জাগরণের ধারাবাহিকতায় আরেক বছর

বছরের শেষভাগে ওটিটি প্ল্যাটফর্ম ‘চরকি’তে মুক্তি পাওয়া মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর চলচ্চিত্র সামথিং লাইক অ্যান অটোবায়োগ্রাফি দেখে মুগ্ধ হয়েছেন দর্শকেরা

প্রেক্ষাগৃহে মুক্তিপ্রাপ্ত চলচ্চিত্র, ওটিটি প্লাটফর্মের চলচ্চিত্র ও ওয়েব সিরিজ—এই তিন ধরনের চলমান চিত্রকে বিবেচনায় নিয়ে এই নিবন্ধে ২০২৩ সালের চলচ্চিত্রের পর্যালোচনা করা হয়েছে। বুসানে বলীর পুরস্কার জয়, রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের মুজিব: একটি জাতির রূপকার, শাকিব খানের ব্লকবাস্টার প্রিয়তমা, স্বাধীন ছবি সাঁতাও এবং ওটিটির ছবি সামথিং লাইক অ্যান অটোবায়োগ্রাফি—পাঁচটি শিরোনাম হলো ২০২৩ সালের হাইলাইট, যা এ বছরের চলচ্চিত্রপ্রবণতার সংক্ষিপ্তসারও বটে।

প্রেক্ষাগৃহে মুক্তিপ্রাপ্ত হিমেল আশরাফের প্রিয়তমা আবারও প্রমাণ করেছে যে শাকিব খান এখনো মূল ধারার চলচ্চিত্রে অপ্রতিদ্বন্দ্বী সুপারস্টার। তবে এফডিসির বাইরে থেকে উঠে আসা নতুন প্রজন্মের নির্মাতারাই এখন মূল ধারায় নেতৃত্ব দিচ্ছেন। রায়হান রাফীর সুড়ঙ্গ আরেকটি ব্যবসাসফল চলচ্চিত্র, যাতে ছোট পর্দার জনপ্রিয় অভিনেতা আফরান নিশোর বড় পর্দায় অভিষেক হয়। চলচ্চিত্রটি পশ্চিমবঙ্গেও মুক্তি পায়। রায়হান রাফী সম্ভবত নতুন এক নির্ভরযোগ্য নির্মাতা, যিনি সংখ্যার বিচারে সবচেয়ে সক্রিয়, ওটিটি ও প্রেক্ষাগৃহ উভয় ক্ষেত্রে দাপটের সঙ্গে চলচ্চিত্র নির্মাণ করে চলেছেন। চয়নিকা চৌধুরীর প্রহেলিকার সাফল্য অপ্রত্যাশিত ছিল, যার মাধ্যমে মাহফুজ আহমেদ অভিনয়ে ফিরলেন। এসব নির্মাতার কেউই প্রাথমিকভাবে এফডিসি ঘরানার নন। দুর্বল ও গতানুগতিক গল্প, মান্ধাতা ও অচল ক্যামেরাভাষা এবং উচ্চকিত অভিনয়ের এফডিসি-ঐতিহ্যের চলচ্চিত্র করোনার সময় যে সংকটে পড়ে, তা থেকে আর বেরোতে পারেনি। গত কয়েক বছরে সম্ভবত সে ধারার মৃত্যুও নিশ্চিত হয়েছে। শাকিব খানের ছবিকেও হতে হয় জীবনের কিছুটা কাছাকাছি, নির্মিতিতে থাকতে হয় যত্ন ও বিশ্বাসযোগ্যতা।

নিঃসন্দেহে মুজিব: একটি জাতির রূপকার সবচেয়ে আলোচিত চলচ্চিত্রগুলোর একটি। ভারতের প্যারালাল চলচ্চিত্রের নামী নির্মাতা শ্যাম বেনেগাল চলচ্চিত্রটির পরিচালক। বাংলাদেশ ও ভারত সরকারের যৌথ প্রযোজনায় নির্মিত ব্যয়বহুল এ ছবিতে বাংলাদেশের বিনিয়োগই বেশি। ছবিটি ভারতেও হিন্দি ও বাংলায় মুক্তি পায়। দুই দেশেই ছবিটি মিশ্র মূল্যায়ন পেয়েছে। এখানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবন, মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপট ও বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্মের ঘটনাবলি বঙ্গবন্ধু-পত্নীর বয়ানে বর্ণিত হয়েছে, যা দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক রাজনীতি ও ইতিহাসে বাংলাদেশ ও ভারতের তৎকালীন যৌথতা ও বন্ধুত্বকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেছে। সে হিসেবে ছবিটির লক্ষ্য অর্জিত হয়েছে। মুজিব শতবর্ষ উপলক্ষে মুজিবকে নিয়ে গত কয়েক বছরে ১০টির মতো চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে, কিন্তু এই চলচ্চিত্র ছাড়া কোনোটিই কোনো আলোচনার জন্ম দিতে পারেনি।

মুক্তিযুদ্ধকে ঘিরে অনন্য এক আন্তর্জাতিক ঘটনা নিয়ে নির্মিত চলচ্চিত্র হলো জেকে ১৯৭১। ফখরুল আরেফিন খানের এই চলচ্চিত্র ইংরেজি ভাষায় নির্মিত। হৃদি হকের মুক্তিযুদ্ধনির্ভর ও অনুদানের চলচ্চিত্র ১৯৭১: সেই সব দিন প্রশংসিত হয়েছে সুন্দর গল্প ও যত্নবান নির্মিতির জন্য। 

এ বছরের একটি উজ্জ্বল চলচ্চিত্র হলো খন্দকার সুমনের সাঁতাও। উত্তরবঙ্গের কৃষিনির্ভর সমাজে মানুষ, প্রকৃতি ও প্রাণীর পরস্পরনির্ভরতার যে আবহমান জীবন, তার সৎ ও জীবনঘনিষ্ঠ রূপায়ণ হলো এই চলচ্চিত্র। অ্যাকশন-থ্রিলারের ভিড়ে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর লড়াকু জীবনের গল্প বলার প্রায় হারাতে বসা ঐতিহ্যকে আবার মনে করিয়ে দিয়েছে গণ–অর্থায়নে নির্মিত এই চলচ্চিত্র। 

প্রেক্ষাগৃহের বাইরে ওটিটিতে কিছু চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে। এসবের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর সামথিং লাইক অ্যান অটোবায়োগ্রাফি। নির্মাতা ও তাঁর স্ত্রীর বিলম্বে সন্তান জন্মদান প্রক্রিয়ার ব্যক্তিগত গল্পটি একপর্যায়ে বৃহত্তর সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে যুক্ত হয়ে যায় এবং দেখানো হয় যে আমাদের ব্যক্তিগত জীবনও রাজনীতি ও ক্ষমতাসম্পর্কের বাইরে নয়। ওয়েব জগতের আরেকটি উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র হলো নুর ইমরান মিঠুর পাতালঘর। একজন নায়িকা ও তার মায়ের অস্বস্তিকর সম্পর্ক এবং নিজ নিজ পেশাগত অন্ধকার দিক একটি ছোট শহরের প্রেক্ষাপটে ফেলে জীবনের গল্প বলেছেন পরিচালক। মিজানুর রহমান আরিয়ান নির্মাণ করেছেন পারিবারিক গল্প পুনর্মিলনে ও রোমান্টিক কাহিনি উনিশ ২০। এ ছাড়া থ্রিলার ঘরানার ছবি হলো রায়হান রাফীর ফ্রাইডে এবং শিহাব শাহীনের বাবা, সামওয়ান ইজ ফলোয়িং মি কলকাতার ওটিটি ‘হইচই’ আগে থেকেই বাংলাদেশে কাজ করছিল, এ বছর ‘চরকি’ কলকাতায় তাদের অফিস খুলেছে। ইন্টারনেটের সুযোগ নিয়ে বাংলাভাষীদের মধ্যে যৌথতা ও আদান–প্রদান এখন নিয়মিত বিষয় হয়ে উঠেছে। জয়া আহসান ও আজমেরী হক বাঁধনের বলিউডে অভিষেক উল্লেখযোগ্য একটি ঘটনা। চঞ্চল চৌধুরী, মোশাররফ করিম ও তাসনিয়া ফারিণ কলকাতার চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন।

ওটিটি প্লাটফর্মের আদরণীয় ফরম্যাট হলো ওয়েব সিরিজ, কারণ দর্শক ধরে রাখার কাজটি সিরিজগুলোই করে। ফলে ওটিটি প্রযোজিত চলচ্চিত্রের চেয়ে সিরিজগুলো আলোচিত হয় বেশি। আশফাক নিপুণ মহানগর ২ সিরিজে ওসি হারুন চরিত্রে আবার হাজির করেন মোশাররফ করিমকে। আগের সিজনের ওসি হারুন ছিলেন ধূর্ত ও অসৎ। তাঁর বিবেচনায় সিস্টেমের মধ্যে থেকে তিনি সিস্টেমের ভূত তাড়ান। কিন্তু সেই লক্ষ্যে এগোতে গিয়ে এই সিজনে তাঁকে দেখা যায় ভিকটিম হিসেবে। গোয়েন্দা সংস্থার হাতে অজানা স্থানে বন্দী হারুনের বয়ানের মাধ্যমে উঠে আসে এক বৃহত্তর সামাজিক ও রাজনৈতিক গল্প। শিহাব শাহীনের সিন্ডিকেট ওয়েব সিরিজের আলোচিত ছোট চরিত্র বড়ো আকারে মাইশেলফ অ্যালেন স্বপন শিরোনামে সিরিজে হাজির হন নাসির উদ্দিন খান। অপরাধী অ্যালেন স্বপন তার চারিত্রিক বর্ণিলতা দিয়ে মুগ্ধ করেন দর্শকদের। মাদক কার্টেলের একেবারে নিচের দিকের সদস্য এক নারী ড্রাগ পেডলারকে নিয়ে ওয়েব সিরিজ গুটি নির্মাণ করেছেন শঙ্খ দাশগুপ্ত, যাতে আজমেরী হক বাঁধন পুনরায় তাঁর অভিনয়প্রতিভার প্রমাণ রেখেছেন। আলোচিত অন্য দুটি থ্রিলার সিরিজ হলো তানিম রহমান অংশুর বুকের মধ্যে আগুন ও আবু শাহেদ ইমনের মারকিউলিস। কমেডি সিরিজ ইন্টার্নশিপ পরিচালনা করেছেন রেজাউর রহমান। তিন প্রেমের গল্পের অ্যান্থলজি হলো গৌতম কৈরীর আন্তঃনগর। গোলাম সোহরাব দোদুল ধর্ষণের ঘটনার সূত্র নিয়ে নির্মাণ করেছেন কোর্টরুম ড্রামা মোবারকনামা। ওয়েব সিরিজগুলো সবই ‘চরকি’ অথবা ‘হইচই’–এ মুক্তি পেয়েছে।

এ বছর আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে বড় একটা খবরের জন্ম দিয়েছে ইকবাল হোসাইন চৌধুরীর বলী। দক্ষিণ কোরিয়ার বুসান আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের সেরা ‘নিউ কারেন্টস অ্যাওয়ার্ড’ জেতে চলচ্চিত্রটি, যা যেকোনো বাংলাদেশি সিনেমার জন্য প্রথম। বুসান হলো এশিয়ার সবচেয়ে বড় চলচ্চিত্র উৎসব। প্রখ্যাত ভ্যারাইটি ম্যাগাজিন বুসানের খবর দিতে গিয়ে শিরোনামে উল্লেখ করে ‘বাংলাদেশ’স বুমিং প্রেজেন্স’-এর কথা। বলী ছাড়া বুসানে অংশ নেয় সামথিং লাইক অ্যান অটোবায়োগ্রাফি ও বিপ্লব সরকারের আগন্তুক। তিনটি ছবিই দুই ক্যাটাগরিতে প্রতিযোগিতার জন্য মনোনীত হয়। আকরাম খানের ‘নকশী কাঁথার জমিন’ এ বছরই আন্তর্জাতিক উৎসবে অংশ নিতে শুরু করে। এসব ছবি হয়তো ২০২৪ সালে মুক্তি পাবে। ওদিকে বেশ কয়েক বছর ধরে, উত্তর আমেরিকার মূল ধারার প্রেক্ষাগৃহে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র মুক্তি পাচ্ছে। মূলত বিদেশে বসবাসরত বাংলাদেশিরাই এসব পরিবেশনার দর্শক। ২০২৩ সালে উত্তর আমেরিকায় মুক্তিপ্রাপ্ত চলচ্চিত্র হলো প্রিয়তমা, অন্তর্জাল ও কাজী আনোয়ার হোসেনের মাসুদ রানা অবলম্বনে আসিফ আকবরের এম আর নাইন। এ বছরও ফারুকীর শনিবার বিকেল তার সেন্সর লড়াই নিয়ে সংবাদে ছিল। এই ছবির সেন্সর লড়াই নিয়ে নিউইয়র্ক টাইমসও বড় নিবন্ধ ছাপে। দেশে সেন্সর না পেলেও ছবিটি আমেরিকা ও কানাডায় এ বছর মুক্তি পায়।

সব মিলিয়ে বলা যায়, বাংলাদেশের চলচ্চিত্র যে প্রেক্ষাগৃহে, ওটিটিতে ও আন্তর্জাতিকভাবে ভালো একটা সময় পার করছে, ২০২৩ সাল তার শক্ত সাক্ষ্য দিচ্ছে।


ফাহমিদুল হক: চলচ্চিত্র সমালোচক