হুমায়ূন আহমেদের (১৯৪৮–২০১২) ৫৮তম জন্মদিন উপলক্ষে ২০০৫ সালের ১১ নভেম্বর প্রথম আলোর শুক্রবারের সাময়িকীতে সাক্ষাৎকারটি প্রকাশিত হয়। ‘কথাশিল্পী হুমায়ূন আহমেদ বলেন, আমি এক অর্থে নিয়তিবাদী’ শিরোনামে প্রকাশিত সাক্ষাৎকারটি এত দিন কাগজের পাতাজুড়ে পড়ে ছিল। আজ অন্য আলো অনলাইন পাঠকের জন্য এটি তুলে ধরা হলো। সাক্ষাত্কারটি নিয়েছেন নাসির আলী মামুন
নাসির আলী মামুন : বেশ কয়েক বছর আগে আপনি একটা মন্তব্য করছিলেন, রবীন্দ্রনাথের পরে বাংলাদেশের একজন লেখিকা সবচেয়ে বেশি প্রচার পাইছেন। আবার অনেকে বলে দুই বাংলায় রবীন্দ্রনাথের পরে আপনার লেখাই প্রচার পাইছে বেশি...
হুমায়ূন আহমেদ: এটা কেউ বলে থাকলে আমার প্রতি প্রচণ্ড মমতা ও ভালোবাসা থেকে বলেছেন। ওই লাইনে যেতে চাচ্ছি না। তবে আমাদের একজন লেখিকা পশ্চিমা মিডিয়াতে অনেক প্রচার পেয়েছেন, তা সত্য। আমাদের কালচার ও ধর্মকে খাটো করে কেউ লেখালেখি করলে তাকে নিয়ে পশ্চিমারা মাতামাতি করতে পছন্দ করে। সেই সূত্রে তিনি প্রচারটা পেয়েছেন। আজ যদি আমিও ওই কাজ করি, ওই প্রচারটা আমিও পাব। আমি পারিনি। উনি হয়তো পেরেছেন।
নাসির: আপনি তো নিশ্চয়ই চান আপনার বই কেউ অনুবাদ করুক।
হুমায়ূন: হ্যাঁ, চাই।
নাসির: আপনার বই কয়টা ভাষায় অনুবাদ হইছে?
হুমায়ূন: হয়েছে কয়েকটা।
নাসির: বাংলাদেশের প্রায় সব পুরস্কার আপনি পাইছেন।
হুমায়ূন: সেটা বলা যেতে পারে।
নাসির: অনেক লেখকের মধ্যে ব্যাকুলতা থাকে, কারওটা প্রকাশ পায়, কারওটা পায় না। নোবেল পুরস্কার বা এ রকম কিছু নিয়ে আপনার কোনো ব্যাকুলতা আছে?
হুমায়ূন: গল্প করার সময় ফান করে অনেক সময় বলি যে আমি সমস্ত লেখালেখি করি পুরস্কারের জন্য। কিন্তু বিস্ময়করভাবে এটা সত্যি যে পুরস্কার নিয়ে আমি মোটেই মাথা ঘামাই না। পত্রিকায় দেওয়া ইন্টারভিউতেও কিন্তু বলি পুরস্কার বা পয়সার জন্য লিখি। পয়সার জন্য যদি লিখতাম তবে অনুবাদ করতাম। আসলে আমার জন্য যেটা নির্ধারিত—আই উইল গেট ইট। আমি এক অর্থে নিয়তিবাদী।
নাসির: নিয়তিবাদীরা তো এভাবে কাজ করতে পারে না।
হুমায়ূন: কাজ করা যায় না আসলে। নিয়তির হাতে সব ছেড়েছুড়ে দিই। এতেও আনন্দ আছে।
নাসির: এই যে হাজার হাজার লাখ লাখ পাঠক আপনার, ছেলেমেয়ে, বুড়াবুড়ি—এরা আপনার নামে এত পাগল কেন? দুই বাংলায় আরও তো লেখক আছে।
হুমায়ূন: আমি আসলে বুঝতে পারি না। আমার নাটকে বাকের ভাইকে ফাঁসি থেকে বাঁচানোর জন্য যখন মিটিং–মিছিল–অনশন হলো, তখনই প্রথম জিনিসটা স্ট্রাইক করল। একজন বিদেশি এ প্রসঙ্গে আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন। তিনি হতভম্ব হয়ে জিজ্ঞেস করেছেন, এটা কোত্থেকে এল। সাইকোলজিস্টরা এটা ভালো বলতে পারবেন। আমি বলতে পারছি না।
নাসির: বাংলা একাডেমির বইমেলায় বা অন্য জায়গায় আপনি পাঠক-ভক্তদের সরাসরি অটোগ্রাফ দেওয়ার সময় নাম জিজ্ঞেস করেন, কোনো কোনো সময় তাদের সঙ্গে কথাও হয়। তখনো কি বোঝেন না কী কারণে তারা ওই বই কেনে?
হুমায়ূন: আমি বুঝি না। বুঝতে চাইও না।
নাসির: আপনার লেখার ভাষার সহজ-সরল আর এমনভাবে বিষয়বস্তু নির্বাচন করেন যে মানুষের পড়তেই হয়।
হুমায়ূন: হতে পারে।
নাসির: আপনার নাটকও তা–ই। নাটক লেখার সময় কি মাথায় থাকে যে এ চরিত্রটা নূর ভাইকে দিয়ে করাবেন বা এটা জাহিদ হাসানকে?
হুমায়ূন: শুরুতে যখন লিখতাম, টেলিভিশন যখন নাটক বানাত, তারাই ঠিক করত কে অভিনয় করবে। এখন যখন নিজেই নাটক বানাই, নিজেকেই আর্টিস্ট খুঁজে বের করতে হয়, তখন তো মোটামুটিভাবে মাথায় থাকেই।
নাসির: আপনি নিজে অভিনয় করেন না কেন?
হুমায়ূন: আমি অভিনয় পারি না। পারলেও করতাম না। আমার কাছে মনে হয়েছে এটা অতি কঠিন বিদ্যা। যখনই কেউ আমার মুখের সামনে ক্যামেরা ধরে তখন আমার সমস্ত মাংসপেশি শক্ত হয়ে যায়। আমার স্বর বন্ধ হয়ে যায়। তখন যে দৃষ্টিতে তাকাই, সেটা মোটামুটি উন্মাদের দৃষ্টি। আমার পক্ষে উন্মাদের অভিনয় ছাড়া অন্য কোনো অভিনয় সম্ভব নয়।
নাসির: অনেকে বলে বাঙালি পাঠকের মন হুমায়ূন আহমেদ খুব ভালোভাবে ধরতে পারছেন। কথাটা কি ঠিক?
হুমায়ূন: কথাটাকে হাস্যকর মনে হয়। নার্ভ বোঝার তো কিছু নেই। আমি উল্টোভাবে বলতে পারি, পাঠকেরা আমার নার্ভটা ধরতে পারছে। এত এত পাঠকের নার্ভ তো ধরা সম্ভব নয়। আমারটা ধরা অনেক সহজ।
নাসির: একসময় নাকি আপনি প্রকাশকদের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন? পরে যখন আপনার বই চলা শুরু হইল তখন আপনি নাকি প্রকাশকদের সঙ্গে ইনটেনশনালি এবং ডিপ্লোম্যাটিক্যালি একধরনের শীতল ব্যবহার করতেন?
হুমায়ূন: এটা একেবারেই সত্যি কথা নয়। কথা হচ্ছে কি, আমি তো খুবই লাজুক ধরনের মানুষ। কখনোই কোনো পাণ্ডুলিপি নিয়ে কোনো প্রকাশকের কাছে যাইনি। এই কাজটা করেছেন আহমদ ছফা। আমাকে তিনি খুবই পছন্দ করতেন। আমার যেন একটা লেখা ছাপা হয়, সে জন্য বগলে পাণ্ডুলিপি নিয়ে গেছেন প্রকাশকদের কাছে। ওদেরকে রাজি করিয়ে উনি যখন বই প্রকাশের ব্যবস্থা করেছেন, তখন একদিন ভয়ে ভয়ে গেছি। আমার অসীম সৌভাগ্য যে কখনোই আমাকে পাণ্ডুলিপি নিয়ে কোনো প্রকাশকের কাছে যেতে হয়নি। যখন ছাপা হয়ে গেছে, তখন তারাই এসেছে। আমি মানুষের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করি না। প্রকাশকদের সঙ্গে তো প্রশ্নই আসে না।
নাসির: লেখালেখি করে বছরে আয় কত হয়? আপনি কি ইনকাম ট্যাক্স দেন?
হুমায়ূন: অবশ্যই আমি ইনকাম ট্যাক্স দিই এবং বছরে ছয়-সাত লাখ টাকা তো বটেই, কমপক্ষে।
নাসির: কোন বছর থেকে দিচ্ছেন?
হুমায়ূন: অনেক দিন। আমার সার্কেলে আমি সর্বোচ্চ দিই। আমার উকিল তো তা-ই বলে।
নাসির: পশ্চিম বাংলায় আপনার পাঠক কেমন?
হুমায়ূন: পাঠক তো ভালো হওয়ার কথা। সেখানে বইমেলা যখন হয়, আমি যাই না কখনো, প্রকাশকেরা বই-টই বিক্রি করে খুব আনন্দিত থাকে। তখন মনে হয় ভালো। অনেক দিন ধরে দেশ পত্রিকায় লিখছি তো। পরিচিতিটা হয়েছে।
নাসির: পাঠকও বাড়ছে?
হুমায়ূন: নিশ্চিত যে বাড়ছে।
নাসির: পশ্চিম বাংলায় নাটক লেখার তাগিদ পান?
হুমায়ূন: এখনো পাইনি। তবে সমরেশ মজুমদার মাঝে মাঝে বলেন, ‘মিসির আলি’ নিয়ে নাটক করতে চান। মুখে বলা পর্যন্তই, এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। মাঝে মাঝে আসে, ‘শুভ্র’ উপন্যাসটার সিরিয়াল করতে চায়, কথাবার্তা পর্যন্তই এসব সীমাবদ্ধ থাকে। হয়তো আমাকে খুঁজে পায়নি। কথাবার্তা কখনোই ম্যাটেরিয়েলিস্ট হয় না।
নাসির: লেখালেখি কখন করেন? অনেকের নির্দিষ্ট সময় থাকে। এস এম সুলতান যেমন বলতেন গোধূলি তাঁর সবচেয়ে প্রিয়। ওই সময় তিনি কোনো দিন ছবি আঁকতেন না।
হুমায়ূন: আমার কোনো নির্দিষ্ট সময় নেই। তবে সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর দু-তিন কাপ চা খেয়ে আমি অবশ্যই লিখতে বসি। প্রতিদিন। যখন কোনো কাজ থাকে না তখনো বসি। এরপর যখনই লিখতে ইচ্ছা করে লিখি।
নাসির: বাংলা একাডেমির বইমেলার সময় লেখালেখি করেন?
হুমায়ূন: না।
নাসির: তার মানে লেখালেখির কাজটা করেন বছরে ১১ মাস? শোনা যায় আপনি একই দিনে বা একই সময়ে দুই-তিনটা লেখা লেখেন!
হুমায়ূন: একসময় লিখতাম। এটাকে আমি বড় ব্যাপার বলে মনে করি না। অনেকেই পারে। একজন পেইন্টার একসঙ্গে অনেক ছবি আঁকতে পারে। ব্রেনের ফিল্ড তো অনেক বিশাল।
নাসির: আপনি তো কলম দিয়ে হাতে লেখেন। আপনি একজন বিজ্ঞানী। আপনি কম্পিউটার ব্যবহার করেন না কেন?
হুমায়ূন: আগে ব্যবহার করতাম। করে দেখলাম আমার চিন্তার স্পিড টাইপের চেয়ে দ্রুত। আমি যখন ১ নম্বর লাইন লিখছি, তখন আমার ব্রেন চিন্তা করছে ১৩ নম্বর লাইনটা। তা ছাড়া কম্পিউটারে লেখার ইতিহাসটা থাকে না। কারণ, মুছে ফেলা যায়। কিন্তু পাণ্ডুলিপিতে ইরেজ করা লাইনও থাকে—স্টোরি অব রাইটিং। কেন কাটলাম, এগুলো পাণ্ডুলিপিতে থাকে।
নাসির: আপনার পাঠক-ভক্তরা চিঠি লেখে আপনাকে?
হুমায়ূন: হ্যাঁ।
নাসির: কোনো সময় হাতে লিখে উত্তর দেন?
হুমায়ূন: একসময় দিতাম। এখন একজন লোক রেখেছি। সে প্রতিটি চিঠি পড়ে জবাব দেয়। সইটা আমি করি।
নাসির: আপনার ভক্তরা কী লেখে?
হুমায়ূন: তারা এখন চিঠি লেখার চেয়ে ফোনে কথা বলতে চায় বেশি।
নাসির: ফোনে কী বলে?
হুমায়ূন: অনেক কিছু। একবার এক তরুণী বলল, আপনার সঙ্গে নুহাশ পল্লীতে জ্যোত্স্না দেখব। আমি বুঝতে পারি তারা কেন এসব বলে!
নাসির: কেন বলে?
হুমায়ূন: হোহ্ হো হোহ্ হো...
নাসির: নির্দিষ্ট কোনো সময় বসেন অফিসে?
হুমায়ূন: না।
নাসির: নতুন কী লিখতেছেন?
হুমায়ূন: নাটকের গান লিখলাম একটা গতকাল। মাঝে মাঝে বাচ্চাদের জন্য লিখতে খুব ইচ্ছা হয়। লিখেছিও। একটা উপন্যাস লিখছি। ২৫-৩০ পৃষ্ঠা লেখা হয়েছে।
নাসির: কী নিয়ে?
হুমায়ূন: একটা ছেলে ছবি আঁকবে। তার জন্য টিচার ঠিক করা হলো। ওই টিচারের সঙ্গে তার সম্পর্কটা নিয়ে লিখছি। মজার আছে। ছেলেটির বাবা-মায়ের ডিভোর্স হয়ে গেছে। বাবা আলাদা থাকে, মা আরেক ভদ্রলোককে বিয়ে করে। ছেলেটা আইসোলেটেড। টিচারের সঙ্গে সম্পর্কটা এগোচ্ছে।
নাসির: আর কত দিন ফিল্ম করবেন? কয়টা করবেন পরিকল্পনা আছে?
হুমায়ূন: না।
নাসির: দুঃখ-বেদনা, নিঃসঙ্গতা থেকে আত্মহত্যা করেন লেখক-শিল্পীরা। আপনি কি মনে করেন আপনি নিঃসঙ্গ? ছেলেমেয়েরা কাছে আসে না?
হুমায়ূন: সব মানুষের বেদনা হলো পার্ট অব লাইফ। যে মানুষটি স্ত্রী-বাচ্চাসহ জীবন শুরু করে, তার একটা পর্যায় আসে যখন ছেলেমেয়েরা বড় হয়ে যায়, তারা বাবা-মাকে ছেড়ে চলে যায়; স্বামী-স্ত্রী একসঙ্গে আছে। স্ত্রী মারা গেল। একটা সময় নিঃসঙ্গতা থাকে। যার জন্য আমাদের বলা হচ্ছিল—বয়স হলে একটা জঙ্গলে চলে যাও। বাংলাদেশে তো আর সুযোগটা নেই। তাই অনেকেই বা আমি নিজেই নিজের বেদনা খুঁজে নিয়েছি, এটা বললে কেমন হয়?
নাসির: কী কারণে?
হুমায়ূন: নানান কারণ থাকে। মানুষ হিসেবে আমার কিছু ফেইলিওর আছে। এগুলো হয়তো অনেক বড় ধরনের ছিল। সে জন্য পরিবারের সঙ্গে একত্রে বাস করা সম্ভব ছিল না বা তারা পছন্দ করেনি। আমার নিজের ফেইলিওর নিয়ে জোর করে এক জায়গায় বাস করাটা খারাপ লেগেছে আমার কাছে।
নাসির: ছেলেমেয়েরা যোগাযোগ করে?
হুমায়ূন: একটা মেয়ে তো দেশের বাইরে চলে গেছে। নোভা। ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ত। কম্পিউটার সায়েন্সে। এখন পিএইচডি করছে। আর বাকি যারা আছে যোগাযোগ রাখছে। নুহাশ তো বাবার খুব ভক্ত। অকেশনে আসে।
নাসির: ছবি আঁকা শুরু করছেন কবে?
হুমায়ূন: আসলে ছবি আঁকার ব্যাপারটা আমার পারিবারিকভাবে আছে। জাফর ইকবাল কার্টুন আঁকত। আহসান হাবীব তো কার্টুন করেই। ছবি আঁকা আরম্ভ করলাম প্রায় আড়াই বছর।
নাসির: আপনার পূর্বপুরুষদের মধ্যে তো কেউ আর্টিস্ট ছিল না।
হুমায়ূন: না। চিত্রশিল্পী নেই, লেখক নেই, কবি নেই। মওলানা আছে—দাদা মওলানা। তার দাদাও মওলানা—মওলানা গোষ্ঠী।
নাসির: ছবি আঁকা শুরু হয় কবে?
হুমায়ূন: পোলাপাইন্যা বয়সে। স্কুল ম্যাগাজিনে আঁকার দায়িত্ব কিন্তু আমার। চিটাগাং কলেজের স্কুল। সিক্স-সেভেনে।
নাসির: মাঝে তো বাদ গেছে। এখন তো মনে হয় সিরিয়াস।
হুমায়ূন: না, সিরিয়াস কোথায়?
নাসির: ছবিতে স্বাক্ষর দেন না কেন?
হুমায়ূন: স্বাক্ষর দেওয়ার মতো ভালো ছবি আঁকা হয়নি। ভালো হলে এমনিই স্বাক্ষর দেব। এখন যা আঁকছি তাতে স্বাক্ষর দিলে লোকে আদর করে নিয়ে যাবে নামটার কারণে। ছবির কারণে না।
নাসির: তাহলে যে পেইন্টিংগুলো আঁকতেছেন, এগুলো শিখতেছেন?
হুমায়ূন: এমনিই। আমার ঘরভর্তি হলো ছবি আঁকার বই। আমার অনেক টিচারও আছে। যেমন অমুককে খবর দিয়ে নিয়ে আসি। আমার ছবির যিনি আর্ট ডাইরেক্টর, উনি একজন পেইন্টার। মহিউদ্দিন ফারুক। উনি শেখান।
নাসির: আপনার আর কোনো উদ্দেশ্য নেই? কম্পিটিশন করা বা এক্সিবিশন?
হুমায়ূন: না। জাস্ট আমার শখ। ভাল্লাগে। খুবই আজেবাজে ছবি যখন সুন্দর ফ্রেম করে ঝুলাই তখন মনে হয়, আরে, ভালোই তো হয়েছে! বাসায় লোকজন এলে প্রথমে ছবিগুলো দেখে একটা ধাক্কা খায়। ওই ধাক্কাটা দেখতে ভালো লাগে।
নাসির: অন্যের পেইটিংস দেখেন?
হুমায়ূন: একসময় দেখতাম। এখন যেতে ইচ্ছা করে না। এখন গর্তজীবী হয়ে গেছি। গর্তে বাস করাটা এখন আনন্দময় মনে হয়। যা দরকার তা ঘরেই যেন থাকে— প্রচুর বই, প্রচুর সিডি, বড় টিভি, প্রচুর ভিডিও।
নাসির: মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আরও লিখবেন?
হুমায়ূন: না। মনে হচ্ছে লেখক হিসেবে যে দায়িত্ব ছিল সেটা পালন করতে পারছি না। আগে যখন ‘১৯৭১’, ‘শ্যামল ছায়া’ লিখেছি তখন অসম্পূর্ণ মনে হতো। এখন বইটা (জননী ও জ্যোত্স্নার গল্প) লেখার পর কোনো আফসোস নেই। আমি আমার উপন্যাসটা লিখেছি। আমি এটুকু বলতে পারি, লেখালেখির মধ্যে আমি কখনো ভান করি না। ব্যক্তিজীবনেও ভানের অংশ কম। লেখালেখিটা আমার কাছে উপাসনার মতো মনে হয়।
নাসির: বইটা নিয়ে পাঠকদের প্রতিক্রিয়া জানতে পারছেন?
হুমায়ূন: আমার মেয়ে শিলার কাছে জানতে চাইলাম। ও বলল, ‘তোমাদের নিজেদের জীবনের হত্যাগুলো না লিখলে পারতে।’ বইটি সে কাঁদতে কাঁদতে পড়েছে এবং ছোট বোনকে বলেছে—বইটা এখন পোড়ো না, খুব মন খারাপ হয়ে যাবে। সামনে তোমার পরীক্ষা। আমার মনে হয় বইটা পছন্দ হয়েছে মেয়েটার। অন্যদের কথা জানি না।
নাসির: সরাসরি পাঠকদের সঙ্গে আলাপ হয়নি?
হুমায়ূন: আমি আসলে বেশির ভাগ সময় সমস্ত টেলিফোন অফ করে রাখি। মোবাইলও। বাসায় এলে নিচে বলে পাঠাই, বাসায় নেই।
নাসির: ইদানীং এমন করেন, নাকি চার-পাঁচ বছর আগেও এমন ছিলেন?
হুমায়ূন: আগে এত ছিল না।
নাসির: কেন এমন করেন, ব্যস্ততা?
হুমায়ূন: ব্যস্ততা ছাড়াও সবকিছু মিলিয়ে মনে হয় সাদ্দাম হোসেনের মতো গর্তে বাস করতে পারলে ভালো হতো।
নাসির: সবকিছু থেকে বিচ্ছিন্ন থাকতে চান কেন?
হুমায়ূন: জানি না।
নাসির: কী বই পড়েন?
হুমায়ূন: বেশির ভাগই পড়ি সায়েন্সের বই। পিওর সায়েন্স। গ্রহ, নক্ষত্র, ওয়ার্ল্ডের ডাইমেনশন। গল্প, উপন্যাস একদম পড়া হচ্ছে না। ফিলসফি পড়তে চেষ্টা করেছি। ভালো লাগেনি। ধোঁয়াটে, অস্পষ্ট মনে হইছে। বিজ্ঞান তো তা না, স্পষ্ট।
নাসির: আপনার বেশির ভাগ লেখায় বিজ্ঞান অনুপস্থিত।
হুমায়ূন: বিজ্ঞান তো নানাভাবে আসে। উপন্যাসে ফিজিক্সের সূত্র নিয়ে ডিল করতে পারি না। তবে যখন লিখি তখন পড়লে বোঝা যায় বিজ্ঞান সম্পর্কে লেখকের ধারণা আছে। ‘মিসির আলি’র লেখাগুলোয় লজিক থাকে। ‘হিমু’ অন্য রকম। সায়েন্স ফিকশন পড়লেও পাঠক বুঝবে লোকটা বিজ্ঞান নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করেছে।
নাসির: উপন্যাস-গল্প আর সায়েন্স ফিকশন আলাদা না?
হুমায়ূন: সায়েন্স ফিকশন কিন্তু আসলে ফিকশন। এটা সাহিত্যের একটা অংশ। যদিও এটা স্বীকার করতে অনেক সময় লেগেছে। বিজ্ঞানের সমস্ত সূত্রও যে ১০০ ভাগ সত্যি, কোনো বিজ্ঞানীই বুকে হাত দিয়ে এখনো বলতে পারে না। আলোকে বলা হয় তরঙ্গ। এটা স্বীকৃত। তরঙ্গ প্রবাহিত হতে তো একটা মিডিয়াম লাগে। কিন্তু কীভাবে প্রবাহিত হচ্ছে এর ব্যাখ্যা এখনো বিজ্ঞানীরা দিতে পারেনি।
নাসির: স্পেস...
হুমায়ূন: আমার একটা খুবই দামি টেলিস্কোপ আছে। মনে করো মঙ্গলের ওপর ধরলে। যখন পৃথিবীটা ঘুরবে টেলিস্কোপের সেটিংয়ে ফোকাস থাকে না। আমারটা হলো পৃথিবী যে গতিতে ঘুরবে, টেলিস্কোপও ওই গতিতে ঘুরবে। সারা দিন তাকিয়ে থাকতে পারবে। কম্পিউটারের সঙ্গে কানেক্টেড। এখন করি না। কারণ, ম্যানুয়াল হারিয়ে গেছে। আমার তিনটা টেলিস্কোপ আছে।
নাসির: গ্রহ-নক্ষত্র দেখলে আপনার কী মনে হয়?
হুমায়ূন: মনে হয়—মাই গড! আমরা এত ছোট! ক্ষুদ্র! তারপরও এত ক্ষমতা! হিউম্যান রেসের আমি একজন সদস্য এটা ভাবতেও ভালো লাগে। গড এতই বিশাল ব্যাপার। গড কী, এটা আমাদের ব্রেনে বোঝা সম্ভব নয়। এখানেই ব্রেনটা মোটামুটি লিমিটেড। আমি তো চার-পাঁচ ডাইমেনশনের বেশি চিন্তা করতে পারছি না; কিন্তু মনে হয় পৃথিবীটা ১০ ডাইমেনশনের। এখানে কিন্তু আবার ক্ষুদ্রতাটা ধরা পড়ছে। আবার যখন ম্যাথমেটিকসে যাই, তখন ব্রেনের ক্ষমতা ধরা পড়ে।
নাসির: মানুষ চাঁদে গেছে, মঙ্গলে যাওয়ার চিন্তা করতেছে, কিন্তু মানুষের বিপর্যয় বিজ্ঞান কমাইতে পারে নাই। মৃত্যুহার কমে নাই।
হুমায়ূন: এটা ঠিক নয়। একটা সময় ছিল আমাদের দেশে গ্রামের পর গ্রাম কলেরায় খালি হয়ে গেছে। কলেরা এখন দূর করেছি। টিবি, ম্যালেরিয়া, পোলিও জয় করেছি। আমি শিওর, একদিন ক্যানসারমুক্ত পৃথিবী হবে। পৃথিবী ডিজিজমুক্ত হবে।
নাসির: একটা বড় সমস্যা ক্ষুধা।
হুমায়ূন: শায়েস্তা খাঁর আমলে যখন জিনিসপত্র খুবই সস্তা ছিল তখন কত লোক মারা গেছে না খেয়ে। এখন লোকসংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ফুড প্রডাকশনও কিন্তু বাড়ছে। তখনকার মতো লঙ্গরখানা তৈরির প্রয়োজন কিন্তু এখন নেই। সাহায্যটা করছে কারা? বিজ্ঞান। কাজেই তুমি যদি বলো বহু লোক ক্ষুধায়, দারিদ্র্যে মারা যাচ্ছে, তা কিন্তু নয়। গায়ে কাপড় আছে। একটা সময় তা–ও ছিল না। সবই বিজ্ঞানের দান। বিজ্ঞান আমাদের ক্ষুধা ও ডিজিজ থেকে মুক্তি দেবে, দিতেই হবে। যদি বলো অ্যাটম বোমা পেয়েছি। এটাও তো একটা পার্ট। খারাপও তো হয়।
নাসির: বিজ্ঞান তো ব্যবহার করে পুঁজিবাদী বিশ্ব। গবেষণাকেও ওরা নিজের মতো করে...
হুমায়ূন: খুব কম। যখন বিজ্ঞানের ব্যবহার ছিল না তখন ঢাল-তলোয়ারের যুদ্ধেও অনেক লোক মারা গেছে। পুঁজিবাদীরা ফলাফলটা বেশি নিচ্ছে। কারণ, তাদের অর্থনৈতিক জোরটা আছে। আমাদের সেটা নেই। ওরাও বুঝতে পারবে ওদের টিকতে হলে আমাদের দরকার।
নাসির: স্টিফেন হকিং বলতেছে ডিম আগে না মুরগি আগে, উনিও কনফিউসড? কোনটা প্রথম সৃষ্টি?
হুমায়ূন: প্রথম সৃষ্টি তো বলছে ওরা বিগ ব্যাং। তার আগে কী তা তো সায়েন্স বলতে পারছে না।
নাসির: মহাকাশে যেতে ইচ্ছা হয় যখন গ্রহ-নক্ষত্র দেখেন?
হুমায়ূন: খুবই। কিন্তু আমি না পারলেও আমার পরবর্তী জেনারেশন চাঁদে-মঙ্গলে যেতে পারবে। আমি তাদের খুবই ঈর্ষা করছি।
নাসির: তারা তো পৃথিবীর বাইরে গ্রহ-নক্ষত্রে ছড়িয়ে পড়বে।
হুমায়ূন: অবশ্যই ছড়িয়ে পড়বে।
নাসির: আপনার কি মনে হয় আবহাওয়াজনিত কারণে আগামী শ-দুই শ বছরে পৃথিবী বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়বে?
হুমায়ূন: না, অযোগ্য হবে না। ওজোন লেয়ার যদি ছিদ্র হয়ে থাকে, প্রকৃতি সিস্টেম করে এটাকে বন্ধ করবে, যাতে মানুষ বাঁচে। নয়তো উল্কাপাত যে ভয়াবহ জিনিস, সেটা পৃথিবীতে হয় না কেন? বৃহস্পতির মাধ্যাকর্ষণ বল এতই প্রবল যে যখন পৃথিবীতে কোনো কিছু আসতে চায়, তাকে সে টেনে নিজের গায়ের ওপর নিয়ে নেয়। আমি যদি বলি ক্রিয়েটর পৃথিবীকে রক্ষার জন্যই বৃহস্পতি তৈরি করে রেখেছে! হঠাৎ ধ্বংসে আমি বিশ্বাস করি না। গড অলমাইটি অথবা প্রকৃতি আমাদের প্রটেকশন দিয়ে রেখেছে।
নাসির: আপনার কাছে আমাদের দেশের প্রধান সমস্যা কী কী?
হুমায়ূন: প্রধান সমস্যা অসহিষ্ণুতা।
নাসির: কাদের মধ্যে আছে?
হুমায়ূন: আমাদের মধ্যেও আছে। বাসে ওঠার একটা লাইন করতে পারি না। তাড়াহুড়া। কোরআনে একটা লাইন আছে, ‘হে মানব সম্প্রদায়, তোমাদের বড়ই তাড়াহুড়া।’ আমার সব সময় মনে হয় আমাদের দেশের মানুষের দিকে তাকিয়ে আল্লাহ ওই কথা বলেছেন।
নাসির: আর কী?
হুমায়ূন: শিক্ষার অভাব।
নাসির: ক্ষুধা-দারিদ্র্যকে একজন লেখক হিসেবে কীভাবে দেখেন? এদের নিয়ে ভাবেন?
হুমায়ূন: ব্রেন মানুষের সিঁড়ি তৈরি করে দেয়। কোনো কিছু দেখতে খারাপ লাগলে ব্রেন অটোমেটিক্যালি একটা পর্দা তৈরি করে দেয়, যেন সে ওটা না দেখে। এখন সবার মধ্যে ওই রকম পর্দা পড়ে গেছে। ফকির দেখলে ওদের দুঃখটা ব্রেন নিতে দিচ্ছে না। তা না হলে কোনো মানুষ কিন্তু বাসায় বসে পাঁচটা-সাতটা তরকারি দিয়ে ভাত খেতে পারত না।
আমি যখন আমার বাচ্চাগুলো নিয়ে আমেরিকা থেকে এলাম, তখন বড় মেয়ে নোভার বয়স পাঁচ থেকে সাড়ে পাঁচ। চুরাশিতে। ও তো জন্মের পর থেকে ফকির দেখেনি। যখন দেখছে লোকজন এসে ফুড চাচ্ছে, খুবই অবাক হয়ে বলল, ‘হাউ কাম? তাদের কি ফুড নাই?’ এটা তাকে খুবই আহত করল; তার মধ্যে একধরনের সমস্যা তৈরি হলো। যে–ই দেখত ফকির আসছে, সে ফ্রিজ খুলত, যা আছে দিত। বাবা হিসেবে বলতে পারছি না, মা এটা কোরো না। তখন টাকাপয়সা কম ছিল। অল্প ফল কিনেছি হয়তো। ও নিয়ে দিয়ে দিল। আটকাতে পারছি না। আবার ভালোও লাগছে—ওর মধ্যে আবেগটা তৈরি হচ্ছে। কিন্তু এই মেয়ে যখন বড় হলো, সে অভ্যস্ত হয়ে গেল। কারণ, পর্দাটি তৈরি হয়েছে। আমরা কনডিশন্ড হয়ে যাই।
নাসির: আগামী ১৩ নভেম্বর (২০০৫) তো আপনার জন্মদিন। এবারের জন্মদিনটা কীভাবে পালন করবেন?
হুমায়ূন: আমি ‘দখিন হাওয়া’তেই (যে বাড়িতে হুমায়ূন আহমেদ থাকেন) থাকব। বন্ধুরা আসবে। জম্পেশ আড্ডা দেব। সবাইকে নিয়ে আনন্দ করব আরকি।
নাসির: অপরিচিত বা সাধারণ কেউ এলে ঘরে ঢুকতে দেবেন?
হুমায়ূন: আমার দরজা খোলা থাকবে। তবে কেউ মালাটালা নিয়া ব্যারাছ্যাড়া করলে আমার ভালো লাগবে না। ঘটা করে আমি জন্মদিন পালন করতে চাই না। কিন্তু কেউ যদি তাদের মতো করে আমার জন্মদিন করতে চায়, আমি আপত্তি করব কেন?