রাজধানীর ধানমন্ডির বেঙ্গল শিল্পালয়ের দোতলায় কামরুল হাসান গ্যালারি। সেখানে চলমান ‘দ্য কোয়ায়েট উইদিন’ প্রদর্শনীর একটা ছবির সামনে দাঁড়াতেই মনে হলো, ‘জনতার মাঝে নির্জনতা’ বলতে বোঝায়, এ যেন ঠিক তাই। ছোট একটা হলরুমে রাজ্যের নাগরিক ভিড়। সবাই জনাকীর্ণ মেগাসিটির কোলাহল, শব্দ আর আলো দূষণ, জানজট থেকে পালিয়ে নীরবে খানিক বিরতি নিয়ে নিজেকে খুঁজতে এসেছেন পাঁচ বছর ধরে রাশেদ জামানের তোলা ছবিগুলোর কাছে।
একটা ভালো আলোকচিত্র নাকি চিত্রকর্মের মতো। কিন্তু বাংলাদেশি সিনেমাটোগ্রাফার রাশেদ জামানের তোলা ছবিগুলো না আলোকচিত্র, না চিত্রকর্ম! যেন এই দুইয়ের ‘নো ম্যানস ল্যান্ড’–এ অবস্থান করা কিছু নীরব, তীব্র অনুভূতির সুবাস। সাধারণত এ ধরনের প্রদর্শনীতে মানুষ আসেন হইরই করে ছবির সঙ্গে ছবি তুলতে। আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তা শেয়ার করতে। ব্যাপারটা যে খারাপ, আমি সেটা বলছি না। কেবল সেটা মুখ্য উদ্দেশ্য হওয়া উচিত নয়। আমি নিজেই এই প্রদর্শনীতে উপস্থিত হয়েছি ফেসবুকে আমার এক বন্ধুর পোস্ট দেখে। পোস্টে তিনি প্রদর্শিত ছবিগুলোর আধ্যাত্মিকতা আর রহস্যময়তা নিয়ে একরাশ মুগ্ধতা প্রকাশ করেছেন। প্রদর্শনীতে দেখা গেল, অনেকেই হাঁটতে হাঁটতে ছবির সামনে কয়েক পল থামছেন। ভাবছেন আর যান্ত্রিক জীবন আর তার তীব্র গতি, কোলাহল থেকে যেন খানিক দম নিচ্ছেন।
ছবিগুলো যেন গতি আর স্থিরতার মাঝামাঝি প্রায় মিলিয়ে যাওয়া ঝাপসা কোথাও অবস্থান করে। অধিকাংশ ছবি প্রায় একরঙা, অথবা খুব কাছাকাছি একই টোনের অল্প কয়েকটি রঙের সমন্বয়ে তৈরি। ছবিতে উপদানও খুব কম। ফলে ছবিগুলো দর্শকের চোখে, মনে একধরনের আরাম, স্বস্তিভাব তৈরি করে। সূর্যকে দেখা যায় তার সবচেয়ে কোমল মুহূর্তে। ফলে প্রতিটা ফ্রেমে আলো যেন তরল হয়ে মোমের মতো গলে গলে চুইয়ে পড়ছে। আবার কোনো কোনো ছবিতে প্রকৃতির অবয়বের সঙ্গে মিশে আছে গভীর, স্বপ্নময় নীল। কোনো ছবিতে খোলা প্রান্তরে একা দাঁড়িয়ে আছে একটি গাছ। একটি ছবিতে আবার বিস্তীর্ণ প্রান্তরে দাঁড়িয়ে আছেন একজন মানুষ। পুরো প্রদর্শনীতে দেখা গেল, কেবল একটি মানুষের ছবি, যিনি নিঃশব্দে চিৎকার করে বলছেন, ‘মানুষ মূলত একা, মহাশূন্যের মতো একা।’ আচ্ছা ওই গাছ, ওই মানুষটা কি রাশেদ জামানেরই প্রতিকৃতি?
সিনেমাটোগ্রাফার রাশেদ জামান বললেন, ‘আমি দেখলাম, নানা কাজের ব্যস্ততায়, ভিড়ে শহুরে কোলাহলে আমার জীবন থেকে নির্জনতা, একাগ্রতা, মৌনতা শব্দগুলো হারিয়ে গেছে। বছরের পর বছর আমি হাজারো মানুষের সঙ্গে কথা বলেছি, কিন্তু নিজের সঙ্গে বসে নিজের যে কথোপকথন, সেটা হয়নি। এই যাত্রাটা আমার কাছে ছিল আত্মানুসন্ধানের মতো।’
রাশেদ জামানের জন্ম ও বেড়ে ওঠা এই ঢাকা শহরেই। তাঁর নানা খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠতেন। গোসল করে গায়ে আতর মেখে পূর্বদিকের জানালার ধারে খালি গায়ে চেয়ার পেতে লিখতে বসতেন। জানালা দিয়ে আলো এসে পড়ত তাঁর শরীরে। সেই আতরের ঘ্রাণে, চোখে-মুখে আলোর স্পর্শে ঘুম ভাঙত ছোট্ট রাশেদের। সেখান থেকেই তিনি শিখেছেন আলো কীভাবে আমাদের এনার্জিকে প্রভাবিত করে। এ জন্য তিনি সব সময় ক্যামেরা ব্যবহার করে আলো দিয়ে কবিতা লিখতে চেয়েছেন। কবিতাতে যেমন অল্প কয়েকটি শব্দে নিজের ভেতরের অনেক কথা বলে ফেলা যায়, সেভাবেই ছবিতে ল্প কিছু উপাদানের ভেতর আলো মাখিয়ে মাখিয়ে নিজেকে প্রকাশ করেছেন রাশেদ।
কিছু ছবিতে গাছের পাতা, আকাশ আর দিগন্তরেখায় ইচ্ছাকৃতভাবে ব্রাশ পেইন্টে অস্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। যেন মূর্ত পৃথিবী ধীরে ধীরে বিমূর্তে লীন হয়েছে। আলো–আঁধারের ভেতর মিশে যাচ্ছে অথবা বাস্তব একটা দৃশ্য যেন পরাবাস্তবতায় উঁকি দিচ্ছে। আলোর এই তরলের মতো মিশে মিশে বাস্তববতার ওপর একটা প্রশ্নবোধক চিহ্ন এঁকে দেওয়াতে ফলে দর্শকের মনে প্রশ্ন জাগে—কোথায় আকাশের শেষ, আর কোথা থেকেই–বা শুরু হয়েছে মাটি কিংবা নদী অথবা এই ছবিটা? তাতে একটা ফ্রেমেই অল্প কিছু উপাদানের মহাবিশ্বের বিশালতা এসে ধরা দিয়ছে। আলো নিয়ে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে এই কাব্যিক নিরীক্ষাই দর্শককে ছবিগুলোর সামনে কিছুক্ষণ থামতে বাধ্য করেছে।
এই ভিজ্যুয়াল আর্টিস্টের কাছে জানতে চাইলাম, তিনি তাঁর দেখাটাকে কীভাবে ফ্রেমে প্রকাশ করছেন। জানা গেল তিনি নিয়মিত বসুন্ধরা থেকে ধানমন্ডি যান। ছবি প্রিন্ট করান। সেটা দেখেন। ঠিকঠাক করেন। আবারো প্রিন্ট করান। এভাবে প্রায় আড়াই বছর চলেছে। বৃহস্পতিবার দুপুরে যখন কথা হচ্ছে তখনো তিনি একটা ছবি নতুন করে প্রিন্ট করাচ্ছিলেন। সাধারণত প্রিন্ট করে তিনি সেটাকে আগে ময়েশ্চারাইজড করেন। তার ওপর ড্রাই ব্রাশ করেন। কোথাও টেক্সচারটা বের করে আনেন। কোথাও স্যাচুরেশন কমান। তারপর স্প্রে করে ফিনিশিং টানেন। এভাবে নানা কিছু ট্রাই করে তিনি যেভাবে ছবিটাকে দেখতে চান, সেভাবে তৈরি করার চেষ্টা করেন।
রাশেদ জামান তাঁর ক্যামেরায় আটকে ফেলা এসব ছোট ছোট মুহূর্তে বহুকাল পরে নিজের সঙ্গে সময় নিয়ে সময় কাটিয়েছেন। আর তাঁর সেই ক্ষণস্থায়ী, অপার্থিব অনুভবকে তাঁর মতো করে ফ্রেমবন্দী করে টানিয়ে রেখেছেন, যাতে দর্শকও সেগুলোর সামনে দাঁড়িয়ে সেই অনুভবের স্পর্শ পায় খানিকটা। প্রদর্শনী চলবে ২৭ আগস্ট প্রতিদিন বিকেল ৪টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত!