[ব্রাত্য রাইসু] আপনে তো একটু প্লেটোনিক ছফা ভাই।
আহমদ ছফা: কেন প্লেটোনিক হব? বাঘ যখন বাঘিনীর সঙ্গে মেশে—প্লেটোর চাইতে ওরা বেশি। সেক্স ইজ আ পার্ট অব ইয়োর এক্সিস্টেন্স। এই যে লিঙ্গপূজা করত হিন্দুরা, এর অর্থ আছে। আমি মনে করি, আমার জীবনের এই পর্যন্ত যে উপলব্ধিতে এসে পৌঁছেছি, পুরো সমাজকে আমার দেওয়ার মতো কিছু আছে।
[রাইসু] আপনি প্রেমট্রেম করছেন কখনো ছফা ভাই?
ছফা: লোকে বলে। আমি তো বুঝতে পারি না।
[রাইসু] আপনার প্রথম প্রেম কি অসামাজিক কিছু ছিল?
ছফা: মানুষের ছোটবেলা একটা পশুর ছোটবেলার মতো। আমি সেটা বলার মতো মানসিক শক্তি অর্জন করি নাই। ট্রুথ উচ্চারণ করার যে শক্তি, তা এই মুহূর্তে আমার নেই। মানুষ অটোবায়োগ্রাফিতে যেগুলো দেয়, সেগুলো হচ্ছে ‘হতে পারত অটোবায়োগ্রাফি’। অর্থাৎ যে মানুষ অনেক কথা অকপটে বলে, সে অনেক কথা অকপটে লুকিয়েও রাখে। সুতরাং এই যে লোকে ফ্র্যাংকনেসের ভান করে...ব্রিডিং সেন্টারে ষাঁড়কে যে কাজে ব্যবহার করা হয়, একজন সফিস্টিকেটেড লোকও নিজের কোয়ালিটি থেকে একটা বৃহত্তর ষাঁড় হওয়ার জন্য তা করে।
মানুষ অটোবায়োগ্রাফিতে যেগুলো দেয়, সেগুলো হচ্ছে ‘হতে পারত অটোবায়োগ্রাফি’। অর্থাৎ যে মানুষ অনেক কথা অকপটে বলে, সে অনেক কথা অকপটে লুকিয়েও রাখে। সেক্স ইজ নট এভরিথিং অব লাইফ। ...সেক্স হচ্ছে একটা এক্সপ্রেশন, দেয়ার আর মেনি আদার এক্সপ্রেশন।আহমদ ছফা
আমার মনে হয়, মানুষ বোধ হয় অন্য কিছু। আমার অভিজ্ঞতা যেটা, সেক্স ইজ নট এভরিথিং অব লাইফ।...সেক্স হচ্ছে একটা এক্সপ্রেশন, দেয়ার আর মেনি আদার এক্সপ্রেশন। ইয়ংয়ের অটোবায়োগ্রাফি যারা পড়বে, তারা বুঝবে। ফ্রয়েড দেখেছে যে মানুষের সবকিছুই যৌন কার্যাবলি। যৌন এনটিটির বাইরেও তো মানুষের আরেকটা এনটিটি আছে। আমরা যদি পশুজগতে যাই, গাছের জগতে যাই, কিছু গাছ আছে তার অঙ্গ দিয়ে বংশবৃদ্ধি করে। কিছু গাছ আছে বীজ থেকে তৈরি করে। কিছু প্রাণী আছে, তার সেল থেকে বংশবৃদ্ধি করে। এবং মানুষ তার বংশবৃদ্ধি করে যেটা, সেটা হচ্ছে স্তন্যপায়ীদের মতো। আমরা যদি অন্য প্রাণী হতাম, আমরা আমাদের অনুভূতি কীভাবে মূল্যায়ন করতাম...?
[রাইসু] কীভাবে করতেন ছফা ভাই?
ছফা: আমি জানি না, অন্যভাবে যদি আবার প্রাণী হিসেবে আমি জন্মাই...আমার একবার টিবি হয়েছিল, আমাকে আলাদা করে রেখেছিল। একটা বিড়াল ছিল আমার সঙ্গে, হুলো। ইট ক্যাম উইথ হিজ গার্লফ্রেন্ড। এবং বিড়ালের যে বাচ্চা হয় এবং বাচ্চার প্রতি যে অপত্য স্নেহ...মানুষকে আমার মনে হয়েছে, অনেক স্টেজে পশুদের নকল করতে হয়েছে। মানুষের মধ্যে ‘গডলি’ যেটা কল্পনা করা হয়, মানুষের এই যে সমস্ত বন্ধন ছাড়াইয়া যাওয়ার ক্ষমতা আছে, এইটাই হচ্ছে ঈশ্বরত্ব।
[রাইসু] যৌনতা এই ঈশ্বরত্বকে নষ্ট করে না?
ছফা: যৌনতা দিয়ে মানুষ একটা কাজই করে—বংশবিস্তার। মানুষের আরও ফ্যাকাল্টি আছে, সমস্ত ফ্যাকাল্টি যৌনতার অধীন নয়। ইয়ং এ জায়গাতেই ডিফার করেন ফ্রয়েডের সঙ্গে। মানুষের জীবন হচ্ছে সাইকো-সোমাটিক ফোর্স, মনোদৈহিক একটা ব্যাপার।...বস্তু আর ভাবের মধ্যে কোনো দ্বন্দ্ব পাবে না হায়ার ফিজিকসে। বাউলরা যে জীবন যাপন করে, জীবনযাপনটা তারা একটা ধর্ম মনে করে।
[রাইসু] আমার মনে হয় ছফা ভাই, এইখানে বাউলরা হইছে সবচেয়ে বড় এলিট।
ছফা: এলিটিজম হচ্ছে সমাজের একটা অংশ, যখন নিজেদের আইডেনটিটি অ্যাসার্ট করতে করতে মনে করে যে দে আর স্টেইং ফর সামথিং। বাউলদের এই যে বিচ্ছিন্ন থাকার মানসিকতা, এটা আমি খুব অপছন্দ করি। দেখো, জৈনরা মনে করে সমস্ত বস্তুসত্তার মধ্যে প্রাণ আছে। প্রাণের যে বৈচিত্র্য, সেটা মাত্রা ও স্তরভেদের। উর্দুতে এমন একটা শের আছে, ‘সে মুক্তাতেও নেই, সে পাথরেও নেই, সে নানা বর্ণে দীপ্ত।’
[রাইসু] এটারই উল্টা করে রবীন্দ্রনাথ বলতেছেন—‘আমারই চেতনার রঙে পান্না হলো সবুজ’।
ছফা: রবীন্দ্রনাথ এটা গ্যেটের সেকেন্ড পার্ট থেকে চুরি করেছেন।
[রাইসু] রবীন্দ্রনাথ তো তাইলে দেখা যায়, অত বড় মাপের কিছু ছিলেন না।
ছফা: বিভিন্ন জায়গা থেকে নিয়ে তালি দেওয়ার যে ক্ষমতা, এটাই মানুষকে বড় করে।
[রাইসু] এইটা তো দামি কথা বললেন, ছফা ভাই।
ছফা: দামি কথা তো বলি, কিন্তু কারও মাথায় তো সান্ধায় না। আমরা একটা গিভেন পয়েন্ট অব টাইমে বাস করছি। আজকে যে মানুষের জীবন, পাঁচ হাজার বছর আগের কোনো ইতিহাস নেই। পাঁচ হাজার বছর পরেও কোনো ইতিহাস থাকবে না।
[রাইসু] কেন, পাঁচ হাজার বছর আগে লেখে নাই কেন?
ছফা: লিখে রাখার প্রয়োজনীয়তা ফিল করেনি। ইতিহাস লেখার সঙ্গে একটা সাবজেক্টিভ আইডিয়া যুক্ত আছে। ‘ইতিহাস’ কথাটা যখনই উচ্চারণ করবা, তখনই তার সঙ্গে একটা সাবজেক্টিভ আইডিয়া যুক্ত আছে।
[রাইসু] কী রকম?
ছফা: আইডিয়াটা হচ্ছে ‘আমরা অন্যদের চাইতে আলাদা’, ‘আমাদের কথা লিখে রাখতে হবে’। মানবজাতিটাই এলিটিজমের মধ্যে নিমজ্জিত। আমরা যে গ্রেকো-রোমান হিস্ট্রি বলি, এটা হচ্ছে গ্রিক ইগোর ফল। মানুষ তখনই ইতিহাস লেখে...রবি ঠাকুর যখন রবি ঠাকুর হন, তখন তার অটোবায়োগ্রাফি লেখতে গেলে তেরো পুরুষের বর্ণনা দেওয়া লাগে। বুঝেছ? যে লোক রবি ঠাকুর হয়নি, সে অটোবায়োগ্রাফিও লেখে না, তেরো পুরুষকেও টেনে আনে না।
আজকে যে মানুষের জীবন, পাঁচ হাজার বছর আগের কোনো ইতিহাস নেই। পাঁচ হাজার বছর পরেও কোনো ইতিহাস থাকবে না। ...ইতিহাস লেখার সঙ্গে একটা সাবজেক্টিভ আইডিয়া যুক্ত আছে। ...আইডিয়াটা হচ্ছে ‘আমরা অন্যদের চাইতে আলাদা’, ‘আমাদের কথা লিখে রাখতে হবে’।আহমদ ছফা
এই যে সাবজেক্টিভনেস, এটা হচ্ছে মানুষের একটা বিশেষ গুণ। আমি এইখানে পাঁচতলায় দাঁড়িয়ে যে আকাশ দেখি, তখন আকাশের চারপাশে যতটা গোল দেখি, নিচের তলায় দাঁড়ালে সে গোলটা আরও সংকুচিত হয়ে আসে। তুমি যত ওপরে উঠবে বলয়টা তত বাড়বে। মানুষের জীবনকে ঘিরে চারপাশে কতগুলো আঁধার, কতগুলো আলো থাকে। যেখানে আমি নিজের চোখে দেখি না, অনুভব করি না, সেখানে সভ্যতা নেই।
[রাইসু] সভ্যতাকে ওইভাবে জরুরি মনে করেন?
ছফা: মনে না করার উপায় নাই, আমাদের যা আছে, তা হলো সভ্যতা, আর আমরা যা তা–ই হলো সংস্কৃতি। সংস্কৃতি-সভ্যতা সবই হচ্ছে মানুষের অস্তিত্বের বিস্তার...আমি তো সবার লেখা পড়ি। আমি লেখা পড়ি প্রাণের বিকাশ দেখার জন্য।
[রাইসু] কী দেখেন?
ছফা: এরা তো এখনো প্রস্তরযুগেই আছে। মানুষের ভাষা পায়নি আজও। প্রস্তরযুগ মানে, তারা যে ভাষাটা ব্যবহার করছে, সেটা আদিম। এখন প্রত্যেক ব্যক্তি-মানুষ জীবন্ত মানুষ। প্রতিমুহূর্তে তার পরিবর্তন হচ্ছে। এই ধাবমান পরিবর্তনের মাঝখানে মানুষের পটভূমিতে মানুষের চরিত্র—যদি তুমি স্থাপন না করো, তখন মানুষ সম্পর্কে তুমি কতগুলো টাইপ ধারণায় বন্দী হয়ে থাকবে। এগুলো সাহিত্যের কিতাবের মধ্যে আছে। ছেলেদের আগে খাওয়াইয়া মেয়েরা ভাত খাইত। তারা সাফার করতে পছন্দ করত। এটা একধরনের সাহিত্যিক ধারণা।
আসলে মেয়েরা তাদের ওপর সুবিচার চায়। ...একবার এক ইউরোপীয় মহিলাকে আমি প্রেমের কথা বললাম। আমি শুধু বলতে থাকলাম, ‘ইফ আই ডু নট লাভ ইউ, হোয়াই কুড আই টক টু ইউ।’ পরে দেখা গেল, আমি যখন বার্লিন থেকে চলে আসছি, সেই ইউরোপিয়ান মহিলা হু হু করে কাঁদছে।আহমদ ছফা
আসলে মেয়েরা তাদের ওপর সুবিচার চায়। বেশির ভাগ পুরুষ মেয়েদের ওপর সুবিচার করে না। এমনকি যারা নারীবাদী তারাও না। নারীবাদ পুরুষের বিপরীতে মেয়েদের দাঁড় করাচ্ছে। মেয়েরা যে রজঃস্বলা হয়, তারা যে গর্ভ ধারণ করে, এর মধ্যে যে একটা মহত্ত্ব আছে। একবার এক ইউরোপীয় মহিলাকে আমি প্রেমের কথা বললাম। আমি শুধু বলতে থাকলাম, ‘ইফ আই ডু নট লাভ ইউ, হোয়াই কুড আই টক টু ইউ।’ পরে দেখা গেল, আমি যখন বার্লিন থেকে চলে আসছি, সেই ইউরোপিয়ান মহিলা হু হু করে কাঁদছে। অর্থাৎ যেই কনসেপ্টগুলো ছিল আগে মানুষের—প্রেম—ব্যক্তিগত জীবনে আমরা এখন পাই না।
[রাইসু] আচ্ছা ছফা ভাই, মেয়েদের ক্ষেত্রেই কেন সাফারিংসটা দেখা যায়, পুরুষের ক্ষেত্রে কেন যায় না?
ছফা: আমি একটা মেয়েকে দেখেছি খুবই ছোটবেলায়। সে যে আমাকে রিফিউজ করেছে, এই ব্যথাটা করে তো আমি কাঁদি। দুটো প্রবলেম আছে। জার্মানরা চমৎকার একটা কথা বলে: পুরুষ আর মেয়ের স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক হচ্ছে কাঁচির দুটা হোলের মতো। ওরা নিজেরা ঝগড়া করবে, কিন্তু তৃতীয় জিনিস আসলে এটা হচ্ছে অনধিকার চর্চা। আমার জীবন খুব কষ্টের, ভাঙাচোরা জীবন। মাঝে মাঝে আমি অমৃতের সন্ধান পেয়েছি। আমি সমস্ত সম্পর্কের মধ্যে অমৃতের সন্ধান পাই। আমি একটা প্রাকৃতিক সত্তা। কিছুদিন বাদেই আমি নিরস্তিত্ব হয়ে পড়ব। আমার ‘পুষ্প, বৃক্ষ এবং বিহঙ্গ পুরাণ’–এর শেষ কনক্লুডিং অধ্যায়টা খুব ইন্টারেস্টিং, অর্থাৎ আমি তো পাখির জগতে অবস্থান করতে পারতাম। কিন্তু মানুষের জীবনের করুণ রঙ্গভূমি এই, এখানে থাকা ছাড়া আমার কোনো উপায় নেই। কিন্তু আমি পাখি বা গাছ এ কারণে নই যে মানুষের জীবন শুধু মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। পাখির সঙ্গে, পশুর সঙ্গে, নক্ষত্রের সঙ্গে, গাছের সঙ্গে এই জীবনের যে বিস্তার, যাকে বলে অধিকারবোধ—সেটা আমি পাখিদের সঙ্গে না মিশলে জানতাম না। যেমন ধরো গাছ, দাঁড়িয়ে আছে; তুমি চলছো, কিন্তু চলার মধ্য দিয়েও যে চলছে না, তার সঙ্গে আমার একটা সম্পর্ক আছে। উপনিষদে চমৎকার একটা কথা আছে: ঈশ্বরের যে ধারণা, হয়তো নাই। কিন্তু এই যে আকাশের মধ্যে স্তব্ধ হয়ে বৃক্ষের মতো কেউ একজন দাঁড়িয়ে আছেন, এইটা হয়তো সত্যি নয়। নাস্তিকেরা হয়তো বলবে যে সত্যি নয়। কিন্তু আমার তো নাস্তিকতা দিয়ে চলে না। আমার নাস্তিকতা কোনো কাজে আইয়ে না।
মানুষের ভেতরে আছে একটা আগুন, যাকে বলা যায় প্রমিথিয়ন ফায়ার। সে সব সময় তার অতীতকে অস্বীকার করে। সে অতীতের যা কিছু গুণাগুণ, সেটা লেখ্য বর্ণমালার মাধ্যমে সামনে প্রবাহিত করে দেয়। তো, মানুষ শুধু এক জায়গায় দাঁড়িয়ে নেই, মানুষ তো ক্রমাগত চলছে।আহমদ ছফা
আমি ছোটবেলা থেকে একটা আস্তিক পরিমণ্ডলের মধ্যে এবং স্নেহের মধ্যে বড় হয়েছি। আমাকে যেটা টানে, সেটা হলো গিয়ে মানুষের বর্তমান অস্তিত্ব: এরই মধ্যে ঈশ্বর আছে, এরই মধ্যে স্বর্গ আছে, এরই মধ্যে নরক আছে। এটা অনুভব করার ক্ষমতা অর্জন করা দরকার। আমি তো কামেল লোক নই। কামেল লোক হইলে অত কথা কইতাম কেন? জঙ্গলে গিয়া থাকতাম। বনের বাঘ–ভালুক–সিংহ—এরা আমার শাগরেদ হইয়া যাইত। এই কামালিয়াত নাই বইলাই তোমাগো লগে কথা কইতে, ডায়ালগ করতে চাই।
[আশীষ খন্দকার] কিন্তু আপনার পৃথিবীতে তো তারা আপনার সাথেই আছে।
ছফা: আপনারা কি নেই? আপনারা তো বাইরে নন। ধরেন, এই যে গান, গানের মধ্যে বিশ রকম গুণ আছে। রক্তগুণ, মাংসগুণ, এইডা গুণ, এইডা গুণ—সংস্কৃতে কত নাম যে দিছে। এই যে ইতিহাসের যুগের আগে মানুষের অবস্থা সুপ্ত ছিল, তারা অন্য প্রাণীর মধ্যে ছিল। আস্তে আস্তে সে যখন বিশিষ্ট হয়ে উঠছে, তার মধ্যে একটা বিশিষ্ট রকম চিজ রাখছে। সে একটি পর্যায়ে এসে আল্লাহ আবিষ্কার কইরা ফেলাইছে। একটা পর্যায়ে এসে তাদের মধ্যে পয়গম্বর বানিয়ে ফেলেছে। এখন যখন মানুষকে আপনি টোটালি দেখবেন, এই অভিজ্ঞতাগুলিকে আপনি মূল্য দেবেন। সংগীতটাই নেন না কেন। সে ‘সা’ স্বর আনছে গাধার আওয়াজ থেকে, ‘মা’ স্বর হচ্ছে ছাগলের। সংগীতটা যখন হয়, তখন সেইটা ছাগলের হয় না, গাধার হয় না, কাকের হয় না, কোকিলেরও হয় না। তখন এর একটা নিজস্ব সত্তা দাঁড়িয়ে যায়। মানুষের ভেতরে আছে একটা আগুন, যাকে বলা যায় প্রমিথিয়ন ফায়ার। সে সব সময় তার অতীতকে অস্বীকার করে। সে অতীতের যা কিছু গুণাগুণ, সেটা লেখ্য বর্ণমালার মাধ্যমে সামনে প্রবাহিত করে দেয়। তো, মানুষ শুধু এক জায়গায় দাঁড়িয়ে নেই, মানুষ তো ক্রমাগত চলছে। তার অভিজ্ঞতাগুলো চলছে। তার গবেষণাগুলো চলছে।
মানুষের ব্যক্তিগত উদ্যোগ মরে মরে সভ্যতা তৈরি হয়। ...মানুষের যে আচরণ, যে অভিব্যক্তি, কোন পরিস্থিতিতে সে কোথায় কী এক্সপ্রেস করবে—এটা তার দেহব্যবস্থা ঠিক করে দেয়। দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের তরুণেরা বুঝতে চাইছে না যে কাজের জন্যে একটা সাধনা দরকার।আহমদ ছফা
মানুষ হয়তো ঈশ্বরঘেরা রইছে। ওই যে গান আছে—‘চিনতে পারো নাকি রে মন বুঝতে পারো নাকি/ খাঁচারও পিঞ্জিরায় থাকে অচেনা এক পাখি।’ তখন এই যে মানুষ, তার ক্লান্তপ্রাণ বুকের তলায় চব্বিশ ঘণ্টা দুঃখে দুঃখে থাকে, কোথায় কালকে পয়সা পাবে, কোথায় কালকে খাবারটা হবে, তখন এই যে মানুষ, এই ভাঙাচোরা মানুষ তার জানের জন্যে কোথায় যাবে, সমুদ্র লঙ্ঘন করে, গিরি লঙ্ঘন করে, পৃথিবীর অপর প্রান্তে যে মানুষ তার কাছে ছুটে যায়। মানুষ কে? মানুষ ঈশ্বরঘেরা। আমি বোঝাতে পারব না। সভ্যতা বলে যে বস্তুটা বুঝি, মানুষের ব্যক্তিগত উদ্যোগ মরে মরে সভ্যতা তৈরি হয়। এই যে প্রবাল দ্বীপের সভ্যতা, এইটা একটা মরা সভ্যতা। মানুষের যে আচরণ, যে অভিব্যক্তি, কোন পরিস্থিতিতে সে কোথায় কী এক্সপ্রেস করবে—এটা তার দেহব্যবস্থা ঠিক করে দেয়। দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের তরুণেরা বুঝতে চাইছে না যে কাজের জন্যে একটা সাধনা দরকার।
[রাইসু] আচ্ছা ছফা ভাই, একটা কথা জিজ্ঞেস করি, আপনি তো এখনো জীবন ধারণ করে আছেন, কখনো আত্মহত্যা করতে চাইছিলেন?
ছফা: আত্মহত্যা করার আমার খুব প্রবল ইনস্টিংট ছিল। আমার মারে কীভাবে কাঁদাব, বাপরে কীভাবে কাঁদাব। আমি যদি মারা যাই, ওরা কীভাবে কাঁদবে—খুব দেখার ইচ্ছা আরকি। আমি ক্রমাগত ভয় দেখাতাম, ট্রেনের গোড়ায় গোড়ায় বসে থাকতাম—টাকার জন্যে, পয়সার জন্যে।