রোদের ক্যানভাসে আদিম মনস্তত্ত্ব

রইদ চলচ্চিত্রের একটি দৃশ্য অবলম্বনে প্রথম আলো গ্রাফিকস

মেজবাউর রহমান সুমনের প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ছিল ‘হাওয়া’। চলচ্চিত্রটি সমুদ্রের উত্তাল তরঙ্গের মতো দর্শকহৃদয়ে আছড়ে পড়েছিল। এই দর্শক আসলে কারা? উত্তরটা সহজ—যাঁরা মুখিয়ে থাকেন ভালো সিনেমার জন্য। বাংলাদেশে এমন একটি দর্শকশ্রেণি তৈরি হয়েছে, যাঁরা ভিন্নমাত্রার চলচ্চিত্রের আশায় অপেক্ষা করেন। বাংলা চলচ্চিত্রে বাঁকবদলের চমৎকার সম্ভাবনা উঁকি দিলে তাঁরা নিজে থেকেই সাড়া দেন। মিথ, রহস্য, প্রকৃতি, জীবননির্ভর জটিল মনস্তত্ত্ব সব সময়ই মানুষকে টানে। সেসব দৃশ্য রূপকের আড়ালে প্রকাশ করলে মানুষ গ্রহণ তো করেই, উপরন্তু সিনেমার ইতিহাসে ভিন্নমাত্রা যোগ হয়। তবে ‘হাওয়া’র অভূতপূর্ব সাফল্যের পর নির্মাতা মেজবাউর রহমান সুমন যেন দীর্ঘদিনের জন্য আত্মগোপনে চলে যান। অবশেষে সেই দীর্ঘ প্রতীক্ষা ও নীরবতার প্রহর কাটিয়ে তিনি ফিরে আসেন তাঁর দ্বিতীয় নির্মাণ ‘রইদ’ নিয়ে।

‘রইদ’ আঁকড়ে ধরেছে তপ্ত মাটির ওপর বেঁচে থাকার প্রাগৈতিহাসিক লড়াইকে, আর ‘হাওয়া’র গল্প গড়ে উঠেছিল সমুদ্রের ঝোড়ো হাওয়া আর মানবীয় সংশয় ঘিরে। তপ্ত রোদে মাটির বুকে লেপ্টে থাকা রুক্ষ জীবনের এই গল্প মানুষের আদিম বাসনার নির্মোহ রূপক। সরাসরি চলচ্চিত্রটি দেখা, আন্তর্জাতিক উৎসবে প্রশংসিত নানা বিশ্লেষণ এবং বিশ্বস্ত সূত্র থেকে পাওয়া তথ্যের ওপর ভিত্তি করে বলা যায়, ‘রইদ’ হচ্ছে সমাজের প্রচলিত মোহযুক্ত বিশ্বাস ও মেকি প্রথা ভাঙার দৃশ্যমান শিল্প। সাজানো সমাজের আড়ালে লুকিয়ে থাকে আদিম মনস্তত্ত্ব, প্রকৃতিবিরুদ্ধতা। সিনেমাটি মানুষের আদিম প্রবৃত্তি, ক্ষুধা ও প্রকৃতির সার্বভৌমত্বের এক পৌরাণিক রূপক হয়ে উঠেছে। গ্রামীণ সমাজ বাস্তবতার আড়ালে এখানে রয়েছে একটি কালোত্তীর্ণ ক্যানভাস।

‘রইদ’ সিনেমায় ‘অ্যাডাম’ ও ‘ইভ’-এর আদি পাপ, লিবিডো কামনা ও বেঁচে থাকার সংগ্রাম ফুটিয়ে তোলা হয়েছে তালের রূপকে, যা গন্ধমের স্থলাভিষিক্ত বলে ভাবা যেতে পারে। নামহীন নারী চরিত্রটির প্রতীকে অঙ্কিত হয়েছে প্রথার শৃঙ্খল ভাঙার প্রচেষ্টা। পাগলবেশে এ নারী যেন এক অনিয়ন্ত্রিত বন্য প্রকৃতি। নায়ক হিসেবে রাখাল সাধু প্রথাগত সমাজের ভয়ভীতি ও দাসত্বের রূপক। ভীতিপ্রদ সমাজ তাকে দিনের পর দিন বন্দী করে রেখেছে, সাধু সেই ক্রূর ব্যবস্থারই নিঃশব্দ শিকার।

‘রইদ’ সিনেমায় ‘অ্যাডাম’ ও ‘ইভ’-এর আদি পাপ, লিবিডো কামনা ও বেঁচে থাকার সংগ্রাম ফুটিয়ে তোলা হয়েছে তালের রূপকে, যা গন্ধমের স্থলাভিষিক্ত বলে ভাবা যেতে পারে। নামহীন নারী চরিত্রটির প্রতীকে অঙ্কিত হয়েছে প্রথার শৃঙ্খল ভাঙার প্রচেষ্টা। পাগলবেশে এ নারী যেন এক অনিয়ন্ত্রিত বন্য প্রকৃতি। নায়ক হিসেবে রাখাল সাধু প্রথাগত সমাজের ভয়ভীতি ও দাসত্বের রূপক। ভীতিপ্রদ সমাজ তাকে দিনের পর দিন বন্দী করে রেখেছে, সাধু সেই ক্রূর ব্যবস্থারই নিঃশব্দ শিকার।

সিনেমাটিতে স্পষ্ট কোনো খলনায়কের উপস্থিতি নেই। প্রকৃতিকে সব সময় জয় করা যায় না, আবার প্রকৃতিবিরুদ্ধতা দিয়েও মানুষের প্রার্থিত ফল আসে না, এমনকি মানুষ নিজেই নিজের বন্ধু কিংবা শত্রু—এই সব দর্শনে অভিষিক্ত হয়েছে ‘রইদ’–এর গল্প। পাগলির পেটের সন্তান নিয়ে নায়ক চরম দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়ে। সন্তানটিতে হত্যা করতে চায়। একসময় পাগলি নিজেই হারিয়ে যায়, অথবা মৃত্যুবরণ করে। গর্ভবতী ছাগলের প্রতীকে সে যেন সাধুর মধ্যে নতুন চৈতন্য জাগ্রত করে। সেই সদ্য সন্তানপ্রসবা ছাগলটিকে সাধু হত্যা করে। তারপর তার সব মাংস গোগ্রাসে খেয়ে ফেলে। সে কি তার হারিয়ে যাওয়া স্ত্রীকে নিজের ভেতরে ধারণ করতে চায়? বর্তমান সমাজে ‘ক্যানিবালিজম’ প্রথা জাগ্রত হয় কি? কুলসুম নামের পাগলির প্রিয় ছাগলটাই যেন সাধুর আত্মায় ভর করে। অন্যদিকে পুরুষতন্ত্র জীবন বা সৃষ্টিশীলতাকে সম্মান জানায় না। বলাবাহুল্য, মন্দ সিস্টেমে বন্দী ব্যক্তিরা অপরকে সম্মান জানাতে অপারগ হয়। এটাই হয়তোবা তাদের নিয়তি। শুভত্ব ও সম্ভাবনার সবকিছু পায়ে পিষে নারী কেবলই ‘পণ্য’ বা ভোগপণ্যে পরিণত হয়। প্রখর রোদ ও অবিরাম বৃষ্টির প্রাকৃতিক বৈপরীত্য দেখা যায় সিনেমায়। মানবাত্মার ভেতরে চলতে থাকা নৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব, ক্ষয়, কামনা, ভয়—‘রইদে’ সবকিছুই যেন বিশ্বস্ত প্রতীক হয়ে ওঠে।

‘রইদ’ সিনেমার গল্পটা ওপর থেকে দেখলে অতিসাধারণ এক গ্রামীণ জীবনের আখ্যান মনে হতে পারে। কিন্তু এর পরতের পর পরত অত্যন্ত জটিল ও মেটাফোরিক বা রূপকনির্ভর। গল্পের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে এক সহজ-সরল, পিতৃহীন-মাতৃহীন রাখাল বালক—সাধু (মোস্তাফিজুর নূর ইমরান)। সে সমাজের এক বিত্তবান গৃহস্থের বাড়িতে কাজ করে। ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত গ্রামের মেঠো পথে গরুর পাল চড়ায়, মাছের খাবার দেয়। এই সাধুর জীবনেও থাকে স্বপ্ন, ঘর বাঁধার অভিপ্রায়। অনিশ্চিত সামাজিক অবস্থান সত্ত্বেও তার মধ্যে দায়িত্ববোধ ও ভালোবাসার কমতি নেই। যদিও অযাচিত সন্তান মেরে ফেলে কেবল বউকে বাঁচিয়ে রাখার ইচ্ছা সে পোষণ করে। অথচ সন্তানটি সমগ্র পৃথিবীর, তার তো একার নয়। তবে সেই ধারণা সাধু একা তৈরি করেনি, পুরো সমাজই তার আয়োজক। এভাবে গড়ে ওঠে সমাজশৃঙ্খল, বিশ্বাস ও সংস্কারের বেড়াজাল তথা খণ্ডিত নীতিবোধ।

সম্পূর্ণ অনিয়ন্ত্রিত, উন্মাদ নারীকে (নাজিফা তুষি) সাধু বিয়ে করে নিয়ে এলে সাধুর জীবনের গল্পটাও যেন নতুন মোড় নেয়। সিনেমার পুরো ক্যানভাস জুড়ে অনামা নারী চরিত্রটি পুরো গ্রামবাসীর কাছে ‘সাধুর বউ’ হিসেবে পরিচিতি পায়। সাধু নিজেও তার নাম জানে না, জানারও প্রয়োজন বোধ করেনি। তার পরিচয়ের যেন দরকার ছিল না; কেবল অন্যের জিজ্ঞাসার উত্তর দিতেই নামটির প্রয়োজন হয়।

‘রইদ’–এর শুটিংয়ে নাজিফা তুষি। অভিনেত্রীর ফেসবুক থেকে

কাহিনির প্রারম্ভেই সাধু বিয়ে করে গরুর গাড়িতে ঘরে ফেরে। বাচ্চা ছেলেরা তাদের পিছু নেয়, পাগলি বলে নতুন বউকে খেপায়, বউটিও যাচ্ছেতাই বকাবকি করে। প্রথম দৃশ্য থেকেই সিনেমাটি যেন তার চিরাচরিত ট্রাজেক্টোরি বা গতিপথ বদলে ফেলে। সাধুর বউ কোনো প্রথাগত লাজুক গ্রামীণ কনে নয়; তার আচরণে স্পষ্ট হয়ে ওঠে মনোবিকারজনিত উগ্রতা, অবাধ্য বন্যতা এবং সামাজিক নিয়মের প্রতি চরম অবজ্ঞা। সে বাচ্চাদের গালাগাল তো করেই, গায়ে থুতু মারে, ভরা মজলিসে কুকুর নিয়ে অসংলগ্ন কথা বলে, জুতা হারানোর আশঙ্কায় প্রথাগত সামাজিক শিষ্টাচারকে তুচ্ছ করে, এমনকি টিভিতে হিন্দি গানের দৃশ্য দেখে জনসমক্ষে নাচে।

‘রইদ’ সিনেমার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর ‘সময়হীনতা’। পুরো চলচ্চিত্রে কোনো আধুনিক যোগাযোগ প্রযুক্তি, বিদ্যুৎ, ঘড়ি কিংবা সমসাময়িক সামাজিক অনুষঙ্গ রাখা হয়নি। মেজবাউর রহমান সুমন খুব সচেতনভাবেই এই গল্পকে সময়ের নির্দিষ্ট বন্ধন থেকে মুক্ত করেছেন। ফলে দৃশ্যপট রূপ নিয়েছে আদিম মানবসভ্যতার ক্যানভাসে। আব্রাহামিক মিথের অ্যাডাম ও ইভের সেই আদি পাপ, ক্ষুধা, কাম, বেঁচে থাকার আদিম লড়াই এবং প্রথাবন্দী হওয়ার মনস্তত্ত্ব এতে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একদিকে প্রখর রোদ, অন্যদিকে অবিরাম বৃষ্টি—প্রকৃতির চরম আবহাওয়ার এই বৈপরীত্য যেন মানুষের নিভৃত লড়াইয়ের প্রতিচ্ছবি।

‘রইদ’ চলচ্চিত্রে গ্রামবাংলার সাধারণ সমাজকে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে নিষ্ঠুর রূপকের মাধ্যমে। সমাজে নারীকে কীভাবে দেখা হয়? তাদের বহুমাত্রিক রূপ—একটি মানবিক ও সৃষ্টিকর্তার অনন্য রূপ, আরেকটি ব্যবহার্য পণ্য বা উৎপাদনযন্ত্র। এই দ্বিধারিক রূপকের উপস্থাপন সিনেমাটির পরতে পরতে ছড়িয়ে আছে। একটি গর্ভবতী ছাগল বাচ্চা জন্ম দিতে গিয়ে অসম্ভব যন্ত্রণা সহ্য করে মৃত্যুর দিকে ঢলে পড়ছে—মর্মান্তিক দৃশ্যটি সাংঘাতিক ব্যঞ্জনা সৃষ্টি করে। সাধারণ দৃষ্টিকোণ থেকে, জীবনের এই স্পন্দন সৃষ্টি করার মুহূর্তে ছাগলটির জীবন রক্ষা করা কিংবা তার কষ্টের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করাই হতো স্বাভাবিক মানবিক প্রবৃত্তি। কিন্তু সেই দৃশ্যে রাখাল সাধু অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় ওই মৃত্যুপথযাত্রী ছাগলটিকে জবাই করে তার মাংস খাওয়ার জন্য উদ্যত। সাধুর কাছে ছাগলটি জীবনের প্রতীক নয়, তা কেবলই একটি ‘পণ্য’ বা আর্থিক সম্পদ; নতুবা তা মানুষের ভেতরের সেই আদিম ও বন্য ক্ষুধা উদ্যাপনেরই অন্তঃসার। তবে এ ঘটনা চলচ্চিত্রের একটি অসাধারণ মেটাফোর। আমাদের গ্রামীণ বা পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ঠিক একইভাবে নারীদের একটি নির্দিষ্ট গণ্ডিতে আবদ্ধ করে। তাদের আবেগ, মর্যাদা, আত্মপরিচয় ও হৃদয়কে উপেক্ষা করে কেবল ‘উপকরণ’ বা ‘পণ্য’ হিসেবে রূপান্তর করে। সাধুর বউয়ের সামাজিক উন্মাদনা কিংবা অসংলগ্ন আচরণ আসলে ওই অবরুদ্ধ ও যান্ত্রিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে তার অবচেতন মনের বন্য প্রতিবাদ।

সম্পূর্ণ অনিয়ন্ত্রিত, উন্মাদ নারীকে (নাজিফা তুষি) সাধু বিয়ে করে নিয়ে এলে সাধুর জীবনের গল্পটাও যেন নতুন মোড় নেয়। সিনেমার পুরো ক্যানভাস জুড়ে অনামা নারী চরিত্রটি পুরো গ্রামবাসীর কাছে ‘সাধুর বউ’ হিসেবে পরিচিতি পায়। সাধু নিজেও তার নাম জানে না, জানারও প্রয়োজন বোধ করেনি। তার পরিচয়ের যেন দরকার ছিল না; কেবল অন্যের জিজ্ঞাসার উত্তর দিতেই নামটির প্রয়োজন হয়।

শুধু গল্প ও নির্মাণে নয়, ক্ষুরধার অভিনয়েও ‘রইদ’ বাংলা চলচ্চিত্রে নতুন নতুন দিগন্তের উন্মোচন করেছে। প্রধান দুটি চরিত্রে মোস্তাফিজুর নূর ইমরান ও নাজিফা তুষি যেভাবে চরিত্রকে যাপন করেছেন এবং নিজেদের উজাড় করে দিয়েছেন, তা সত্যিই বিস্ময়কর। ‘হাওয়া’ চলচ্চিত্রে ‘গুলতি’ চরিত্রে নাজিফা তুষি যে চমক দেখিয়েছিলেন, ‘রইদ’-এ তিনি তাকে বহু যোজন পেছনে ফেলে গেছেন। সাধুর বউ চরিত্রে অভিনয় করার জন্য নিজেকে আমূল বদলে ফেলেছেন তিনি। কেবল সাজসজ্জার পরিবর্তন নয়; চরিত্রের মনস্তত্ত্বকে রক্তে-মাংসে ধারণ করার প্রয়াস রেখেছেন। ত্বকে গ্রামের কড়া রোদের তামাটে পোড়া ছাপ, উষ্কখুষ্ক চুল, আর কৃত্রিম দাঁতের প্রলেপ দিয়ে মুখের শারীরিক গঠন পর্যন্ত বদলে ফেলেছেন। তুষির চোখমুখের তীব্র বন্যতা, উন্মাদের মতো চাহনি, খামখেয়ালি আর সামাজিক অবজ্ঞা—এসবই দর্শকদের অভূতপূর্ব অস্বস্তি ও ঘোরের মধ্যে ফেলে দেয়।

বাংলা চলচ্চিত্রে মোস্তাফিজুর নূর ইমরান (সাধু) সব সময়ই এক স্বকীয়, অথচ অনালোচিত প্রতিভার নাম। ‘রইদ’-এ তিনি একজন অসহায়, প্রথাতাড়িত অথচ অন্তর্দ্বন্দ্বে জর্জরিত মানুষ। রাখালের চরিত্রে ও পাগলির স্বামী হিসেবে তিনি অভাবনীয় পারফর্ম করেছেন। সমাজের কাছে তিনি নিঃস্ব, বিত্তবানের দয়ায় বেঁচে থাকা এক চরিত্র; আবার ঘরের ভেতরে নিজের ওই উগ্র স্ত্রীর বন্য আচরণের সামনে তিনি কিংকর্তব্যবিমূঢ়। ইমরানের শারীরিক ভাষা, ভয়ার্ত দৃষ্টি ও সংলাপের প্রখর অভিব্যক্তি সিনেমাটিকে অন্য রকম করে তুলেছে।

এ ছাড়া পার্শ্বচরিত্রের অন্যান্য অভিনেতাও গ্রামীণ জীবনের সেই রুক্ষ ও মেকি প্রথার প্রতিচ্ছবি নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।

মেজবাউর রহমান সুমনের নির্মাণশৈলী স্বতন্ত্র। দৃশ্য-নির্মাণে তিনি কোনো কিছু জোর করে চাপিয়ে দেন না। পারিপার্শ্বিক আবহকে তিনি এমনভাবে কাজে লাগান, যা নিজেই একটি আলাদা চরিত্র হয়ে ওঠে। ‘রইদ’-এর ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। সিনেমায় নীরবতা ও ‘এনভায়রনমেন্টাল সাউন্ড’-এর কাজ অবিশ্বাস্য রকমের নিখুঁত। শুকনা পাতায় মচমচ শব্দ, প্রখর রোদে খড়খড় করতে থাকা মাটির শব্দ, কাদার ছপছপ শব্দ, কিংবা গরুর গাড়ির চাকার ঘষা খাওয়ার আওয়াজ—এসবই নেপথ্য বাদ্যযন্ত্রের চেয়ে বেশি নাটকীয়তা তৈরি করেছে। বাস্তুভিটায় মানুষ, পশুপাখি ও প্রকৃতি—সবকিছুই যেন এক নিবিড় সহাবস্থানে একাকার। সজীব রঞ্জন বিশ্বাস ও রশীদ শরীফ শোয়েবের আবহসংগীত গল্পকে অতিনাটকীয় না করে দৃশ্যের মনস্তাত্ত্বিক চাপকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। গল্পের গতি এখানে ধীর, কিন্তু দৃশ্যগুলোর অন্তর্নিহিত উত্তেজনা দর্শকদের প্রতিমুহূর্তে অদৃশ্য থ্রিলের মধ্যে আটকে রাখে।

‘রইদ’–এর শুটিংয়ে নাজিফা তুষি। অভিনেত্রীর ফেসবুক থেকে

জোয়াহের মুসাব্বিরের ক্যানভাস ও ক্যামেরা সঞ্চালন ‘রইদ’ সিনেমাটিকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। এই চলচ্চিত্রের মূল চালিকা শক্তিই হলো এর ভিজ্যুয়াল ল্যাঙ্গুয়েজ বা দৃশ্যভাষা। সিনেমাটোগ্রাফির প্রধান চার অনুষঙ্গ—প্রাকৃতিক আলো, ফ্রেম ও স্কেলের খেলা, সূক্ষ্ম টেক্সচারধর্মী ক্লোজআপ ও ক্যামেরার ছন্দময় সঞ্চালন—‘রইদ’–এ পেয়েছে অসাধারণ নান্দনিক রূপ।

সিনেমাটি তার শিরোনামের সার্থকতা বজায় রেখেছে। অর্থাৎ আলো এখানে কেবল দৃশ্যপট ফুটিয়ে তোলেনি, গল্পের মানসিক আবহ তৈরি করেছে। বলা ভালো, আলো নিজেই এই গল্পের কেন্দ্রীয় চালিকা শক্তি হয়ে উঠেছে। চলচ্চিত্রে কৃত্রিম আলোর বদলে সর্বোচ্চ ব্যবহার করা হয়েছে প্রাকৃতিক সূর্যরশ্মি। কোম্পানীগঞ্জের শাহ আরেফিন টিলা এবং সিলেটের নানা দুর্গম গ্রামীণ প্রান্তরে রোদের যে খড়খড়ে, তপ্ত ও পোড়া ভাব তা ক্যামেরায় অসাধারণভাবে ধরা পড়েছে। সকালের নরম আলো থেকে দুপুরের প্রখর রোদের উত্তাপ এবং বিকেলের হেলে পড়া ছায়া—সবকিছুকে অত্যন্ত নিপুণভাবে ব্যাকগ্রাউন্ড ও ক্যারেক্টার মুডের সঙ্গে মেলানো হয়েছে।

সিনেমার ফ্রেম নির্বাচনের ক্ষেত্রে জোয়াহের মুসাব্বির প্রকৃতি ও মানুষের অনুপাতকে দুর্দান্তভাবে ব্যবহার করেছেন। বিশাল জনমানবহীন টিলা, খাঁ খাঁ করা প্রান্তর কিংবা গভীর বনের পরিবেশে মানুষকে ধারণ করা হয়েছে। মানুষের ক্ষুদ্রত্ব ও অসহায়ত্বকে ফ্রেমের এক কোণে উপস্থাপন করা হয়েছে। এই ফ্রেম স্ট্রাকচার স্পষ্ট করে—প্রকৃতির বিশালতা ও আদিমতার সামনে মানুষের অহংকার ও সামাজিক পরিচয় কতটা তুচ্ছ।

ক্যামেরার লেন্সের কাজে টেক্সচার বা উপাদানের রূপকে দারুণ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। রোদে শুকিয়ে চৌচির হওয়া মাটি, মানুষের ঘাম, তামাটে চামড়া, প্যাচপ্যাচে ভেজা কাদা, চোখের ভেতরে উন্মত্ত আলো-ছায়ার খেলা—এসবের ‘এক্সট্রিম ক্লোজআপ শটগুলো’ পর্দায় অতিজীবন্ত। দর্শক তাদের শরীর ও মন একাকার করে রোদের উত্তাপ ও মাটির গন্ধ অনুভব করতে পারেন।

সিনেমায় ক্যামেরার মুভমেন্ট অত্যন্ত শান্ত, ধীর ও স্থির। অনর্থক জুম বা দ্রুত প্যানিং এড়িয়ে দৃশ্যকে স্বাভাবিকভাবে এগোতে দেওয়া হয়েছে। দীর্ঘ সিঙ্গেল শটগুলোর কারণে দৃশ্যের আবহ একটানা বজায় থাকে। দর্শকেরা বিচ্ছিন্ন না হয়ে নিমেষেই সেই উত্তপ্ত গ্রামীণ পরিবেশে আচ্ছন্ন হয়ে পড়েন। তাঁরা সরাসরি সেই গ্রামের তপ্ত আবহাওয়ার মধ্যে যেন নিজেরাই আটকা পড়ে যান। ক্যামেরার প্রতিটি অ্যাঙ্গেল একেকটি স্থিরচিত্র বা পেইন্টিংয়ের মতো সুবিন্যস্ত।

বাংলা চলচ্চিত্রে মোস্তাফিজুর নূর ইমরান (সাধু) সব সময়ই এক স্বকীয়, অথচ অনালোচিত প্রতিভার নাম। ‘রইদ’-এ তিনি একজন অসহায়, প্রথাতাড়িত অথচ অন্তর্দ্বন্দ্বে জর্জরিত মানুষ। রাখালের চরিত্রে ও পাগলির স্বামী হিসেবে তিনি অভাবনীয় পারফর্ম করেছেন। সমাজের কাছে তিনি নিঃস্ব, বিত্তবানের দয়ায় বেঁচে থাকা এক চরিত্র; আবার ঘরের ভেতরে নিজের ওই উগ্র স্ত্রীর বন্য আচরণের সামনে তিনি কিংকর্তব্যবিমূঢ়। ইমরানের শারীরিক ভাষা, ভয়ার্ত দৃষ্টি ও সংলাপের প্রখর অভিব্যক্তি সিনেমাটিকে অন্য রকম করে তুলেছে।

কোনো শিল্পই আসলে শতভাগ ত্রুটিহীন হয় না। ‘রইদ’-ও এর ব্যতিক্রম নয়। মেজবাউর রহমান সুমন রূপক ও প্রতীকের মাধ্যমে চলচ্চিত্রের মেটান্যারেটিভ বা মহা-আখ্যানকে নানাভাবে চ্যালেঞ্জ করেন। ‘রইদ’-এ প্রতীকের প্রাচুর্য এতই বেশি যে সাধারণ দর্শক কেবল দৃশ্য দেখে গল্পের মূল অনুভূতির সঙ্গে তাৎক্ষণিক সংযোগ ঘটাতে বা মেলাতে অসুবিধা বোধ করতে পারেন। রূপকের অতিরিক্ত ভার অনেক সময় স্বভাবজাত আবেগপ্রবাহকে ব্যাহত করে। অনেক সময় প্রান্তিক পরিবেশে সংলাপ প্রকাশের ক্ষেত্রে স্থানিক ও স্বাভাবিক স্বতঃস্ফূর্ততার চেয়ে মাঝেমধ্যে অতিদার্শনিকতা ফুটে উঠেছে। বাস্তব জীবনের রুক্ষতার বিপরীতে কিছু দৃশ্য অতিপরিকল্পিত বা থিয়েটারধর্মী মনে হতে পারে। সামাজিক ব্যবস্থার প্রতিনিধিত্বকারী পার্শ্বচরিত্রগুলোর (যেমন লুৎফর রহমান জর্জ বা সমরের চরিত্র) বিকাশ তুলনামূলকভাবে একরৈখিক বলে মনে হয়েছে।

তবে ‘রইদ’ যেন ধুলাবালু, রোদ আর মাটির খুব কাছাকাছি। এটি হয়ে উঠেছে সাধুর হাতে জ্বলন্ত পোড়াকাঠের মতো নির্মোহ মানবিক উপাখ্যান। চিরাচরিত রুপালি পর্দার মিষ্টি প্রেমের গল্প বা নাটকীয় সংঘর্ষের সিনেমা নয় ‘রইদ’। আদিম বাসনা, সমাজের মেকি মুখোশ ও প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের অমোঘ নিয়তির লড়াই এতে সূচিত। সিনেমার সমাপ্তি যেন ‘শেষ হয়েও হইল না শেষ’-এর ব্যঞ্জনামুখর। ‘শো’ শেষে দর্শকের মনের মধ্যে থাকে ঝুড়িভরা প্রশ্ন এবং তীব্র কিছু খটকা। ফলে দর্শক কেবল শিল্পে আকণ্ঠ নিমজ্জিত বা বুঁদ হয়ে থাকেন না; বরং তাঁদের ভেতরেও আলাদা ব্যাখ্যা ও অনুভবের অবকাশ তৈরি হয়। পরিচালক সম্ভবত দর্শককে ক্ষণিকের মোহাচ্ছন্নতায় আটকে রাখতে চাননি; চেয়েছেন আত্মবিশ্লেষণের দুয়ার খুলে দিয়ে সৃজনশীল চিন্তার প্রদীপটি নিরন্তর জ্বালিয়ে রাখতে।

সিনেমার শেষ দৃশ্যগুলো দেখতে দেখতে দর্শক যেন কোনো এক প্রাগৈতিহাসিক কাহিনির পুনর্জন্ম হতে দেখেন। তাঁরা নিজেদের ভেতরের সেই আদিম ও প্রশ্নবিদ্ধ মানবসত্তার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যান। অসাধারণ কাস্টিং, নিখুঁত শব্দ পরিকল্পনা ও জোয়াহের মুসাব্বিরের অবিস্মরণীয় সিনেমাটোগ্রাফির সৌজন্যে ‘রইদ’ বাংলা চলচ্চিত্রকে আন্তর্জাতিক ক্যানভাসে আরেকটি নতুন, সাহসী ও বৈপ্লবিক অধ্যায়ে উন্নীত করেছে বলা যায়। চলচ্চিত্রটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আরও সুখ্যাতি অর্জন করুক এবং বাংলাদেশে এমন চিন্তার খোরাক জোগানো সিনেমা নির্মাণের ধারা অব্যাহত থাকুক—এই প্রত্যাশায় আজকের মতো এখানেই ইতি টানছি।