default-image

পুরোনো বই কেনা ও ঘাঁটাঘাঁটি করা আমার অভ্যাস। এই অভ্যাসের বশেই কিনেছিলাম ভারতীয় দর্শনবিষয়ক একটি পুরোনো বই। একদিন ক্লাসে বসে পড়াতে পড়াতে হঠাৎ বইটির শেষ দিকটার মাঝামাঝি একটি খাম দেখতে পাই, রুশ ভাষা ও কমিউনিস্ট রাশিয়ার হাতুড়ি-কাস্তেযুক্ত লালচিহ্ন আঁকা। খামের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে একটি চিঠি। লেখার নিচে সুফিয়া কামালের স্বাক্ষর। চিঠিটি পেয়ে বিশেষ আপ্লুত হই আমি। কারণ, চিঠিটি আর কারও নয়, বেগম সুফিয়া কামালের। আর যাঁর কাছে এটি লেখা হয়েছে, তিনিও স্বনামখ্যাত, দ্বিজেন শর্মা। ভিন্ন ভিন্ন কারণে দুজনই আমার প্রিয়।

পুরোনো বইয়ের ভেতর এ রকম চিঠি, চিরকুট, টুকরা কথা বহুবার পেয়েছি। কিন্তু আচমকা সুফিয়া কামালের হাতে লেখা চিঠির হদিস পাওয়াটা অবিশ্বাস্য লাগে আমার কাছে। এক নিশ্বাসে পড়ে ফেলি চিঠিটি। মনে হতে থাকে লুপ্ত রত্ন উদ্ধারের মতো কোনো ঘটনা ঘটছে।

চিঠিটি পড়ে কিছু অনুমান তৈরি করে নিই আমি। দ্বিজু বাবু কে? দ্বিজেন শর্মাই হবেন; সুফিয়া কামাল হয়তো এই নামেই তাঁকে সম্বোধন করতেন। কমিউনিস্ট রাশিয়ায় বাংলাদেশের অনেক প্রগতিশীল ও বামপন্থী লেখকের মতো দ্বিজেন শর্মাও ছিলেন। ফলে চিঠির সঙ্গে রাশিয়ান খাম পাওয়া গেছে।

বিজ্ঞাপন

চিঠিটিতে আমরা পাচ্ছি বিভিন্ন ব্যক্তিত্বের উল্লেখ ও প্রসঙ্গ। আবার কর্মনিষ্ঠ সুফিয়া কামালকেও দেখা যাচ্ছে চিঠিটির বয়ানে। আর আছে টুকরো কিছু ব্যক্তিগত অভিমান। নারীদের লেখালেখি নিয়ে তাঁর একটি মন্তব্য আছে, যা খুবই ভাবনা-উদ্দীপক, ‘বর্তমান মেয়েরা কত ভালো লিখছে, অথচ তাদের লেখার আলোচনা–সমালোচনা তো হচ্ছেই না, বরং এক রকম উপেক্ষাই করা হচ্ছে।’ এই প্রশ্ন এখনো প্রাসঙ্গিক, নারীদের লেখালেখি, চিন্তা, মতাদর্শ, রাজনীতি ইত্যাদি বিষয়ে সত্যিকার ‘সিরিয়াস’ গবেষণা ও সমালোচনা বাংলাদেশে হচ্ছে কি?

আলোচ্য চিঠিতে তারিখসংক্রান্ত একটি বিভ্রাট আছে। সুফিয়া কামাল চিঠির ওপরে তারিখ লিখেছেন, ৪ সেপ্টেম্বর ১৯৯০। তবে একই চিঠিতে আবার সুফিয়া কামাল লিখেছেন, দ্বিজেন শর্মা তাঁকে পত্রটি লিখেছিলেন একই বছরের ৯ সেপ্টেম্বরে। কিন্তু এটি তো সম্ভব নয়। যখন চিঠিটি সুফিয়া কামাল লিখছেন, তখন তাঁর বয়স প্রায় ৮০। তাই ভুল বা স্মৃতিভ্রষ্টতা তাঁর ঘটতেই পারে।

এখানে পত্রস্থ অপ্রকাশিত এই চিঠিতে তৃতীয় বন্ধনীর মধ্যে লিখিত অংশটুকু আমার বক্তব্য, সংশয় ও অনুমান। আর প্রকাশের সময় চিঠিতে সমকালীন বানানরীতি অনুসরণ করা হয়েছে।

৪-৪-৯০

কল্যাণীয়েষু দ্বিজু বাবু [দ্বিজেন শর্মা],

তোমার ৩০.১২.৮৯–এর চিঠি আমি পেয়েছিলাম ৯.৯.৯০ তারিখে। তুমি দেখা করে গেলে ১৯.০৩.৯০ তারিখে, দেখা হলো। কিছু কথা হলো। কিন্তু তোমার চিঠির জবাব দেওয়া হয়নি। তাই আজ লিখতে বসলাম।

আজ আমার বড় আনন্দের দিন। আমাদের মহিলা পরিষদ আজ ২০ বছর পূর্তি হলো। আজ সকালে জ্বর-সর্দি-কাশি-বুকে ব্যথা নিয়ে ৪ ঘণ্টা মিটিং করে এলাম। বহু মহিলারা এসেছিলেন। নারী, তথা মানবকল্যাণের ব্রত নিয়ে মহিলা পরিষদ আরও দৃঢ়তার সাথে সামনে চলবে, এই শপথে আমি আস্থাবান।

তোমার চিঠিটি আমাকে আনন্দ দিয়েছে। তুমি প্রশ্ন রেখেছিলে, পদ্মা–মেঘনা–যমুনায় আমি উপস্থিত নেই কেন। শুধু পদ্মা–মেঘনা–যমুনায় নয়, ’৭৭ যখন আমি আমেরিকায় ছিলাম, তখন বাংলা গবেষক এক আমেরিকান লেখক আমাদের বলেছিলেন, ‘তোমাদের লেখক সৈয়দ আলী আহসান ৩ খানা বাংলা সাহিত্যবিষয়ক বই লিখেছেন। অনেক জনার নাম আছে তাতে, কিন্তু আপনার উল্লেখ কোথাও নেই, অবশ্য তাতে করে আপনার কোনো ক্ষতি বৃদ্ধি হয় নাই, লেখকের অজ্ঞতারই প্রমাণ পেলাম আমরা।’ আমি কোনো উত্তর দিইনি, ওসব আমার ধরা-ছোঁয়ার বাইরে। কিন্তু যে আহসান হাবীবকে এককা [একা?] তার মেস থেকে বসন্তরোগে আক্রান্ত অবস্থায় আমি কলকাতায় আমার বাড়িতে এনেছিলাম, তখন আমার বড় ছেলে ৩–৪ মাসের আমার কোলে। অনেকেই তখন আমাকে সাবধান করেছিলেন, তার পরেও ’৫৫-তে আবার কলকাতা থেকে বিতাড়িত হয়ে অসহায় অবস্থায় ঢাকা আসার পর হাবীবের পুনর্বাসনের জন্য সপ্রাণ চেষ্টা করে রেডিওতে কাজের সংস্থানের উপায় করে দিয়েছিলাম। তার লেখায় বা কলকাতা থাকাকালীন ও পরে ’৪৭-এ ঢাকা এসে অসহায় কামরুল হাসান আমার কাছেই থাকল, ভাষা আন্দোলনের সময় কাগজ-রঙের অভাবে খবরের কাগজে চুন-হলুদ-কয়লার কালি দিয়ে পোস্টার এঁকে আমার বাড়ি থেকেই মিছিলে যাওয়া হতো। তার জীবনীতে কোথাও আমার উপস্থিতি নেই।

অসহায় কিশোর ফররুখ আহমদ যাদবপুর থেকে রোজ আমার পার্ক সার্কাসের বাড়িতে এসে আশ্রয় খুঁজত, শান্তি, সাহস পেত, কবিতা লিখত, তার জীবনীতেও কোথাও আমার উল্লেখ নেই, থাকবে না। তা হোক, কিন্তু আমার দুঃখ, বর্তমান মেয়েরা কত ভালো লিখছে, অথচ তাদের লেখার আলোচনা-সমালোচনা তো হচ্ছেই না, বরং এক রকম উপেক্ষাই করা হচ্ছে। আমার তো এখন ফালতু জীবন। সে যাহোক, এ দেশে সবকিছুর অবক্ষয় আমাকে বড় দুঃখ দেয়। আরও লিখতাম, হাতের লেখা ভালো নয়, তোমার পড়তে কষ্ট হবে। আমার এখন লিখতে হাত কাঁপে, তবুও কিছু লিখি। কিন্তু স্বাধীনতার কবিতা আমি লিখি না।

খুব দুঃখ বোধ করছি। তোমাকে, দেবীকে [দ্বিজেন শর্মার স্ত্রী] নিজে রেঁধে খাওয়াতে পারলাম না, তোমার কথা সব সময়ই মনে পড়ে। তোমরা সোয়াস্তিতে থাকো, ভালো থাকো এই দোয়া করি। বাচ্চাদের আমার স্নেহাশিষ দিয়ো, ওরা আমাকে চিনবে তো? কামাকে [সুফিয়া কামালের কবিতার রুশ অনুবাদক] আমার সম্ভাষণ জানায়ো। স্নেহাশিষ রইল।

সুফিয়া কামাল

* আমার ছেলে শামীমের খুব ইচ্ছা ছিল তোমাকে নিয়ে গাছগাছালির আলোচনা করার, তা-ও হলো না।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0