কবির ফ্যাশন: কেমন ছিল আশির দশক

আশির দশকের কবিদের ছবি অবলম্বনে প্রথম আলো গ্রাফিকস

কবি শুনলেই কফি হাউসের আড্ডার ‘কবি কবি চেহারা কাঁধেতে ঝোলানো ব্যাগ’–এর কথা মনের পর্দায় ভেসে ওঠে। অথবা কবিমাত্রই যেন চেহারায় উষ্কখুষ্ক ভাব, পোশাকে-আশাকে এলোমেলো একটি মলিন মুখ। সমাজে প্রচলিত এই ছবিটাকেই যেন স্পষ্ট করে তুলেছিলেন হুমায়ূন আহমেদ তাঁর ‘কবি’ উপন্যাসে। তরুণ কবি আতাহারের চিরচেনা ও প্রধান পোশাক পাঞ্জাবি। উপন্যাসে হুমায়ূন আহমেদ সেই পোশাকের বর্ণনা দিয়েছেন, ‘পাঞ্জাবিতে ইস্তিরি নেই, দলামোচা ভাব। সেটা কোনো ব্যাপার না—নতুন জামাইদের ক্ষেত্রেই ইস্তিরি করা পাঞ্জাবি বাধ্যতামূলক, সে নতুন জামাই নয়। সমস্যা একটাই—পাঞ্জাবির পেটের কাছে হলুদ দাগ। মনে হয় গোশত দিয়ে ভাত খাবার পর কেউ একজন হাত না ধুয়ে পাঞ্জাবিতে হাত মুছে ফেলেছে।’

তবে অবহেলা, অনাদরে ক্রমশ ম্রিয়মাণ হলেও কবি নিতাইয়ের যে অবয়ব তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় ‘কবি’ উপন্যাসে দাঁড় করিয়েছেন, সেখানে অনিশ্চিত জীবনের বিপরীতেও নিতাই সগৌরবে নিজেকে দেখতে চেয়েছে মর্যাদার আসনে। তাই ডাকাত বংশে জন্মেও স্বভাব-কবি নিতাইচরণ নিজের কবিসত্তাকে সমাজের বুকে মর্যাদাপূর্ণ করে তুলতে গায়ে একটি চাদর জড়াত। এক জোড়া নতুন জুতাও সে কিনেছিল। কারণ, নিতাই জানত, ‘চাদর না হইলে কবিয়ালকে মানায় না’। বিশ্বাস করত, ‘ভেক নহিলে ভিখ মিলে না’...‘নগ্নপদ জনের পদবি মানুষ সহজে স্বীকার করিতে চায় না।’ অর্থাৎ, সমাজে কবির স্বীকৃতি পেতেই নিতাই নিজেকে সাজিয়ে তুলেছিল চাদর ও জুতোয়। আর পোশাকের কদর বুঝেছিল বলেই যাযাবর কবিয়াল জীবনেও সেই ধারাটি বজায় রেখেছিল।

হুমায়ুন আজাদ তাঁর ‘কবি অথবা দণ্ডিত অপুরুষ’ উপন্যাসের নায়ক কবি হাসান রশিদকে উপস্থাপন করেছেন একজন আধুনিক মানুষ হিসেবে। দৈনন্দিন জীবনে সে খুব সাদামাটা ও সাধারণ পোশাকে অভ্যস্ত হলেও খাঁটি ও শুদ্ধতায় বিশ্বাসী। ফলে তার পোশাকে-আশাকে নেই কৃত্রিমতা।

এ তো গেল সমাজের ধারণা ও কবিদের নিয়ে বাংলাসাহিত্যের প্রধান তিনটি উপন্যাসের কথা। কল্পনার সঙ্গে বাস্তবের কিছুটা সামঞ্জস্য রয়েছে বলেই হয়তো গল্প-উপন্যাসের অনেক কথাই সমাজে প্রতিফলিত নানান কাহিনি ও চরিত্রের সঙ্গে মিলে যায়। কবিদের বেলাতেও তার ব্যতিক্রম হয়নি।

কবি সাজ্জাদ শরিফ
ছবি: সংগৃহিত

কবিদের দীনভাবে দেখার প্রবণতা ঠিক কোথা থেকে এসেছে, সেই ঠিকুজি হয়তো খুঁজে পাবেন সমাজতাত্ত্বিকেরা। তবে কবির কদরের কথাও কিন্তু অবিদিত নয়। মহাকবি ফেরদৌসীকে মহাকাব্য ‘শাহনামা’র জন্য গজনীর সুলতান মাহমুদ ৬০ হাজার স্বর্ণমুদ্রা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। যদিও তিনি প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে প্রথমে পাঠিয়েছিলেন ৬০ হাজার রৌপ্যমুদ্রা। তবে ইরান-তুরানই নয় শুধু, সভাকবিদের কথাও তো অজানা নয়। প্রাচীন ও মধ্যযুগে মধ্যপ্রাচ্য-মধ্যএশিয়াতেও কবির যথাযথ সম্মানের ঘাটতি হয়নি। গ্রিক সভ্যতাই হোক আর ইংরেজ, সেখানেও একই কথা। আবার প্রাচ্যে-হিন্দুকুশ পর্বতমালার নিম্নভূমিতে রাজা-মহারাজাদের আমল তো বটেই, মোগল-পাঠানদের সময়েও রাজদরবারে কবির কদরের কথা মুখে মুখেই এত দূরে এসেছে। আরাকান রাজসভাতেও কবিদের আদরের কথা সুবিদিত। তাই কবিমাত্রই মলিন মুখ, কাঁধেতে ঝোলানো ব্যাগের যে অবয়ব দাঁড় করিয়ে দেওয়া হয়েছে, সে উদাহরণ সর্বার্থে খাটে না। আমাদের বাংলাদেশেও কবিদের ফ্যাশনসচেতনতা, তাদের গাম্ভীর্য-মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান রীতিমতো ঈর্ষণীয়ও। গত শতকের চল্লিশের দশকের কবি ফররুখ আহমদ, আহসান হাবীব, সৈয়দ আলী আহসান, পরবর্তী সময়ে পঞ্চাশের দশকের শামসুর রাহমান, সৈয়দ শামসুল হক, আল মাহমুদ, শহীদ কাদরী, আলাউদ্দিন আল আজাদ, ফজল শাহাবুদ্দীন, তার ওপরে—রফিক আজাদ, আসাদ চৌধুরী, ফরহাদ মজহার, নির্মলেন্দু গুণ, মহাদেব সাহা, রবিউল হুসাইন, আবদুল মান্নান সৈয়দসহ অনেক কবির ফ্যাশনসচেতনতা উদাহরণ হয়ে রয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় গত শতকের আশির দশকের কবি সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ, বিষ্ণু বিশ্বাস, কাজল শাহনেওয়াজ, রিফাত চৌধুরী, মাসুদ খান, তপন বড়ুয়া, সাজ্জাদ শরিফ, খোন্দকার আশরাফ হোসেন, ফরিদ কবির, গোলাম কিবরিয়া পিনু, রেজাউদ্দিন স্ট্যালিন, মজিদ মাহমুদসহ ফ্যাশনসচেতন অনেকের নামই সামনে আসতে পারে।

হালে-আশির দশকের ট্রেন্ড বলে, যখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে সেই আমলের নায়ক-নায়িকাদের পোশাক-আশাকে মোড়ানো ছবি তৈরির হিড়িক পড়েছে, যা ছড়িয়ে যাচ্ছে অন্তর্জালে। স্বাভাবিকভাবেই তখন মনের মধ্যে উঁকি দেয়, ওই সময়ের বাংলা কবিতাকে যাঁরা শাসন করতে চেয়েছেন, যাঁদের হাত ধরে বেরিয়ে এসেছে প্রেম-ভালোবাসা-রাজনীতি-দর্শন-দেশপ্রেমের অব্যর্থ সব পঙ্ক্তিমালা, যাঁদের কথামালা হৃদয়ে ধারণ করে প্রেয়সীর হাতে ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে চিরকুট, তাঁরা কেমন ছিলেন ফ্যাশনে? তাঁদের পোশাকে-আশাকে কতটুক ধরা ছিল সময়?

আশির কবিরা, বাম দিক থেকে রিফাত চৌধুরী, কাজল শাহনেওয়াজ, তাদের এক বন্ধু ও কফিল আহমেদ
ছবি: সংগৃহিত

আজকের মতো তখন কিন্তু দ্রুত ছুটতে শেখেনি সময়। প্রয়োজন নেই বলেই কারও হাত ছেড়ে দিতেও শেখায়নি কেউ। তার মাঝেও গতি ছিল, তবে সেই গতির ঢেউকে তীরে আছড়ে পড়তে সময় নিতে হতো। তখন ফ্যাশনের উৎসমুখ ছিল হলিউড। বাঙালি পুরুষের পোশাকে একসময়ের ধুতি-পাঞ্জাবি, লুঙ্গি-পাঞ্জাবি-ফতুয়া, ঢোলা পায়জামা-পাঞ্জাবির সঙ্গে তখন ঢুকে পরেছে শার্ট, ট্রাউজার, জ্যাকেট। সিনেমা, টেলিভিশন আর পপতারকাদের অনুসরণ থাকলেও তার গতি শ্লথ। পরিবর্তন ছিল ধীরলয়ে। কখনো বেলবটম প্যান্ট, বড় কলারের শার্ট, শার্টে দুটো বুকপকেট—তা কখনো ঢাকনাওয়ালা, আবার কখনো ঢাকনাবিহীন, আবার শার্টে বুকের বোতাম খুলে রাখার প্রবণতা, নাভির ওপরে চওড়া বেল্টের সঙ্গে ঢোলা প্যান্ট, পপতারকাদের অনুসরণে প্যান্টের ভেতরে গুঁজে রাখা শার্ট। রোদচশমার সঙ্গে ঘড়ি তখনো ফ্যাশনের অনুষঙ্গ। ব্যবহৃত চশমার ফ্রেম, সেই সঙ্গে রঙিন ঝলঝলে পোশাক, গরমের দিনে বুশশার্ট, টাইট প্যান্ট, বেল্ট; আর শীতে ব্লেজার, ডেনিম জ্যাকেটের বাহারি ব্যবহারও ছিল চোখে পড়ার মতো। ফ্যাশনেবল পোশাকে নিজেকে মানানসই করে তুলতে চুলের স্টাইলও রাখত বড় ভূমিকা। কবিদের ছবিতেও ধরা রয়েছে সে সময়।

তবে আজকের দিনে ছবি তোলার জন্য আলাদা করে যেমন কোনো উপকরণের প্রয়োজন হয় না। শুধু একটি মুঠোফোন থাকলেই হলো। অথচ আশির দশকে একটি ছবি তোলার হ্যাপা, এখন সহ্য করে কেউ ছবি তোলাতে আগ্রহী হবেন, তা কষ্টকল্পনাই মনে হয়।

কবি কাজল শাহনেওয়াজ
ছবি: কবির ফেসবুক থেকে

ইয়াসিকা ক্যামেরার রমরমা বাজারে ফুজি ও কনিকার দাপটে অন্য কোনো ফ্লিমের নাম শোনা যেত না। এই দুইয়ের জুড়ি মেলাও ছিল ভার। সামর্থ্যের সঙ্গে রুচির মেলবন্ধন ঘটলেই ঘরে আসত ইয়াসিকা। যাতে ফুজি বা কনিকা ফ্লিম তোলা হলে সাকল্যে ছবি হতো ছত্রিশটা। তাই একটা বাজে ক্লিক মানেই আফসোস। আর এই আফসোস থেকে বাঁচাতেই জেলা শহরগুলোতে গড়ে উঠতে শুরু করে সাদাদেয়ালে ফুটে ওঠা শিল্পীর তুলির আঁচড়ে পাহাড়-নদী-ফুল-পাখির স্টুডিও। সাদাকালোর যুগ ফসকে সৈয়দ শামসুল হকের ‘বকুল রঙিন স্টুডিও’ তখন পাড়ায় পাড়ায় মুখ দেখাচ্ছে। সেই ইয়াসিকা অথবা বকুল রঙিন স্টুডিওর হাত ধরেই আশির দশকের কবিদের মুখ ধরা রয়েছে সময়ের ছাপচিত্রে। সমাজ তাদের মলিন ও ধূসরতায় মুড়িয়ে রাখতে চাইলেও-স্থিরচিত্রে তো আমরা সেই সময়কেই দেখি। আর কল্পনার পাখা মেলে-মন থেকে কবি মাত্রেই মলিন মুখের ম্রিয়মাণ যে ছবি চোখের সামনে স্থির, তাকে সরিয়ে দিই, দিতে চাই দূর থেকে দূরে, বহুদূরে..