খালিকুজ্জামান ইলিয়াসের সাক্ষাৎকার

‘পড়াশোনার কথা শুনি না, খালি বিজনেস করো, উদ্যোক্তা হও!’

বাংলা অনুবাদচর্চায় খালিকুজ্জামান ইলিয়াস এক বিরল নিবেদন ও নৈতিকতার নাম। তাঁর মতে, অনুবাদ যেমন স্বতন্ত্র শিল্প, তেমনি মূলের প্রতি দায়বদ্ধতাও অনিবার্য। খোয়াবনামার ইংরেজি অনুবাদ নিয়ে তাঁর আক্ষেপ, নেটিভ সংবেদন না থাকলে ভাষার প্রাণ ধরা যায় না। কাজানজাকিস থেকে রুশো—কঠিন ও ঢাউস ক্ল্যাসিক বেছে নেওয়াই তাঁর অভ্যাস। রাজনীতিতেও তাঁর স্পষ্ট উচ্চারণ: বর্তমান রেজিমের উদ্যোক্তানির্ভর স্লোগান, ছাত্রদের প্যাম্পারিং ও রাষ্ট্রীয় নিষ্ক্রিয়তাকে তিনি দেখেন এক গভীর ইমম্যাচিউরিটি হিসেবে। সম্প্রতি প্রথম আলোর পক্ষে তাঁর সঙ্গে কথা বলেছেন তানিম কবির

প্রশ্ন:

অনুবাদকে আপনি স্বতন্ত্র শিল্প বলে থাকেন। আবার বলেন, মূল থেকেও সরে যাওয়া যাবে না। অনুবাদে আপনি কী পরিমাণ স্বাধীনতা নেন?

খালিকুজ্জামান ইলিয়াস: খুব একটা স্বাধীনতা আমি নিই না, আমি শুধু দেখি ওটা বাংলার মতো হচ্ছে কি না, বাংলার মতো না হলে সেটা আমি বাংলার মতো করি, যতটা পারা যায় মূলের সঙ্গে সম্পৃক্ত থেকে। মূলকে বিট্রে করে না বা এমবেলিশ করে না। বাঙালি পাঠক যেন বুঝতে পারেন এবং বাংলার মতো শোনায়, এটুকু স্বাধীনতাই নিই। অনুবাদ অবশ্যই শিল্প এবং সৃজনশীল শিল্প।

প্রশ্ন:

এ-ও বলেছেন যে অনুবাদকের মৌলিকত্ব থাকতে হয়।

খালিকুজ্জামান ইলিয়াস: হ্যাঁ, সেটা থাকেই। দুটো অনুবাদ পড়ে দেখুন, একদম অন্য রকম, আলাদা। ফরাসি থেকে দুটো ইংরেজি ভার্সন পড়ে দেখলেই বোঝা যায় একটির চেয়ে অন্যটি কত আলাদা হতে পারে। বাংলাও তা–ই, একটা আমি করলাম, ওই একই বই যদি আরেকজন করেন, অন্য রকম, তাই না? গানের মতো। রবীন্দ্রসংগীত তো রবীন্দ্রসংগীতই; সেটা দেবব্রত গাইছেন একরকম শোনাচ্ছে, রাজেশ্বরী দত্ত গাইছেন অন্য স্টাইলে।

প্রশ্ন:

স্টাইলটাই কি তাহলে মৌলিকত্ব?

খালিকুজ্জামান ইলিয়াস: হ্যাঁ, ট্রান্সলেটরের স্টাইল থাকতে হয়। ট্রান্সলেটর তাঁর স্টাইলের কারণে আলাদা হয়ে যান অন্য ট্রান্সলেটরদের চেয়ে।

প্রশ্ন:

আপনি কি মনে করেন অনুবাদ কখনো মূলের চেয়ে বেশি সফল হয়ে যেতে পারে?

খালিকুজ্জামান ইলিয়াস: হতে পারে! যেমন মার্কেস নিজেই তো স্বীকার করেছেন, তাই না? বলেছেন, ইংলিশ ট্রান্সলেশন ইজ বেটার দ্যান মাই স্প্যানিশ ভার্সন। ওটা বিনয়। কিন্তু স্টিল—হতে পারে!

প্রশ্ন:

অনুবাদে মূলানুগ থেকে স্বাধীনতা নেওয়ার ভারসাম্য কীভাবে রক্ষা করেন? কোনো সীমানা আছে কি?

খালিকুজ্জামান ইলিয়াস: সীমানা নেই, আবার থাকাও উচিত। আমার মনে হয়, নিজের থেকে একটা সীমানা তৈরি করে নেওয়া উচিত। এতটা স্বাধীনতা নিতে পারি না, যতটা নিলে অরিজিনালের প্রতি আমার অন্যায় করা হবে; এ ধরনের একটা মোরাল অ্যাটিচ্যুড অনুবাদকের থাকা উচিত।

প্রশ্ন:

খোয়াবনামার ইংরেজি অনুবাদ আপনার মনঃপূত হয়নি। আপনার মূল্যায়নে অনুবাদক অরুণাভ সিনহা কতটা মূলানুগ থেকেছেন আর কতটুকু স্বাধীনতা নিয়েছেন?

খালিকুজ্জামান ইলিয়াস: মূলানুগ থেকেছেন! আমার মনে হয় একটু বেশিই মূলানুগ থেকেছেন। আমি মিলিয়ে অনেকগুলো পৃষ্ঠা পড়ে দেখেছি যে ডিভিয়েট করেননি। কিন্তু ওই যে প্রাণটা আসেনি। হয়তো একজন নেটিভ স্পিকার যদি এটা করতেন, যিনি ভালো বাংলা জানেন এবং বাংলা ভাষার ও খোয়াবনামার ভাষার স্ট্রেন্থটা অ্যাবজর্ভ করে তিনি যদি নিজের ইংরেজি ভাষায় এটাকে করতে পারতেন, দ্যাট উইল বি দ্য বেস্ট ট্রান্সলেশন।

প্রশ্ন:

 ইংরেজি অনুবাদে খোয়াবনামার পুঁথি বা গানগুলো বিকৃত হয়েছে কি?

খালিকুজ্জামান ইলিয়াস: পুঁথিগুলো তো একদম আনরাইমড, তারপর কবিতাগুলো—রাইমড করতে পারেননি। আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, এটা তো শুনতে একদম ভালো লাগছে না। বললেন, আমি চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু শুনতে ডগারেলের মতো হয়ে যায়। ডগারেল মানে খুবই বাজে কবিতা।

প্রশ্ন:

অরুণাভ সিনহার সেই দক্ষতা ছিল না?

খালিকুজ্জামান ইলিয়াস: না। সেটা হয়তো একজন নেটিভ স্পিকার, ক্রিয়েটিভ রাইটার হলে...অনুবাদক হিসেবেও তিনি (অরুণাভ সিনহা) এত বেশি মেকানিক্যাল...কেন বলছি, তিনি এত বেশি অনুবাদ করেন—বঙ্কিমচন্দ্র করেন, বিভূতিভূষণ করেছেন, রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র...নেই কে?

প্রশ্ন:

আপনিও তো কাজানজাকিসের দ্য ওডিসি: আ মডার্ন সিকুয়েল-এর অনুবাদ করছেন উপন্যাস ফরম্যাটে?

খালিকুজ্জামান ইলিয়াস: না, এখন আমি ভাবছি এটা কবিতাতেই করব। শুরুতে ভেবেছিলাম উপন্যাসের মতো ফরম্যাটে। পরে ভেবে দেখলাম কাজানজাকিসের অনেকগুলো চরণ আছে এখানে—তেত্রিশ হাজার তিন শ তেত্রিশ লাইন। নাম্বার ‘থ্রি’ গ্রিক মিথলজিতে একটা সিগনিফিক্যান্ট নাম্বার, আর কাজানজাকিস এটা পারপাসলি করেছেন।

আমার মনে হয়, নিজের থেকে একটা সীমানা তৈরি করে নেওয়া উচিত। এতটা স্বাধীনতা নিতে পারি না, যতটা নিলে অরিজিনালের প্রতি আমার অন্যায় করা হবে; এ ধরনের একটা মোরাল অ্যাটিচ্যুড অনুবাদকের থাকা উচিত।
খালিকুজ্জামান ইলিয়াস

নাম্বার থ্রিকে ওরা অনেক রেসপেক্ট করে। কাজানজাকিসও সেটাকেই রেসপেক্ট করে তেত্রিশ হাজার তিন শ তেত্রিশ লাইন মানে পাঁচটা তিন—৩৩৩৩৩—এভাবে করেছেন। তাই ভাবলাম, যদি এটা উপন্যাসের মতো করি, তাহলে মনুমেন্টাল স্ট্রাকচার নষ্ট হবে। অতএব আমিও লাইন ঠিক রেখে ফ্রিভার্সে করব।

প্রশ্ন:

কাজ কতটা এগিয়েছে? কবে নাগাদ গ্রন্থাকারে পাওয়া যাবে?

খালিকুজ্জামান ইলিয়াস: এটা অনেক সময় লাগবে। অলরেডি আমি পার করলাম আড়াই বছর। আরও দুই বছর!

প্রশ্ন:

দুই বাংলায় আপনিই কি কাজানজাকিসকে পরিচিত করে তুললেন?

খালিকুজ্জামান ইলিয়াস: প্রবাবলি, কারণ ওখানে কেউ কিন্তু কাজানজাকিস করেনি। আমি পেয়েছিলাম আমার ভাই আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের কাছ থেকে। আমাকে এনে দিয়েছিল প্রথমে একটা উপন্যাস—আমি তখন মুহসীন হলে থাকি—তো বলল যে বইটা পড়ে দেখো, এটা খুবই ভালো। বইটার নাম ছিল ক্রাইস্ট রিক্রুসিফাইড।

খালিকুজ্জামান ইলিয়াস। ছবি: প্রথম আলো

ওটা পড়ে আই ওয়াজ রিয়েলি চার্মড, কয়েকটা দিন আমার ঘোরের মধ্যে কেটেছে। তারপর তাঁর যত বই যেখানে পাওয়া যায়—এখানে তেমন পাওয়া যেত না—এবং তাঁর ওপর যত বই পাওয়া যায় জোগাড় করে পড়ে ফেলি। পড়ে আমি একটা বড় আর্টিকেল লিখি, দুই সংখ্যায় ছাপা হয়েছিল সেটা নজরুল একাডেমি পত্রিকায়। সেটা মুক্তিযুদ্ধের আগে বা পরে।

প্রশ্ন:

আক্ষরিক অনুবাদ নিয়ে কী বলবেন?

খালিকুজ্জামান ইলিয়াস: আক্ষরিক অনুবাদ বলে কিছু নেই। বোর্হেস বলেছেন, ‘লিটারেল ট্রান্সলেশন ইজ নট লিটারেরি’। ম্যারিজ সার্টিফিকেট বা জন্মসনদের আক্ষরিক অনুবাদ হতে পারে, কিন্তু সাহিত্যের না।

প্রশ্ন:

সম্প্রতি বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র থেকে আপনার অনুবাদে জ্যঁ-জ্যাক রুশোর কনফেশনের বাংলা অনুবাদ স্বীকারোক্তি প্রকাশিত হলো।

খালিকুজ্জামান ইলিয়াস: তিন শ বছর ধরে কনফেশনস ওয়ার্ল্ড ফেমাস একটা বই। অথচ এর কোনো বাংলা অনুবাদ ছিল না। এখনো নেই আমারটি ছাড়া। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র থেকে প্রস্তাব পাওয়ার পরে এ জন্যই আমি ইন্টারেস্টেড হলাম।

প্রশ্ন:

অনুবাদের জন্য ক্ল্যাসিক, ঢাউস ও কঠিন বই বেছে নেওয়ার কারণ কী?

খালিকুজ্জামান ইলিয়াস: যেকোনো ক্ল্যাসিকই হলো উন্নত মানের। ক্ল্যাসিক পড়লে একজন মানুষ সমৃদ্ধ হয়। যদি সমৃদ্ধ হতে চায় কেউ, তার চিন্তাভাবনার জগৎ যদি বাড়াতে চায়, ক্ল্যাসিক পড়তে হবে। অনুবাদের ক্ষেত্রে আমি সাধারণত কঠিনগুলো নিই, কঠিন এবং ঢাউস—কারণ অনেকেই হয়তো এগুলো করতে চাইবে না বা এড়াবে। যেমন কাজানজাকিসের এটা কে করবে, ৭০০ পৃষ্ঠার, ৩৩ হাজার লাইনের একটা কবিতা...এবং উনি লিখেছেন এটা ১২ বছর সময় নিয়ে।

প্রশ্ন:

ইউরোপ আমেরিকার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ক্ল্যাসিক পড়ার অভ্যাস ফিরিয়ে আনতে শিক্ষার্থীদের ট্রেনিং দেওয়া হচ্ছে। মানে কেউ তো ক্ল্যাসিক পড়ছে না।

খালিকুজ্জামান ইলিয়াস: তবু বইগুলো আছে বলেই করছি। আমার মনে হয় না কেউ করবে...করতে পারে কেউ, আই ডোন্ট নো...

প্রশ্ন:

কেউ না–ও করতে পারে, এই আশঙ্কা থেকেই কি আপনার বাড়তি দায়িত্ব নেওয়া?

খালিকুজ্জামান ইলিয়াস: হ্যাঁ, হ্যাঁ। কম হোক, কিন্তু যত দূর পারা যায় করতে থাকি। আমি তো আর হুমায়ূন আহমেদের মতো লিখতে পারব না!

প্রশ্ন:

হুমায়ূন আহমেদ আপনার বন্ধু ছিলেন। এবং আপনাদের দুজনেরই লেখালেখির শুরুটা কবিতা দিয়ে।

খালিকুজ্জামান ইলিয়াস: হ্যাঁ। ভেরি ক্লোজ ফ্রেন্ড ছিল। না, সে সময় তো লেখালেখি সেভাবে শুরু করিনি। ক্লাস টেনে পড়ি। একটা বই ধার নিয়েছিলাম আমি হুমায়ূনের কাছ থেকে, ওটা ফেরত দেওয়ার সময় ভেতরে ওই সময়ে লেখা একটা দীর্ঘ কবিতা গুঁজে দিয়েছিলাম।

প্রশ্ন:

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯৬৭ সালে ইংরেজি সাহিত্যে ভর্তি হলেন আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের ইচ্ছায়।

খালিকুজ্জামান ইলিয়াস: হিস্ট্রিতে পড়লে আমি নিশ্চিত ফার্স্ট ক্লাস পেতাম। কিন্তু আমার এক স্যার বলেছিলেন, হিস্ট্রির ফিউচার ভালো না। চাকরি পাওয়া যাবে না। ভাইয়ের (আখতারুজ্জামান ইলিয়াস) ইচ্ছা ছিল ইংরেজিতে পড়ার। রেজাল্ট খারাপ হওয়ায় পারেনি। পরে মুনীর চৌধুরী ওকে বাংলা বিভাগে নিয়ে নেন। ফলে সে-ও (আখতারুজ্জামান ইলিয়াস) চাইছিল আমি ইংরেজিতে পড়ি।

প্রশ্ন:

ওই সময়ের সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট কেমন দেখেছিলেন?

খালিকুজ্জামান ইলিয়াস: ওই সময় তো খুবই টার্বুলেন্ট সময় ছিল, এখনকার মতোই...কিন্তু তখন ছিল একধরনের হেলদি পলিটিকস। উনসত্তরের আন্দোলন, পুরো মুভমেন্টটাই গিয়েছে আমাদের ওপর দিয়ে। চিলেকোঠার সেপাই-এর যে ব্যাকগ্রাউন্ড, ওটা পুরোটাই আমাদের ইউনিভার্সিটি লাইফ। ভাই (আখতারুজ্জামান ইলিয়াস) তো তখন কলেজের টিচার, জগন্নাথ কলেজে পড়ায়। আমরা মিছিলে যেতাম। পকেট ভরে ইটপাটকেল নিয়ে।

প্রশ্ন:

২৫ মার্চ রাতে আপনি কোথায় ছিলেন?

খালিকুজ্জামান ইলিয়াস: তখন আমি বগুড়ায়। তার কিছুদিন আগে, ১৬ তারিখে আমি চলে গেছি। পরিস্থিতি দেখে আব্বা–আম্মা বললেন, চলে এসো।

প্রশ্ন:

আখতারুজ্জামান ইলিয়াস কি তখন সক্রিয় বামপন্থী রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন?

খালিকুজ্জামান ইলিয়াস: ইউনিয়ন–বেজড, মেনন (রাশেদ খান মেনন) গ্রুপের সঙ্গে কিছু সম্পৃক্ততা ছিল। চীনপন্থী ছিল মূলত।

প্রশ্ন:

মুক্তিযুদ্ধকালীন আখতারুজ্জামান ইলিয়াস চীনপন্থী ছিলেন?

খালিকুজ্জামান ইলিয়াস: ওই রকম সক্রিয় না। চীনপন্থী বলতে মেননের ফ্রেন্ড ছিল। মেনন ছিল চীনপন্থী, মতিয়া (মতিয়া চৌধুরী) রাশিয়াপন্থী।

প্রশ্ন:

আপনি ও আপনার বড় ভাই কথাসাহিত্যিক আখতারুজ্জামান ইলিয়াস মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিলেন না কেন?

খালিকুজ্জামান ইলিয়াস: মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিইনি। এটা নিয়ে আমার অপরাধবোধ আছে। আমি একটা প্রবন্ধ লিখেছি ‘আক্ষেপ’ নামে। ওর মধ্যে আছে যে কেন গেলাম না, তখন আমার বয়স ২২! যুদ্ধে যাওয়ার উপযুক্ত সময়, তাই না? একবার চেষ্টা করেওছিলাম। মাঝে বিশ্ববিদ্যালয় খুলে গেল। এসেছি, এসে ক্লাসও করলাম। তখন ক্লাস করে আমি খোঁজ নিতাম রিক্রুট করছে কারা এখানে। পরে বাংলা বিভাগের দুজনের সঙ্গে দেখাও হয়েছিল। তারা কথাবার্তা বলেও আমাকে নেয়নি কোনো কারণে। অথচ আমার কিন্তু ট্রেনিং ছিল, কলেজের ইউটিসি ট্রেনিং। ফলে আমার পক্ষে যাওয়া একেবারেই উচিত ছিল। কারণ, আর্মির চার মাসের ট্রেনিং মানে রিগোরাস ট্রেনিং ছিল। ’৬৫-এর ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের পরপর তখন কলেজগুলোতে আর্মি ট্রেনিং নেওয়ার ব্যবস্থা করেছিল পাকিস্তান সরকার।

প্রশ্ন:

বাধ্যতামূলক ট্রেনিং?

খালিকুজ্জামান ইলিয়াস: না, বাধ্যতামূলক ছিল না।

প্রশ্ন:

সম্প্রতি স্থানীয় সরকার উপদেষ্টা বাংলাদেশে বাধ্যতামূলক আর্মি ট্রেনিং দেওয়ার কথা বলেছেন।

খালিকুজ্জামান ইলিয়াস: হতে পারে। আমি মনে করি থাকা উচিত। বিদেশে আছে তো। আমেরিকাতেও আছে, ইংল্যান্ডেও আছে।

প্রশ্ন:

এমন সিদ্ধান্তের পেছনে ইনটেনশনটাও আলোচিত হচ্ছে।

খালিকুজ্জামান ইলিয়াস: ইনটেনশনটা আর বলার কী আছে। এটা তো অনুল্লেখই থাকতে পারে।

প্রশ্ন:

অপ্রাসঙ্গিক হলেও প্রশ্নটা করি, রাষ্ট্র পরিচালনায় ছাত্রদের আসা উচিত হয়েছে বলে মনে করেন কি?

খালিকুজ্জামান ইলিয়াস: না না, একেবারেই উচিত হয়নি। একেবারেই উচিত হয়নি। এটা ইউনূস সাহেব পুরোপুরি একটা ব্লান্ডার করেছেন।

প্রশ্ন:

অধ্যাপক ইউনূসের শাসনামল নিয়ে আপনার মন্তব্য কী?

খালিকুজ্জামান ইলিয়াস: পড়াশোনার কথা শুনি না। খালি বিজনেস করো, উদ্যোক্তা হও! একি!

প্রশ্ন:

মব সন্ত্রাস নিয়ে কী বলবেন?

খালিকুজ্জামান ইলিয়াস: এত প্যাসিভ! নিষ্ক্রিয় সরকার। উনি (অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস) প্রথমেই ছাত্রদের যেভাবে প্যাম্পারিং করলেন, একেবারেই উচিত হয়নি। একেবারেই ওটা ম্যাচউরিটির লক্ষণ না। কোনো স্টেটম্যান কোয়ালিটি তাঁর নেই। ক্লিনটনও দেখলাম, উনি ক্লিনটনের ওখানে গিয়ে ওসব বলছিলেন না, মেটিকুলাস ডিজাইন, মাস্টারমাইন্ড, ক্লিনটনও দেখলাম অবাক হচ্ছেন তখন, যে এটা কী!

মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিইনি। এটা নিয়ে আমার অপরাধবোধ আছে। আমি একটা প্রবন্ধ লিখেছি ‘আক্ষেপ’ নামে। ওর মধ্যে আছে যে কেন গেলাম না, তখন আমার বয়স ২২! যুদ্ধে যাওয়ার উপযুক্ত সময়, তাই না? একবার চেষ্টা করেওছিলাম।
খালিকুজ্জামান ইলিয়াস

তারপর ক্ষমতায় এসেই বললেন, ‘আপনারা আমাদের সমালোচনা করুন। আরে এত বড় একটা ব্লাডশেডের পরে এ রকম লিবারেল কথাবার্তা কেউ বলে? যে, আপনি এত দিন কোনো দাবিদাওয়া তুলে ধরতে পারেননি, এখন আসুন। তারপরই তো বন্যার মতো দাবিদাওয়া আর সেই সূত্রে মব সন্ত্রাসের উত্থান। তাঁর এসেই বলা উচিত ছিল, আমরা কিচ্ছু দিতে পারব না, আমরা অল্প সময়ের জন্য এসেছি, আমরা কিছু কিছু জিনিস সংস্কার করে ইলেকশন দিয়েই চলে যাব। আপনারা কোনো দাবিদাওয়া আনবেন না।’

শেখ মুজিব সেটা বলেছিলেন। শেখ মুজিব বলেছিলেন, ‘তিন বছর কিছু দিবার পারমু না।’ অন্তত সেটা সত্যভাষণ ছিল।

প্রশ্ন:

সম্প্রতি বাংলা একাডেমি তাদের লিটলম্যাগ সংগ্রহের নতুন প্রকল্পের নামকরণ করেছে আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের নামে।

খালিকুজ্জামান ইলিয়াস: হ্যাঁ, এটা আজম সাহেব করেছেন। ভালোই তো! উনি তো আরও অনেক কিছু করছেন; আল মাহমুদের নামে একটা কর্নার করেছেন।

প্রশ্ন:

আপনার ভবিষ্যৎ অনুবাদ প্রকল্প নিয়ে কিছু বলুন।

খালিকুজ্জামান ইলিয়াস: প্রবাবলি দিস ইজ লাস্ট।

প্রশ্ন:

দ্য ওডিসি: আ মডার্ন সিকুয়েল–ই আপনার শেষ অনুবাদ!

খালিকুজ্জামান ইলিয়াস: আর কত!

প্রশ্ন:

জেমস জর্জ ফ্রেজারের গোল্ডেন বাউ অনুবাদ করতে বিশ বছর সময় নিয়েছেন।

খালিকুজ্জামান ইলিয়াস: ’৯৬ সালে শুরু করে ২০১৬ সালে শেষ হয়েছে। তবে মাঝে পাঁচ বছর ধরিইনি।

প্রশ্ন:

হাজার পৃষ্ঠার এ বই কেন পড়া দরকার?

খালিকুজ্জামান ইলিয়াস: জানার জন্য! ছাত্র অবস্থায় এলিয়ট পড়তে গিয়ে দেখতাম, এটার অনেক প্রভাব আছে তাঁর কবিতায়। কাজানজাকিসের বহু লেখায় এই গোল্ডেন বাউ–এর প্রভাব আছে। হারমেন হেস, তাঁর লেখায়ও প্রভাব আছে। এটা পড়বেন জানার জন্য—মানুষের বিশ্বাস, অবিশ্বাস, মানুষের যে প্র্যাকটিসেস, মানুষের মতো এমন জটিল প্রাণী আর কেউ নেই। জাদুর ব্যাপার আছে বইতে। জাদু, ধর্ম ও বিজ্ঞান—এ তিনটা ভাগ তিনি করেছেন; প্রথমে জাদু, জাদুকে তিনি ভালোই বলেছেন। তারপর আসে ধর্ম। ধর্ম আসার পর থেকে এক্সপ্লয়টেশনগুলো বেড়েছে, পুরোহিতদের সুপ্রিমেসি; এর আগে জাদুর সময়ে ছিল প্রিমেটিভ কমিউনিজম। এটা লেখক–পাঠক সবারই পড়া দরকার।

প্রশ্ন:

আপনি কি এখন আর কবিতা অনুবাদ করেন না?

খালিকুজ্জামান ইলিয়াস: ভালো লাগলে এখনো করি তো! হয়তো ছাপি না কোথাও।

প্রশ্ন:

আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের অগ্রন্থিত/অপ্রকাশিত কোনো লেখা কি আপনাদের সংগ্রহে আছে?

খালিকুজ্জামান ইলিয়াস: অপ্রকাশিত গল্প–উপন্যাস মনে হয় না আছে। পত্রিকায় ছাপা হয়ে গেছে, যেগুলো ছিল। যেমন একটা—বেহেশতের পুঞ্জি—ওটা ভলিউম ৪-এ (রচনাসমগ্র) আছে। আর মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে উপন্যাসের (করোতোয়া মাহাত্ম্য) একটা অধ্যায়—ওটাও কোনো একটা পত্রিকায় আছে। এ ছাড়া ওর কিছু ডায়েরি, জার্নাল আছে, সেগুলোর বেশির ভাগই বিভিন্ন সময়ে ওর নেওয়া বিভিন্ন নোটস। ডায়েরির কিছু অংশ বের করেছিল শাহাদুজ্জামান। চিলেকোঠার সেপাই লেখার সময় সে রেগুলার ডে টু ডে সংবাদপত্রের (উপন্যাসের জন্য) প্রয়োজনীয় সংবাদগুলো রাখত, কোথায় কখন কী হচ্ছে—এই বর্ণনাগুলো আছে। এ ছাড়া কিছু কিছু প্রবন্ধের খসড়া এখানে আছে।