বাউলেরা খুব বড় সামাজিক শক্তি

গবেষক আবুল আহসান চৌধুরীর এ সাক্ষাৎকার নেওয়া হয় মূলত ২০০৭ সালে প্রকাশিত তাঁর লালন সাঁইয়ের সন্ধানে বইটিকে কেন্দ্র করে। তবে কথোপকথনে বইটিকে ছাড়িয়ে লালন বিষয়ে আরও নানা প্রসঙ্গ উঠে আসে। সাক্ষাৎকারটি ২০০৮ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি প্রথম আলোর ‘সাহিত্য সাময়িকী’তে সংক্ষিপ্ত আকারে ছাপা হয়েছিল। ফিরোজ এহতেশামের নেওয়া সাক্ষাৎকারটি এত দিন ছিল শুধু কাগজের পাতাজুড়ে। আজ লালন ফকিরের ১৩৬তম তিরোধান দিবস উপলক্ষে সাক্ষাৎকারটির পূর্ণাঙ্গ রূপ অনলাইন পাঠকের জন্য তুলে ধরা হলো।

আবুল আহসান চৌধুরীর প্রতিকৃতি ও তাঁর বই ‘লালন সাঁইয়ের সন্ধানে’র প্রচ্ছদ অবলম্বনে গ্রাফিকস: প্রথম আলো

ফিরোজ এহতেশাম: আপনার লালন সাঁইয়ের সন্ধানে বইটির ভূমিকায় আপনি লিখেছেন, লালন নিয়ে আপনার গবেষণার বয়স ৩২ বছরের বেশি। লালন বিষয়ে আপনার কখন ও কেন আগ্রহ জন্মাল?

আবুল আহসান চৌধুরী: আমার জন্ম লালন সাঁইয়ের আখড়া ছেঁউড়িয়ার খুব কাছেই। সেই সূত্রে আমি ছোটবেলা থেকে লালনের আখড়ায় মাঝেমধ্যে যেতাম। ওখানে গিয়ে বাউলদের গান শুনতাম। আর এক-দুইজন বাউলের কাছে সাধারণভাবে ওনাদের কথা জানতে চাইতাম। লালন ও পরবর্তীকালের বাউল সম্পর্কে আমাকে প্রথম অনেক তথ্য দেন সেই সময়ের লালন আখড়ার খাদেম বা সেবায়েত ফকির বেল্লাল শাহ। তাঁর কাছ থেকে আমি অনেক গানও সংগ্রহ করি। পাশাপাশি লালনের এক উৎসবে আমার সঙ্গে আলাপ হয় ভেড়ামারার এক প্রত্যন্ত গ্রামের বাউল সাধক ফকির আজিম শাহের। আজিম শাহ নানা অঞ্চল থেকে আমাকে লালন ও অন্য বাউলদের গান ও জীবনী সংগ্রহ করে দেন। এরপর ছেঁউড়িয়ার লালন-আখড়াতেই আমি প্রথম দেখি অধ্যাপক মুহম্মদ মনসুর উদ্দীনকে। তাঁর লালনের গান সংগ্রহের কথা জানতাম। হারামনির একটি-দুটি খণ্ডও তখন আমার হাতে এসেছে। তিনি আমাকে নানা বাউলের গান সংগ্রহ করে দিতে বলতেন। কিছু কিছু আমি তাঁকে সংগ্রহ করেও দিয়েছি। মূলত এই বাউলদের সান্নিধ্যে এসে এবং মনসুর উদ্দীনের প্রেরণায় লালন সম্পর্কে আমার আগ্রহ জাগে। ১৯৭৪ সালে লালন সাঁইয়ের জন্মের ২০০ বছর পূর্ণ হয়। সে উপলক্ষে আমি লালন সম্পর্কে প্রকাশিত বেশ কিছু দুষ্প্রাপ্য লেখাসহ একটি স্মারক গ্রন্থের পরিকল্পনা করি। আমার বিরল সৌভাগ্য যে বইটি বাংলাদেশ জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র প্রকাশ করে। আমি অত্যন্ত কৃতজ্ঞ জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের সেই সময়ের পরিচালক কথাশিল্পী সরদার জয়েন উদ্দিন ও উপপরিচালক কবি কায়সুল হকের কাছে। বইটি কবি অন্নদাশঙ্কর রায়কে পাঠালে তিনি ওই বছরের শারদীয় আনন্দবাজারে এই বই সম্পর্কে একটি খুব বড় আলোচনা করেন, প্রবন্ধের আকারে। এ ঘটনাও আমাকে অত্যন্ত অনুপ্রাণিত করেছিল। আরেকটি বিষয়, ওই ১৯৭৪ সালেই লালন ও আরও ৫৫ বাউলের জীবনী ও গান নিয়ে আমার একটি বই প্রকাশিত হয় কুষ্টিয়ার বাউল সাধক নামে। এ বইয়ের ভূমিকা লিখে দেন আমার শিক্ষক ড. আহমদ শরিফ এবং আশীর্বাণী লিখেছিলেন অন্নদাশঙ্কর রায়। আমি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের ছাত্র। লালন ও বাউল পদাবলী আমাদের পাঠ্য ছিল। আমাদের শিক্ষকেরা এ বিষয়ে পড়াতে গিয়ে আমার বই দুটির কথাও উল্লেখ করতেন আমার উপস্থিতিতেই। এটিও আমার আরেকটি উৎসাহ ও প্রেরণার বিষয়। এভাবেই লালনের টানে আমি দীর্ঘকাল ধরে তাঁর গান সংগ্রহ এবং তাঁর গান সম্পর্কে আলোচনা করে আসছি। এ পর্যন্ত লালন ও তাঁর অনুষঙ্গী বিষয়ে দেশ ও দেশের বাইরে থেকে আমার আটটি বই বেরিয়েছে।

ফিরোজ এহতেশাম: লালন সম্পর্কে গবেষক হিসেবে আপনার মূল্যায়ন কী? আপনার জীবনকে লালন কীভাবে প্রভাবিত করেছে?

আবুল আহসান চৌধুরী: লালন সম্পর্কে ভাবতে গেলে আমি খুব বিস্মিত হই। ২০০ বছর আগে তিনি জন্মেছিলন এক অজপাড়াগাঁয়ে। প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়ার কোনো সুযোগ তাঁর ছিল না। কিন্তু তিনি যে গান রচনা করেছেন, সেই গানের ভাব-ভাষা-ভাবনা, ছন্দ-অলংকার-উপমা-উৎপ্রেক্ষা ও সুর তিনি যে একজন নিরক্ষর গ্রাম্য সাধক, সে কথা ভুলিয়ে দেয়। রবীন্দ্রনাথের মতন মানুষকেও তিনি প্রভাবিত করেছেন। যাঁরা ইতিহাস চর্চা করেন, তাঁদের মধ্যেও কেউ কেউ লালনকে রাজা রামমোহন রায়ের সঙ্গে তুলনা করে থাকেন। তাঁরা বলেন, রামমোহন নাগরিক জীবনে যে নবজাগরণ এনেছিলেন, ঠিক একই কাজ গ্রামীণ সমাজে করেছিলেন লালন ফকির। লালনের গানের সঙ্গে অন্যান্য বাউলের গানের তুলনা করলে দেখা যায়, অন্যদের গান কেবলই সাধনার অনুষঙ্গে রচিত। তাঁদের গান বাউল সাধনার ভাষ্যমাত্র। এতে সাধারণত কোনো বৈচিত্র্য কিংবা শিল্পগুণ পাওয়া যায় না। কিন্তু লালন তাঁর গানে সাধনার বিষয় ছাড়াও সামাজিক দায় ও কর্তব্যবোধ থেকে এবং সমকালীন সমাজের কুসংস্কার ও কুপ্রথার বিরুদ্ধে, জাতপাত, সাম্প্রদায়িকতা, মৌলবাদ—এসবের বিরুদ্ধে গান বেঁধেছেন। তিনি নিজে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মে বিশ্বাসী ছিলেন না, কোনো শাস্ত্র মানতেন না, কোনো জাত বা ধর্মের গণ্ডিতে নিজেকে আবদ্ধ রাখতে চাননি। তাই তিনি তাঁর এক গানে বলেছেন, ‘জাত না গেলে পাইনে হরি/কী ছার জাতের গৌরব করি/ছুঁসনে বলিয়ে।/লালন কয়, জাত গাতে পেলে পোড়াতাম আগুন দিয়ে।’ তিনি নিজে হিন্দু না মুসলমান, এ ধরনের প্রশ্নের মুখোমুখি বারবার হয়েছেন। তিনি এসব প্রশ্নের জবাবে সরাসরি তাঁর গানে বলেছেন, ‘সব লোকে কয় লালন কী জাত সংসারে/লালন বলে, জেতের কী রূপ দেখলাম না এই নজরে।’ এমনই আরও অনেক উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে, যার ভেতরে লালনের উদার মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় আছে। তিনি ছিলেন বিশুদ্ধ, অসাম্প্রদায়িক, মুক্তবুদ্ধির মানুষ। তিনি মানবগুরুকেই তাঁর ঈশ্বর বলে মানতেন। তাঁর গানে বারবার সেই কথাই বলেছেন। আবার ইহজাগতিকতার প্রতিও তাঁর পক্ষপাত আমরা দেখি তাঁর গানে। যেমন, ‘এমন মানবজনম আর কী হবে/মন যা করো ত্বরাই করো এই ভবে।’

আবুল আহসান চৌধুরীর ‘লালন সাঁইয়ের সন্ধানে’ বইয়ের প্রচ্ছদ
লালন নিজেই বলেছেন তাঁর গানে, ‘কুতর্কের দোকান খুলিসনে আর’। আমি আগেই বলেছি যে লালন কোন সম্প্রদায়ের মানুষ ছিলেন, এটি বড় তুচ্ছ কথা। লালন কী বলেছিলেন, সেটিই হচ্ছে বড় কথা। সে কারণে যাঁরা লালনকে সাম্প্রদায়িক ভেদবুদ্ধি দিয়ে বুঝতে চান বা বিরোধিতা করতে চান বা লালনকে সুফি-দরবেশ বানাতে চান কিংবা খাঁটি বৈষ্ণব বানাতে চান, এসব কিছুর বিরুদ্ধেই আমার তীব্র প্রতিবাদ। কেননা, লালন এসব কিছুই ছিলেন না।

লালনের শিল্পবোধ এত উচ্চাঙ্গের ছিল যে রবীন্দ্রনাথ ছন্দ সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে লালনের নিটল ছন্দের প্রশংসা করেছেন। লালনের শব্দ ব্যবহারে একটা ভিন্ন বৈশিষ্ট্য লক্ষ করা যায়। হিন্দু ও মুসলমানের ভেতর যে বিভেদ আছে, শব্দ ব্যবহারের ক্ষেত্রেও লালন সেই বিভেদ অগ্রাহ্য করেছেন তাঁর গানে। দৃষ্টান্ত দিয়ে বলা যায়, তাঁর একটি গানে আছে, ‘পেয়েছি এক ভাঙা নৌকা, জনম গেল সেচতে পানি’। আবার তাঁর আরেকটি গানে তিনি বলছেন, ‘মাটি কি পবন জল কি হুতাশন’। তাহলে আমরা লক্ষ করছি যে মুসলমানের ব্যবহৃত ‘পানি’ এবং হিন্দুর ব্যবহৃত ‘জল’কে তিনি এক পাত্রে রেখেছেন। তাই উনিশ শতকের যে প্রধান সামাজিক সমস্যা ছিল হিন্দু মুসলমানের বিরোধ, তা নিরসনেও লালনের চিন্তাচেতনা কাজ করেছিল। আরও বিস্ময়ের বিষয়, এই আত্মনিমগ্ন, সংসারনিস্পৃহ ভোলা বাউল তাঁর সামাজিক কর্তব্য পালন করতে গিয়ে তাঁর বিপন্ন বন্ধু গ্রামবার্তা প্রকাশিকার সম্পাদক কাঙাল হরিনাথ মজুমদার যখন প্রজাপীড়নের সংবাদ প্রকাশ করতে গিয়ে শিলাইদহের ঠাকুর-জমিদারদের কোপানলে পড়েন, তখন জমিদারের লেলিয়ে দেওয়া লাঠিয়ালদের বিরুদ্ধে লালন তাঁর শিষ্যদের নিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন। এই যে নানাভাবে লালনকে আমরা দেখি, এর ভেতর দিয়ে একজন বহুমাত্রিক, অনন্যসাধারণ, সমাজমনস্ক সাধক বাউলকে আবিষ্কার করা যায়। আমি সেভাবেই লালনকে মূল্যায়ন করি। আরেকটি কথা এখানে বলার আছে, লালন যে বিরুদ্ধ পরিবেশে জন্ম নিয়েছিলেন, যে প্রতিকূলতা তাঁর সামনে ছিল, তিনি তা অতিক্রম করার চেষ্টা করেছেন তাঁর গানে ও সাধনায়। কিন্তু মৌলবাদী, সাম্প্রদায়িক, শাস্ত্র ও ধর্মধ্বজী মানুষেরা তাঁর ও তাঁর অনুসারীদের ওপর নির্যাতন-নিগ্রহ চালিয়েছে। লালন ও তাঁর সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে হিন্দু-মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের তরফ থেকেই আঘাত এসেছে, জারি হয়েছে বাউল ধ্বংস ফতোয়া কিংবা রদ্দে নাড়া। হিন্দুদের পক্ষ থেকে লিখিত হয়েছে পাষণ্ড পীড়ন; এখানেও বাউল সাধনা ও লালন সম্প্রদায়কে অভিযুক্ত ও নিন্দা করা হয়েছে। লালনের ধর্ম ছিল মানুষের ধর্ম। রবীন্দ্রনাথ তাঁর ভেতরে যে আদর্শ লালন করতেন, তা অনেকাংশে বাউলদের মত ও আদর্শের সঙ্গে মিলে যায়। লালন ছিলেন মহৎ জীবনের অভিসারের যাত্রী। কিন্তু এই বিরুদ্ধ সমাজে তিনি নিজেকে বিকশিত করতে পারেননি বলে তাঁর অন্তরে অতৃপ্তির বেদনা ছিল। তাঁর গানে পাওয়া যায়, ‘এ দেশেতে এই সুখ হলো আবার কোথা যায় না জানি’। আরেকটি গানে তিনি বলছেন, ‘সাঁই আমারে রাখলেন কূপজল করে আন্ধেলা পুকুরে। কবে হবে সজল বরষা, রেখেছি মন সেই ভরসা’। এ থেকে আমরা বুঝি, যার বেগবান নদী হওয়ার কথা ছিল, তরঙ্গসংকুল স্রোতস্বতী হওয়ার কথা ছিল, সে কিনা হয়ে রইল বদ্ধ জলাশয়। এই আফসোস, এই হাহাকার লালনকে আত্মজিজ্ঞাসার মুখোমুখি করেছিল। লালনকে নিয়ে কুটতর্কে আমরা মেতে উঠেছি। কোথায় তাঁর জন্ম, কী তাঁর ধর্ম—এ নিয়ে আমাদের তর্ক ও বিবাদ। কিন্তু এসব তুচ্ছ। লালন সব সম্প্রদায় ও ধর্মের ঊর্ধ্বে উঠেছিলেন। লালন মানুষ হতে চেয়েছিলেন, বিশুদ্ধ মানুষ, যে মানুষ কল্যাণের পথে, প্রেমের পথে, শুভ চেতনার পথে ভিন্ন ধর্ম ও শাস্ত্রের অনুসারীকেও আলিঙ্গন করতে পারেন। তাই আজ আমরা লক্ষ করি যে কেবল বাংলাভাষী অঞ্চল নয়, বিদেশেও লালনের এ আদর্শ, লালনের এ বাণী সমাদর পাচ্ছে। বিদেশে লালনকে নিয়ে ভালো ভালো কাজ হচ্ছে।

লালন আমার জীবনকে এতটাই প্রভাবিত করেছেন যে আমি যখন লালনের গান শুনি, একই গান বারবার শুনি, প্রতিবার একটা নতুন তাৎপর্য আবিষ্কার করি। লালনের গানের ভেতর দিয়ে একটি গভীর জীবনবোধ আমার ভেতরে সঞ্চারিত হয়। সেই অর্থে বলা যায়, লালন আমার আবেগ, লালন আমার চেতনা, লালন আমার প্রেরণা।

ফিরোজ এহতেশাম: লালন নিজেই সব প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম ত্যাগ করেছিলেন, যার প্রমাণ তাঁর জীবনযাপন ও গানগুলোয় বিধৃত আছে। সে ক্ষেত্রে লালন হিন্দু নাকি মুসলমান, এ নিয়ে বিভিন্ন গবেষকের উত্তর অনুসন্ধানকে আপনি কীভাবে দেখেন?

আবুল আহসান চৌধুরী: লালন নিজেই বলেছেন তাঁর গানে, ‘কুতর্কের দোকান খুলিসনে আর’। আমি আগেই বলেছি যে লালন কোন সম্প্রদায়ের মানুষ ছিলেন, এটি বড় তুচ্ছ কথা। লালন কী বলেছিলেন, সেটিই হচ্ছে বড় কথা। সে কারণে যাঁরা লালনকে সাম্প্রদায়িক ভেদবুদ্ধি দিয়ে বুঝতে চান বা বিরোধিতা করতে চান বা লালনকে সুফি-দরবেশ বানাতে চান কিংবা খাঁটি বৈষ্ণব বানাতে চান, এসব কিছুর বিরুদ্ধেই আমার তীব্র প্রতিবাদ। কেননা, লালন এসব কিছুই ছিলেন না। থাকলে তিনি শাস্ত্রদ্রোহী হতেন না, তিনি প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মকে অগ্রাহ্য করতেন না। তিনি যা হতে চাননি, গবেষকেরা তাঁকে তা-ই বানাতে চান। সে জন্য এই সব গবেষণা-আলোচনাকে আমি অনধিকারচর্চা বলে মনে করি। ধীরে ধীরে লালনের গানই প্রমাণ দেবে, লালন কী ছিলেন এবং লালন কী চেয়েছিলেন।

আবুল আহসান চৌধুরী
ছবি: নাসির আলী মামুন/ফটোজিয়াম
আজ যে অপসংস্কৃতি চলছে, আমরা দেখি যে আজ বাউলের গান বা লোকসংস্কৃতি নয়, ব্যান্ড সংগীত তরুণ প্রজন্মকে একেবারে উন্মাদ করে তুলেছে। তারা কিন্তু লালনের ভাষায় ‘নিজের ঘরের খবর’ জানে না। তারা হাসন রাজা, রাধারমন, মনমোহন, জালাল শাহের গান শোনেনি, এমনকি শাহ আবদুল করিমের গানও তারা শ্রদ্ধার সঙ্গে শোনেনি। কবিয়াল রমেশ শীলের নামও জানে না তারা। যদি এই লোকসংগীত তথা লোকসংস্কৃতির চর্চা আমাদের দেশে হতে পারত অবাধ ও স্বতঃস্ফূর্ত, তাহলে আমরা বিশুদ্ধ বাঙালি হিসেবে নিজেদের পরিচয় দিতে পারতাম।

ফিরোজ এহতেশাম: রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে লালনের সাক্ষাৎ নিয়ে বিভিন্ন গবেষকের মধ্যে যে মতদ্বৈধ, সে বিষয়ে আপনার বক্তব্য কী?

আবুল আহসান চৌধুরী: এটা নিয়ে একটা রহস্য রয়েই গেছে। এর জন্য রবীন্দ্রনাথের নিজেরও কিছুটা দায় ও ভূমিকা আছে। রবীন্দ্রনাথ একসময় শ্রী নিকেতনের আদর্শ কেমন হবে, সে বিষয়ে কালীমোহন ঘোষের সঙ্গে আলাপচারিতায় বলেছিলেন, কথাটি অনেকটা এ রকম, ‘তুমি তো দেখেছ, শিলাইদহে লালন শাহ ফকিরের শিষ্যদের সঙ্গে আমার কেমন ঘণ্টার পর ঘণ্টা আলাপ জমত।’ এখানে যদি লালনের সঙ্গেই তাঁর পরিচয় থাকত, তাহলে তিনি ‘লালন ও তাঁর শিষ্যদের সঙ্গে’—এইভাবে কথাটি বলতেন। কিন্তু সরাসরি তিনি লালনের শিষ্যদের কথা বলেছেন। আবার আরেক জায়গায় দেখি, বসন্তকুমার পাল, যিনি প্রথম লালনের জীবনী লিখেছিলেন, লালনের জীবনী লেখার জন্য কিছু তথ্য জানতে রবীন্দ্রনাথকে তিনি চিঠি লিখেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ সে সময় বয়সের ভারে ন্যুব্জ। তাঁর একান্ত সচিব সুধীরচন্দ্র কর রবীন্দ্রনাথের বরাত দিয়ে সেই চিঠির জবাব দেন। তাতে লেখা হয়েছিল যে কবি ফকির সাহেবকে জানতেন। কিন্তু সে তো বহুকাল আগের কথা। এই সব কথা আজ আর তাঁর মনে স্পষ্ট নয়। এখানে ‘ফকির সাহেবকে জানতেন’ বাক্যটি থেকে আবার ধারণা করা যায় যে নিশ্চয়ই তাঁদের মধ্যে দেখা-সাক্ষাৎ হয়েছে, আলাপ-পরিচয় হয়েছে। নইলে ‘জানতেন’ কথাটি কেন তিনি বলবেন? এই দুটি প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথের নিজের কথাতেই কিন্তু তাঁর স্ববিরোধ আমরা লক্ষ করি। আমার নিজের মনে হয় যে এ রহস্যমোচনের আর বেশি সুযোগ নেই এবং প্রয়োজনও নেই। কেননা রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে লালনের সাক্ষাৎ হোক আর না-ই হোক, তাতে কিছু আসে যায় না। লালন রবীন্দ্রনাথকে গভীরভাবে প্রাণিত ও প্রভাবিত করেছিলেন, এটাই সত্য।

ফিরোজ এহতেশাম: লালনের সময়ের তুলনায় এখন সামাজিক-রাজনৈতিক সমস্যাগুলো নতুন নতুন মাত্রায় আমাদের সামনে উপস্থিত হচ্ছে। লালনের তত্ত্ব ও মতবাদ বর্তমান সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে কতটা প্রাসঙ্গিক?

আবুল আহসান চৌধুরী: লালনের কাল থেকে একালের যে ব্যবধান, এটিকে আমাদের বুঝতে হবে। যেমন লালনের গানের কথাই বলি; তাঁর গানের আদি আখড়াই সুর প্রায় হারিয়ে গেছে। এখন রেডিও-টেলিভিশন কিংবা মঞ্চে লালনের যেসব গান গাওয়া হয়, তার সুর ও বাণী দুটোই বিকৃত হয়ে যাচ্ছে। আর বাউলেরা তো সামাজিকভাবে চিরকাল, এখনো.... যদিও সাধারণত মুসলমান বা হিন্দু বাউলদের একেক ধরনের বিধান; মৃত্যুর পরে বাউলদের যে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া, সেটা হচ্ছে তাঁদের সমাধিস্থ করা। মুসলমান বাউল হলে তাঁদের জানাজার প্রয়োজন হয় না। কেননা দীক্ষার সময়ই তাঁর জানাজার যেসব আচরিক কাজ, সেগুলো দীক্ষগুরু করে থাকেন। কিন্তু এখন সামাজিক চাপে, একঘরে হওয়ার ভয়ে বাউলকে আবার মোল্লা-পুরুত ডেকে মুসলমানদের জানাজা এবং হিন্দুদের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া করতে হয়। বাউলেরা একটা খুব বড় সামাজিক শক্তি। বাউলদের সঙ্গে ভদ্রলোকেদের পার্থক্য হচ্ছে যে বাউলেরা অসত্য বলেন না, দুর্নীতি করেন না। বাউলেরা কপট নন, দুঃশাসকও নন। সে জন্য লালনের গান, সাধনা ও দর্শন আজকের দিনে বড় পথ দেখাতে পারে, আমাদের বাংলাদেশের এই ক্রান্তিলগ্নে। যেমন লালন তাঁর গানে বলেছেন, ‘সত্য বল, সুপথে চল, ওরে আমার মন’, ‘পরের দ্রব্য, পরের নারী হরণ কোরো না’ ইত্যাদি। লালনের প্রতিটি পঙ্‌ক্তিকে সুভাষণ বলে মনে হতে পারে আমাদের কাছে। তো সে জন্য বাউল সম্প্রদায়কে যদি আমরা বাঁচিয়ে রাখি, তাঁদের সাধনা ও দর্শনকে যদি প্রচার করতে দিই, তাহলে আমরা যে সমাজ চাচ্ছি, দুর্নীতিমুক্ত মুক্তবুদ্ধির সমাজ, তা পাব, যা কপট, শিক্ষিত, দুর্নীতিবাজ কথিত সুশীল সমাজের মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। এই আউল-বাউল এবং গ্রামের সহজ, সরল ও সাধারণ মানুষই আমাদের সত্য ও সঠিক পথ দেখাতে পারে। তার জন্য আমাদের প্রয়োজন বাঙালির ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির শেকড়ের সন্ধান করা। আজ যে অপসংস্কৃতি চলছে, আমরা দেখি যে আজ বাউলের গান বা লোকসংস্কৃতি নয়, ব্যান্ড সংগীত তরুণ প্রজন্মকে একেবারে উন্মাদ করে তুলেছে। তারা কিন্তু লালনের ভাষায় ‘নিজের ঘরের খবর’ জানে না। তারা হাসন রাজা, রাধারমন, মনমোহন, জালাল শাহের গান শোনেনি, এমনকি শাহ আবদুল করিমের গানও তারা শ্রদ্ধার সঙ্গে শোনেনি। কবিয়াল রমেশ শীলের নামও জানে না তারা। যদি এই লোকসংগীত তথা লোকসংস্কৃতির চর্চা আমাদের দেশে হতে পারত অবাধ ও স্বতঃস্ফূর্ত, তাহলে আমরা বিশুদ্ধ বাঙালি হিসেবে নিজেদের পরিচয় দিতে পারতাম। এটা তো ভাষা আন্দোলনের মাস। এ মাসে লালন, দুদ্দু শাহ ও মহীন শাহ—এই তিন বাউলের আমাদের স্মরণ করতে হয়।

সাক্ষাৎকারটি ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০০৮ ‘প্রথম আলো’র ‘সাহিত্য সাময়িকী’তে এভাবেই প্রকাশিত হয়েছিল
লালন মানুষকে যে কতখানি প্রভাবিত করতে পারেন, তার প্রমাণ ফাদার রিগন। তিনি লালনের প্রায় ৩০০ গান ইতালীয় ভাষায় অনুবাদ করেছেন এবং রোববারে যখন গির্জায় প্রার্থনা শুরু হয়, তিনি শুরুতেই লালনের গানের বাণী উচ্চারণ করে প্রার্থনা শুরু করেন। এর চেয়ে বড় স্বীকৃতি, সম্মান আর কী হতে পারে! লালনের গান শুনে জার্মানির এক সংগীতবিশেষজ্ঞ ড. মেনরিন উইনিয়স মন্তব্য করেছিলেন যে লালনের গান তাঁকে মরমি চেতনায় আবিষ্ট করে।

যেমন লালন তাঁর একটি গানে বলেছেন, আরবি কিতাব পড়ার আগে বাংলা কিতাবখানা পড়ে নাও। দুদ্দ শাহ বাংলা ভাষার পক্ষে গান রচনা করেছেন। আর মহীন শাহ কবি জসীমউদ্‌দীনের প্রেরণায় ৫২ সালে সারিন্দা নিয়ে ভাষা আন্দোলনের গান গেয়ে পুলিশি নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন। কজন আমরা সে খবর রাখি? আমরা তো নাগরিক জন যাঁরা ভাষা আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন, তাঁদের ভাষাসৈনিক বলি। ফকির মহীন শাহ প্রত্যক্ষভাবে ভাষা আন্দোলনের সময় রাস্তায় রাস্তায় গান গেয়েছেন, পুলিশের নির্যাতন সহ্য করেছেন, পলাতক থেকেছেন, কই তাঁকে তো আমরা ভাষাসৈনিক বলি না। এই মহীন বাউলসহ আরও অনেক বাউল আছেন, যাঁরা আমাদের ক্রান্তিকালে তাঁদের গান দিয়ে, সুর দিয়ে আমাদের সেই আন্দোলন-সংগ্রামকে অনুপ্রাণিত করেছেন। প্রসঙ্গক্রমে বলি, লালনের গানের খুব বড় অসাধারণ শিল্পী মকসেদ আলী সাঁই মুক্তিযুদ্ধের সময় শরণার্থীশিবিরে ও মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্পে ঘুরে ঘুরে তাঁদের অনুপ্রেরণা দিয়েছেন, তাঁদের মনোবল রক্ষা করেছেন। কোথায় আমরা সেই বাউলের খবর রাখি? অথচ আমরা ঢাকা শহরে বাস করেন যাঁরা, যাঁরা স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে গান গেয়েছেন বা কোনো অনুষ্ঠান করেছেন, তাঁদের কথা লিখি, ইতিহাসে তাঁদের নাম আছে। কিন্তু মকসেদ আলী সাঁই, মহীন সাঁইয়ের নাম কোথায়? তো তাই আজ, আপনি খুব মূল্যবান একটি প্রশ্ন করেছেন, সেই পরিপ্রেক্ষিতে আমি বলতে চাই, আমাদের বিদ্যাসাগর যেমন বলেছিলেন যে এই বাংলাদেশে সাতস্তর মাটি তুলে যদি নতুন মানুষ নিয়ে এসে বসতি স্থাপন করা যায়, তো আমাদের বাঙালি চরিত্রের পরিবর্তন হবে। আমার মনে হয় যে আজ লোকসংস্কৃতি বা লোকজীবনের কাছ থেকে অনেক দূরে সরে গেছি বলেই আমরা আমাদের অস্তিত্বের শেকড় খুঁজে পাই না। আমরা স্বাধীন হয়েছি বটে, আমাদের রাষ্ট্রভাষা বাংলা বটে, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেছে বটে, কিন্তু এ ভাষার যাঁরা প্রকৃত চর্চা করেন, গ্রামের বাউল কিংবা সমধর্মী অন্য সাধকেরা, যাঁরা বাংলা ভাষার জন্য গান বাঁধেন, তাঁদের খবর আমরা করি না, করতে পারি না। রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন যে দেহের সব রক্ত মুখে উঠে আসার নাম স্বাস্থ্য নয়। তেমনি ঢাকা মহানগরী বাংলাদেশ নয়। তো সেইভাবে আমরা বলতে চাই যে ঢাকার বাইরেও আমাদের একটু তাকাতে হবে। হাসন, মনমোহন, জালাল শাহ, দুদ্দু শাহ, সর্বোপরি লালন শাহ আমাদের জন্য আলো জ্বেলে রেখেছেন। সেই আলোয় পথ চিনে আমরা সত্য, সুন্দর, কল্যাণ, আনন্দের গন্তব্যে পৌঁছাতে পারব। আলেক সাঁই।

ফিরোজ এহতেশাম: দুই বিদেশি লালন গবেষক—মার্কিন মুলুকের ডক্টর ক্যারল গোল্ডবার্গ সলোমন ও ইতালীয় ধর্মযাজক ফাদার মারিনো রিগন। আপনার নেওয়া এ দুজনের সাক্ষাৎকার আছে লালন সাঁইয়ের সন্ধানে বইটিতে। এই গবেষকদ্বয় সম্পর্কে আপনি কী মূল্যায়ন করবেন?

আবুল আহসান চৌধুরী: আমি মনে করি যে ড. ক্যারল সলোমন বাঙালি–বিদেশি মিলিয়ে লালনের গানের অর্থ ও তাৎপর্য সবচেয়ে ভালো বোঝেন। লালন সম্পর্কে তাঁর জ্ঞান ও উপলব্ধি আমাকে বিস্মিত করে। আমরা দীর্ঘদিন একসঙ্গে কাজ করেছি। লালনের জীবিতকালে তাঁর শিষ্যরা যেসব গান লিখে রাখতেন, আমরা দুজন মিলে লালনের সেই আদি গানের প্রামাণ্য সংকলন বের করার চেষ্টা করছি। ড. আহমদ শরীফ সেই বইয়ের নাম দিয়েছিলেন আয়নামহল। এ নামেই হয়তো একসময় আমাদের বইটি প্রকাশিত হবে। এটি দ্বিভাষিক, মূল গান এবং পাশাপাশি ইংরেজি অনুবাদ থাকবে।

ঠিক আজকের দিনে (৫ ফেব্রুয়ারি) যাঁর জন্মদিন, তিনি একজন খ্রিষ্টীয় ধর্মযাজক ফাদার মারিনো রিগন। তিনি সুন্দরবনের প্রায় কাছাকাছি থাকেন। বাংলাদেশে প্রায় ৫৩ বছর ধরে আছেন। লালন মানুষকে যে কতখানি প্রভাবিত করতে পারেন, তার প্রমাণ ফাদার রিগন। তিনি লালনের প্রায় ৩০০ গান ইতালীয় ভাষায় অনুবাদ করেছেন এবং রোববারে যখন গির্জায় প্রার্থনা শুরু হয়, তিনি শুরুতেই লালনের গানের বাণী উচ্চারণ করে প্রার্থনা শুরু করেন। এর চেয়ে বড় স্বীকৃতি, সম্মান আর কী হতে পারে! লালনের গান শুনে জার্মানির এক সংগীতবিশেষজ্ঞ ড. মেনরিন উইনিয়স মন্তব্য করেছিলেন যে লালনের গান তাঁকে মরমি চেতনায় আবিষ্ট করে। এ রকম বিদেশিদের নাম আরও অনেক বলা যায়, যাঁরা লালনকে নিয়ে কাজ করেছেন এবং লালনের গানের ভেতর দিয়ে বাঙালিকে চিনেছেন, বাংলাদেশের সংস্কৃতি ও বাংলাদেশকে চিনেছেন। এ অর্থে লালন বাঙালি সংস্কৃতির দূত, বাঙালি সংস্কৃতির মহান প্রতিনিধি।

লালন ফকির
প্রতিকৃতি: মাসুক হেলাল
যেকোনো মরমি সাধনায়, বাউলদের সাধনায় তো বটেই, একটা গূঢ়, গুহ্য সাধনার ধারা তাঁরা অনুসরণ করেন। দীক্ষিতজন ছাড়া, নিজেদের সম্প্রদায়ের মানুষ ছাড়া তাঁদের সাধনার গোপন কথা অন্য কাউকে বলা তাঁদের জন্য নিষিদ্ধ। তবে যখন কেউ বাউল হবেন বা দীক্ষা নেবেন, তখন তিনি ধীরে ধীরে জানতে পারবেন।

ফাদার রিগনকে তো আমি বলি যে উনি একজন বিশুদ্ধ বাঙালি। ফাদার রিগন মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতা করেছেন। তখন তিনি ফরিদপুরের একটি ফিল্ড হাসপাতালে কাজ করতেন। ওই সময় তিনি যে ডায়েরি লিখতেন, সেই ডায়েরি ইতালিয়ান ভাষায় লিখতেন বলেই তিনি বেঁচে গেছেন, ইরেজিতে লিখলে তাঁর বিপদ হতো। সেই ডায়েরি তিনি গত বছর মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে দান করেছেন। সবচেয়ে বড কথা যে তিনি রবীন্দ্রনাথের ৩০টি বই ইতালিয়ান ভাষায় অনুবাদ করেছেন এবং তা প্রকাশিতও হয়েছে। এ ছাড়া তিনি জসীমউদ্‌দীনের দু-তিনটি বই ইতালিয়ান ভাষায় অনুবাদ করেছেন। লালনের ৩০০ গান অনুবাদ করেছেন। আমি তাঁকে প্রশ্ন করেছিলাম যে লালন ও রবীন্দ্রনাথের মধ্যে কে তাঁকে বেশি অনুপ্রাণিত করে। তিনি মৃদু হেসে বলেছিলেন, লালনই তাঁকে সবচেয়ে বেশি অনুপ্রেরণা জোগায়। এ থেকে আমরা বুঝি যে যদি লালনের বাণীকে আত্মস্থ করা যায়, লালন কী বলতে চেয়েছেন, তা যদি উপলব্ধি করা যায়, তবে বারবার আমাদের লালনের কাছে যেতে হবে। লালনের কাছে আমাদের ঋণ অপরিসীম। লালনকে আমরা এখনো চিনি না। লালন নিজেই বলছেন, ‘ঘরের কাছে হয় না খবর, কী দেখতে যাও দিল্লি লাহোর’। আসলে আমাদের ঘরের মানুষ লালনকে আমরা আবিষ্কার করতে পারিনি। আবিষ্কার করেছেন ফাদার মারিনো রিগন, ক্যারল সলোমন, মাশাহিকো তোগাওয়া, এন্ড্রিন উইনিয়স, চার্লস ক্যাপলসহ অনেক বিদেশি গবেষক। আমাদের সম্পদ, আমরা তার কদরও বুঝিনি, তার ব্যবহারও জানিনি। বিদেশিরা সেটা পেরেছেন, সেটা করেছেন।

ফিরোজ এহতেশাম: বাউলদের মধ্যে একটা কথা প্রচলিত আছে, ‘আপন ভজন কথা, না কহিবে যথা-তথা, আপনাতে আপনি সাবধান’। কেন এ সতর্কতা?

আবুল আহসান চৌধুরী: সতর্কতার কারণ হচ্ছে, যেকোনো মরমি সাধনায়, বাউলদের সাধনায় তো বটেই, একটা গূঢ়, গুহ্য সাধনার ধারা তাঁরা অনুসরণ করেন। দীক্ষিতজন ছাড়া, নিজেদের সম্প্রদায়ের মানুষ ছাড়া তাঁদের সাধনার গোপন কথা অন্য কাউকে বলা তাঁদের জন্য নিষিদ্ধ। তবে যখন কেউ বাউল হবেন বা দীক্ষা নেবেন, তখন তিনি ধীরে ধীরে জানতে পারবেন।

ফিরোজ এহতেশাম: আপনি এখন কী নিয়ে ব্যস্ত? শুনেছি আরেক সাধক হাসন রাজাকে নিয়ে গবেষণা করছেন। এ বিষয়ে জানতে চাচ্ছি।

আবুল আহসান চৌধুরী: আমার নানামুখী কাজের মধ্যে প্রসঙ্গ হাসন রাজা নামে একটি বই বেশ আগেই বেরিয়েছিল বাংলা একাডেমি থেকে। এবারের বইমেলায় হাসন রাজা সম্পর্কে আরও দুটি বই বের হচ্ছে। হাসন রাজার গান নামে একটি বই বেরিয়ে গেছে বর্ণায়ন প্রকাশনী থেকে। উৎস প্রকাশনী থেকে বের হচ্ছে হাসন রাজা: মরমি মৃত্তিকার ফসল বইটি। আর আমার ফোকলর–বিষয়ক লেখা নিয়ে একটি বই বের করছে মনন প্রকাশ, নাম বাংলার লোকসংস্কৃতির চালচিত্র। আর লালন নিয়ে আমার সবচেয়ে বড় যে কাজ লালন সমগ্র, সেটিও এই বইমেলায় পাঠক সমাবেশ থেকে প্রকাশিত হচ্ছে, সেটির আমি সংকলন ও সম্পাদনা করেছি। এই বইয়ের ভেতরে লালনের গান শুধু নয়, লালন সম্পর্কে এযাবৎ যত গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ বেরিয়েছে, তার একটি নির্বাচিত সংকলনও আছে। বইটিতে লালনের প্রচুর তথ্য-দলিল এবং লালনপন্থী বাউলদের ছবি ও অন্যান্য অ্যালবাম এখানে থাকছে। লালন ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে এ বইয়ের সঙ্গে আমরা লালনগীতির একটি সিডিও প্রকাশ করব, যাতে একেবারে খাঁটি বাউলের কণ্ঠে লালনের আখড়াই ঘরানার গান পরিবেশিত হয়েছে। আমি মনে করি যে এটি বড় গুরুত্বপূর্ণ কাজ। লালনের নামে যেসব জাল-বিকৃত-খণ্ডিত গান বিভিন্ন সংকলনে স্থান পেয়েছে, আমরা আদি খাতা থেকে যাচাই করে সেসব গান বাদ দিয়েছি এবং যতটা সম্ভব পারা যায়, আমরা লালন সমগ্র বইটিকে লালনের গানের প্রামাণ্য সংকলন হিসেবে প্রকাশের চেষ্টা করেছি। এ ছাড়া আমার আরও কিছু বই আসছে, যেমন সূচীপত্র বের করছে মীর মোশারফ হোসেন। অন্বেষা থেকে প্রকাশ পাচ্ছে একটি গুরুত্বপূর্ণ বড় বই কাঙাল হরিনাথ: গ্রামীণ মনীষার প্রতিকৃতি। শোভা প্রকাশ বের করছে নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসুর অপ্রকাশিত পত্রাবলি। তারা আরেকটি চমকপ্রদ ও ব্যতিক্রমধর্মী বই অবিদ্যার অন্তঃপুরে প্রকাশ করছে। বইটি উনিশ ও বিশ শতকের পতিতাদের আত্মকথার একটি সংকলন। বইটির প্রচ্ছদ ও অলংকরণ করেছেন কাউয়ুম চৌধুরী। এ ছাড়া গতিধারা বের করছে উনিশ শতকের সাহিত্যসাধক, নবযুগ প্রকাশনী এনেছে কাজী মোতাহার হোসেন: জীবন ও সৃষ্টি ইত্যাদি।