বামদের শূন্য থেকে শুরু করতে হবে

স্লাভোই জিজেক-এর জন্ম সাবেক যুগোস্লাভিয়ায়। নয়া মার্ক্সবাদী জনবুদ্ধিজীবী হিসেবে তিনি এখন বিশ্বনন্দিত। একাধিক দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি দর্শন ও সংস্কৃতিতত্ত্বের অধ্যাপক। গত ২ আগস্ট তিনি আলাপ করেন দ্য গার্ডিয়ান-এর কলাম লেখক ওয়েন জোন্স-এর সঙ্গে। আলোচনাটি ইউটিউবে ‘হাউ টু একাডেমি’ নামের একটি চ্যানেলে প্রকাশিত হয়েছে। আলাপের নির্বাচিত অংশ এখানে প্রকাশিত হলো। অনুবাদ করেছেন জাভেদ হুসেন

গ্রাফিকস: প্রথম আলো

শুনতে হাস্যকর লাগতে পারে। আমি বারবার কথাটা বলি, তবে তা কিন্তু কৌতুক করে নয়। আমি নিজেকে বলি ‘নমনীয় রক্ষণশীল কমিউনিস্ট’। কারণ, আমি মনে করি, আজ আমরা যেসব বড় সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছি, মানে পরিবেশ, বিশ্বযুদ্ধ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা—এগুলোর সঙ্গে আমরা শুধু দেশীয় বা আঞ্চলিক সমাধান দিয়ে মোকাবিলা করতে পারব না। এসবের সমাধান করতে হবে বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গিতে। আমার কাছে কমিউনিজম মানে নতুন কোনো পলিটব্যুরো দখল করা নয়। কমিউনিজম মানে, সারা বিশ্বে আন্তরিক সহযোগিতা।

একটি উদাহরণ দিই। তিন-চার বছর আগে ভ্যাঙ্কুভার ও সিয়াটলের তাপমাত্রা কয়েক দিনের জন্য ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছে গিয়েছিল। সে সময় এই দুই শহরের তাপমাত্রা হয়ে গিয়েছিল সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো উষ্ণ দেশের চেয়ে বেশি। তাহলে ভুলটা হলো কোথায়? না, ওই দুই শহরে স্থানীয়ভাবে তারা তাদের পরিবেশ নিয়ন্ত্রণে যথেষ্ট সচেতন ছিল। অন্তত পরিবেশ বিষয়ে যারা সচেতন, তারা তাদের চেয়ে খারাপ ছিল না। সমস্যা কোথায়? উত্তর মেরুর চারপাশের বায়ুপ্রবাহ গভীরভাবে ব্যাহত হয়েছে। এ কারণে উত্তর রাশিয়ায়, সাইবেরিয়ার আর্কটিক উপকূলেও গত বছরে তাপমাত্রা ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছুঁয়েছে। ফলে এই যে তাপমাত্রা এতটা অসহনীয় অবস্থায় পৌঁছে যাচ্ছে, একে শুধু আঞ্চলিক সমস্যা হিসেবে দেখার উপায় নেই। এর জন্য আমাদের সমাধান চাই বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গিতে।

যখন বলি যে আমি ‘নমনীয় রক্ষণশীল’, তখনই সমস্যাটা শুরু হয়। বামপন্থীদের এসব বড় ঘটনার প্রতি মুগ্ধতা দেখে আমি ক্লান্ত ও বিরক্ত, যেমন তাহরির স্কোয়ারে ১০ লাখ মানুষ বা অন্য কোনো বড় আন্দোলন। এগুলো আমাকে মুগ্ধ করে না। আমার আগ্রহ সব সময় ‘পরবর্তী সকাল’ বা ‘পরের দিন’ নিয়ে। বড় বড় ঘটনা তো ঘটছেই। কিন্তু আসল ব্যাপার হলো সেসবের তিন মাস পর পরিস্থিতি যখন স্বাভাবিক হয়ে আসে, তখন সাধারণ মানুষের অবস্থাটা কী?

বড় আন্দোলন আমাকে মুগ্ধ করে না। আমার আগ্রহ সব সময় ‘পরবর্তী সকাল’ বা ‘পরের দিন’ নিয়ে। বড় বড় ঘটনা তো ঘটছেই। কিন্তু আসল ব্যাপার হলো সেসবের তিন মাস পর পরিস্থিতি যখন স্বাভাবিক হয়ে আসে, তখন সাধারণ মানুষের অবস্থাটা কী?
স্লাভোই জিজেক

এ কারণে আমার একটি পুরোনো কৌতুক আছে। কৌতুকটা খুব বিখ্যাত সিনেমা ভি ফর ভেনদেত্তা নিয়ে। ছবিটা মানুষের দাসত্ব ও অধীনতা এবং সেই অধীনতা থেকে মুক্তি নিয়ে। আমার কৌতুক ছিল, ভি ফর ভেনদেত্তার দ্বিতীয় পর্ব দেখতে আমি আমার মাকে পর্যন্ত দাস হিসেবে বিক্রি করে দিতে রাজি ছিলাম!

শেষে ক্ষমতা দখল করে মানুষই। ঠিক আছে, ব্যাপারটা সুন্দর। কিন্তু এরপর তারা কী করবে?

আমি মনে করি, ট্রাম্প যা বুঝতে পেরেছিলেন, তা আমাদের জন্য একটা আশার আলো দেখিয়েছে। তিনি দেখেছিলেন, উদার গণতান্ত্রিক কল্যাণ রাষ্ট্রের আকারে নয়া উদারতাবাদ বলে যে বস্তুটি আছে, তার আয়ু ফুরিয়েছে। আর এই ব্যাপার কে স্পষ্টভাবে দেখেছিলেন? ফ্রান্সিস ফুকুইয়ামা নিজেই। তাই সর্বশেষ নির্বাচনে ফুকুইয়ামা বার্নি স্যান্ডার্সের পক্ষে ভোট দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন।

হয়তো বেশি উসকে দিচ্ছি বলে মনে হবে। আমি বলতে চাই, বামপন্থীদের অবশ্যই প্রথমে পুরোনো চেহারার বিপ্লবী বা বিদ্রোহী ঘটনার প্রতি মুগ্ধতা ছেড়ে দিতে হবে। আপনি রাস্তায় প্রতিবাদ করুন, জানালা ভাঙুন। এসব দমনমূলক বা অশুভ শক্তি প্রতিরোধের চেষ্টা; কিন্তু দুঃখজনকভাবে ডানপন্থীরা এসব আমাদের কাছ থেকে নিয়ে ফেলেছে। উদাহরণস্বরূপ, (২০২১ সালের) ৬ জানুয়ারি ট্রাম্পের অনুসারীরা ক্যাপিটল হিল আক্রমণ করল। আমার বন্ধুরা তখন কাঁদছিল। তারা বলছিল, ‘হায় খোদা, বড় একটা ডানপন্থীদের দল কংগ্রেস দখল করেছে। আমাদেরও পাল্টা কিছু করা উচিত।’ তখন আমার প্রশ্ন ছিল, আমরা প্রথমে কী করতে চাই?

এ প্রসঙ্গে লেনিনের ১৯২২ সালে লেখা একটা রচনার উদাহরণ দিই। লেনিনের আমি অনেক সমালোচনা করি। কিন্তু এই লেখাটা অসাধারণ। তিনি বিপ্লবী প্রক্রিয়াকে একটি পাহাড়ে ওঠার সঙ্গে তুলনা করেছিলেন। সেই পাহাড়ের চূড়ার মাঝপথে যদি আপনি আটকে যান, তাহলে সেখানেই ঠায় দাঁড়িয়ে শুধু চিন্তা করে লাভ নেই। আবার আপনাকে পাহাড়ের তলায় ফিরে যেতে হবে। বামপন্থীদের আজ ঠিক এই কাজই করতে হবে।

একটি বিষয় স্পষ্ট। ট্রাম্পের বিজয় এবং ইউরোপে জনতুষ্টিবাদী ডানপন্থার উত্থান দেখাচ্ছে যে বামপন্থীরা আবার পাহাড়ের পাদদেশে পৌঁছে গেছেন। নিজেদের পুরোপুরি আবার নতুন করে তাঁদের আবিষ্কার করতে হবে। নইলে তাঁরা বিলীন হয়ে যাবেন।

বামপন্থীদের অবশ্যই প্রথমে পুরোনো চেহারার বিপ্লবী বা বিদ্রোহী ঘটনার প্রতি মুগ্ধতা ছেড়ে দিতে হবে। আপনি রাস্তায় প্রতিবাদ করুন, জানালা ভাঙুন। এসব দমনমূলক বা অশুভ শক্তি প্রতিরোধের চেষ্টা; কিন্তু দুঃখজনকভাবে ডানপন্থীরা এসব আমাদের কাছ থেকে নিয়ে ফেলেছে।
স্লাভোই জিজেক

বামপন্থীরা যখন পশ্চিমে আবার রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন, বার্নি স্যান্ডার্স ও জেরেমি করবিনরা দৃশ্যপটে এলেন; তখন বিভিন্ন রকমের পডকাস্টসহ এ রকম অনেক প্রচেষ্টা দেখা গিয়েছিল। কিন্তু সবকিছু কোনো না কোনোভাবে ব্যর্থ হয়েছে। তবু আমি বলি, এতেও আশার দিক আছে। ১৯৬৪ সালে ব্যারি গোল্ডওয়াটার নির্বাচনে হেরেছিলেন। অনেক পরে সেই ধারারই রিগ্যানের জয় হয়েছিল ১৯৮০ সালে। অনেক সময় লেগেছিল। অনেকে বলেন, ব্যারি নির্বাচন করলেন ১৯৬৪ সালে, আর ভোট গুনতে লেগে গিয়েছিল ১৯৮০ সাল পর্যন্ত। এই ১৯৮০ সালের মধ্যে বামপন্থা ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। এর পেছনে অনেকগুলো কারণ ছিল।

ফ্রান্সিস ফুকুইয়ামার ভাষায়, শীতল যুদ্ধের শেষে এসেছে ‘ইতিহাসের সমাপ্তি’। সেই সঙ্গে ছিল থ্যাচারবাদ আর শ্রমিক আন্দোলনের পরাজয়। তখন জানতাম, আমরা কিসের বিরুদ্ধে আছি। কিন্তু কিসের পক্ষে আছি, সেটা আমাদের কাছে স্পষ্ট ছিল না। ফলে আমাদের বামপন্থী হওয়ার দৃষ্টিভঙ্গি নতুনভাবে তৈরি করতে হয়েছিল।

তাই যখন বার্নি স্যান্ডার্স, জেরেমি করবিন ও অন্যরা আবার উঠে আসেন, তখন আমাদের সেই মজবুত ভিত্তি ছিল না। তাঁদের কাজ ছিল একই সময়ে বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত্তি তৈরি করা এবং ক্ষমতার জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা। কিন্তু আমি মনে করি, এ রকম বামপন্থী প্রচেষ্টা সব সময়ই শেষ পর্যন্ত মূলধারার উদার গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মধ্যে লুপ্ত হয়ে গেছে।

স্লাভোই জিজেক (২১ মার্চ ১৯৪৯)
আমাদের দরকার বাস্তবিক ও প্রায়োগিক শিক্ষা, যা সত্যিকারের সমস্যার মোকাবিলা করতে সাহায্য করবে। আমাদের দার্শনিকদের কর্তব্য কী? নির্বোধের মতো উত্তর দেওয়ার জন্য তাদের দরকার পড়ে না। যখন মানুষ কোনো সমস্যা উপলব্ধি করে, সেটা বোঝার জন্য দার্শনিকদের প্রয়োজন।
স্লাভোই জিজেক

একটা ঘাবড়ে যাওয়ার মতো কথা বলি। ১৯৬৮ সালের বিপ্লবের উত্তরাধিকারকে সত্যিই আমি অপছন্দ করি। এ কথা বলছি কারণ, আমি মনে করি, সেই বিপ্লবী প্রয়াসের বড় বিপর্যয়টি ছিল এর মূল কর্মসূচি বেদখল হয়ে যাওয়া।

১৯৬৮ সালের প্রকল্পটি সহজভাবে বলতে গেলে ছিল—গায়ে-গতরে খাটা কারখানা শ্রমের বদলে আরও সৃজনশীল কাজ, বিচ্ছিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে আরও বাস্তবমুখী শিক্ষা ও যৌনমুক্তি। আজকে আমরা এসব পাচ্ছি ভয়ংকররূপে। এর সবই আপনি এখন পাবেন ট্রাম্প যা করছেন তার মধ্যে।

না, আমাদের বিচ্ছিন্ন বা নীরস মানববিদ্যার প্রয়োজন নেই। সবাই জানে, যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিভিন্ন পাঠ্যসূচি বাতিল করা হচ্ছে। আমাদের দরকার বাস্তবিক ও প্রায়োগিক শিক্ষা, যা সত্যিকারের সমস্যার মোকাবিলা করতে সাহায্য করবে।

আমাদের দার্শনিকদের কর্তব্য কী? নির্বোধের মতো উত্তর দেওয়ার জন্য তাদের দরকার পড়ে না। যখন মানুষ কোনো সমস্যা উপলব্ধি করে, সেটা বোঝার জন্য দার্শনিকদের প্রয়োজন। সমস্যাকে আমরা যেভাবে দেখি, সেটাই যদি হয়ে ওঠে সমস্যার অংশ?

আমার মনে হয়, আজকের দিনে আমাদের যা সবচেয়ে বেশি দরকার, তা হলো পুরোনো ধাঁচের বিচ্ছিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, যেখানে শিক্ষার্থীরা স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে পারবেন, ধারণা পরীক্ষা করতে পারবেন এবং বাস্তব সমস্যার জন্য সৃজনশীল সমাধান খুঁজবেন।