বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

ধারণা করা হয়, ফেডারেল রেকর্ডে কবির নাম থাকায় তাঁর আবেদন গ্রহণ করা হয়নি। স্বভাবতই প্রশ্ন আসে, যুক্তরােষ্ট্রর ফেডারেল রেকর্ড ও কবিতা—দুইয়ের মধ্যে যোগাযোগটা কোথায়? কেন যুক্তরােষ্ট্রর ফেডারেল সরকারের গোয়েন্দা সংস্থা নোবেলজয়ী বিশ্ববরেণ্য এই বাঙালি কবির সম্পর্কে গোপন নথি সংরক্ষণ করল?

১৯১২ সালে প্রথম মার্কিন মুলুক ভ্রমণ করেন রবীন্দ্রনাথ। তখনো তিনি নোবেল পাননি। তাঁর আগমনের সেই ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রে সে সময় তেমন কোনো আলোড়ন ওঠেনি। ১৯১৩ সালে নোবেল পাওয়ার পর দুনিয়াজুড়ে তাঁর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। সম্ভবত বিশ্ববিখ্যাত হওয়ার কারণেই ফেডারেল সরকারের বিভিন্ন সংস্থার নজর কাড়েন তিনি। এ ছাড়া কবির বারবার বিশ্বভ্রমণ, স্বদেশি আন্দোলনে সম্পৃক্ততা, ব্রিটিশ রাজকীয় ‘নাইট’ উপাধি পরিহার, যুক্তরাষ্ট্রে হিন্দু-জার্মান ষড়যন্ত্রে তাঁর নাম যুক্ত হওয়া—এসব কারণে তিনি হয়তো যুক্তরােষ্ট্রর ফেডারেল সরকারের দৃষ্টিতে এসে থাকতে পারেন। ফলে ওই দেশের যুদ্ধ বিভাগের সামরিক গোয়েন্দা শাখা সারা পৃথিবীর বাছাই করা ব্যক্তিদের মতো রবীন্দ্রনাথের নামেও নথি খুলে তাঁর জীবনী তথ্য সংরক্ষণ শুরু করে। অনেকে আবার হিন্দু-জার্মান চক্রান্তের সঙ্গে তাঁর নাম যুক্ত হওয়াকেই মুখ্য কারণ হিসেবে চিহ্নিত করতে চান।

এগুলো এখন যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় মহাফেজখানাসহ তাদের ওয়েবসাইট ও ব্লগে সংরক্ষিত আছে।

হিন্দু-জার্মান চক্রান্তের বিস্তারিত

বিংশ শতাব্দীর প্রথম দশকে যুক্তরােষ্ট্রর সান ফ্রান্সিসকো শহরে জীবিকার প্রয়োজনে আবাস গড়েছিলেন বিপুলসংখ্যক ভারতীয়। তাঁদের অনেকেই তখন যুক্তরাষ্ট্রে বসেই নানাভাবে ভারতের ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে যোগ দেন। লেল্যান্ড স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারতীয় দর্শন ও সংস্কৃত ভাষার অধ্যাপক হরদয়াল ভারতীয়দের সংগঠিত করার চেষ্টা চালান। বিপ্লবী পন্থায় ব্রিটিশ শাসন থেকে ভারতকে মুক্ত করার উদ্দেশ্যে ১৯১৩ সালে প্যাসিফিক কোস্ট হিন্দুস্তানি অ্যাসোসিয়েশন প্রতিষ্ঠা করেন তিনি। হরদয়ালের সম্পাদনায় গদর নামে একটি উর্দু পত্রিকাও প্রকাশিত হয়। পরে অবশ্য পত্রিকাটির নাম পরিবর্তন করে হিন্দুস্তান গদর রাখা হয়। এই নাম থেকেই তাদের সংগঠনের নাম হয়ে যায় ‘গদর পার্টি’। সেই সময় তারা জার্মানি ও জাপানের সহযোগিতায় চীন থেকে জাহাজভর্তি অস্ত্র কিনে ভারতে ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে সংগ্রামরত স্বদেশিদের পাঠানোর ব্যবস্থা করেন।

তবে এই ‘ষড়যন্ত্র’টি অচিরেই ব্রিটিশ গোয়েন্দারা ফাঁস করে দেয়। যুক্তরােষ্ট্রর ভূখণ্ডে তাদের বন্ধুরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের জন্য গদর পাটির কর্মীদের বিচার হয়, যার নাম ছিল হিন্দু-জার্মান ষড়যন্ত্র। এই মামলার রায় ঘোষণার পর কোর্ট প্রাঙ্গণে রাম সিংয়ের পিস্তলের গুলিতে রামচন্দ্র এবং কোর্টে দায়িত্বরত অস্ত্র বহনকারী কর্মকর্তার (মার্শাল) পিস্তলের গুলিতে রাম সিং নিহত হন। বিভিন্ন মেয়াদে সাজা পান ৩২ আসামির মধ্যে ২৯ জন।

চক্রান্তে কীভাবে জড়াল রবীন্দ্রনাথের নাম

১৯১৬ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর দ্বিতীয়বারের মতো যুক্তরাষ্ট্রে আসেন রবীন্দ্রনাথ। তাঁকে বিপুল সংবর্ধনা দেওয়া হয়। বিখ্যাত সব দৈনিকের পৃষ্ঠাজুড়ে তাঁর ছবিসহ সাক্ষাৎকারও প্রকাশিত হয়। কিন্তু একই সঙ্গে ঘটে কিছু বিপত্তি। ৩০ সেপ্টেম্বর সান ফ্রান্সিসকোতে আসার পর ৫ অক্টোবর ঘটে এক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা।

যুক্তরাষ্ট্রে আসার পথে জাপান ভ্রমণকালে কট্টর জাতীয়তাবাদের নিন্দা করেছিলেন কবি। কিন্তু প্রবাসী ‘গদর’ অনুসারীদের কাছে তা সুখপ্রদ হয়নি। তা ছাড়া রবীন্দ্রনাথের ‘নাইট’ উপাধি গ্রহণও তারা ভালোভাবে নেয়নি। এর মধ্যে রবীন্দ্রভক্ত অধ্যাপক বিষাণ সিং মাট্টু তাঁর দুই সঙ্গী উমরাও সিং ও পারদাম সিংকে নিয়ে হোটেলে রবিঠাকুরকে এক অনুষ্ঠানে বক্তৃতা দেওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানাতে গেলে রামচন্দ্রের দুই সহযোগী হাত কাটা জিওয়ান সিং ও এইচ সিং হাতেশি তাঁদের বাধা দেন। বচসার একপর্যায়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে বিষণ সিংয়ের পাগড়ি। আর বাধাদানকারীদের পুলিশ গ্রেপ্তার করলে স্পষ্ট হয় তাদের পরিচয়। ঘটনাটি সাধারণ হলেও স্থানীয় সংবাদপত্রে তা ব্যাপক প্রচার পায়। পুলিশ এই ঘটনাকে কবিকে হত্যার একটি ‘চক্রান্ত’ বলে উল্লেখ করে।

তাই আদালতে কার্যবিবরণী চলার সময় চলে আসে রবীন্দ্রনাথের নাম। ১৯১৮ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি নিউইয়র্ক টাইমস সংবাদ ছাপে, ‘জার্মান চক্রান্তে টেগোরের নাম সংযুক্ত।’ (Link Tagore’s Name with German Plots)।

ওই সংবাদে বলা হয়েছিল, সরকার আজ তথাকথিত হিন্দু-জার্মান ষড়যন্ত্রে জার্মান কূটনীতিকের জড়িত থাকার কথা জনসমক্ষে প্রকাশ করে। সরকারি গোপন দলিলে ব্রিটিশ নাইট ও নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত কবি স্যার রবীন্দ্রনাথের নাম আগ্রহের ব্যক্তি হিসেবে উল্লেখ করা হয়। কারণ, তাঁর সঙ্গে জাপানের সাবেক রাষ্ট্রপ্রধান কাউন্ট ওকামা ও বর্তমান রাষ্ট্রপ্রধান কাউন্ট টেরাউচির যোগাযোগ রয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রে চীনের সাবেক মন্ত্রী ইউ টেঙ-ফেঙের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সাক্ষাৎকারের খবর পাওয়া গেছে।

তবে নিজের নাম যুক্ত হওয়ার কথা রবীন্দ্রনাথের কাছে পৌঁছাতে অনেক দেরি হয়ে গিয়েছিল। সংবাদটি পেয়ে ১৯১৮-এর ১১ মে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসনের (১৮৫৬-১৯২৪) কাছে একটি চিঠি পাঠান রবীন্দ্রনাথ। চিঠি পৌঁছাতে দেরি হতে পারে ভেবে তাঁকে একটি টেলিগ্রামও করেছিলেন। যদিও তত দিনে মামলার রায় ঘোষিত হয়ে গেছে। কয়েক মাস পর ভারতের তৎকালীন ভাইসরয় লর্ড চেমসফোর্ডের কাছ থেকে কবিকে একটি চিঠি দিয়ে জানানো হয় যে কথিত এই চক্রান্তের সঙ্গে তাঁর কোনো সংযোগ নেই। অভিযোগ থেকে তিনি মুক্ত।

প্রেসিডেন্টকে রবীন্দ্রনাথের চিঠি ও গোয়েন্দা নথিতে রবীন্দ্রনাথ

উইলসনকে লেখা চিঠিতে নিজের বক্তব্য স্পষ্ট করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। এখানে তাঁর সেই চিঠিটি অনুবাদ করে দিচ্ছি:


প্রিয় প্রেসিডেন্ট উইলসন,

আমি যখন যুক্তরােষ্ট্রর উদ্দেশে জাহাজে উঠতে যাচ্ছি, তার কিছুদিন আগে জাপান থেকে আমার হাতে কিছু পেপার কাটিং এসে পৌঁছায়, যেগুলোতে সান ফ্রান্সিসকোয় অনুষ্ঠিত ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে হিন্দু বিপ্লবীদের ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে অভিশংসনের তথ্য ছিল। আমি দেখেছি, বাদীপক্ষের পরিষদমণ্ডলী আমার নাম উল্লেখ করে ষড়যন্ত্রে আমার যুক্ত থাকার অভিযোগ এনেছেন। পাশাপাশি আদালতকে এই অভিযোগের সপক্ষে প্রামাণিক দলিল আছে বলে জানিয়েছেন।

এমনও বলা হয়েছে, গতবার আমার যুক্তরাষ্ট্রে ভ্রমণ কিছু জার্মান এজেন্টের প্ররোচনায় হয়েছিল, এবং তাদের আমি ধারণা দিয়েছিলাম যে কাউন্ট টেরিচি আমার গোপন প্রস্তাবের প্রতি অনুকূল আর কাউন্ট ওকামা সহানুভূতিশীল।

আমি নিশ্চিত, যুক্তরাষ্ট্রে আমার বন্ধুরা এবং যাঁরা আমার লেখা মনোযোগ দিয়ে পড়েছেন, তাঁরা কখনো এমন শ্রুতিমধুর মিথ্যার টুকরো বিশ্বাস করতে পারেন না, তবু আমার নামকে এই অপবাদের মধ্যে টেনে আনা আমাকে প্রচণ্ড ব্যথিত করেছে।

এটি বলার অপেক্ষা রাখে না যে সেই দেশপ্রেমে আমি বিশ্বাস করি না, যা উচ্চতর নম্রতার আদর্শের ওপর ভরসা করতে পারে না। আমি তাকে দেশের বিরুদ্ধে অশ্লীল কাজ বলে মনে করি, যখন দেশসেবার নামে গোপন মিথ্যা ও সহিংস অসাধু আচরণ করা হয়। দেশের যখন প্রয়োজন হয়েছে, তখন নিজের বক্তব্যে আমি যথেষ্ট স্পষ্টবাদী হয়েছি, আমার দেশবাসীর কাছে অপ্রিয় সত্য বলার ঝুঁকি নিয়েছি। পাশাপাশি এ দেশের শাসকদেরও একই কথা বলেছি। তবে আমি সেই সব কুটিল পদ্ধতির তীব্র নিন্দা জানাই, যা কোনো সরকার বা দলের দ্বারা গৃহীত হয়েছে এবং যাতে কর্তব্যের নামে শয়তানকে অংশীদার করা হয়েছে।

আপনার দেশবাসীর কাছ থেকে আমি সদয় ব্যবহার পেয়েছি। আপনার জন্য আমার গভীর শ্রদ্ধা আছে। রাজনীতির জগতে যথাযোগ্যভাবে এবং কাল ব্যতিক্রমে আপনি আদর্শবাদের প্রবর্তক। এ কারণে আপনার ও আপনার জনগণের কাছে আমি ঋণী। কেননা, আমার বিশ্বাসকে তারা গ্রহণ করেছে। আপনার জনগণকে আমি এই বলে আশ্বস্ত করতে চাই যে তাদের অতিথি আপ্যায়ন এমন একজনকে দেওয়া হয়েছে, যে তা গ্রহণ করতে প্রস্তুত ছিল, যখন রাষ্ট্রদ্রোহের পাতাল ময়লা নিকষিত হচ্ছিল।

আপনারই একান্ত

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

এখন দেখা যাক যুক্তরােষ্ট্রর যুদ্ধ বিভাগ কবির যে জীবনী তৈরি করেছিল, তাতে কী আছে। যুদ্ধ বিভাগের গোয়েন্দা শাখা প্রণীত রবীন্দ্রনাথের জীবনীর নথিটি ১৩ পৃষ্ঠার। মূল লেখাটি টাইপ করা এবং সেটিতে কেউ একজন জায়গায় জায়গায় হাতে লিখে নানা কিছু সংযোজন ও সংশোধন করেছেন। এই জীবনী সংক্ষিপ্ত হলেও কবির জীবনে সব গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় এখানে উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ যে দুটি বিষয় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে তা হলো, কানাডা থেকে যুক্তরাষ্ট্র প্রবেশকালে তাঁকে সীমান্তে যুক্তরােষ্ট্রর ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ কর্তৃক নিগ্রহের কথা এবং সান ফ্রান্সিসকোতে হিন্দু-জার্মান চক্রান্তে কবির সম্পৃক্ততার কথা।

গোয়েন্দা নথির প্রথম পৃষ্ঠায় রবীন্দ্রনাথের জীবনী শুরু করা হয়েছে এভাবে:

‘স্যার রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। কবি, নাট্যকার, দার্শনিক, ইতিহাসবেত্তা, সংগীতজ্ঞ, চিত্রকর ও অভিনেতা। ভারতের সর্বশ্রেষ্ঠ কবি। ১৯১৩ সালে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। তাঁর জন্ম কলকাতায় ১৮৬১ সালের ৭ মে। তিনি মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের সন্তান ও প্রিন্স দ্বারকানাথের পৌত্র।’

এরপর ধারাবাহিকভাবে বর্ণনা করা হয়েছে তাঁর পারিবারিক ঐতিহ্য, বাল্যকালের শিক্ষাজীবন, বিলেত গমন ইত্যাদি। এখানে প্রথম জীবনে রবিঠাকুরের তীব্র জাতীয়তাবাদী ও স্বদেশি আন্দোলনে পাদপ্রদীপে থাকার কথাসহ তাঁর লেখা এবং তাঁর জীবনের খুঁটিনাটি প্রসঙ্গও বাদ যায়নি।

মার্কিন নথিতে অনেকবার রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নাম থাকলেও কথিত হিন্দু-জার্মান চক্রান্তের ঘটনায় তাঁর নাম আসা অবশ্যই বিরাট এক ঘটনা। তবে এটি ছাড়াও ১৯৬১ সালে রবীন্দ্রজন্মশতবার্ষিকীতে সেই সময়ের মার্কিন প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডির বাণীর খসড়া ইত্যাদি কারণে যুক্তরােষ্ট্রর গোয়েন্দা নথিতে রবীন্দ্রনাথের নাম আরও এসেছে, পরে সেগুলো নিয়ে বিস্তারিত লেখা যাবে। তবে এই ঘটনা যতটা চমকপ্রদ, অন্যগুলো হয়তো ততটা নয়।

অন্যান্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন