বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

‘জন্মিলে মরিতে হবে, অমর কে কোথা কবে’—কবিই এমন বলেছেন। কিন্তু কারাবন্দী এক কবি ও চলচ্চিত্রনির্মাতার মৃত্যু মানতে পারেননি কেউই। ছয় বছরের কারাদণ্ড মাথায় নিয়ে ইরানের একটি জেলখানায় বন্দী ছিলেন বাখতাশ আবদিন। ৮ জানুয়ারি তিনি মারা যান। এর পর থেকে তাঁর মৃত্যুকে ঘিরে রহস্য ঘনীভূত হচ্ছে। ইরান সরকারের তরফ থেকে যদিও বলা হচ্ছে, বাখতাশের মৃত্যু হয়েছে করোনায়। তবে এ ব্যাখ্যা কায়মনোবাক্যে মানতে নারাজ বিশ্বের লেখক, কবি ও শুভবুদ্ধির মানুষেরা। ইতিমধ্যে প্রতিবাদ, বিবৃতি, সভা–সমাবেশ শুরু হয়ে গেছে। ইরানে রাজনৈতিক বন্দীদের একটি দল ১০ জানুয়ারি এক বিবৃতিতে এ মৃত্যুকে ‘পরিকল্পিত হত্যা’ বলে উল্লেখ করেছে। তারা বলেছে, এটি একটি ‘ধারাবাহিত হত্যাকাণ্ড’। গত শতকের আশি ও নব্বইয়ের দশক থেকে ইরানে ভিন্নমতাবলম্বীদের হত্যার সংস্কৃতি শুরু হয়। বাখতাশের মৃত্যু সেই ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ডেরই অংশ।

লেখকদের বৈশ্বিক সংগঠন পেন আমেরিকার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সুজান নোজেল ৯ জানুয়ারি বলেছেন, কোভিডে যে কারও মৃত্যু হতে পারে। এটা স্বাভাবিক। কিন্তু বাখতাশের মৃত্যু স্বাভাবিক নয়, তাঁকে ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। জেলখানার অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে তিনি সুচিকিৎসা পাননি। কারাগারেই তিনি দুই–দুইবার কোভিডে আক্রান্ত হয়েছেন। শেষে কোমায় চলে গেছেন। তবু তাঁর উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়নি। এটি স্পষ্টতই ‘মৃত্যুর দিকে প্ররোচিত করা’ ছাড়া আর কিছু নয়।

লেখকদের আরেকটি বৈশ্বিক সংগঠন রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার এক টুইটবার্তায় বলেছে, সম্পূর্ণ অন্যায়ভাবে কারাবন্দী একজন লেখক জীবনের শেষ মুহূর্তে বিনা চিকিৎসায় মারা গেলেন। যদিও তাঁকে শেষ মুহূর্তে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, কিন্তু ততক্ষণে তিনি ‘জীবন-মরণের সীমানা ছাড়িয়ে’ চলে গেছেন। প্যারিসভিত্তিক এ সংগঠন বাখতাশের পায়ে শিকলপরা একটি ছবি পোস্ট করে লিখেছে, এ মৃত্যুর দায় ইরান সরকার এড়াতে পারে না।

নিউইয়র্কভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা সেন্টার ফর হিউম্যান রাইটস ইন ইরানের নির্বাহী পরিচালক হাদি ঘায়েমি বলেছেন, বাখতাশ আবতিন মারা গেছেন। কারণ, ইরান সরকার তাঁকে জেলেই মারতে চেয়েছিল। বাখতাশের এই ট্র্যাজিক মৃত্যুর ব্যাপারে বিচার বিভাগের প্রধান গোলাম হোসেনকে অবশ্যই জবাবদিহি করতে হবে।

নরওয়েভিত্তিক এনজিও ইরান হিউম্যান রাইটসের পরিচালক মাহমুদ আমিরি মোগাদ্দাম বলেছেন, যে সরকার এ লেখককে কারারুদ্ধ করেছে, সেই সরকারের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা এ মৃত্যুর জন্য সরাসরি দায়ী। তাঁদের জবাবদিহি করতেই হবে।

৮ জানুয়ারি বাখতাশের মৃত্যুর এক ঘণ্টার মধ্যেই প্রতিবাদের ঝড় ওঠে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। হাজার হাজার টুইটারে উঠে আসে শোক ও প্রতিবাদ। সেই ধারা এখনো অব্যাহত। বরং প্রতিবাদ পুঞ্জীভূত হচ্ছে সাধারণ মানুষের ভেতরেও। কারণ, এটা স্পষ্ট যে ইরান সরকার তাঁর চিকিৎসার ব্যাপারে যথাযথ পদক্ষেপ নেয়নি। বাখতাশের অবস্থা যখন আশঙ্কাজনক, তখন পেন আমেরিকাসহ আরও ১৮টি আন্তর্জাতিক সংস্থা যৌথভাবে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লা আলী খামেনির কাছে একটি খোলা চিঠি লিখেছিল। সেখানে আবতিনের সুচিকিৎসার উদ্যোগ নিতে অনুরোধ জানানো হয়। কিন্তু ইরান সরকার তাতে কর্ণপাত করেনি।

গত সেপ্টেম্বরে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল একটি সমীক্ষা প্রকাশ করেছে। তাতে দেখা যায়, ২০১০ সালের জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত ৭২ জন কারা হেফাজতে মৃত্যুবরণ করেছেন ইরানে, যাঁদের মৃত্যুর ব্যাপারে যথাযথ সদুত্তর দিতে পারেনি ইরান সরকার—এমন অভিযোগ করেছে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল।

এদিকে সেন্টার ফর হিউম্যান রাইটস ইন ইরান বলছে, বর্তমানে ইরানের বিভিন্ন কারাগারে অন্তত ১১ লেখক বন্দী আছেন।

কে এই বাখতাশ আবতিন

default-image

বাখতাশ আবতিনের পরিচয় ইরানি কবি, লেখক ও চলচ্চিত্রনির্মাতা হিসেবে। ইরানের শহর-ই রেতে ১৯৭৪ সালে জন্মেছিলেন তিনি। ছোটবেলা থেকেই ঝোঁক ছিল শিল্প–সাহিত্যের প্রতি। হাইস্কুল পাস করার পর থেকেই কবিতা লিখতে শুরু করেছিলেন। তারপর শুরু করেন তথ্যচিত্র নির্মাণ। তাঁর উল্লেখযোগ্য তথ্যচিত্রের মধ্যে রয়েছে লরিস চেকনাভারিয়ানকে নিয়ে নির্মিত ১৩ অক্টোবর ১৯৭৩, বিখ্যাত ইরানি কম্পোজার হোমায়ুন খোরামকে নিয়ে তথ্যচিত্র আনসুর ইত্যাদি। এ ছাড়া রয়েছে দ্য স্যান্ড জার, দ্য স্লিপ পেনাট্রেশন, মিকা, দ্য নেয়ার ড্রিম, পার্ক মার্ক, মরি ওয়ান্টস আ ওয়াইফ। এর পাশাপাশি লেখালেখি তো ছিলই। তিনি কবিতা লিখতেন, সমালোচনা লিখতেন। তাঁর সমালোচনার বিষয় ছিল ইতিহাস, সমাজ ও সাহিত্য। তবে বেশির ভাগ সময়ই তাঁর মাতামত সরকারের মতের সঙ্গে মিলত না। এ মতদ্বৈধতাই কাল হয়েছিল তাঁর জীবনে।

কেন বাখতাশের ছয় বছরের কারাদণ্ড

দিনটি ছিল ২০১৯ সালের ১৫ মে। ইরানের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী গ্রেপ্তার করে বাখতাশ আবতিনকে। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি জাতীয় নিরাপত্তার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালান। এটি প্রকাশ্য অভিযোগ হলেও অপ্রকাশ্য আরও একটি অভিযোগ ছিল বলে মনে করেন ইরানের লেখক–বুদ্ধিজীবীরা। সেটি হচ্ছে, ইরানি লেখক সমিতির সঙ্গে বাখতাশের সম্পর্ক। এ সমিতিকে শত্রুজ্ঞান করে ইরানের সরকার। কারণ, এ সমিতির সদস্যরা প্রায়ই রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের শিকার ব্যক্তিদের কবর পরিদর্শন করেন। সরকার যাঁদের মেরে ফেলেছে বলে অভিযোগ আছে, তাঁদের কবর কেন খুঁজে খুঁজে বের করতে হবে? এ ‘অন্যায়’ কি মেনে নেওয়ার মতো? তাই ইরান সরকার অনেক দিন ধরেই এ সমিতির সদস্যদের নানাভাবে হয়রানি করে আসছিল।

বাখতাশ আবার আরেক ধাপ এগিয়ে। তিনি কবিতা লিখে, তথ্যচিত্র বানিয়ে সাধারণ মানুষকে সরকারের বিরুদ্ধে সচেতন করে তুলছিলেন। তাই গ্রেপ্তার করা হয় বাখতাশ আবতিনকে।

বাখতাশ আবতিন ২০২০ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ইরানি লেখক সমিতির অপর দুই সহকর্মী রেজা খান্দান মাহাবাদি ও কিভান বাজানের সঙ্গে বন্দী ছিলেন। দীর্ঘদিন ধরে হৃদ্‌রোগে ভুগছিলেন তিনি। এর মধ্যে আক্রান্ত হন করোনায়। দ্বিতীয়বার করোনায় আক্রান্ত হওয়ার পর পরিস্থিতি জটিল হলে গত ১৪ ডিসেম্বর তাঁকে তেহরানের কুখ্যাত কারাগার এভিন থেকে হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে অবস্থার আরও অবনতি হলে তাঁকে নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রে স্থানান্তর করা হয়। এরপর তিনি কোমায় চলে যান। অতঃপর শনিবার ৪৮ বছর বয়সী বাখতাশ আবতিনের মৃত্যু নিশ্চিত করে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

সূত্র: আল–জাজিরা, টাইমস অব ইসরায়েল, আল আরাবিয়া নিউজ, রেডিও জামানা

অন্যান্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন