একাত্তর: ভুট্টোর চোখে

প্রায় ২৭ বছর আগে ১৯৯৯ সালের ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে প্রকাশিত প্রথম আলোর বিশেষ আয়োজনে হাসান ফেরদৌসের এই লেখাটি প্রথম ছাপা হয়েছিল। লেখাটিতে প্রাসঙ্গিকভাবে উদ্ধৃত হয়েছে লেখকের অনুবাদে ইতালীয় সাংবাদিক ওরিয়ানা ফালাচির নেওয়া জুলফিকার আলী ভুট্টোর সাক্ষাৎকারের নির্বাচিত অংশ। আমাদের বহু মূল্যবান লেখা শুধু মুদ্রণের পাতায় রয়ে গেছে; তেমনি একটি লেখা এই—‘একাত্তর: ভুট্টোর চোখে’।

স্বাধীনতা দিবস ও মুক্তিযুদ্ধকে কেন্দ্র করে অনলাইনপূর্ব যুগে যত লেখা, সাক্ষাৎকার, স্মৃতিচারণ ও কবিতা ছাপা হয়েছিল, স্বাধীনতার পুরো মাসজুড়ে সেসব ধুলোঝরা পৃষ্ঠা আমরা প্রথমবারের মতো অনলাইনে তুলে আনছি।

গ্রাফিকস: প্রথম আলো

‘কনজেনিটাল লায়ার’ কথার বাংলা কী? জন্মমিথ্যুক? সম্ভবত মিথ্যাবাদী? নাকি গাঢ় মিথ্যাবাদী? যেভাবেই বলি না কেন, জুলফিকার আলী ভুট্টো কনজেনিটাল লায়ার ছাড়া আর কিছু নয়। ওরিয়ানা ফালাচির কাছে ১৯৭২-এর এপ্রিলে তাঁর দেওয়া একটি সাক্ষাৎকার নতুন করে পড়ে এই সত্য আবার বোঝা গেল।

‘ইন্টারভিউ উইথ হিস্ট্রি’ এই নামে ১৪টি রাজনৈতিক সাক্ষাৎকারের সংকলনের জন্য ইতালীয় সাংবাদিক ও লেখক ফালাচির নাম জগৎজোড়া। তিনি যে একজন চমৎকার ঔপন্যাসিক, এ কথা অবশ্য তেমন পরিচিত নয়। ফালাচি ১৯৭২-এর গোড়ার দিকে মুজিব, ইন্দিরা ও ভুট্টোর তিনটি সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন। মুজিবের সাক্ষাৎকারটি এই গ্রন্থভুক্ত হয়নি। তবে ইন্দিরা ও ভুট্টোর সাক্ষাৎকারটি সবিস্তারে মুদ্রিত হয়েছে। ভুট্টোর সাক্ষাৎকারের প্রায় পুরোটাজুড়েই বাংলাদেশ ও মুজিবের বিরুদ্ধে বিষোদ্‌গারে পূর্ণ। মুজিব মিথ্যাবাদী, এ কথা ভুট্টো তাঁর সেই সাক্ষাৎকারে প্রায় আধডজনবার বলেছেন। চোখ-কান বন্ধ করে বলে ফেলেছেন, একাত্তরে বাংলাদেশে কোনো গণহত্যা হয়নি! জেরার মুখে পড়ে বলতে বাধ্য হয়েছেন, সেখানে বড়জোর হাজার পঞ্চাশেক লোক মারা গেছে। এই গণহত্যা নীতিসম্মত, তা জাস্টিফায়েড, এ কথা বলে নির্দ্বিধায় তার ব্যাখ্যা করেছেন এভাবে যে জাতীয় ঐক্যের খাতিরে এ ধরনের গণহত্যার প্রয়োজন ছিল।

ভুট্টোর সাক্ষাৎকারের প্রায় পুরোটাজুড়েই বাংলাদেশ ও মুজিবের বিরুদ্ধে বিষোদ্‌গারে পূর্ণ। মুজিব মিথ্যাবাদী, এ কথা ভুট্টো তাঁর সেই সাক্ষাৎকারে প্রায় আধডজনবার বলেছেন। মুজিবকে যতটা সম্ভব তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেছেন।

তাঁর এই সাক্ষাৎকারে ভুট্টো মুজিবকে যতটা সম্ভব তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেছেন। রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে তাঁর সব যোগ্যতাকে ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দিয়েছেন, কখনো তাঁকে জুড়ে দিয়েছেন ইয়াহিয়া খানের দোসর হিসেবে, কখনো বানিয়েছেন নিজের বশংবদ নাবালক রাজনৈতিক এজিটেটর হিসেবে। মিয়ানওয়ালির বন্দিশালায় তাঁর জন্য যে গোর খোদা হয়েছিল, তা অস্বীকার করে বলেছেন, ওটা ছিল একটা বম্ব শেল্টার।

ইতিহাস, বিশেষত ১৯৭১-এর ইতিহাস—যাঁদের বিন্দুমাত্র জানা আছে, তাঁরা মানবেন এই ভুট্টো একজন আত্মপ্রেমী, ভারসাম্যহীন রাজনৈতিক সুযোগসন্ধানী ছাড়া আর কিছু নয়। তিনি প্রকৃতিস্থ নন, এ কথাও স্পষ্ট বোঝা যায় তাঁর কথা থেকে। তাঁর অপ্রকৃতিস্থতার কারণেই ভুট্টোর এই সাক্ষাৎকার ১৯৭২-এ মস্ত রাজনৈতিক কেলেঙ্কারিতে পরিচিত হয়। সেটি অবশ্য মুজিবকে নিয়ে তাঁর মন্তব্যের জন্য নয়। ইন্দিরা গান্ধী বিষয়ে তাঁর অবিরাম অশালীন মন্তব্যের কারণে। ভুট্টো যে কত বড় মিথ্যাবাদী, তা বোঝার জন্য এই ঘটনা মনে রাখা দরকার। ফালাচি ইন্দিরার সাক্ষাৎকারটি নিয়েছিলেন ১৯৭২-এর ফেব্রুয়ারিতে। তখন বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে। মুজিব ফিরে এসেছেন স্বাধীন বাংলাদেশে। তাঁর সে সাক্ষাৎকারে ইন্দিরা ভুট্টোকে ‘অপ্রকৃতিস্থ’ বলে অভিহিত করেছিলেন। বলেছিলেন ভুট্টো কখন কী বলে তার ঠিক নেই, তা বোঝার উপায় নেই। ইন্দিরার সে সাক্ষাৎকার পড়ে ভুট্টোর বায়ুরোগ হওয়ার উপক্রম। তিনি নিজে ওরিয়ানাকে খুঁজে বের করেন, সরকারি খরচে রাওয়ালপিন্ডিতে ছয় দিন রেখে এই সাক্ষাৎকার দেন। তাঁর একটাই উদ্দেশ্য ছিল: ইন্দিরাকে নির্মম ও অশালীন ভাষায় আক্রমণ করা। এই মহিলার হস্তমর্দন করার কথা ভাবতেও তাঁর সারা শরীর শিউরে ওঠে বলে তিনি মন্তব্য করেন। ইন্দিরা নির্বোধ, বাবার মেধার সিকি ভাগও তার নেই বলে ঘোষণা করেন।

ইতালীয় সাংবাদিক ও লেখক ওরিয়ানা ফালাচির ১৪টি রাজনৈতিক সাক্ষাৎকারের সংকলন ‘ইন্টারভিউ উইথ হিস্ট্রি’
ছবি: সংগৃহীত

এখানে স্মরণ রাখা দরকার, এই সাক্ষাৎকার-পাল্টা সাক্ষাৎকার চলছে এমন এক সময়ে যখন পাকিস্তান ভারত থেকে তার লাখখানেক যুদ্ধবন্দী ফিরিয়ে আনার জন্য সলা-পরামর্শ চালাচ্ছে। সিমলা চুক্তির প্রাথমিক ভিত্তি তৈরি হচ্ছে। ভারতীয় পত্রপত্রিকায় ইন্দিরাকে নিয়ে ভুট্টোর অশোভন মন্তব্যসমূহ ছাপা হলে ইন্দিরা বেঁকে বসলেন, পাকিস্তানের সঙ্গে চুক্তি হবে না বলে জানিয়ে দিলেন। ভুট্টোর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে বন্দীদের ফিরিয়ে আনার ওপর। এখন তাহলে? এরপর ঘটল সবচেয়ে অবিশ্বাস্য একটি ঘটনা। ভুট্টোর মিথ্যাবাদী স্বভাব বুঝতে হলে এই ঘটনা জানা প্রয়োজন। ফালাচি তখন আদ্দিস আবাবায়। হঠাৎ সেখানে ভুট্টোর লোক গিয়ে হাজির। ফালাচি তাঁর যে সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন তা সত্য নয়, প্রধানমন্ত্রী ভুট্টো এমন একটি আবদার করেছেন। রাষ্ট্রদূত মহাশয় জানালেন, জনাব ভুট্টোর অনুরোধ—তাঁকে বলতে হবে এমন কোনো সাক্ষাৎকারই নেওয়া হয়নি, পুরো ব্যাপারটি ফালাচির কল্পনার ফসল। ফালাচি তো হতবাক। পাকিস্তানি রাষ্ট্রদূত তাঁকে অনুনয়-বিনয় করে বললেন, এটা তাঁকে করতেই হবে, বিশেষ করে ইন্দিরা সম্বন্ধে ভুট্টোর মন্তব্যগুলো বেমালুম তিনি উদ্ভাবন করেছেন এটা বলতে হবে। ফালাচি তাঁকে জাহান্নামে যাওয়ার পরামর্শ দিলেন। এরপরও ভুট্টোর রাষ্ট্রদূতেরা ফালাচির পিছু ছাড়েননি। ছয় কোটি মানুষের ভাগ্য তাঁর হাতের মুঠোয় আছে, এই যুক্তি দেখালেন ভুট্টোর রাষ্ট্রদূত। ফালাচি অবশ্য তাঁর হাত অত বড় নয় বলে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। শেষমেশ ইন্দিরা নিজেই পুরো ব্যাপারটি আর বাড়তে না দিয়ে ভুট্টোর সঙ্গে চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন।

২৭ বছর পর ফালাচিকে দেওয়া এই মিথ্যাবাদী ও অপ্রকৃতিস্থ ভুট্টোর সাক্ষাৎকারটি থেকে নতুন কোনো সত্য জানার নেই। প্রকৃতপক্ষে এতে কোনো সত্যও বিন্দুমাত্র নেই। ভুট্টো তাঁর নিজের অবস্থান পোক্ত করতে, তাঁর হাতের রক্ত মুছে ফেলতে ইতিহাসকে ইচ্ছেমতো বিকৃত করেছেন। একাত্তরের আগের ও পরের ঘটনা এখন অনেকটাই ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত ও নথিপত্র দ্বারা নির্ধারিত। খোদ পাকিস্তানিরাই অনেকে সে সত্য উদ্‌ঘাটন করেছেন। তারপরও ভুট্টোর এই সাক্ষাৎকার এখন ঐতিহাসিক দূরত্ব থেকে ফের বিবেচনা করে দেখা দরকার দুটি কারণে। প্রথমত, ১৯৭১ সালে খুনি পাকিস্তানিদের ‘মাইন্ড সেট’ বোঝার জন্য। পাকিস্তানি, তা সিন্ধিই হোক বা পাঞ্জাবিই হোক, কখনোই পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিদের সমমর্যাদাসম্পন্ন মনে করেনি। নিজেদের শ্রেষ্ঠ জ্ঞান করে তারা একধরনের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অ্যাপারথেইড ব্যবস্থা চালু করে রেখেছিল। এই কারণে জাতীয় ঐক্যের খাতিরে ‘৫০ হাজার’ বাঙালিকে নির্বিচার হত্যাও তাদের চোখে ‘জাস্টিফায়েড’, এমনকি তা প্রয়োজনীয়।

ভুট্টোর এই সাক্ষাৎকার ঐতিহাসিক দূরত্ব থেকে ফের বিবেচনা করে দেখা দরকার দুটি কারণে। প্রথমত, ১৯৭১ সালে খুনি পাকিস্তানিদের ‘মাইন্ড সেট’ বোঝার জন্য। দ্বিতীয়ত, সেই মানসিকতার কোনো পরিবর্তন পাকিস্তানিদের মধ্যে দেখা গেছে কি?

দ্বিতীয় কারণটি প্রথম কারণ থেকে উদ্ভূত। পাকিস্তানিরা ‘কনজেনিটাল কিলার্স’ এই কথা উপরোক্ত বক্তব্যে প্রমাণিত হলে স্বাভাবিকভাবেই পাল্টা প্রশ্ন ওঠে, সেই খুনে মানসিকতার কোনো পরিবর্তন পাকিস্তানিদের, বিশেষত সে দেশের শাসকদের মধ্যে দেখা গেছে কি? পাকিস্তানিদের সঙ্গে আমাদের অর্থাৎ বাঙালিদের সমঝোতা আদৌ কখনো সম্ভব কি না, এই প্রশ্নের জবাবের ওপরও তা নির্ভর করবে। আমি এখানে রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক সমঝোতার কথা বলছি না। এই দুই ক্ষেত্রে আমরা দুই দেশ এখন নানাভাবে পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত এমনকি এক অর্থে একে অপরের মিত্র। কিন্তু নৈতিকভাবে এই খুনে পাকিস্তানিদের এবং তার সহযোগীদের আমরা কখনো কি গ্রহণ করতে পারব? তা কি পারা সম্ভব?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে নিতে ফালাচির সঙ্গে ভুট্টোর সাক্ষাৎকারটি খানিকটা সাহায্য করবে। ভুট্টো নিজেকে বামপন্থী এমনকি মাওবাদী বলতেও দ্বিধা করেন না। অথচ কখনো, কোনো সময়েই বাঙালিদের মুক্তির ইচ্ছার প্রতি কোনো সহানুভূতি দেখাতে পারেননি। অন্যদিকে, বাঙালিরা হতচ্ছাড়া দারিদ্র্যক্লিষ্ট, ঢাকা একটি আঁধারঘেরা নোংরা শহর, বাঙালিদের নেতা মুজিব একজন মহামূর্খ ইত্যাদি মন্তব্য অকাতরে করে গেছেন। ফালাচির এই সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হওয়ার পর আজ পর্যন্ত কেউ তাঁর এই ঔদ্ধত্যের জন্য ক্ষমা চায়নি। ঐতিহাসিক সত্যকে তার নিজস্ব পরিপ্রেক্ষিতে উদ্ধার করেনি।

ওরিয়ানা ফালাচির কাছে দেওয়া ভুট্টোর সে সাক্ষাৎকারের নির্বাচিত অংশের ভাষান্তর নিচে পত্রস্থ করা হলো।

পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জুলফিকার আলী ভুট্টোর সাক্ষাৎকার নিচ্ছেন ইতালীয় সাংবাদিক ও লেখক ওরিয়ানা ফালাচি। এপ্রিল, ১৯৭২
ছবি: সংগৃহীত

জুলফিকার আলী ভুট্টো: তোমার সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য আমি কেন এত আগ্রহী ছিলাম জানো? তুমিই প্রথম সাংবাদিক যে মুজিবুর রহমান বিষয়ে সত্যি কথা লিখেছ। তা পড়ে ভালো লেগেছে, তবে মার্চের ঘটনার সঙ্গে আমার হাত ছিল বলে যে কথা বলেছ, তা আমার ভালো লাগেনি।

ওরিয়ানা ফালাচি: আপনার হাত ছিল মানে? মি. প্রেসিডেন্ট, ঢাকায় সবাই দাবি করে আপনিই এ হত্যা ঘটিয়েছেন। মুজিবের গ্রেপ্তার চেয়েছিলেন আপনি এবং সে জন্য আপনি ২৬ মার্চের সকাল পর্যন্ত ঢাকায় ছিলেন।

জুলফিকার আলী ভুট্টো: সম্ভবত ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলের শেষতলার আমার হোটেল কক্ষের জানালা দিয়ে সে দৃশ্য দেখতে, হুইস্কি খেতে এবং বোধ করি নিরোর মতো বাঁশি বাজাতে আমি ঢাকায় পড়ে ছিলাম। আশ্চর্য! কোন সাহসে তারা আমাকে এত বর্বর ও নির্বোধ ঘটনার সঙ্গে যুক্ত করে? ওই ব্যাপারে পুরোটাই করা হয়েছিল চূড়ান্ত বোকামির ভেতর দিয়ে। তারা সব নেতাদের ভারতে পালিয়ে যেতে দিয়ে শেষমেশ আঘাত করল হতভাগা সাধারণ মানুষজনকে। তাদের আর কী দাম ছিল? এক মুজিবকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। একটু লজিক্যাল হোন, তাহলেই বুঝবেন এমন একটি অপারেশন আমি হলে অনেক বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে, অনেক বিজ্ঞানসম্মতভাবে এবং কম নিষ্ঠুরতার সঙ্গে সম্পন্ন করতাম। টিয়ার গ্যাস, রাবার বুলেট দিয়ে তা করা যেত, আর আমি প্রথমেই সব নেতাকে জেলে ঢোকাতাম। বাহ্, ইয়াহিয়া খানের মতো একজন মদ্যমাতাল প্রেসিডেন্টের পক্ষেই এ রকম বাজে ও রক্তাক্ত অপারেশনে নেতৃত্ব দেওয়া সম্ভব ছিল।

তা ছাড়া এ রকম পাগলামোর জন্য আমার কোনো আগ্রহ থাকবে কেন? তুমি জানো, ইয়াহিয়া তার প্রথম ভিকটিম হিসেবে মুজিবকে নয়, আমাকে নির্বাচন করেছিল। আমার দলের অনেক নেতা-কর্মী তখন জেলে। সে সময়, সঠিক তারিখটি হলো ৫ নভেম্বর ১৯৭০। ইয়াহিয়া মুজিবকে জিজ্ঞেস করেন, কী, ভুট্টোকে গ্রেপ্তার করব নাকি? একমাত্র যে কারণে ইয়াহিয়া তার মত বদলায় তা হলো, পূর্ব পাকিস্তানের মতো পশ্চিম পাকিস্তানের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করার কোনো ক্ষমতা তার ছিল না। তা ছাড়া মুজিব কখনোই খুব একটা বুদ্ধিমান লোক ছিল না বলে নিজেই নিজের গোর খুঁড়ে নেয় সে।

তবে সংক্ষেপে বলতে গেলে, ২৫ মার্চের ঘটনা আমার জন্য খুবই আকস্মিক ছিল। ইয়াহিয়া আমাকে পর্যন্ত বোকা বানিয়েছিলেন। তিনি আমাকে পরদিন সাক্ষাৎকারের জন্য সময় দিয়েছিলেন। পরে জেনারেল মোহাম্মদ ওমর আমাকে বলেছিলেন, (সামরিক হামলার আগেই ঢাকা ছেড়ে যাওয়ার) বুদ্ধিটা সে নিয়েছিল এই জন্য যে আমি যেন ঢাকায় থাকি ও সামরিক বাহিনীর দক্ষতা পর্যবেক্ষণ করি। আমি হলফ করে বলছি, এর প্রতিটি কথা সত্যি।

ওরিয়ানা ফালাচি: কিন্তু আমি ভাবছি সেই ভয়াবহ রাতে এবং পরবর্তী মাসগুলোতে আসলে কী ঘটেছিল তা আমরা কখনো ঠিক ঠিক জানতে পারব কি না? মুজিবুর রহমান...

জুলফিকার আলী ভুট্টো: তুমি তো দেখেছ, মুজিব একটা আজন্ম মিথ্যুক। মিথ্যা ছাড়া অন্য কথা বলা তার পক্ষে অসম্ভব। তার নিজের চেয়েও অধিক শক্তিশালী মিথ্যা বলার এই প্রবণতা। মুজিব অনর্গল কথা বলে, সেসব কথা তার ‘মুডের’ বা তার অসুস্থ মনের বিশৃঙ্খলার ওপর নির্ভর করে। যেমন ধরো, সে বলে (বাংলাদেশ যুদ্ধে) তিন মিলিয়ন মানুষ মারা গেছে। লোকটা পাগল, আস্ত পাগল। যারা এ কথায় বিশ্বাস করে, তারা সবাই পাগল। পত্রপত্রিকাগুলোও তার কথামতো চেঁচায়, ‘তিন মিলিয়ন মৃত, তিন মিলিয়ন মৃত।’ ভারতীয়রা এক মিলিয়নের কথা বলেছিল। তারপর মুজিব এসে সে সংখ্যা প্রথম দ্বিগুণ ও পরে তিন গুণ করে দেয়। লোকটার স্বভাবই এ রকম। ঘূর্ণিঝড় নিয়েও একই কাণ্ড ঘটিয়েছিল। শুনুন, ভারতীয় সাংবাদিকদের মতে সে রাতে ৬০-৭০ হাজার মানুষ মারা যায়। কোনো মিশনারির মতে, এই সংখ্যা হাজার তিরিশেক। আমি নিজে যা জানতে পেরেছি, তা হলো হাজার পঞ্চাশের মতো। মানছি, এ অনেক বড় সংখ্যা। সামরিক হস্তক্ষেপ নৈতিকতার গ্রহণযোগ্য (জাস্টিফায়েড) হলেও তা অনেক বেশি। আমি ঘটনার গুরুত্ব কমিয়ে দেখতে চাইছি না। আমি শুধু বাস্তবতা দেখিয়ে দিতে চাইছি। ৫০ হাজার আর ৩০ লাখের মধ্যে ব্যবধান বিস্তর।

উদ্বাস্তুদের নিয়েও একই ব্যাপার। মিসেস গান্ধী বলেন, ১০ মিলিয়ন। এটা স্পষ্ট যে এই সংখ্যা তিনি বলেছিলেন যাতে করে পূর্ব পাকিস্তানে তাঁর আগ্রাসনকে আইনসম্মত করা যায়। কিন্তু আমরা যখন জাতিসংঘকে ডেকে সে সংখ্যা পরখ করতে চাইলাম, ভারতীয়রা তার বিরোধিতা করল কেন? সে সংখ্যা সঠিক হলে তাদের তো আপত্তি করার কথা না। সত্যি কথা হলো, আসল সংখ্যাটা দশ মিলিয়ন নয়, মাত্র দুই মিলিয়ন। মৃতদের সংখ্যার ব্যাপারে আমি ভুল হিসাব করে থাকতে পারি, কিন্তু উদ্বাস্তুদের ব্যাপারে নয়। আমরা জানি, কারা দেশ ছেড়েছিল। এদের অনেকেই ছিল পশ্চিম বাংলার বাঙালি, কলকাতা থেকেই তাদের পাঠানো হয়েছিল। মিসেস গান্ধীই তাদের পাঠিয়েছিলেন। সব বাঙালিই তো দেখতে একরকম, কে কোথাকার কে জানবে?

এবার নারীদের গণধর্ষণের ও হত্যার ব্যাপারটি বিবেচনা করা যাক। আমি কোনোটাই বিশ্বাস করি না। এ কথা ঠিক যে বাড়াবাড়ি হয়েছিল। জেনারেল টিক্কা খান অবশ্য বলেছেন, অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের ঘটনা সম্বন্ধে অভিযোগ জানতে জনতাকে তার কাছে সরাসরি আমন্ত্রণ করতেন। লাউড স্পিকার দিয়ে তিনি সেসব অনুরোধ জানিয়েছিলেন। তারপরও মোটে চারটির মতো অভিযোগ এসেছিল। তো সে সংখ্যা দশ দিয়ে গুণ করলেও দাঁড়ায় মোটে চল্লিশ। মুজিব এবং ইন্দিরা যে সংখ্যার কথা প্রচার করে বেড়িয়েছেন, তার অনেক অনেক কম এই সংখ্যা।

প্রতিটি সরকার, প্রতিটি রাষ্ট্র প্রয়োজনমতো ক্ষমতা প্রয়োগের অধিকার রাখে। যেমন ঐক্য ও সংহতির জন্য বল প্রয়োগ করা যায়। দেশ গড়ার জন্য স্টালিনকে বল প্রয়োগ করতে হয়েছিল। মাও সে–তুংকেও বলপ্রয়োগ ও হত্যা করতে হয়েছিল।
মার্চের গণহত্যা প্রসঙ্গে জুলফিকার আলী ভুট্টো

ওরিয়ানা ফালাচি: না, মি. প্রেসিডেন্ট। দশ দিয়ে নয়, এক হাজার বা দশ হাজার দিয়ে গুণ করলে তবে হয়তো ঠিক সংখ্যাটি পাওয়া যাবে। মুজিবের দাবিমতো ৩০ লাখ হয়তো সঠিক না হতে পারে, কিন্তু টিক্কার দেওয়া সংখ্যা ঠাট্টা ছাড়া আর কিছু নয়। গণহত্যা ঘটেছিল, আমি নিজে ঢাকায় লাশের পর লাশ দেখেছি। তা ছাড়া আমার মনে হয়, অত্যন্ত বাজে একটি শব্দ আপনি ব্যবহার করেছেন। আপনি বলেছেন, এই গণহত্যা নীতিসম্মত (মোরালি জাস্টিফায়েবল) বা জাস্টিফায়েড ছিল। এই কথাই তো আপনি বলেছেন, নাকি? আপনি এ কথা সত্যি সত্যি বলেছেন যে এই গণহত্যা নীতিসম্মত ছিল?

জুলফিকার আলী ভুট্টো: প্রতিটি সরকার, প্রতিটি রাষ্ট্র প্রয়োজনমতো ক্ষমতা প্রয়োগের অধিকার রাখে। যেমন ঐক্য ও সংহতির জন্য বল প্রয়োগ করা যায়। তা ছাড়া ধ্বংস ছাড়া নির্মাণ কখনো সম্ভব নয়। দেশ গড়ার জন্য স্টালিনকে বল প্রয়োগ করতে হয়েছিল। মাও সে–তুংকেও বলপ্রয়োগ ও হত্যা করতে হয়েছিল। পুরো বিশ্ব ইতিহাস থেকে নয়, সাম্প্রতিক ইতিহাস থেকে দুটি উদাহরণ দিলাম। এমন একটা সময় আসে যখন রক্তাক্ত বলপ্রয়োগ নীতিসম্মত ও সঠিক। মার্চ মাসে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগের ওপর দেশের সংহতি নির্ভর করছিল। তবে তা বিচ্ছিন্নতাবাদীদের ওপর পরিচালিত না হয়ে সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে এ রকম নির্মমতার কোনো দরকার ছিল না। সেখানকার মানুষদের, যাদের বলা হয়েছিল ছয় দফা অর্জিত হলে ঘূর্ণিঝড় বন্ধ হবে, বন্যা থাকবে না, ক্ষুধা থাকবে না—সেখানে এভাবে বল প্রয়োগ করে তাদের মন ঘোরানো সম্ভব ছিল না। আমি সব নিষ্ঠুরতার বিরুদ্ধে সবচেয়ে স্পষ্টভাবে এবং সবার আগে বলেছি, যখন তা বলার সাহস পর্যন্ত অন্য কারও ছিল না।

ওরিয়ানা ফালাচি: অথচ সেই আপনিই গণহত্যার পরিচালক টিক্কা খানকে আপনার সেনাবাহিনীর প্রধান হিসেবে দায়িত্ব দিয়েছেন?

জুলফিকার আলী ভুট্টো: টিক্কা খান সৈনিক হিসেবে তার দায়িত্ব পালন করেছেন মাত্র। সুনির্দিষ্ট নির্দেশ নিয়ে তিনি পূর্ব পাকিস্তানে গিয়েছিলেন, সুনির্দিষ্ট নির্দেশের ভিত্তিতে তিনি ফিরে এসেছেন। তাকে যা নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল, তিনি তাই পালন করেছেন। অনেক সময় সে নির্দেশের প্রতি তার সম্মতি ছিল না, কিন্তু তবু তা পালন করেছেন। আমি তাকে নির্বাচন করেছি কারণ আমি জানি, একই শৃঙ্খলার সঙ্গে তিনি আমার নির্দেশ পালন করবেন। রাজনীতিতেও তিনি নাক গলাবেন না। পুরো সেনাবাহিনীকে তো আর আমি ধ্বংস করে ফেলতে পারি না। তা ছাড়া ঢাকার ঘটনাবলির জন্য তার যে দুর্নাম, তা–ও অতিরঞ্জিত। সেসব ঘটনাবলির জন্য দায়ী মাত্র একজন, সে হলো ইয়াহিয়া খান। তিনি, তাঁর পরামর্শদাতারা ক্ষমতা ও দুর্নীতির জালে এভাবে জড়িয়েছিলেন যে সামরিক বাহিনীর সম্মানের কথাটাও পর্যন্ত ভুলে গিয়েছিলেন। তাদের একমাত্র লক্ষ্য ছিল সুন্দর গাড়ি জোগাড় করা, চমৎকার সব বাড়ি বানানো ও বিদেশে টাকা পাঠানো। দেশের সরকার নিয়ে ইয়াহিয়ার কোনো আগ্রহ ছিল না, তার একমাত্র আগ্রহ ছিল ক্ষমতার জন্য ক্ষমতা ভোগ। বলুন, যে নেতা ঘুম থেকে উঠে মদ খাওয়া শুরু করেন, ঘুমাতে না যাওয়া পর্যন্ত যিনি মদ খেতে থাকেন, তাঁর সম্বন্ধে আর কী বলা যায়? সত্যি বলতে কি, তিনি ছিলেন আরেক জ্যাক দি রিপার।

ওরিয়ানা ফালাচি: ইয়াহিয়া খান এখন কোথায়, তাঁকে নিয়ে আপনি কী করতে চান?

জুলফিকার আলী ভুট্টো: রাওয়ালপিন্ডির কাছে এক বাংলোতে তিনি গৃহবন্দী রয়েছেন, সরকারি বাংলোয়। তাঁকে নিয়ে আমার মস্ত মাথাব্যথা রয়েছে। এই সংঘর্ষের জন্য কার কী দায়িত্ব—তা নির্ধারণের জন্য আমি একটি যুদ্ধ কমিশন গঠন করেছি। এই কমিশনের ফলাফল দেখার অপেক্ষায় রয়েছি আমি। কমিশনের রিপোর্ট ইয়াহিয়া সম্বন্ধে সিদ্ধান্ত গ্রহণে আমাকে সাহায্য করবে। কমিশন যদি তাকে দোষী সাব্যস্ত করে, তাহলে আমার মনে হয় তার বিচার হবে। যে হার আমাদের হয়েছে, তা ওই ইয়াহিয়ার জন্য। মিসেস গান্ধী যুদ্ধজয়ের জন্য গর্ব করতে পারেন তা ঠিক, কিন্তু সে জন্য ইয়াহিয়া এবং তাঁর অশিক্ষিত অনুচরবর্গদের ধন্যবাদ দেওয়া উচিত। ইয়াহিয়ার সঙ্গে সলা-পরামর্শ করাটা পর্যন্ত অর্থহীন ছিল, তাতে আপনার রাগ আরও বাড়বে।

ঢাকায় তালগোল পাকানোর পর এপ্রিলে তিনি আমাকে ডেকে পাঠান। সে সময় তাঁকে পরিতৃপ্ত দেখাচ্ছিল—আত্মবিশ্বাসে ভরা, যেন অবস্থা তাঁর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, এমন একটা ভাব। আমাকে মদ্যপানের আমন্ত্রণ জানালেন তিনি। তিনি বললেন, ‘রাজনীতিবিদদের আমি একদম শেষ করে দিলাম।’ তারপর তিনি বললেন, এক মুজিব নয়, আমাকে উসকানিদাতা হিসেবে ভাবা হয়েছিল, কারণ আমিও পাকিস্তানের ঐক্যের বিরুদ্ধে কথা বলছিলাম। তোমাকে গ্রেপ্তারের জন্য আমার ওপর সব সময়েই চাপ রয়েছে ভুট্টো, ইয়াহিয়া বললেন। সে কথা শুনে আমি এত রেগে গিয়েছিলাম যে নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলি। তাঁর কথা আমি থোড়াই কেয়ার করি, তার জন্যই তো এই দুর্যোগ নেমে এসেছে। এই কথা বলে হুইস্কির গ্লাস ছুড়ে ফেলে আমি ঘর থেকে বেরিয়ে আসি। এরপর জেনারেল পীরজাদা আমাকে থামালেন, হাত ধরে বললেন, ‘শান্ত হোন, আপনি ফিরে যান।’ আমি ঠান্ডা হয়ে ফিরে আসি। তাঁকে আমি বোঝানোর চেষ্টা করি যে মুজিবের সঙ্গে আমার মস্ত বিভেদ রয়েছে। মুজিব একজন বিচ্ছিন্নতাবাদী, আমি তা নই। কিন্তু সে কথায় কে কান দেয়। ইয়াহিয়া কেবলই মদ খাচ্ছিলেন। তারপর তিনি রীতিমতো খেপে উঠলেন এবং...

ওরিয়ানা ফালাচি: মি. প্রেসিডেন্ট, মার্চের সে ভয়াবহ ঘটনা তা নীতিসম্মত হোক বা না হোক আপনারা কীভাবে সেখানে পৌঁছালেন, তা নিয়ে কিছু বলা যায়?

জুলফিকার আলী ভুট্টো: দেখুন, মার্চের ২৭ তারিখে আমি ঢাকায় আসি মুজিবের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার জন্য। তার সঙ্গে কথা বলতে হলে ঢাকায় তীর্থযাত্রায় যেতে হতো। রাওয়ালপিন্ডি আসার মতো মানহানিকর প্রস্তাবে তার সম্মতি ছিল না। ঠিক সেদিনই আমার বোনের স্বামী মারা যান, তারপরও আমি ঢাকায় গেলাম। লারকানায় আমাদের পারিবারিক গোরস্থানে তার কবর দেওয়ার কথা ছিল। আমার বোন আমার সিদ্ধান্তে ভীষণ অসন্তুষ্ট হয়েছিল। নির্বাচনে মুজিব পূর্ব পাকিস্তানে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছিল, আমি পশ্চিম পাকিস্তানে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করি। কিন্তু তিনি তাঁর ছয় দফা নিয়ে বেঁকে বসলেন। ঢাকায় এসে এসব নিয়ে আলাপ-আলোচনা শুরু হলো।

ইয়াহিয়া খান হুমকি দিয়ে বলেছিলেন, চার মাসের মধ্যে নতুন শাসনতন্ত্র রচিত না হলে আইন পরিষদ ভেঙে দিয়ে তিনি নতুন নির্বাচন আহ্বান করবেন। মুজিবকে সে কথা বোঝানো অসম্ভব ছিল, যার মাথায় কোনো বুদ্ধি নেই, তার কাছ থেকে বুদ্ধি আশা করে কী লাভ। সে কেবলই বলতে থাকল, ‘ছয় দফা, ছয় দফা—আপনি ছয় দফা মানবেন কি না বলুন?’ ছয় দফার প্রথম তিনটি দফা নিয়ে সমঝোতায় আমি তৈরি ছিলাম, কিন্তু চতুর্থ দফায় নয়। সেখানে প্রতিটি প্রদেশকে নিজ ইচ্ছেমতো বৈদেশিক বাণিজ্য ও বিদেশি সাহায্য গ্রহণের অধিকার দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। সে ক্ষেত্রে সার্বভৌমত্বের কী হবে, তার ঐক্যের কী দশা হবে? তা ছাড়া এ কথা তো সবার জানাই ছিল, মুজিব চেয়েছেন পূর্ব পাকিস্তানকে আলাদা করে ফেলতে। সে উদ্দেশ্যে ১৯৬৬ সাল থেকেই ভারতের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে আসছিলেন। জানুয়ারিতে আমাদের আলোচনা বিঘ্নিত হলে তা মার্চে এসে গড়ায়।

মার্চের মাঝামাঝি ইয়াহিয়া খান করাচি এসে আমাকে বললেন, তিনি ঢাকায় যাচ্ছেন। আমিও তাঁর সঙ্গে যাব কি না? হ্যাঁ, আমি বললাম, যদি মুজিব আমার সঙ্গে আলোচনায় রাজি থাকে, তাহলে যাব। ঢাকা থেকে ইয়াহিয়া নিজে আমাকে মুজিবের সম্মতিজ্ঞাপক বার্তা পাঠিয়েছিলেন। ১৯ মার্চ আমি রওনা হই। ২০ তারিখে ইয়াহিয়া এবং ২১ তারিখে ইয়াহিয়া ও মুজিবের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয় আমার। ইয়াহিয়ার সঙ্গে মুজিবের খুব মাখামাখি দেখলাম সেবার। মুজিব বললেন, মি. প্রেসিডেন্ট, আপনার সঙ্গে চুক্তিতে পৌঁছাতেই আমি এখানে এসেছি। কিন্তু ভুট্টোর সঙ্গে আমার কোনো লেনদেন নেই। আমি তথ্যমাধ্যমকে জানাব, আপনার সঙ্গে সাক্ষাৎকারের সময় ভুট্টো আকস্মিকভাবে উপস্থিত ছিলেন। ইয়াহিয়া বললেন, ‘না মুজিব, আপনাকে নিজের হয়ে কথা বলতে হবে।’ মুজিব (বিষয় পাল্টে) বললেন, ঝড়ে অসংখ্য লোক মারা গেছে। মুজিব ওই রকমই। হঠাৎ একেকটা বাক্য তার অসুস্থ মনে যেন গেঁথে থাকে। কী নিয়ে কথা হচ্ছে, তার সঙ্গে কোনো সম্পর্ক না থাকলেও মুজিব সে কথাই ঘুরেফিরে বলতেন। একসময় আমার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেল। ঘূর্ণিঝড়ের জন্য দোষ কি আমার নাকি? ঘূর্ণিঝড় কি আমি পাঠিয়েছি? জবাবে মুজিব উঠে দাঁড়ালেন, বললেন তাঁকে এক জানাজায় যেতে হবে। ওহ্, ওসব কথা মনে করার অর্থ নেই।

ওরিয়ানা ফালাচি: তবু বলুন।

জুলফিকার আলী ভুট্টো: মুজিব সম্বন্ধে সবকিছু এত উদ্ভট যে কী বলব। আমি বুঝি না, পৃথিবীর মানুষ তাকে কীভাবে সিরিয়াসলি নিতে পারে। যাহোক, মুজিবের সঙ্গে সঙ্গে আমিও উঠে দাঁড়ালাম তাকে বিদায় জানাতে, তিনি অবশ্য আমি বিদায় জানাতে আসি তা চাইছিলেন না। বাইরের কক্ষে তখন তিনজন ছিলেন প্রেসিডেন্টের ব্যক্তিগত সহকারী—তাঁর সামরিক সচিব এবং তাঁর সামরিক কসাই জেনারেল ওমর। মুজিব চেঁচানো শুরু করে দিলেন—যান, যান আপনারা এখান থেকে। ভুট্টোর সঙ্গে আমার কথা আছে। তাঁরা তিনজন বেরিয়ে গেলেন। চেয়ারে বসে তিনি বললেন, ভাই, আমাদের একটা মতৈক্যে পৌঁছাতেই হবে। খোদার কসম, আপনাকে মিনতি করছি। বিস্মিত হয়ে আমি তাঁকে কক্ষের বাইরে নিয়ে গেলাম, যাতে আর কেউ আমাদের কথোপকথন না শুনতে পায়। বাইরে এসে উত্তেজিত কণ্ঠে বললেন, আমি পূর্ব পাকিস্তান নেব, আপনি পশ্চিম পাকিস্তান। গোপন সলাপরামর্শ করে সব ব্যবস্থাও তিনি করে রেখেছেন বলে জানালেন মুজিব। সন্ধ্যার পর আমাকে নিয়ে যেতে লোক পাঠাবেন। আমি বললাম, ব্যাপারটা আমার মোটেই ভালো লাগছে না। চোরের মতো কলাগাছের নিচে সাক্ষাৎকারের জন্য আমি ঢাকা আসিনি। দেশভাগ হোক তা আমি চাই না, আর তিনি যদি দেশভাগ চান, তাহলে আইন পরিষদে সে প্রস্তাব তুলতে পারেন। সেখানে তো তার সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছেই। কিন্তু কাকে কী বলব, যেন দেয়ালের সঙ্গে কথা বলা আরকি! আমাদের মুখপাত্রের মাধ্যমে আলাপ চালিয়ে যেতে সম্মত হতে হলো আমাকে। তাই হলো, কিন্তু এসবই ছিল অর্থহীন। সে সময়ে তার মাথা আরও বিগড়ে গিয়েছিল। আর এভাবেই ২৫ মার্চে পৌঁছালাম আমরা।

লোকটা এত অযোগ্য, এত মিথ্যাবাদী, এত সংস্কৃতিহীন এবং নির্বোধ যে আর কী বলব। কোনো সমস্যা সমাধানের কোনো যোগ্যতাই তার নেই, তা সে সমস্যা রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বা সামাজিক যা–ই হোক না কেন!
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব প্রসঙ্গে জুলফিকার আলী ভুট্টো

ওরিয়ানা ফালাচি: ২৫ মার্চে সন্দেহজনক কিছু চোখে পড়েনি আপনার?

জুলফিকার আলী ভুট্টো: হ্যাঁ, একধরনের অস্বস্তি, একধরনের বিচিত্র অনুভূতি জেগেছিল। এর আগে প্রতি সন্ধ্যায় ইয়াহিয়াকে আমি জানিয়ে আসতাম, মুজিবের সঙ্গে আলোচনায় কত দূর অগ্রগতি হয়েছে। ইয়াহিয়ার সেসব কোনো আগ্রহই ছিল না। টিভি প্রোগ্রাম দেখতে না পেয়ে বা তার পছন্দের গান না শুনতে পেয়ে তিনি তখন মহাখ্যাপা। এরপর ২৫ মার্চ সকালে তিনি এমন এক কথা বললেন, যে আমি বিচলিত না হয়ে পারলাম না। মুজিবের সঙ্গে আজ দেখা করার দরকার নেই। কাল তুমি-আমি দুজনেই তাঁর সঙ্গে দেখা করব, ইয়াহিয়া বললেন। ঠিক আছে, আমি বললাম। সেদিন রাত আটটার দিকে মুজিবের প্রতিনিধির সঙ্গে দেখা হলে তাবৎ বিষয় জানালাম। তিনি বললেন, ‘হারামিটা ইতিমধ্যে চলে গেছে।’ আমার সে কথায় বিশ্বাস হলো না। তখন ইয়াহিয়ার সঙ্গে ফোনে কথা বলার চেষ্টা করলাম আমি। আমাকে জানানো হলো, তাকে এখন বিরক্ত করা যাবে না। জেনারেল টিকার সঙ্গে তিনি নৈশাহার করছেন। কোনো একটা চক্রান্ত চলছে, এ কথা ভাবতে ভাবতে আমি রাতের খাবার খেতে গেলাম। তারপর ঘুম। গোলাগুলির শব্দে পরে আমি জেগে উঠি। আমি দৌড়ে জানালার কাছে গেলাম। খোদার কসম বলছি, যা দেখলাম তাতে চোখে পানি চলে এল। আমি কেঁদে ফেললাম, বললাম, খোদা, দেশটা আমার শেষ হয়ে গেল।

ওরিয়ানা ফালাচি: কেন? জানালা দিয়ে আপনি কী দেখলেন?

জুলফিকার আলী ভুট্টো: বেপরোয়া গুলিগোলা আমি দেখিনি, তবে সৈনিকেরা সে সময় দি পিপল পত্রিকার অফিস তছনছ করছিল। ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলের সামনে ওই পত্রিকার অফিস ছিল। লাউড স্পিকারে তারা সবাইকে সরে যেতে বলছিল, যারা বাইরে বেরুচ্ছিল তাদের বন্দুকের ভয় দেখিয়ে এক কোনায় জড়ো করা হচ্ছিল। অন্যদিকে মেশিনগান ধরে রেখে ফুটপাতের ওপর দাঁড় করানো হচ্ছিল। আর হোটেলের চারদিকে তখন ট্যাঙ্কের পাহারা। যারা সেখানে আশ্রয় নেওয়ার চেষ্টা করছিল, সৈনিকেরা তাদের গ্রেপ্তার করছিল। ব্যস, ওই পর্যন্তই। পরদিন সকাল আটটায় আমি জানলাম, মুজিবকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সেটা অবশ্য আমার ঢাকা ছাড়ার পরের কথা। তখন আমার কী মনে হয়েছিল জানেন? ভেবে আশ্বস্ত হয়েছিলাম যে তিনি এখনো বেঁচে আছেন, এ–ও ভেবেছিলাম হয়তো তার সঙ্গে খানিক দুর্ব্যবহার করা হয়েছে। ভাবলাম, তার গ্রেপ্তারের ফলে এখন সমঝোতায় পৌঁছানো যাবে। এক বা দুই মাসের বেশি তাকে নিশ্চয় জেলে রাখা হবে না, আর সে সময়ের মধ্যেই আইনশৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা যাবে।

ওরিয়ানা ফালাচি: মি. প্রেসিডেন্ট, মুজিব আপনাকে বললেন পূর্ব পাকিস্তান আমার, পশ্চিম পাকিস্তান আপনার। শেষ পর্যন্ত তাই হলো; এ জন্য কি শেখ মুজিবকে আপনি ঘৃণা করেন?

জুলফিকার আলী ভুট্টো: না, মোটেই না। আমি এ কথা ভারতীয়দের মতো কপটতা করে বলছি না। আমি আন্তরিকভাবেই এ কথা বলছি, কারণ ঘৃণার বদলে তার জন্য আমার রয়েছে সহানুভূতি। লোকটা এত অযোগ্য, এত মিথ্যাবাদী, এত সংস্কৃতিহীন এবং নির্বোধ যে আর কী বলব। কোনো সমস্যা সমাধানের কোনো যোগ্যতাই তার নেই, তা সে সমস্যা রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বা সামাজিক যা–ই হোক না কেন! ও কেবল পারে চেঁচাতে আর আমি কী হনু ভাব দেখাতে। ১৯৫৪ থেকে লোকটাকে আমি চিনি, ওকে কখনোই সিরিয়াসলি আমি নিইনি। গোড়া থেকেই আমি বুঝি, এই লোকটার কোনো গভীরতা নেই, কোনো প্রস্তুতি নেই। পারত কেবল উত্তেজনা সৃষ্টি করতে, নাক দিয়ে আগুন ঝরাতে, কিন্তু কোনো সুস্থ চিন্তাই তার মাথায় আসত না। একমাত্র যে ভাবনা তার মাথায় ছিল—তা হলো বিচ্ছিন্নতার ভাবনা। এমন একজন লোক সম্বন্ধে অনুকম্পা ছাড়া আর কী অনুভূতি হবে, বলুন?

১৯৬৯ সালে আমি ঢাকা সফরকালে তাকে আবার দেখি। আমার হোটেলের লবিতে তার সঙ্গে দেখা। আমি গিয়ে বললাম, হ্যালো মুজিব, চলুন না চা খাওয়া যাক। তখন সে মাত্র জেল থেকে বেরিয়েছে, মহা খেপে আছে সে। কোনো রকম হেল্লা (হেলাফেলা) ছাড়া আলাপ হলো আমাদের। তিনি বললেন, পশ্চিম পাকিস্তান পূর্ব পাকিস্তানকে শোষণ করছে, কলোনির মতো ব্যবহার করছে, তার রক্ত চুষে নিচ্ছে। কথাটা ঠিকই ছিল। এক বইতে এ কথা আমি নিজেই লিখেছি। কিন্তু মুজিবের পক্ষে কোনো সিদ্ধান্তে আসা সম্ভব ছিল না। এ কথা সে বোঝেনি যে এই অসাম্যের কারণ ছিল অর্থনৈতিক এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থা। সমাজতন্ত্র ও ন্যায়বিচারের জন্য সংগ্রামের কোনো কথাও সে বলেনি। বরং সে বলেছিল, সংগ্রামের জন্য দেশের মানুষ তখনো প্রস্তুত নয়। সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধাচরণ করতেও রাজি হবে না তারা। লোকটার কোনো সাহস ছিল না। কখনোই না। সাংবাদিকদের সঙ্গে মুজিব সত্যি নিজেকে বাংলার বাঘ বলে পরিচয় দেয় নাকি?

ওরিয়ানা ফালাচি: মুজিব (আমাকে) বলেছেন, তাঁর বিচারের সময় তিনি আত্মপক্ষ সমর্থনে অস্বীকার করেন। গ্রেপ্তারের পর তাঁর নিজের ব্যবহার ছিল সাহসিকতাপূর্ণ, এ কথাও বলেছেন। যে সেলে তিনি বন্দী ছিলেন, সেখানে লেপ-তোশক পর্যন্ত ছিল না।

জুলফিকার আলী ভুট্টো: সব বাজে কথা। মুজিবকে কোনো সেলেই রাখা হয়নি, গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বন্দীদের জন্য নির্ধারিত একটি অ্যাপার্টমেন্টে তাঁকে রাখা হয়েছিল। মিয়ানওয়ালির কাছে পাঞ্জাবের লায়ালপুরে। এ কথা ঠিক, রেডিও শোনা বা পত্রপত্রিকা পড়ার সুযোগ তার ছিল না। কিন্তু পাঞ্জাব গভর্নরের পুরো লাইব্রেরি তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল। বেশ চমৎকারই ছিলেন তিনি। একপর্যায়ে তাঁকে একজন বাঙালি পাচক পর্যন্ত দেওয়া হয়েছিল, কারণ বাঙালি রান্না খাওয়ার শখ হয়েছিল তাঁর। বিচারের সময় তিনি নিজেকে আত্মপক্ষ সমর্থন করেছিলেন, আর তা–ও কী প্রবলভাবে। এ ছাড়া তিনি কামাল হোসেন এবং এ কে ব্রোহি—এই দুজন নামজাদা আইনীবীকে চেয়েছিলেন। কামাল হোসেন তখন জেলে, কিন্তু ব্রোহি নয়। আর ব্রোহিকে পাওয়া মানে একদম সব সেরা আইনজ্ঞকে পাওয়া। শুনুন, ব্রোহি প্রথমে এই কেস নিতে চায়নি, কিন্তু ইয়াহিয়া তাঁকে বাধ্য করেন। ব্রোহি পরে তার চারজন সহকারী নিয়ে আদালতে হাজিরা দেয়। এদের খরচ পুরোটাই সরকারকে বহন করতে হয়। সেই বিচারে সরকারের মোটা অর্থ খরচ হয়। তবে ব্রোহিকে নিয়ে একটা সমস্যা আছে, তা হলো ও বড় বাচাল। প্রতিবার লায়ালপুর থেকে করাচি ফিরে এসে সে হড়হড় করে মুজিবের সঙ্গে তার কী কথাবার্তা হয়েছে তা বলে দিত। তার কথায় মুজিবকে দোষী সাব্যস্ত করা খুব কঠিন হবে। মুজিব পাকিস্তানের ঐক্যের বিপক্ষে নন। ইয়াহিয়ার প্রতি তাঁর আনুগত্য বিষয়েও সব চমৎকার যুক্তি সাজিয়ে নিয়েছিলেন। মুজিব এ কথা সব সময়ই বলতেন যে ইয়াহিয়া একজন চমৎকার মানুষ, একজন দেশপ্রেমিক আর যত দোষ তা হচ্ছে আমার। তাঁর গ্রেপ্তারের জন্য আমিই দায়ী। জেনারেল পীরজাদা নিজে আমাকে এ কথা জানিয়েছেন। পীরজাদাকে আমি বলেছিলাম, মুজিবকে আমার কাছে ছেড়ে দিয়ে দেখুন, সে আমাকেও মহান দেশপ্রেমিক বানিয়ে ছাড়বে, আর আপনাকে যা তা বলবে। এই হলো ব্যাপার।

ওরিয়ানা ফালাচি: কিন্তু তাঁকে তো দোষী সাব্যস্ত করা হয় ও জেলে পাঠানো হয়?

জুলফিকার আলী ভুট্টো: না। স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল তাকে দোষী সাব্যস্ত করে, কিন্তু এর পরের যা কিছু তা ছিল ইয়াহিয়ার হাতে। পাঁচ বছর থেকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড, এর যেকোনোটিই তাকে তিনি দিতে পারতেন। ইয়াহিয়া কিছুই করেননি। এদিকে যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল। আর তখন বাধ্য হয়ে অন্যদিকে নজর দিতে হলো।

ওরিয়ানা ফালাচি: মুজিব আমাকে বলেছেন, তাঁর জন্য কবর খোঁড়া হয়েছিল।

জুলফিকার আলী ভুট্টো: কেমন সে কবর, তা তুমি জানো? বোমা থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য একটা শেল্টার। জেলখানার চারদিকেই শেল্টার খোঁড়া হয়েছিল। বেচারা মুজিব। আস্ত ভিতু, সবকিছুতেই তার মারা যাওয়ার দুচিন্তা। আমার মনে হয় না ইয়াহিয়া তাকে মেরে ফেলার কথা ভাবছিলেন। ডিসেম্বরের ২৭ তারিখে প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেওয়ার পর ইয়াহিয়ার সঙ্গে আমার দেখা হয়। তখন তাকে বেপরোয়া মাতাল দেখাচ্ছিল, ঠিক যেন ‘পোর্ট্রেট অব ডোরিয়ান গ্রে’। তিনি বলেছিলেন, ‘আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল মুজিবকে হত্যা না করা। চাইলে এ কাজটি তুমি শেষ করে ফেলো।’

ওরিয়ানা ফালাচি: তো, আপনি কী ভেবেছিলেন এ ব্যাপারে?

জুলফিকার আলী ভুট্টো: আমি দ্বিমত করেছিলাম, পরে ভাবনাচিন্তা করে মুজিবকে ছেড়ে দিতে প্রস্তুত হই। পৃথিবীর লোকের কাছে কথিত গণহত্যার জন্য নিন্দিত হওয়ার পর পাকিস্তানের দরকার ছিল যেকোনো রকম সহানুভূতির। আমি ভেবেছিলাম, মুজিবকে ক্ষমা করলে সে সহানুভূতি পাওয়া যাবে। তা ছাড়া এর ফলে আমাদের সামরিক বন্দীদের ভারত থেকে প্রত্যাবর্তন ত্বরান্বিত হবে বলেও ভেবেছিলাম আমি। এক জরুরি নির্দেশে আমি মুজিবকে লায়ালপুর থেকে রাওয়ালপিন্ডি নিয়ে আসতে বললাম। সে নির্দেশ দেখে মুজিব তো ভয়ে অস্থির। ভাবল, এবার বুঝি তাকে ফাঁসি দেওয়া হবে। যাত্রাপথে বা এমনকি তাকে দেওয়া বাংলোতে ঢোকার পরেও তার অস্থিরতা কমেনি। গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের জন্য চমৎকার বাংলো ছিল সেটি। আমি যখন রেডিও, টিভি সেট ও কাপড়চোপড় নিয়ে তার সঙ্গে দেখা করতে এলাম, সে খেপে উঠে জিজ্ঞেস করল, তুমি এখানে কী করছ? আমি বুঝিয়ে বললাম, এখন আমি দেশের প্রেসিডেন্ট। অমনি মুজিব তার গলার স্বর বদলে ফেলল। আমার গলা জড়িয়ে ধরে বলল, এমন চমৎকার সংবাদ সে জীবনে শোনেনি। খোদা যেন আমাকে বারবারই পাঠাচ্ছে তাকে মুক্ত করতে। (এর আগেও একবার আমি তাকে ছাড়িয়ে এনেছিলাম।) আর তারপরই আমি যেমন ভেবেছিলাম তাই হলো। মুজিব ইয়াহিয়াকে অকথ্য ভাষায় গালাগালি শুরু করল। একফাঁকে জিজ্ঞেস করল, আমি তাকে মুক্তি দিতে পারি কি না। লন্ডন হয়ে ঢাকা যাওয়ার আগে তার সঙ্গে আরও বার দুয়েক আমার দেখা হয়। প্রতিবার সে কোরআন বের করে শপথ করেছে—পশ্চিম পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখবে। ভোর তিনটার সময় যখন তাকে বিদায় জানাতে গিয়েছি, মুজিব তখনো সেই শপথ পুনরাবৃত্তি করে আমার সঙ্গে কোলাকুলি করে। আমাকে ধন্যবাদ জানান, তার আমৃত্যু কৃতজ্ঞতার কথা জানান, বলেন, মি. প্রেসিডেন্ট, শিগগিরই ফিরে আসব। আপনার সুন্দর দেশকে আমি আরও ভালোভাবে জানতে চাই।

ওরিয়ানা ফালাচি: মুজিবকে মুক্তি দেওয়ায় আপনি কি এখন অনুতপ্ত?

জুলফিকার আলী ভুট্টো: না, মোটেই না। মুজিব যা–ই বলুক, সে আমার মতোই একজন পাকিস্তানি। আমরা দুজনে বারবার একই অভিযোগের মুখোমুখি হয়েছি। এসব তর্কবিতর্কের মধ্যে তাই রয়েছে আমাদের গভীর বন্ধন। আমি কখনো ভুলব না জানুয়ারির সেদিনের ঘটনা, যেদিন মুজিব আমার হাত ধরে মিনতি করে বলেছিলেন, আমাকে রক্ষা করুন, প্লিজ। তার জন্য আমার করুণা হয়। বেচারা মুজিব। দীর্ঘদিন টিকে থাকতে পারবে না ও। আট মাস, বড়জোর এক বছর। তারপর বিশৃঙ্খলার আবর্তে তলিয়ে যাবে সে।

সত্যি কথাটা হলো, বাংলাদেশ আজ ভারতের এক স্যাটেলাইট রাজ্য ছাড়া আর কিছু নয়। খুব শিগগির তা রাশিয়ার স্যাটেলাইটে পরিণত হবে। কিন্তু সমস্যা হলো, মুজিব তো কমিউনিস্ট নয়। যদিও সবকিছু ঠিকঠাক চালাতে পারে, তবে তার সম্ভাবনা অবশ্য খুবই কম, দেখবেন, মাওবাদীরাও তার ঘাড়ে চড়ে বসবে। এই যুদ্ধে মাওবাদীরাই হচ্ছে আসল বিজয়ী শক্তি। তারা এর মধ্যে মুজিবের ঘাড়ে চড়ে বসেছে। রাজনৈতিকভাবে মুক্তিবাহিনীর কোনো গুরুত্ব নেই। তাদের কোনো আদর্শগত প্রস্তুতি বা অঙ্গীকার নেই, কোনো শৃঙ্খলা নেই। সামাজিকভাবে বলতে গেলে তারা সমস্যা ছাড়া আর কিছু নয়। তারা কেবল জানে বাতাসে গোলা ছুড়তে, লোকজনকে ভয় দেখাতে, চুরি করতে আর ‘জয় বাংলা’ বলে চেঁচাতে। শুধু ‘জয় বাংলা’ বলে চেঁচিয়ে তো আর দেশ শাসন করা যায় না। অন্যদিকে, বাঙালি মাওবাদীরা—তারাও যে খুব পরিশীলিত তা নয়—অবশ্যই মাও-এর রেড বুক কিছু কিছু পড়েছে। তবে হ্যাঁ, তারা অনেক বেশি আর্টিকুলেট গ্রুপ। ভারতকে নিজেদের ব্যবহার করতে তারা দেবে না। তারা পাকিস্তানের ঐক্যের বিরোধী, তা–ও আমার মনে হয় না। একসময় ঢাকা তাদের দিকেই ঘুরবে। হায় খোদা! এ রকম জটিল ও ভয়াবহ সমস্যার সমাধানের জন্য দরকার একজন মহাপ্রতিভাবান নেতার। সেখানে মুজিব! এরপর দেশটা যে পরিমাণ অভাগা! ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, ঝড় ইত্যাদি তো লেগেই আছে। বলা যায়, ভাগ্যটাই খারাপ দেশটার। সারা পৃথিবীর তলানিতে রয়েছে দেশটি। ১৯৪৭ বা ১৯৫৪–তে আপনি ঢাকা দেখলে বুঝতেন। যেন নোংরা গ্রাম একটা, ভালো রাস্তাঘাট পর্যন্ত নেই। এখন সেসবও গেছে মুক্তিবাহিনীর তেজোদীপ্ত কাজকর্মে। বাংলাদেশ...।

আমিও তাদের স্বীকৃতি দিতে প্রস্তুত, তবে তার আগে ভারত থেকে আমাদের যুদ্ধবন্দীদের ফেরত দিতে হবে, বিহারি গণহত্যা বন্ধ করতে হবে, পাকিস্তানের সঙ্গে ঐক্যপন্থীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়ার নিশ্চয়তা দিতে হবে।
বাংলাদেশকে স্বীকৃত দেওয়া প্রসঙ্গে জুলফিকার আলী ভুট্টো

ওরিয়ানা ফালাচি: আমি বিস্মিত হচ্ছি, আপনি বাংলাদেশ বলছেন।

জুলফিকার আলী ভুট্টো: ক্রোধ ও ঘৃণার সঙ্গে এ কথা বলছি আমি। আমার কাছে দেশটি এখনো পূর্ব পাকিস্তান। ৫০টির মতো দেশ তাকে স্বীকৃতি দিয়েছে, এ কথা আমাকে মানতে হবে। আমিও তাদের স্বীকৃতি দিতে প্রস্তুত, তবে তার আগে ভারত থেকে আমাদের যুদ্ধবন্দীদের ফেরত দিতে হবে, বিহারি গণহত্যা বন্ধ করতে হবে, পাকিস্তানের সঙ্গে ঐক্যপন্থীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়ার নিশ্চয়তা দিতে হবে। ফেডারেশন হিসেবে আমাদের যদি পুনরায় ঐক্য প্রতিষ্ঠা করতে হয়, তাহলে সবার আগে দরকার কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা। আমার বিশ্বাস, তাহলে আগামী ১০-১৫ বছরে পাকিস্তান এবং বাংলাদেশ একটি ফেডারেশন হিসেবে ঐক্যবদ্ধ হবে। তাই হওয়া উচিত। তা না হলে যে শূন্যতার সৃষ্টি হবে, তা পূরণ হবে কী দিয়ে? এদিকে পশ্চিম বাংলা ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন হতে চায়। পূর্ব ও পশ্চিম বাংলার মানুষের মধ্যে কোনো মিলই নেই। অন্যদিকে আমাদের সঙ্গে পূর্ব বাংলার বাঙালিদের ধর্মের দিক দিয়ে ঐক্য রয়েছে। প্রকৃতপক্ষে ১৯৪৭-এর দেশভাগ একটি সঠিক পদক্ষেপ ছিল।

ওরিয়ানা ফালাচি: সঠিক? এক দেশের দুই অংশ দুই হাজার মাইল দূরত্বে আর তার মাঝখানে ভারত। তারপরও সঠিক?

জুলফিকার আলী ভুট্টো: ২৫ বছর ধরে ওই দুটি অংশ একসঙ্গে টিকে ছিল, সব ভুলভ্রান্তি সত্ত্বেও। রাষ্ট্র তো কেবল ভৌগোলিক বা সীমানানির্ভর ধারণা নয়। যখন জাতীয় পতাকা, জাতীয় সংগীত ও ধর্ম অভিন্ন, তখন দূরত্ব কোনো সমস্যা নয়। মোগলরা যখন ভারতকে সংযুক্ত করে, এ দেশের মুসলমানরা তখন এক অংশ থেকে অন্য অংশে যেতে মোটে ১০০ দিন নিয়েছিল।

আর এখন আমাদের প্রয়োজন বড়জোর দুই ঘণ্টার বিমানযাত্রা। ব্যাপারটা এখন বুঝতে পারছ তো?

[সাক্ষাৎকারের পরবর্তী অংশ ভারত এবং ইন্দিরা গান্ধীকে নিয়ে। এখানে তার ভাষান্তর সম্ভবত অবান্তর হবে। তবে ভুট্টোর মতিভ্রম, তার ফাঁপানো বেলুনের মতো ইগো এবং পর্বতপ্রমাণ মূর্খতার সঙ্গে পরিচিত হতে হলে এর পুরোটাই পড়া উচিত। দেখুন: ইন্টারভিউ উইথ হিস্ট্রি, ওরিয়ানা ফালাচি, হটন মিফলিন কোম্পানি, বস্টন, ১৯৭৬।]