default-image

করোনার এই ভয়াল সময়ে কিছু লিখতে গেলে প্রথম ভাবনা মাথায় আসে যে আদৌ কি কোনো স্বাভাবিক সময় এটা? এই যে আমাদের প্রতিমুহূর্তের ভয় ও উদ্বেগ, এই যে হাসপাতালে হাসপাতালে নাকের মধ্যে কাঠি ঢুকিয়ে করোনা টেস্ট, এই যে আইভারমেকটিন ট্যাবলেট দিয়ে শুরু করে ঘর আটকে আশঙ্কায় থাকা যে ফুসফুস বিগড়ে আপনি আবার মৃত্যুর দিকে রওনা দিচ্ছেন কি না, এই যে মিডিয়াজুড়ে চেঁচামেচি আজ এখানে আক্রান্ত এতজন, কাল ওখানে মারা গেছেন অতজন, ইত্যাদি ইত্যাদি আপনার নিত্যদিনের জীবনের অংশ হয়ে উঠলে সেই জীবনকে কি আর স্বাভাবিক জীবন বলা চলে? মানুষের উদ্বিগ্নতা ও মৃত্যুময়তার এই বর্তমান দিনগুলো কি আবহে ও চরিত্রে কাফকায়েস্ক দিন না? চারপাশের এই চাকরি হারানোর ও বেতন কমার ডামাডোলের মধ্যে প্রতিদিন সকালবেলা মাস্ক পরে কাজে বের হতে উন্মুখ ব্যক্তিমানুষের অবস্থাটা কি গ্রেগর সামসার মতো না, যে কিনা একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখে সে এক পোকা হয়ে গেছে?

এসব নিয়ে লিখব ভাবছি, এরই মধ্যে একটা রাত পার হলো। আমি তারাশঙ্করের কবি উপন্যাস পড়া শেষ করলাম জীবনে তৃতীয়বার। সময়টা কাফকায়েস্ক কি না, সেই চিন্তা মাথার মধ্যে বারবার ভিড় করে এল যখন পড়ছি নায়িকা বসন্তর মৃত্যুর কথা। উপন্যাসে বসন্তের মৃত্যুর মধ্য দিয়েই নায়ক নিতাই হালকা-ঝাপসা ধরে উঠতে পারল জীবন-মৃত্যুর অপার রহস্যকে, আর তখনই তার মধ্যে স্রোতোধারার মতো জন্ম নিল মরমি সব গীতিকবিতা। একবার অসুস্থ বসন্ত নিতাইয়ের কোলে মাথা রেখে বিছানায় শোওয়া। বাইরে বাজনদার বেহালায় কী এক করুণ সুর তুলেছে। ওই সুর বাজছে কেঁপে কেঁপে, সুরটা এমন ভয়ংকর কোমলের খাদেও নেমে যাচ্ছে যে শরীর সত্যি ঝিমঝিম করে উঠছে, মনে হচ্ছে পৃথিবী নিঝুম, পৃথিবী হিম। বেহালার সুরের রাগিণীতে এই ক্ষুদ্রায়তন জীবনের অকিঞ্চনের ধাক্কাকে আর নিতে পারল না বসন্ত। নিতাইকে সে বলে বসল, ‘বেহালা! বেহালা বাজাতে বারণ করো গো!’ নিতাই জবাব দিল, ‘আ, শুনতে পাচ্ছ না? ওই যে, ওই যে! কেবল বেহালা বাজছে, কেবল বেহালা বাজছে।’

বিজ্ঞাপন

‘কেবল বেহালা বাজছে’ বাক্যটা তারাশঙ্কর দুবার লিখেছেন, আর তাতেই গায়ের লোম দাঁড়ানো এক ধাক্কায় পাঠক বুঝতে পারছেন জীবনের সত্যিকারের মানে কী। বেহালার বাজনা না শুনেও আমরা বাক্যটা ও রকম দুবার পড়ার মধ্য দিয়ে স্পষ্ট শুনতে পাই আমাদের সবার জন্য আসন্ন সেই শেষ মুহূর্তের করুণ রাগিণীকে।

বির এ অংশটুকু আমাকে বুঝিয়ে দিল যে করোনাভাইরাসের বয়ে আনা এই মৃত্যুময়তা পৃথিবীতে নতুন করে কোনো রাগই যোগ করেনি। পৃথিবী চিরকাল এমনই ছিল। আমরা স্রেফ ভুল বুঝেছি, পৃথিবী অন্য রকম।

জীবনকে তার আসল রূপে বুঝতে ভুল করার মধ্যেও একটা কাফকায়েস্ক ব্যাপার আছে। আপনি ভাবছেন জীবন একরকম, আর জীবন প্রতিমুহূর্তে করোনার মতো নানা অসুখ আর জ্বালাপোড়া আপনার দিকে ছুড়ে দিয়ে বলে দিচ্ছে জীবন আসলে এ রকম না, ও রকম। এই যে ভাবনা আর বাস্তবের মধ্যে কমিক্যাল এক সাতচাড়া খেলা, এই যে আপনি বুঝে যাচ্ছেন বেহালার করুণ রাগিণী চারপাশে, তবু ভাবছেন বাজুক বেহালা, কারণ এর সুরের মধ্যে আধ্যাত্মিক কী যেন এক মরমি কী আছে—এই যে আপনার এক্কাদোক্কার ছটফটানি, সেটা কাফকায়েস্কই। এই ছটফটানি আছে কাফকার ‘রায়’ গল্পের নায়ক গেয়র্গ বেনডেমানের মধ্যে, যার বাবা ছেলেকে বিয়ে করতে দিতে নারাজ, আর সেই নারাজি থেকে তিনি তরুণ গেয়র্গকে প্রলাপ-বকা এক সাংগীতিক সুরে বলে বসলেন, ‘নিরপরাধ এক শিশু তুমি, সত্যি; কিন্তু আরও বড় সত্যি এই যে তুমি একটা শয়তান।’ এই যে ‘সত্যি...আরও বড় সত্যি’ কথাটা, এর মধ্যে বেহালার করুণ রাগিণী খুঁজে পেয়েছেন কাফকা বিশেষজ্ঞেরা। তাঁরা বলেছেন, কথাটার প্রথম অংশে বাবা ছেলেকে ‘নিরপরাধ শিশু’ খেতাব দিয়ে সুখী এক সুরে ছেলের মন ভরিয়েছেন, কিন্তু পরের অংশে তাকে ‘শয়তান’ ডেকে, সেই ডাককে ‘আরও বড় সত্য’ বলে একটা ভাগনারিয়ান উন্মাদনার সুরে আবার তিনিই ছেলেকে ছিঁড়েফেঁড়ে ফেলেছেন। সেটারই নিশ্চিতকরণ আছে বাবার উচ্চারিত পরের বাক্যে, ‘আর তাই জেনে নাও, আমি তোমাকে পানিতে ডুবে মরার মৃত্যুদণ্ড দিচ্ছি।’

দুমাস আগে আমার নিজের যখন কোভিড, তখন অ্যাপোলো হাসপাতালে আমি বাংলাদেশের এক করপোরেট হাউসের বড় একজন মানুষকে দেখি কপালে বিরাট ব্যান্ডেজ লাগানো। জানতে পারি, করোনার ধাক্কায় তিনি ঘুম কী জিনিস তা ভুলে গেছেন এবং ও রকম পাঁচ রাত না-ঘুমের এক রাতে টলতে টলতে বাথরুমে পড়ে পানির লোহার ট্যাপে ধাক্কা লাগিয়ে এই অকাণ্ড ঘটিয়ে বসেছেন। এ মুহূর্তে আমি কল্পনা করতে পারি তার ডাক্তার সেদিন তাঁকে কী বলেছিলেন: ‘কপাল-টপাল ফেটে এ কী অবস্থা! উফ্, সত্যি আপনি একদম বাচ্চাদের মতো, কিন্তু তার চাইতেও বড় সত্যি—আপনি করোনাকে এখনো বুঝে উঠতে পারছেন না। এভাবে চললে মরবেন তো যেকোনো দিন।’ ভাবি, করোনাতে কত কত ডাক্তার এ রকম নিজের অজান্তেই নিটশেয়ান ক্ষমতালিপ্সু এক বিশ্ববীক্ষার চর্চা করেছেন এতগুলো মাস।

তারাশঙ্করের অতীন্দ্রিয় বেহালার সুর নিয়ে কথা বলছিলাম। আমাকে বলা হয়েছে, এই সময়ে মানুষের গ্রেগর সামসার মতো পোকায় রূপান্তর হয়ে যাওয়া নিয়ে লিখতে। কাফকার রূপান্তর উপন্যাসে গ্রেগর সামসা পোকা হয়ে যে নরকে নেমে যায় তা এক অভিজ্ঞতা বটে, আর কাফকাও তাঁর এই অভিজ্ঞতাকে মায়া ও নিষ্ঠুরতার পাশাপাশি ফোঁড়ে জুড়ে দেন সংগীত দিয়ে। মানুষ থাকতে গ্রেগর সংগীতের অনুরাগী ছিল না, আর এখন পোকা হয়ে কেবল সে-ই তার বোনের বেহালা বাজানোটা বুঝতে পারে। আমরা দেখি, গ্রেগর পার্থিব সব খাদ্য-খাবারের ওপরে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে, বোনের বাজানো বেহালার রাগিণীই এখন তার পুষ্টির একমাত্র উৎস। বোনের বেহালা শুনে গ্রেগর ভাবে: ‘সংগীত যদি মানুষের মনকে এইভাবে নাড়া দেয়, তাহলে কী করে হয় যে সে একটা পোকা?’ এই ধাঁধা-কুহকে ভরা বাক্যটা যেমন ‘রূপান্তর’ গল্পকে বোঝার একটা চাবি, তেমন ‘জীবনসত্য’ বোঝাও। পার্থিব জীবনের কাফকায়েস্ক সব সত্যের মুখোমুখি কাঁপতে কাঁপতে দাঁড়িয়ে থেকে আমাদের এক বৃহত্তর জীবনের, এক মরমি জীবনের দিকে যাওয়ার নান্দনিক আকাঙ্ক্ষাকেই কি এখানে ব্যক্ত করেছেন কাফকা? করোনার দিনে বাস্তবের অ্যাসিড টেস্ট নিলে কি টিকবে তাঁর এসব কথা?

বিজ্ঞাপন

‘কাফকায়েস্ক’ শব্দের অর্থই ধরি: ‘অর্থহীন, বিভ্রান্তকর, প্রায়শই ভীতিকর জটিলতা’; ‘পরাবাস্তব বিকৃতিতে ভরা নৈরাজ্যের বোধ-জাগানো অনুভূতি’; ‘দুঃস্বপ্নপীড়িত রকমের উদ্ভট কিছু’। এর প্রতিটা শব্দই আপনি মেলাতে পারবেন চারপাশের বাস্তব অবস্থার সঙ্গে—সেটা স্বাস্থ্য-ব্যবস্থা নিয়ে বলেন আর ইউটিউবে ছেড়ে দেওয়া বিপজ্জনক গোপন আলাপ-সালাপ নিয়ে বলেন, কিংবা শাহেদ নামের এক প্রতারকের টিভিতে মানবতার জয়গান গাইতে গাইতে করোনা টেস্টের নামে কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার কথাই বলেন। এই প্রতিটা বিষয়ই সুরহীন অতিরিক্ত গদ্যে ভরা, বঙ্কিমচন্দ্রের পুরুষালি গদ্যে একেকটা খিলানের মতো দাঁড়িয়ে থাকা অসুর যেন। আমাদের চারপাশের অন্ধকারের মধ্যে কবিতা কোথায়? অন্যায়-অবিচার-নিপীড়নে ভরা মানুষে মানুষে দূরত্বের এই সময়ে সাংগীতিক কোনো আত্মার উদ্ভাসের আয়োজন কোথায়?

কবিতাবিহীন এই কালে চতুর্দিকে আমি একটা কথাই শুনি আজকাল যে ‘লাইফ ইজ মিনিংলেস’—জীবন অর্থহীন। জীবনের মিনিং নেই বলতে নিশ্চয় এই সময়ের মানুষেরা বোঝাচ্ছেন, জীবনের কোনো তাৎপর্য নেই। মানে কোনো একটা দিকে যাওয়ার তীর চিহ্নটা মিসিং। ও রকম যখন কেউ বলে, তখন এমন না যে জীবন কী জিনিস তা সে ধরে উঠতে পারছে না। আদতে ব্যাপার হচ্ছে, কী জন্য বাঁচবে তা সে জানে না, তার সামনে কিছু নেই যে জন্য সে বাঁচতে চাইতে পারে। অর্থাৎ তার অস্তিত্ব কেবল ব্যাখ্যার অযোগ্যই না, সেটা একটা শূন্য, একটা ফক্কাও বটে। কিন্তু এই যে আমার অস্তিত্ব একটা ফাঁকা শূন্যতা, এটা বলার জন্যও দরকার অনেক কিছুর অর্থ থাকা। এ সময়ের সবচেয়ে চালু কথা—‘আমার জীবন অর্থহীন’ তাই একটা অস্তিত্ববাদী বিবৃতি, কোনো যৌক্তিক বাক্য নয়। যার জীবন অর্থহীন, সে কিন্তু জীবনের অস্তিত্বকে ধ্বংস করতে রেললাইনের দিকে ছুটবে, কাফকা বা তারাশঙ্করের লেখা কিংবা প্রথম আলো সাহিত্য পাতার দিকে না।

ম্যাকবেথ-এ ম্যাকবেথ যখন মৃত্যুর সময় বলে, জীবন কোনো এক মঞ্চের ওপরে ছটফটানি ভরা সময় পার করে পরে নিশ্চুপ হয়ে যাওয়া, অতএব জীবন কোনো ইডিয়টের বলা এক ফাঁপা আওয়াজে ভরা তাৎপর্যহীন কাহিনি, তখন অনেকগুলো প্রশ্ন চলে আসে মাথায়। ম্যাকবেথ এখানে জীবনের ক্ষণস্থায়িত্ব ও জীবনের ফক্কা—দুই সত্য নিয়েই বলেছে। অর্থাৎ সব যেহেতু ধুলোতেই মিলায়, তাই আমাদের সব অর্জন মিথ্যা। এই ধুলোয় মিলানোটা ট্র্যাজিকই হতে হবে, এমন কিন্তু কোনো কথা নেই। ট্র্যাজেডি বা দুঃখ মনের একটা অবস্থা মাত্র। সত্য হচ্ছে, জীবন এমনই। ট্র্যাজেডি বলেন আর কমেডি, করোনাকাল বলেন আর করোনাহীন কাল—জীবন এমনই। কেমনই? ম্যাকবেথের ভাষ্যমতে, এটা এক ইডিয়টের বলা কাহিনি।

কাফকায়েস্ক এই সময়ে দাঁড়িয়ে আমার মনে পড়ছে কাফকার ওই কথা: ‘নিরপরাধ এক শিশু তুমি, সত্যি; কিন্তু আরও বড় সত্যি হলো, তুমি একটা শয়তান।’ কাফকার এই দুই সত্যির বিভ্রান্তিকে সামনে রেখে পাঠকের উদ্দেশে আমিও একই রকম একটা প্রশ্ন রাখছি, জীবন নামের কাহিনি বলা এই ইডিয়টটা কে? আর যে কাহিনিটা বলা হচ্ছে তা কি কাহিনির মূল শাঁসে গিয়ে সত্যি অর্থহীন কোনো কাহিনি, নাকি তা সত্যি অর্থহীন এ কারণে যে একটা ইডিয়ট বলছে কাহিনিটা? নাকি আরও বড় সত্য এই যে সত্য দুটোই?

মন্তব্য পড়ুন 0