বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

স্বাধীন দেশের প্রথম বর্ষবরণ বাঙালির আবেগকে গভীরভাবে স্পর্শ করেছিল। কেননা পাকিস্তানি সামরিক জান্তাদের শাসন-শোষণামলে পয়লা বৈশাখ ও বাংলা বর্ষবরণের অনুষ্ঠান নানা বাধা-বিপত্তির মধ্যে পালন করতে হয়েছে। আর ১৯৭১ সালের বর্ষবরণ তো বাঙালিরা করতেই পারেনি। একাত্তরের পয়লা বৈশাখ পালন তো দূরে থাক, ৩১ চৈত্র ১৩৭৭, বায়তুল মোকাররম থেকে শান্তি কমিটি ও রাজাকাররা মুক্তিযুদ্ধবিরোধী বিক্ষোভ-মিছিল বের করেছিল। পরদিন পয়লা বৈশাখ ১৩৭৮ (১৪ এপ্রিল ১৯৭১), দৈনিক আজাদ পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা যায়, মিছিলে অংশ নেওয়া শান্তি কমিটির সদস্য ও রাজাকারদের হাতে ছিল লাঠি, পাকিস্তানি পতাকা, মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ আর ইয়াহিয়া খানের ছবিসংবলিত প্ল্যাকার্ড। তাই সংগত কারণে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম বর্ষবরণের নানা আয়োজনে দখলদার বাহিনীর বুলেটবিদ্ধ পটভূমি ও বিধ্বস্ত বাস্তবতার প্রতিফলন ছিল। এদিন প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জাতির উদ্দেশে দেওয়া বাণী এবং দৈনিক সংবাদপত্রগুলোর প্রতিবেদনেও এই চিত্র পাওয়া যায়।

১৪ এপ্রিল ১৯৭২–এর দৈনিক বাংলার প্রথম পাতায় ছয় কলামে প্রকাশিত প্রধান প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল, ‘রক্তস্নাত বাংলায় নববর্ষ এসেছে।’ প্রতিবেদনের সঙ্গে প্রকাশিত ছবিটিতে দেখা যায়, ভোরের মেঘাচ্ছন্ন আকাশে উদীয়মান সূর্যের আলোয় একটি কবুতর ওড়ার চেষ্টা করছে। গোলাম মাওলার তোলা ছবিটির ক্যাপশনে লেখা হয়, ‘রক্তেভেজা ছাড়পত্রে নববর্ষের অরুণোদয় শান্তির পাখা মেলুক নতুন সম্ভাবনায়’। শেষের পাতায় ‘রিক্ত বাংলায় চিরদিনের বৈশাখ নতুন রূপে’ শিরোনামের প্রতিবেদনে ছিল মুক্তিযুদ্ধকালীন অবরুদ্ধ এবং পাকিস্তান আমলে পরাধীনতার শেকলে বন্দী বাঙালির বর্ষবরণের তথ্য। দ্য বাংলাদেশ অবজারভার পত্রিকার প্রধান শিরোনাম ছিল: বঙ্গবন্ধু’স নিউ ইয়ার’স আপিল টু ওয়ান অ্যান্ড অল—রিবিল্ড সোনার বাংলা। সঙ্গে প্রকাশিত ছবিটিতে দেখা যায়, সূর্যালোকে একজন শ্রমিক হাতে হাতুড়ি দিয়ে কাজ করছেন, তাঁর মাথার ওপরে টাঙানো একটি ছাতা।

default-image

এদিন দৈনিক সংবাদ–এ ‘সোনার বাংলা গড়ে তোলাই হউক নববর্ষের শপথ’ শিরোনামে বঙ্গবন্ধু বাণী ছাপা হয়। প্রথম পাতায় প্রকাশিত মূল ছবিটিতে দেখা যায়, প্রজ্বলিত মোমের আলোয় হাস্যোজ্জ্বল একটি শিশু। জাতির উদ্দেশে দেওয়া বাণীতে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘বাংলাদেশকে “সোনার বাংলা” হিসেবে গড়তে হবে, এটাই হোক আমাদের নববর্ষের অঙ্গীকার।...সুদীর্ঘ পঁচিশ বছরের দুঃখ-দুর্দশা, সংগ্রাম এবং ত্যাগ-তিতিক্ষার পর এক রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে রক্তিম বলয় খচিত সবুজ পতাকা উড়ছে আজ বাংলাদেশের ঘরে ঘরে। তাই আসুন, সবাই এই পতাকার সম্মান অক্ষুণ্ন রাখবার উদ্দেশ্যে লাখো শহীদের আত্মার নামে শপথ করে দেশ গড়ার কাজে নিজেকে উৎসর্গ করি।’

বর্ষবরণ উদ্‌যাপনে বিগত স্বাধীনতাযুদ্ধে ৩০ লাখ শহীদের প্রতি শ্রদ্ধা এবং অসংখ্য মানুষের স্বজন হারানোর বেদনার বিষয়টি বিবেচনায় রেখে বিভিন্ন সংগঠন ও প্রতিষ্ঠান সেদিন নানা অনুষ্ঠানের করে। ভোর সাড়ে পাঁচটায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে সুসজ্জিত প্রভাতফেরি বের করে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন। যদিও শহীদ মিনারটি ছিল তখনো মিনারবিহীন। কারণ, মুক্তিযুদ্ধের সময় শহীদ মিনারকে ধ্বংস করে দিয়েছিল হানাদার পাকিস্তানি সেনারা।

যা–ই হোক, সকাল সাতটায় রমনার বটমূলে ছায়ানটের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে সন্‌জীদা খাতুনের নেতৃত্বে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম বাংলা সনকে বরণ করে নেওয়া হয়। ১৯৬৭ সাল থেকে শুরু হওয়া ছায়ানটের এই বর্ষবরণ উৎসব ১৯৭১ সালে অনুষ্ঠিত হয়নি। তবে ১৯৭২–এ ছায়ানটের বর্ষবরণ নিয়ে সচেতন মধ্যবিত্ত শ্রেণির মধ্যে বেশ উৎসাহ দেখা যায়। তখনকার পত্রপত্রিকায়ও এর প্রতিফলন রয়েছে। সে সময়ের দৈনিক পত্রিকাগুলো থেকে আরও দেখা যায়, বাংলা একাডেমিতে বিচিত্রা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এ অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করেও কবি–সাহিত্যিকদের মধ্যে সে বছর যথেষ্ট উদ্দীপনা লক্ষ্য করা যায়।

স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম নববর্ষ উপলক্ষে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ প্রভাতফেরি, শহীদদের কবরে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ এবং বিশেষ মোনাজাতের আয়োজন করে। বাংলা একাডেমিতে হয় বিশেষ সংগীতানুষ্ঠান। আর এদিন কচিকাঁচার মেলার অনুষ্ঠানের বিশেষ আকর্ষণ ছিল শিশুদের নৃত্য। অন্যান্য সংগঠনও নানা আয়োজনে নতুন বছরকে বরণ করে নেয়। এ ছাড়া মসজিদ, মন্দির ও গির্জায় মোনাজাত ও প্রার্থনায় দেশ ও জাতির কল্যাণ কামনা করা হয়। এ উপলক্ষে সব শ্রেণির মানুষ প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে দেখা করে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন।

এখনকার পয়লা বৈশাখের সঙ্গে আজ থেকে পঞ্চাশ বছর আগের পয়লা বৈশাখের তুলনাই চলে না। তবে এ কথা বলা যায়, ১৯৭২ সালে (১৩৭৯ বঙ্গাব্দ) দেশের মানুষের কাছে পয়লা বৈশাখ বা নববর্ষ হাজির হয়েছিল দেশ গড়ার প্রত্যয় নিয়ে।

অন্যান্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন