default-image

‘এটা কী বললেন ভাই? প্রেম-ভালোবাসা মিডিয়ার সৃষ্টি?’

‘অবশ্যই।’ ইকোনমিস্ট পত্রিকার ওয়েবসাইট খুলে জবাব দিলেন ইভান ভাই। ‘মিডিয়া না থাকলে এইসব প্রেম-ট্রেম কিচ্ছু থাকত না।’

অফিসের বস হওয়ার অন্যতম সুবিধা হলো, যা-তা বলা যায়। ইভান ভাই আমার বস। তাঁর সঙ্গে তর্ক করে ইনক্রিমেন্টের পথে ডিমেরিট পয়েন্ট যোগ করার মানে হয় না। আমি ভাইয়ের ল্যাপটপের দিকে তাকিয়ে রইলাম। ইকোনমিস্ট, নিউইয়র্ক টাইমস, টাইম—সবগুলোর সাইট খুলে রেখেছেন ইভান ভাই। জ্ঞানগর্ভ সাইট খুলে রাখা তাঁর অভ্যাস। আমার ধারণা, এগুলোর কোনো লেখা ভাই পড়েন না। উল্টো নিজের চিন্তাগুলো তিনি এই পত্রিকার নামে চালিয়ে দেন।

‘তো যা বলছিলাম,’ রিভলভিং চেয়ারটা ঘুরিয়ে আমার দিকে তাকালেন ইভান ভাই। ‘কোথায় যেন একটা লেখা পড়লাম এই বিষয়ে। একজ্যাক্টলি মনে নাই, লেখক ভদ্রলোক বলছেন, “আমরা প্রেম বলতে যা বুঝি, তা আসলে সম্পূর্ণ মিডিয়া দ্বারা প্রভাবিত।” তুমিই বলো, এই “প্রেম করা” ব্যাপারটার উৎপত্তিটা হলো কোত্থেকে?’

বিজ্ঞাপন

‘কোত্থেকে ভাই?’

‘ডেফিনিটলি মিডিয়া! নাটক-সিনেমা, গল্প-উপন্যাস। সাপোজ ধরো, ফর এক্সাম্পল, “মন্তু আর টুনি প্রেম করে”—এখানে “প্রেম করা” মানে কী, বলো।’

‘মন্তু কে ভাই?’

‘আহা, যে-ই হোক। যা জিজ্ঞেস করছি তার জবাব দাও। সাইড টক করো কেন?’

‘এক সাইডে বসছি তো…’

‘মানে?’

‘মানে ভাই, মন্তু-টুনি সেজেগুজে রিকশায় ঘোরে। রেস্টুরেন্টে যায়। কোনো একটা খাবার অর্ডার করে ঘণ্টার পর ঘণ্টা হাত ধরে পরস্পরের দিকে তাকিয়ে ফিসফাস করে। এর মধ্যে মন্তুর কোনো এক মেয়ের দিকে তাকানোকে কেন্দ্র করে অভিমান হয় টুনির। সেই অভিমান ভাঙাতে ভাঙাতে টুনিকে বাড়ি পৌঁছে দেয় মন্তু—এটাই তো “প্রেম করা”।’

‘রাইট।’ ইভান ভাই এখন খানিকটা উত্তেজিত, ‘অ্যাই মামুন, কফি দিলা না এখনো?’ বলে হাঁক দিলেন তিনি। তারপর তাকালেন আমার দিকে।

একটা দিন ছুটি চাইতে এলে যে সামাজিক বিজ্ঞানের ক্লাস করতে হবে, আগেই আঁচ করেছিলাম।

‘ওয়েল, আমরা যেন কোথায় ছিলাম?’

‘এখানেই ছিলাম ভাই… আশা করছি আরও অনেকক্ষণ থাকব…’

‘তোমার হিউমার দেখি ভালো ডেভেলপ করেছে। শোনো, যা বলছিলাম… এই যে দেখা করতে যাওয়া, প্রতিনিয়ত প্রেমিকাকে মুগ্ধ করার চেষ্টা করা, চমকে দেওয়া, আবার অযৌক্তিক কারণে অভিমান করলে সেটা ভাঙানো—এগুলো নাটক-সিনেমা দেখেই শেখা। তোমার যে ঘনিষ্ঠ বন্ধু, তাকে মুগ্ধ করার জন্য তোমার কিছু করতে হয় না। তাই না?’

‘জি ভাই। ও ছোটবেলা থেকেই মুগ্ধ।’

‘মানে?’

‘ওর নামই মুগ্ধ।’

‘আরে তোমার আর ফ্রেন্ড নাই? খেয়াল করবা, তোমাদের মধ্যে দারুণ আন্ডারস্ট্যান্ডিং। তার কোনো কিছু ঠিক না হলে তুমি ডিরেক্ট বলতে পারো, “কিছু হয় নাই”। প্রেমিকার ক্ষেত্রে এটা বললে তোমার প্রেম ভেঙে যাবে ব্যান্ডের মতো। তোমাকে সবকিছুতে একমত হতে হবে। একমত হলে সম্পর্ক টিকবে, নইলে নয়—এটা হেলদি রিলেশন হতে পারে?’

‘ভাই আমি নিজেই হেলদি না, আর রিলেশন!’

‘তুমি বিষয়টাকে সিরিয়াসলি নিচ্ছ না। এই যে প্রেমিকাকে খুশি করা, কাজকর্ম ফেলে তাকে সময় দেওয়া, যাবতীয় সবকিছু ভুলে যাওয়ার কমিটমেন্ট—এগুলো সিনেমাটিক চিন্তা। বাইরে এসব কনসেপ্ট নাই। সেখানে তুমি যদি পার্টনারকে বলো, “আমার অফিস আছে” সে কখনোই বলবে না, “কিসের অফিস? আজ দেখা করতেই হবে।” সে বলবে “ইটস ওকে।” এটাই সায়েন্স। তোমাকে সম্মান করতে হলে তোমার কাজকেও সম্মান করতে হবে, নাকি? ঘণ্টায় ঘণ্টায় ফোন দিয়ে “খাইসো”, “পৌঁছাইসো”—এসব কী? কিন্ডারগার্টেনের ছাত্রছাত্রী নাকি যে এসব জিজ্ঞেস করতে হবে? কেন সব অকেশনে দেখা করতেই হবে? অর্থহীন। যত সব স্বার্থপর চিন্তাভাবনা!’

বিজ্ঞাপন

কথা বললেই কথা বাড়বে ভেবে চুপচাপ বসে রইলাম মাথা নিচু করে। ইভান ভাই বললেন, ‘তো এই অর্থহীন কাজের জন্য তুমি ছুটি চাইছ? এটা কি ঠিক, বলো?’

‘ভাই, গত বছরও আমি ১৪ তারিখ ছুটি চেয়ে পাই নাই। আমার তো আর্ন লিভ আছে।’

‘তা আছে। কিন্তু এতগুলো প্রজেক্ট, এ সময় কী করে ছুটি দিই বলো? তোমাকে তো দায়িত্ব নিতে হবে। তোমার এখন যা বয়স, ক্যারিয়ারই হওয়া উচিত তোমার প্রেম-ভালোবাসা। ক্যারিয়ার ঠিক থাকলে প্রেমের অভাব হয় না। এখন যাও, প্রেজেন্টেশনটা রেডি করে ফেলো।’

দীর্ঘশ্বাস নিয়ে ফিরে এলাম নিজের ডেস্কে। মেসেজে মিতুকে লিখলাম, ‘ছুটি পাইনি।’ মেসেজ দেখল মিতু, জবাব দিল না। পরিস্থিতি সামলাতে টানা টাইপ করতে লাগলাম, ‘আসলে অফিসে অনেক কাজ। বস কিছুতেই ছুটি দিল না। অনেক অনুরোধ করেছিলাম...’

মিতু লিখল, ‘ইটস ওকে।’

এই ‘ওকে’ যে আসলে ওকে না, এটা বুঝতে আইনস্টাইন হওয়া লাগে না, আমি ভালোভাবেই বুঝলাম। কিন্তু কী করব!

১৪ ফেব্রুয়ারি অফিসে এসে কফির কাপ নিয়ে কাজে বসেছি। খুলব না ভেবেও খুলেই ফেললাম ফেসবুক। শুরুতেই দেখি ইভান ভাইয়ের ছবি। প্রেমিকার সঙ্গে ঘুরতে বেরিয়েছেন। হাত ধরে ছবি তুলে লিখেছেন, ‘হ্যাপি ভ্যালেন্টাইনস ডে’।

বিরক্তিতে চোখমুখ কুঁচকে উঠল আমার। কফিটা বোধ হয় বেশি তিতকুটে বানিয়ে ফেলেছে মামুন। আসলেই বসের কথাই ঠিক। প্রেম-ভালোবাসা মিডিয়ারই সৃষ্টি। ফেসবুকটা না খুললে তো বুঝতেই পারতাম না বস প্রেম করছেন!

অন্যান্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন