default-image

বিখ্যাত উর্দু কবি মির্জা গালিবের একজন প্রেমিকা ছিলেন। বাস্তব এই প্রেমিকা নিয়ে গল্প শোনা যায় অনেক। সত্য জানা যায় খুব কম। সাদত হাসান মান্টো ১৯৪৮ সালে জীবনের শেষ চিত্রনাট্য লিখেছিলেন মির্জা গালিব ও তাঁর সেই প্রেমিকাকে নিয়ে। পরে বোম্বেতে যে ক্লেয়ার রোডে মান্টো থাকতেন, তার নাম রাখা হয় ‘মির্জা গালিব মার্গ’।

মান্টোর চিত্রনাট্যে গালিবের সঙ্গে কেন্দ্রীয় চরিত্র ছিলেন একজন নৃত্য–গীত পটিয়সী নারী, যাঁদের তাওয়ায়েফ বলা হতো। ছবিতে তাঁর নাম ‘চৌদভি’, মানে চাঁদনি। পরবর্তীকালে গুলজার তাঁর টিভি ধারাবাহিক মির্জা গালিব-এ চরিত্রটির নাম দিয়েছিলেন নওয়াব জান। এই নামের কোনো ঐতিহাসিক সূত্র নেই। মুগল জান নামের একজন তাওয়ায়েফের নাম গালিবের একটি চিঠিতে বলা আছে। সে চিঠিতে গালিব বৃদ্ধ বয়সে নিজের যৌবনরূপের বর্ণনা করেছেন। এই মুগল জান গালিবের যৌবনের প্রেমিকা নন। বয়োজ্যেষ্ঠদের গালগল্পে বিশ্বাস করার উপায় নেই। ১৮৫৮ সালে গালিব নিজেই শিষ্য হরগোপাল তুফতাকে লিখেছিলেন,‘পূর্বজদের সব কথা সত্য বলে মেনে নিয়ো না। পুরোনো কালেও বোকা লোক ছিল।’ এখন অবধি গালিবের এই প্রেমিকার নাম আমাদের কাছে অজানাই রয়ে গেছে।

কিন্তু গালিবের এই প্রেমিকা নিয়ে কিছু ইশারা পাওয়া যায় বটে। গালিব বলেছেন, ‘যে কবির কবিতা বালাখানায় ডোমনি আর রাস্তায় ফকিরেরা গায়, তাকে কে মারতে পারে?’ এই প্রেমিকা ছিলেন তেমনই একজন ডোমনি (অন্ত্যজ শ্রেণির নারী)। মানে অভিজাত নন।

বিজ্ঞাপন

তাওয়ায়েফরা ছিলেন ডাকসাইটে সুন্দরী, নৃত্য-গীতে অনন্যা, অনেকেই কবি। অভিজাত পিতারা তাদের সদ্য তরুণ পুত্রদের তাওয়ায়েফদের আসরে পাঠাতেন আদবকায়দা ও ভদ্রস্থ কথাবার্তা শেখার জন্য। তাওয়ায়েফরা নগর থেকে নগরে যেতেন গানবাজনা করতে। তাওয়ায়েফদের গানের মাধ্যমে নিজেদের কবিখ্যাতি ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য তাদের মুখাপেক্ষী ছিলেন কবিরা। একক কবি হিসেবে উর্দু ভাষার প্রথম বই ছাপা হয় মাহলাকা চান্দার। ৫৬ বছর বয়সে ১৮২৪ সালে গত হওয়া হায়দরাবাদ দরবারের প্রভাবশালী এই কবি ছিলেন একজন তাওয়ায়েফ।

১৩ বছর বয়সে বিয়ে হয় গালিবের। বিয়েটি সুখের হয়নি। নিজের বিয়ে আর দাম্পত্য জীবন নিয়ে এক চিঠিতে তিনি লিখছেন, ‘৭ রজব ১২২৫ সালে আমার জন্য যাবজ্জীবন কারাবাসের বিধান হলো। একটা বেড়ি, অর্থাৎ বিবি আমার পায়ে পরিয়ে দেওয়া হলো আর দিল্লি শহরকেই আমার কারাগার সাব্যস্ত করে আমাকে সেই কারাগারে নিক্ষেপ করা হলো।’

বন্দী চায় তাজা হাওয়া। ফলে গালিব প্রেমে পড়লেন। গালিবের প্রেমিকা শেষ মোগল দরবারে নৃত্য–গীত ও কবিতার যোগে মুজরা করেছেন অনেকবার। গালিবের গজলে সুর বসিয়ে গেয়েছেন। তিনি নিজে কবিতা লিখতেন। গালিবের কাছে সেসব পাঠাতেন শুদ্ধির জন্য। কবির কাছে বারবার আরজি পাঠাতেন তাঁর আসরে আসার জন্য। গালিব বোধ হয় যেতেনও। সম্ভবত ১৮৬০ সালে গালিবের এক চিঠিতে সেই প্রেমিকার ইশারা পাওয়া যায়, ‘আজ থেকে চল্লিশ বছর বা তারও বেশি হবে।...সেই পথ চিরদিনের জন্য ছেড়ে এসেছি। তবে এখনো তার লীলাময়তার কথা মনে পড়ে। হায়! তার মৃত্যুর কথা কোনো দিন ভুলব না।’

চিঠি অনুযায়ী এই প্রেমকাহিনির সময় গালিবের বয়স ছিল ২৩ বছর। বন্ধু মুজাফফর হুসেইন খানের কাছে আরেক চিঠিতে কিছুটা অকপট বর্ণনাও পাওয়া যায়, ‘একসময় আমার ভাবনা আচ্ছন্ন করে রাখত পুষ্পমুখীদের প্রেম। ভাগ্য সেই সময় আমার পানপাত্রেও বেদনার মদিরা ঢেলে দিল। আমার সামনের পথ দিয়েই গিয়েছিল আমার প্রেমিকার শবযান। আমার প্রাণ সেই পথের ধুলো হয়ে উড়ছিল এখানে-সেখানে। সে ছিল এত সুন্দর যে ফুলের নজর লাগার ভয়ে তাকে ফুলবনে যেতেও বারণ করতাম!’

আরও পরে এক বন্ধুর পত্নীবিয়োগের প্রসঙ্গে নিজের যৌবনের গল্পচ্ছলে গালিব জানালেন, ‘মোগল সন্তানরাও আজব হয়! যার জন্য শেষ হয়, তাকেও শেষ করে রেখে যায়। আমিও মোগল সন্তান। এই জীবনে এক নির্দয় ডোমনিকে আমিও শেষ করে রেখেছি। তাঁর মৃত্যু সারা জীবনে ভুলতে পারব না।’

এই ব্যর্থ মনস্কাম প্রেমিকার সঙ্গে গালিবের সম্পর্ক কোনো পরিণতিতে পৌঁছানো সম্ভব ছিল না। প্রেমিকাকে উপপত্নীরূপে কাছে রাখার লোক ছিলেন না তিনি। একে একে তাঁর সাতটি সন্তান জন্মের কয়েক মাস পরই মারা গেছে। এরপরও দ্বিতীয় বিয়ে না করায় বন্ধু-স্বজনদের কাছে আশ্চর্য লোক বলে পরিচিত হয়েছিলেন গালিব।

সব মিলিয়ে গালিবের এই প্রেম কবির কল্পনা আর অসম্ভব কোনো বাস্তব হয়েই রয়ে গেল। মনোবেদনা আর সেই বেদনাজনিত কোনো অসুখে ভুগে অল্পকাল পরই মারা গেলেন গালিবের প্রেমিকা, ঐতিহাসিক সূত্র খুঁজে পাওয়া গেলেও যার নাম আমরা কেউ জানি না।

গালিবের কাছে এই মৃত্যুর খবর এসে পৌঁছায় অনেক পরে। তিনি শুধু প্রেমিকার সমাধি দর্শন করে বিছিয়ে এসেছিলেন নিজের প্রিয় কারুকার্যময় শাল। আর লিখেছিলেন একটি গজল। সেই গজলের পঙ্​ক্তি দিয়ে শেষ হোক এই প্রেমকাহিনি:

‘আমার বেদনায় তুমি হয়ে যাচ্ছ অধীর, হায় রে হায়!

কোথায় গেল নির্দয়, তোমার উদাসীন স্বভাব, হায় রে হায়।’

বিজ্ঞাপন
অন্যান্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন