিলাম, তাতে ভয়ও কাজ করেছে। একদিকে আমি ভুল খুঁড়ছিলাম, অন্যদিকে বালি দিয়ে ঢেকেও রেখেছিলাম। তবু এগিয়ে গেলাম। অন্য কিছু করতে জানতাম না। মাঝেমধ্যে আমার মনে হতো, আমি একজন প্রতিবেদক যে নিজেকে নিয়ে রিসার্চ করছে। হ্যাঁ, এর জন্য কিছুটা সাহসের প্রয়োজন, কিন্তু একজন লেখক হিসেবে বোকা হওয়ার সুযোগ নিতে হবে...হ্যাঁ, বোকা হওয়ার জন্য সম্ভবত সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সাহসের।

প্রশ্ন:

লেখা শুরু করার পর কৌশল শেখার জন্য কি আপনি কোনো আনুষ্ঠানিক ক্লাসে অংশ নিয়েছিলেন?

সেক্সটন: প্রায় তিন মাস লেখালেখি করার পর আমি জন হোমসের পড়ানো বোস্টন সেন্টার ফর অ্যাডাল্ট এডুকেশনে কবিতার ক্লাসে যাওয়ার সাহস করেছিলাম। ক্লাসের মাঝামাঝি সময়ে শুরু করেছিলাম। খুব লাজুক ছিলাম, খুব খারাপ কবিতা লিখতাম আর ক্লাসের সেই ১৮ জনকে শোনানোর জন্য সেগুলো আন্তরিকভাবে তুলে দিতাম। আমার জন্য সেই ক্লাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল—আমি সেখানে অনুভব করতাম যে আমি কোথাও আছি। যখন আমি প্রথম অসুস্থ হয়ে পড়ি, বাস্তুচ্যুত হয়ে পড়ি, তখন ভেবেছিলাম, আমি খুব একা। কিন্তু যখন মানসিক হাসপাতালে যাই, সেখানে আমি আবিষ্কার করি—আমার মতো অন্য মানুষও আছে। তখন আরও ভালো বোধ করেছিলাম, আরও বাস্তব ও সুস্থ বোধ করেছিলাম। অনুভব করেছিলাম, এরা আমার আপন মানুষ।

অ্যান সেক্সটন
ছবি: সংগৃহীত
প্রশ্ন:

প্রথম দিকে পারিবারিক কঙ্কালের ঝনঝন শব্দে আপনার আত্মীয়স্বজন কেমন প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছিল?

সেক্সটন: আমি সব সময় আত্মীয়দের কোনো কবিতা না দেখানোর চেষ্টা করেছি। আমার মা একবার আমার ডেস্কে ঢুকে ‘দ্য ডাবল ইমেজ’ ছাপার আগেই পড়েছিলেন। মৃত্যুর ঠিক আগে তিনি আমাকে বলেছিলেন, কবিতাটি তাঁর ভালো লেগেছিল। তাঁর এ কথা আমাকে আরও কিছু অপরাধবোধ থেকে রক্ষা করে। আমার স্বামীও সেই কবিতা পছন্দ করেছে। সাধারণত অনিচ্ছা সত্ত্বেও যদি আমি তাকে কোনো কবিতা দেখাই, সে বলে, খুব একটা এক্সাইটিং হয়েছে বলে মনে হয় না। ফলে আমি বিরক্ত হই। তাই খুব একটা দেখাই না। আমার শ্বশুরবাড়ির লোকেরা আমার কবিতা মোটেও পছন্দ করে না। তবে আমার বাচ্চারা করে, সামান্য খারাপ লাগলেও তারা তা করে।

প্রশ্ন:

আপনার কবিতায় বেশ কিছু পারিবারিক কঙ্কাল বেরিয়ে আসে—আপনার বাবার মদ্যপ প্রবণতা, আপনার আত্মহত্যার চেষ্টা সামলাতে আপনার মায়ের অক্ষমতা, আপনার প্রপিতামহীর স্ট্রেইটজ্যাকেট। কোন কঙ্কাল প্রকাশ করবেন আর কোনটি করবেন না, সে সম্পর্কে কি আপনি কোনো নিয়ম মেনে চলেন?

সেক্সটন: আমি এমন কোনো কঙ্কাল রিভিল করি না, যেটা কাউকে আঘাত করবে। তারা মৃতদের আঘাত করতে পারে, কিন্তু মৃতরা তো আমার। মাঝেমধ্যেই তারা পাল্টা কথা বলে। যেমন আমি কিন্তু আমার স্বামী বা তার পরিবার সম্পর্কে লিখি না, যদিও সেখানে আশ্চর্য সব গল্প আছে।

প্রশ্ন:

কোনো শিক্ষক একজন লেখককে সৃজনশীল লেখার ক্লাসে কী দিতে পারেন?

সেক্সটন: অবশ্যই সাহস। এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। তারপর বেশ স্পষ্টভাবে বলতে গেলে, লোয়েল আমাকে সহজ সুরেলা বাক্যে অবিশ্বাস করতে এবং সাধারণ কথাবার্তার স্পষ্টতা খুঁজে পেতে সাহায্য করেছিলেন। লোয়েল কখনোই চিত্র বা শব্দের প্রদর্শনে মুগ্ধ হন না। আপনার কাছে যথেষ্ট প্রাকৃতিক চিত্র থাকলে তিনি আপনাকে কীভাবে সেটা লিখতে হবে, তা দেখাতে পারেন। তিনি আমাকে কী কবিতা লিখতে হবে, তা বলেননি, কিন্তু কী বাদ দিতে হবে, তা শিখিয়েছিলেন। আমাকে শিখিয়েছিলেন, রুচি, সম্ভবত রুচিই একমাত্র জিনিস, যা একজন কবিকে শেখাতে পারেন শিক্ষক।

প্রশ্ন:

সিলভিয়া প্লাথও লোয়েলের ক্লাসের একজন সদস্য ছিলেন, তাই না?

সেক্সটন: হ্যাঁ। সে আর জর্জ স্টারবাক শুনল যে আমি লোয়েলের ক্লাস অডিট করছি। দ্বিতীয় টার্মের জন্য ওরা আমার সঙ্গে ওখানে যোগ দিয়েছিল। ক্লাসের পর আমরা আমার পুরোনো ফোর্ডের সামনের সিটে ঠাসাঠাসি করে বসতাম, দ্রুত গাড়ি চালাতাম রিটজে। আমি সব সময় লোডিং ওনলি জোনে অবৈধভাবে গাড়ি পার্ক করতাম, আর আনন্দের সঙ্গে বলতাম, ঠিক আছে, আমরা কেবল গাড়ি লোড করব।

লোয়েল আমাকে সহজ সুরেলা বাক্যে অবিশ্বাস করতে এবং সাধারণ কথাবার্তার স্পষ্টতা খুঁজে পেতে সাহায্য করেছিলেন। তিনি আমাকে কী কবিতা লিখতে হবে, তা বলেননি, কিন্তু কী বাদ দিতে হবে, তা শিখিয়েছিলেন। শিখিয়েছিলেন, রুচি।
অ্যান সেক্সটন

দুজনে জর্জের বাহুতে ঝুলতে ঝুলতে গিয়ে তিন-চারটি মার্টিনি পান করতাম। জর্জের প্রথম কবিতার বই ‘বোন থটস’-এ এই বিষয়ে একটি লাইন আছে। রিটজের পর, আমরা আমাদের শেষ পয়সাটুকুও ওয়ালডর্ফ ক্যাফেটেরিয়ায় খরচ করতাম—সত্তর সেন্টের ডিনার—জর্জের কোনো তাড়াহুড়ো ছিল না। সে তার স্ত্রীর থেকে আলাদা ছিল, সিলভিয়ার টেড [হিউজ] তার নিজের কাজে ব্যস্ত ছিল, আর আমাকে আমার মনোরোগ বিশেষজ্ঞের সঙ্গে সন্ধ্যা সাতটার অ্যাপয়েন্টমেন্টের জন্য শহরে থাকতে হয়েছিল।...মজার তিন বন্ধু।

প্রশ্ন:

সিলভিয়া প্লাথের শেষ বই, তাঁর আত্মহত্যার ঠিক আগে লেখা হয়েছিল, সেখানে তিনি মৃত্যুর থিমে ডুবে ছিলেন, ঠিক যেমন আপনি আপনার ‘লিভ অর ডাই’ বইতে আছেন। আপনি কি কখনো রিটজে মৃত্যু বা আপনার আত্মহত্যা সম্পর্কে কথা বলার সুযোগ পেয়েছেন?

সেক্সটন: প্রায়শই। সিলভিয়া আর আমি আত্মহত্যা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করতাম। বিস্তারিত ও গভীরভাবে—মুক্ত আলুর চিপস চাবাতে চাবাতে। আত্মহত্যা হলো কবিতার বিপরীত। সিলভিয়া আর আমি প্রায়শই বিপরীত কথা বলতাম। আমরা পুড়ে যাওয়া তীব্রতার মতো মৃত্যু নিয়ে কথা বলতাম। দুজনেই মৃত্যুর প্রতি এমনভাবে আকৃষ্ট হতাম, যেমন পতঙ্গ বৈদ্যুতিক বাল্বের দিকে যায়, চুষে খায়। মিষ্টি করে ও প্রেমময়ভাবে তার প্রথম আত্মহত্যার গল্পটি বর্ণনা করেছিল সে, এবং ‘দ্য বেল জার’ বইয়ে তার বর্ণনা ঠিক একই গল্প। আশ্চর্যের বিষয় যে আমরা অহংকার দিয়ে জর্জকে হতাশ করিনি, বরং আমার মনে হয়, আমরা তিনজনই এতে উদ্বুদ্ধ হয়েছিলাম, এমনকি জর্জও, যেন মৃত্যু আমাদের প্রত্যেককে এই মুহূর্তে একটু বেশি বাস্তব করে তুলেছে।

প্রশ্ন:

যদিও আপনি আমেরিকান একাডেমি অব আর্টস অ্যান্ড লেটারস থেকে ইউরোপীয় ভ্রমণ ফেলোশিপ পেয়েছেন, তবু আজ পর্যন্ত আপনার ইউরোপীয় অভিজ্ঞতা সম্পর্কে খুব কম কবিতা প্রকাশিত হয়েছে। কেন?

সেক্সটন: প্রথমত, কবিতা বাড়িতে পাঠানোর কোনো পোস্টকার্ড নয়। দ্বিতীয়ত, আমি ইউরোপে গিয়েছিলাম একটা উদ্দেশ্য নিয়ে এবং একই সঙ্গে অনুদান নিয়েও। আমার প্রপিতামহী, যিনি সত্যিই আমার শৈশবের সবচেয়ে ভালো বন্ধু ছিলেন, তিনি ইউরোপ থেকে বাড়িতে চিঠি পাঠিয়েছিলেন তিন বছর ধরে। ‘সাম ফরেন লেটারস’ নামের কবিতায় এ বিষয়ে লিখেছিলাম। ইউরোপে যাওয়ার সময় আমার কাছে তাঁর চিঠিপত্র ছিল। আমি তাঁর এলাকাটা ঘুরে দেখতে চেয়েছিলাম। তাঁর জীবনে যেসব পথ তিনি অতিক্রম করেছেন, সেসব পথে হাঁটতে চেয়েছিলাম। তাঁর জীবনটাই আবার যাপন করতে চেয়েছিলাম। ফিরে গিয়ে তাঁকে চিঠি লিখতে যাচ্ছিলাম। ইউরোপ সম্পর্কে আমি যে দুটি কবিতা লিখেছিলাম, তাতে চিঠিগুলোর উল্লেখ ছিল। ‘ক্রসিং দ্য আটলান্টিক’-এ উল্লেখ করেছি, আমার দাদির চিঠি আর আমার মায়ের চিঠি পড়েছি। ডিকেন্সের আমেরিকার জার্নালের কথা ভেবে তাঁদের কথাগুলো গিলে ফেলেছিলাম। দ্বিতীয় কবিতা ‘ওয়াকিং ইন প্যারিস’ আমার প্রপিতামহী সম্পর্কে লেখা হয়েছিল, কীভাবে তিনি প্যারিসে প্রতিদিন চৌদ্দ-পনেরো মাইল হাঁটতেন, আমি তাকে নানা বলে ডাকতাম—এই সব। কিছু সমালোচক ভেবেছিলেন যে আমি জোলার নানা বলতে চাইছিলাম, কিন্তু আমি আসলে পিটার প্যানের নানা বলতে চাইনি। যাহোক, বেলজিয়ামে আমার গাড়ি থেকে চিঠিগুলো চুরি হয়ে গেছে। ব্রাসেলসে চিঠিগুলো হারিয়ে যাওয়ার পর সেই ধরনের কবিতার সমাপ্তি ঘটে।

গ্রাফিকস: প্রথম আলো
প্রশ্ন:

১৯৬৪ থেকে ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত আপনি নাটক লেখার ক্ষেত্রে ফোর্ড ফাউন্ডেশনের অনুদান পেয়েছিলেন এবং বোস্টনের চার্লস স্ট্রিট প্লে হাউসে কাজ করেছিলেন। মঞ্চস্থ করতে হবে এমন কিছু লেখার অনুভূতি কেমন ছিল?

সেক্সটন: আমার খুবই ভালো লাগছিল! লিভিং রুমে ওপর-নিচ করতে করতে লাইনগুলো চিৎকার করে আওড়াতাম, আর এটাকে কী বলে...মঞ্চের চারপাশে হেঁটে যাওয়ার জন্য...নাটকটি আটকে রাখার জন্য।

যখন আমাদের সময় থাকত তখন অল্প কিছু কর্ম পরিবেশনা হতো চার্লস প্লেহাউসে। সেখানে বেশ ব্যস্ততা ছিল। মাঝেমধ্যে তারা আমার জন্য দৃশ্য বানাত, তারপর সেটি আবার লিখত আর পরিচালকের কাছে বিশেষ ডেলিভারি পাঠাত। তিনি পরের দিন সকালে আমাকে ফোন করে বলতেন, তেমন ভালো হয়নি। তারপর আমি আবার এটি নিয়ে কাজ করতাম, সেই সন্ধ্যাতেই তাঁকে পাঠাতাম। তারপর পরের দিন সকালে তিনি ফোন করতেন। এভাবেই চলতে থাকত।

প্রশ্ন:

আপনি কি লক্ষ করেছেন যে আপনার কবিতার বিষয়বস্তু আপনার নাটকের সঙ্গে মিলে গেছে? আপনার নাটক কি আপনার কবিতারই একটি সম্প্রসারণ?

সেক্সটন: হ্যাঁ। পুরোপুরি। নাটকটি ছিল একটি মেয়ের তার মনোরোগ বিশেষজ্ঞ আর এক পুরোহিতের মধ্যে আলাপচারিতার গল্প। আমি বুঝতে পেরেছিলাম যে পুরোহিত আসলে তাঁর সঙ্গে কোনো সংলাপ করছেন না, এই পুরোহিতকেই বাদ দিয়েছিলাম। নাটকটি ছিল আমার কবিতার সমস্ত বিষয় নিয়ে রচিত আমার মা, আমার প্রপিতামহী, আমার বাবা ও আত্মহত্যা করতে চাওয়া মেয়ে। আর তার স্বামী সম্পর্কে কিছুটা, কিন্তু খুব বেশি কিছু নয়। নাটকটি আসলে নীতিগত এক নাটক। দ্বিতীয় অংশটি তার মৃত্যুর পরের ঘটনা।

প্রশ্ন:

আপনি কি একসঙ্গে অনেক কবিতা লেখেন, নাকি সময়সূচির দ্বারা নিয়ন্ত্রিত?

সেক্সটন: আমি যে পরিমাণ লিখি, তাতে আমি খুবই অসন্তুষ্ট। আমার প্রথম বই—যদিও এটি শেষ করতে তিন বছর সময় লেগেছে—প্রকৃতপক্ষে এক বছরেই লেখা হয়েছিল। মাঝেমধ্যে দুই সপ্তাহে দশটি কবিতা লেখা হতো। যখন আমি এই হারে লেখার চেষ্টা করতাম, দেখতে পেতাম যে আমি সত্যিই ভালোভাবে কাজ করতে পারি। এখন আমি নিজের ওপরই অসন্তুষ্ট হয়ে পড়ি, কেন আমি এত ধীরে লিখি, কেন আমার কাছে এত ধীরে আসে কবিতা। যখন আসে, আমি তখন লিখি; যখন আসে না, আমি কিছুই লিখি না। তবে আমার কোনো সুশৃঙ্খল সময়সূচি নেই লেখার। কেবল একটি বিষয় ছাড়া যখন কবিতা আসে, তখন আমাকে অবশ্যই প্রস্তুত থাকতে হবে, পেশিগুলোকে নমনীয় করতে হবে। অর্থাৎ যখন আসে, তারা ফেটে পড়ে, তাই আপনাকে অন্য সবকিছু একপাশে রেখে কেবল লিখতে হবে। আদর্শভাবে বলতে গেলে সবকিছু কী, তা বিবেচ্য নয়, যদি না আপনার স্বামীর ডাবল নিউমোনিয়া হয়, অথবা সন্তানের পা ভেঙে যায়। অন্যথায় আপনি টাইপরাইটার থেকে আলাদা হবেন না যতক্ষণ না ঘুম আসে।

প্রশ্ন:

স্ত্রী ও মায়ের অন্যান্য দায়িত্ব কি আপনার লেখালেখিতে বাধা সৃষ্টি করে?

সেক্সটন: আমার বাচ্চারা যখন ছোট ছিল, সব সময় বাধা সৃষ্টি করত। কারণ, ছোট বাচ্চারা যখন ‘মা, মা’ ডাকত, তখন আমি হয়তো ছবি আঁকছিলাম, কিংবা কবিতা লিখছিলাম। কিন্তু সবকিছু সামাল দিয়েছি আমি। এখন আমার বাচ্চারা বড় হয়েছে, ঘরের ভেতর ঘুরে ঘুরে বলছে, মা কবিতা লিখছে। কিন্তু আবার যখন আমি ‘তোমাকে ছাড়া আঠারো দিন’ কবিতাটি লিখছিলাম, প্রেমের কবিতার শেষ কবিতা, তখন আমার স্বামী আমাকে বলল, ‘আমি আর সহ্য করতে পারছি না, তুমি অনেক দিন ধরে আমার কাছে আসছ না।’ কবিতাটি মূলত ছিল ‘তুমি ছাড়া একুশ দিন’, কিন্তু পরে এটি আঠারো দিন হয়ে গেল। কারণ, সে আমার অনুপ্রেরণায় প্রবেশ করেছিল, আবার আমার উপস্থিতি দাবি করেছিল তার জীবনে। তাই তার কাছ থেকে এত কিছু নিতে পারিনি।

প্রশ্ন:

লেখার সময় কবিতার কোন অংশটি সবচেয়ে কাঁটাযুক্ত মনে হয়?

সেক্সটন: যতিচিহ্ন, মাঝেমধ্যে। যতিচিহ্ন পুরো অর্থ বদলে দিতে পারে, আর আমার জীবন ছোট ছোট বিন্দু আর ড্যাশে ভরা। তাই সম্পাদকদের আমাকে যতিচিহ্ন ঠিক করতে সাহায্য করতে হবে। আর সম্ভবত ছন্দ। শুরুতেই আমাকে সবচেয়ে বেশি পরিশ্রম করতে হবে অনুভূতি, কবিতার কণ্ঠস্বর, এবং এটি কীভাবে উতরে আসবে, পাঠকের কাছে কেমন লাগবে—এই সব। ছবি সম্ভবত কবিতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রথমত, আপনি একটি গল্প বলতে চান, কিন্তু ছবিগুলোই সেই গল্পকে তুলে ধরে, বিষয়টির মূলে পৌঁছায়। তবে আমাকে ছবিগুলোর জন্য খুব বেশি পরিশ্রম করতে হয় না। কারণ, আমি জানি তাদের আসতেই হবে। যদি না আসে, তাহলে আমি কবিতাও লিখছি না, তখন সেটা অর্থহীন হবে। তাই আমি ছন্দটা বুঝতেই সবচেয়ে বেশি পরিশ্রম করি। কারণ, প্রতিটি কবিতার নিজস্ব ছন্দ, নিজস্ব কাঠামো থাকা উচিত। প্রতিটি কবিতার নিজস্ব জীবন আছে, প্রতিটি কবিতা আলাদা।

প্রশ্ন:

দিনের নির্দিষ্ট কোনো সময় আছে, কোনো বিশেষ মেজাজ আছে, যা লেখার জন্য ভালো?

সেক্সটন: না। কবিতা আসার আগের সেই মুহূর্তগুলো, যখন নিজের ওপর তীব্র সচেতনতা আসে এবং বুঝতে পারি যে কবিতা কোথাও চাপা পড়ে আছে, তখন আমি লেখার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করি। দৌড়াদৌড়ি করি, ঘরের চারপাশে লাফিয়ে লাফিয়ে, অসাধারণ আনন্দ হয় তখন। মনে হয় যেন আমি উড়ে যেতে পারি প্রায়, আর সত্য বলার আগেই আমি খুব টেনশনে পড়ে যাই—কঠিন টেনশন। তারপর আমি ডেস্কে বসে লিখতে শুরু করি।

প্রশ্ন:

লেখার সময় অনুভূতির মান কেমন থাকে?

সেক্সটন: খুব সুন্দর অনুভূতি, যদিও কঠিন পরিশ্রমের। আমি যখন লিখি, জানি যে আমি সেই কাজই করছি, যার জন্য জন্মেছি আমি।

প্রশ্ন:

আপনি বলেছিলেন, ‘যখন আমি কবিতা নিয়ে কাজ করি, তখন সত্যের সন্ধান করি...কেবল বাস্তব সত্য নয়, কাব্যিক সত্য।’ আপনি কি বিষয়টা একটু খুলে বলবেন?

সেক্সটন: আমার অনেক কবিতাই সত্য, লাইন বাই লাইন, গল্পের মূলে পৌঁছানোর জন্য কিছু তথ্য পরিবর্তন করা হয় কেবল। ‘দ্য ডাবল ইমেজ’-এ, ক্যানসারে আমার মায়ের মৃত্যু আর আমার মেয়ের মৃত্যু নিয়ে লেখা কবিতাটিতে আমি উল্লেখ করিনি যে আমার আরেকটি সন্তান ছিল। প্রতিটি কবিতার নিজস্ব সত্য আছে। এ ছাড়া সেই কবিতায়, আমি কেবল বলেছি যে আমি দুবার হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলাম, যখন বাস্তবে, সেই সময়ের মধ্যে আমাকে পাঁচবার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। কিন্তু তারপর কাব্যিক সত্য অগত্যা আত্মজীবনীমূলক নয়। এটি এমন এক সত্য, যা তাৎক্ষণিকভাবে নিজের, অন্য জীবনের বাইরের। আমি সব সময় আক্ষরিক তথ্য মেনে চলি না, যখনই প্রয়োজন হয়, আমি সেগুলি তৈরি করি নিজের মতো করে লেখার প্রয়োজনে। বাস্তব উদাহরণগুলো একেকটা সত্যতা দেয় কেবল। আমি চাই পাঠক অনুভব করুক, হ্যাঁ, হ্যাঁ, এমনই। আমি চাই যেন অনুভব করে তারা আমাকে স্পর্শ করছে। কবিতার জন্য যেকোনো শব্দ, মনোভাব, চিত্র বা ব্যক্তিত্ব পরিবর্তন করতে পারি। ইয়েটস যেমন বলেছিলেন, ‘আমি অনেকগুলো জীবনকে যাপন করেছি, আমি একজন দাস আর একজন রাজপুত্র ছিলাম। অনেক প্রিয়জন আমার হাঁটুতে বসেছেন, এবং আমিও অনেক প্রিয়জনের হাঁটুতে বসেছি; যা ছিল আবার ফিরে আসবে।’

প্রশ্ন:

সেখানে ইয়েটস পুনর্জন্মের কথা বলছেন।

সেক্সটন: আমিও তা–ই। একটু পাগলাটে, কিন্তু আমি বিশ্বাস করি, আমি একের ভেতরে বহু। যখন আমি কবিতা লিখি, মনে হয়—আমিই সেই ব্যক্তি, যার লেখা উচিত। অনেক সময় আমি ছদ্মবেশ ধারণ করি, একজন ঔপন্যাসিকের মতো আক্রমণ করি। কখনো কখনো আমি অন্য কারও হয়ে যাই, আমি তখন পুরোপুরি বিশ্বাস করি, এমনকি যখন আমি কবিতা লিখি না, তখনো আমিই সেই ব্যক্তি। যখন কোনো কৃষকের স্ত্রী সম্পর্কে লিখি, তখন আমি মনে মনে ইলিনয়ে বাস করতাম। যখন আমার অবৈধ সন্তান ছিল, আমি তাকে লালন-পালন করতাম মনে মনে, তারপর ফিরিয়ে দিয়েছিলাম এবং এভাবেই জীবন বিনিময় করেছিলাম।

আমি মানুষের আবেগ সম্পর্কে লিখি, ঐতিহাসিক ঘটনা সম্পর্কে নয়; অভ্যন্তরীণ ঘটনা সম্পর্কে লিখি, বাহ্যিক নয়। একটি প্রেমের কবিতায় আমি লিখেছি, আমার প্রেমিকা ভিয়েতনাম থেকে মৃতদেহ নামিয়ে আনছে।
অ্যান সেক্সটন

যখন আমার প্রেমিককে তার স্ত্রীর কাছে ফিরিয়ে দিয়েছিলাম, মনে মনে, আমি শোক পালন করেছিলাম। দেখেছি আমি কতটা অলৌকিক আর অপ্রয়োজনীয় ছিলাম। যখন আমি খ্রিষ্টান ছিলাম, তখন আমি খ্রিষ্টের মতো অনুভব করতাম। আমার বাহুতে ব্যথা ছিল, মরিয়া হয়ে ক্রুশ থেকে আমার হাত টেনে খুলে ফেলতে চেয়েছিলাম। যখন আমাকে ক্রুশ থেকে নামিয়ে জীবিত কবর দেওয়া হয়েছিল, তখনো আমি সমাধান খুঁজছিলাম। আশা করেছিলাম, এগুলো খ্রিষ্টীয় সমাধান।

প্রশ্ন:

আপনার দর্শন কতক্ষণ স্থায়ী হয়? সেগুলো কেমন?

সেক্সটন: বলা অসম্ভব। এগুলো ছয় মাস, ছয় মিনিট, অথবা ছয় ঘণ্টাও স্থায়ী হতে পারে। আমি যখন কোনো স্বপ্ন দেখি, আমার অনুভূতির সঙ্গে তার খুব একটা মিল থাকে না। কবিতা লেখার শুরুর মতো পুরো পৃথিবীটাই খুব তীক্ষ্ণ ও স্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত। মনে হয়, যেন খুব তীব্রভাবে জীবিত আমি, যেন আমাকে বৈদ্যুতিক ভোল্টে পূর্ণ করে তোলা হয়েছে।

প্রশ্ন:

আপনার অনেক কবিতাই কষ্টের স্মৃতির। খুব কম কবিতাই আছে সুখের স্মৃতির। কেন আপনি সব সময় ব্যথা সম্পর্কেই বেশি লিখতে আগ্রহী?

সেক্সটন: এ কথা পুরোপুরি সত্য নয়। আমার শেষ বইটি আনন্দের। আমার মনে হয়, অসুখী বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করেছি। কারণ, আমি সেগুলোর ভেতর দিয়েই বেঁচেছি। যদি আমি সেভাবে না বেঁচে থাকি, তাহলে হয়তো আমি সেগুলো আবিষ্কার করেছি।

প্রশ্ন:

আপনি কি কবিতাপাঠ উপভোগ করেন?

সেক্সটন: এর জন্য জীবনে তিন সপ্তাহ সময়। পাঠের এক সপ্তাহ আগে নার্ভাসনেস শুরু হয় এবং পড়ার আগের রাত পর্যন্ত বাড়তে থাকে। আর আমার ভেতরের কবি একজন অভিনয়শিল্পীতে রূপান্তরিত হয়। পাঠ আমার কাছ থেকে অনেক কিছু কেড়ে নেয়। কারণ, এগুলো আমার অভিজ্ঞতাকে পুনরুজ্জীবিত করে, অর্থাৎ এগুলো যেন আবার ঘটছে বলে মনে হয়। মনে হয়, আমি আমার নিজের আত্মজীবনীমূলক নাটকের একজন অভিনেত্রী। তারপর আছে ভালোবাসা...দর্শক-শ্রোতা আর আমার মধ্যে যখন মিলন হয়, যখন তারা সত্যিই আমার সঙ্গে থাকেন এবং সুরও আমার সঙ্গেই থাকে, তখন আমি আর একা নই।

প্রশ্ন:

একজন তরুণ কবিকে আপনি কী পরামর্শ দেবেন?

সেক্সটন: আপনার সমালোচক কারা, সে ব্যাপারে সাবধান থাকবেন। যা বলবেন, নির্দিষ্টভাবে বলবেন। প্রায় পুরো গল্পটা বলবেন। আর শুনতে হবে নিজের আত্মার কথা খুব মনোযোগ দিয়ে।

প্রশ্ন:

কেউ কেউ ভাবছে, ভিয়েতনাম যুদ্ধ বা নাগরিক অধিকার সংকটের মতো সময়ের মহান বিষয়গুলোকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে কীভাবে আপনি কেবল নিজের সম্পর্কেই লিখতে পারেন।

সেক্সটন: জাতীয় ইস্যুগুলোর মুখোমুখি হওয়ার আগে মানুষকে খুঁজে বের করতে হবে যে তারা আসলে কারা। হ্যাঁ, আমি জনসাধারণের ইস্যুগুলো নিয়ে খুব কমই লিখি, তা আমার ব্যক্তিগত মতামতকে প্রতিফলিত করে না। আমি শান্তিবাদী। আমি আবেদনপত্রে স্বাক্ষর করি ইত্যাদি। তবে আমি বিতর্কবাদী নই। ‘দ্য ফায়ার বোম্বারস’ একটি নতুন কবিতা—ভিয়েতনাম সম্পর্কে নয়, বিশেষ করে যখন রবার্ট কেনেডি নিহত হন, তখন আমি একজন খুনি সম্পর্কে লিখেছিলাম। আমি মানুষের আবেগ সম্পর্কে লিখি, ঐতিহাসিক ঘটনা সম্পর্কে নয়; অভ্যন্তরীণ ঘটনা সম্পর্কে লিখি, বাহ্যিক নয়। একটি প্রেমের কবিতায় আমি লিখেছি, আমার প্রেমিকা ভিয়েতনাম থেকে মৃতদেহ নামিয়ে আনছে। যদি সেই কবিতা ১০০ বছর পরে পড়া হয়, তাহলে মানুষকে ভিয়েতনামের যুদ্ধের দিকে তাকাতে হবে তখন। তারা একে কোরিয়ান যুদ্ধের সঙ্গে মিশিয়ে ফেলবে হয়তো, অথবা ঈশ্বর জানেন, আর কী কী হতে পারে। আশা করা যায়, এটা খুব শিগগিরই ইতিহাস হয়ে যাবে। হ্যাঁ, আমি বদলাতে পারি। অভিজ্ঞতা প্রকাশের জন্য আমি যুদ্ধের সুনির্দিষ্ট বিষয়গুলো ব্যবহার করতে পারি। আমি যে বিবরণগুলোর সঙ্গে পরিচিত, তার মতোই বৈধ হবে তখন। নাগরিক অধিকারের বিষয়টি আমি একটি কবিতায় আকস্মিকভাবে উল্লেখ করেছি, কিন্তু আমি তাতে পুরোপুরি প্রবেশ করি না। আমার মনে হয়, এটি একটি প্রধান বিষয়। আমার অনেক কবিতাই ব্যক্তি সম্পর্কে লেখা, যাকে বঞ্চিত করা হয়েছে, যাকে দাসের ভূমিকায় দেওয়া হয়েছে, যে স্বাধীনতা চায়, মতামত প্রকাশ করতে চায় বলে চিৎকার করে পৃথিবীতে কালো থাকার মানব-অভিজ্ঞতা সম্পর্কে বলছে। কালোদের আবেগও সাদাদের আবেগ হতে পারে। ব্যক্তি ও জাতির জন্যও এটা একটা সংকট। আমার মনে হয়, সাদা মুখোশ পরে আমি সারা জীবন কালো কবিতা লিখে আসছি।