আমি মাঝেমধ্যেই আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে প্রশ্ন করি—আমরা আসলে কোন পৃথিবীতে বাস করছি? আমি মিলেনিয়াল প্রজন্মের মানুষ। ছাপা হওয়া খবরের কাগজের গন্ধ শুঁকে আমাদের বেড়ে ওঠা। আমরা জানতাম সত্য মানে প্রামাণিক কিছু, যা তথ্যের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। কিন্তু আজ? নিজের চোখেই দেখছি কীভাবে সেই তথ্যের ভিতকে আষ্টেপৃষ্ঠে গ্রাস করল বুদবুদ নীল মায়াবী আলো।
আমরা এক অদ্ভুত সময়ের ভেতর দিয়ে হাঁটছি। পোস্ট-ট্রুথ বাস্তবতা আমাদের প্রতিনিয়ত বিপন্ন করছে। ২০১৬ সালে অক্সফোর্ড ডিকশনারিতে পোস্ট–ট্রুথ (Post-truth) শব্দটা যখন জায়গা করে নিল, তখনো বুঝিনি এর প্রভাব কতটা সর্বগ্রাসী হবে। পোস্ট-ট্রুথ মানে এমন এক পরিস্থিতি, যেখানে বস্তুনিষ্ঠ তথ্যের চেয়ে মানুষের ব্যক্তিগত আবেগ আর বিশ্বাস জনমত গঠনে বেশি প্রভাব ফেলে। অর্থাৎ, তথ্য আছে, প্রমাণও আছে, কিন্তু মানুষ সিদ্ধান্ত নেয় তার মজ্জাগত সংস্কার আর অনুভূতি দিয়ে। সত্য আর ব্যাখ্যার মাঝখানে এক বিষাক্ত কুয়াশা নেমে এসেছে।
এই ডিলেমা বা দ্বিধা শুধু পশ্চিমা সংস্কৃতিতে নয়, আমাদের দেশের সমাজ বাস্তবতায় রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, রাজনৈতিক বক্তব্য, এমনকি পারিবারিক আলোচনাতেও সত্যের চেয়ে আবেগ, পক্ষপাত আর গোষ্ঠীস্বার্থ বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠছে। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা আজ ডিগ্রি দিচ্ছে ঠিকই, কিন্তু সত্য-মিথ্যার প্রভেদ করার মতো সাধারণ বিচারবুদ্ধিটুকু তৈরি করতে পারছে না। ফলাফল কী হচ্ছে? ইতিহাসের প্রতিষ্ঠিত বয়ানগুলো আজ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে কাটাছেঁড়ার টেবিলে।
পোস্ট-ট্রুথ মানে এমন এক পরিস্থিতি, যেখানে বস্তুনিষ্ঠ তথ্যের চেয়ে মানুষের ব্যক্তিগত আবেগ আর বিশ্বাস জনমত গঠনে বেশি প্রভাব ফেলে। অর্থাৎ, তথ্য আছে, প্রমাণও আছে, কিন্তু মানুষ সিদ্ধান্ত নেয় তার মজ্জাগত সংস্কার আর অনুভূতি দিয়ে।
আমাদের স্বাধীনতার ইতিহাসের কথাই ধরা যাক। ১৯৭১ সালে যে ভয়াবহ গণহত্যা আর মা-বোনের ওপর পাশবিক নির্যাতন চলেছিল—তা শুধু কিছু সংখ্যা নয়, তা এ দেশের প্রতিটি ধূলিকণায় লেগে থাকা অমোঘ সত্য। অথচ আজ আমার পাড়াতো ছোট ভাই, জেন-জি প্রজন্মের প্রতিনিধি—অবলীলায় বলছে, ‘ভাইয়া, ইতিহাস তো আপেক্ষিক! ফেসবুকে দেখলাম সব নাকি অতিরঞ্জিত।’
সে জানে না, এই ‘আপেক্ষিকতা’র আড়ালে একাত্তরের সেই পরাজিত অন্ধকার শক্তিরাই লুকিয়ে আছে। যারা এই দেশেরই সন্তান হয়েও ধর্মের দোহাই দিয়ে নিজ দেশের মানুষের বিরুদ্ধে অস্ত্র তুলে নিয়েছিল। সেই রাজাকার, আল-বদর, আল-শামস—যারা সরাসরি মানবতাবিরোধী অপরাধে লিপ্ত ছিল, তারা আজ পোস্ট-ট্রুথের চাদর মুড়ি দিয়ে নতুন রূপে আবির্ভূত হয়েছে। তারা সরাসরি একাত্তরকে অস্বীকার করার সাহস পায় না, বরং সুকৌশলে এমন এক বয়ান তৈরি করে, যেখানে খুনি আর শহীদ, ঘাতক আর মুক্তিদাতা—সবই সমান মনে হয়। তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘বিকল্প সত্য’ ফেরি করছে, যাতে নতুন প্রজন্ম বিভ্রান্ত হয়ে ভাবে—‘হয়তো ওরাও ঠিকই ছিল!’ এ এক মারাত্মক রাজনৈতিক সংকটই শুধু নয়, খুনিদের দায়মুক্ত করারও এক সুগভীর রূপক ব্যঞ্জনা।
এই গোলকধাঁধায় আমি পথ হারাতাম, যদি না সেদিন বছির উদ্দিনের সঙ্গে দেখা হতো। মধ্যরাতের ঢাকা শহর। ইরান-ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের ডামাডোলে বিশ্বজুড়ে তেলের বাজারে অস্থিরতা। ফেসবুকে খবর ছড়িয়েছে—তেল শেষ হয়ে যাচ্ছে। অমনি আমাদের উচ্চমধ্যবিত্ত সমাজ গাড়ি নিয়ে ফিলিং স্টেশনগুলোয় হুমড়ি খেয়ে পড়ছে। তেল সংগ্রহের জন্য দীর্ঘ লাইন। কেউ ভাবছে না দেশে তেলের মজুত আসলে কতটুকু, সবাই শুধু নিজের নিরাপত্তার জন্য তেল মজুত করতে ব্যস্ত।
পেট্রলপাম্পের সেই লাইনের পাশ দিয়ে আমাকে রিকশা দিয়ে টেনে নিয়ে যাচ্ছিলেন বছির উদ্দিন। গামছায় ঘাম মুছতে মুছতে আমাকে জিজ্ঞেস করল, ‘স্যার, ধরেন একজন লোক বাড়তি তেল কিনে রাখল, কারণ তার বাবা অসুস্থ, যেকোনো সময় হাসপাতালে নেওয়া লাগতে পারে। কিন্তু সেকি একবারও ভাবছে—তার এই বাড়তি তেল জমানোর কারণে হয়তো কোনো ডাক্তারের গাড়িতে কাল তেল থাকবে না? ডাক্তার যদি সময়মতো হাসপাতালে না পৌঁছায়, তবে ওই শিক্ষিত লোকের বাবার চিকিৎসা কি শেষমেশ হবে?’
আমরা তথাকথিত শিক্ষিতরা তথ্য জানি, কিন্তু তার সুদূরপ্রসারী সম্পর্ক দেখি না। আমরা ব্যক্তিগত স্বার্থ বুঝি, কিন্তু সমষ্টির ধস দেখি না। যেখানে ব্যক্তি-আবেগ বা সাময়িক নিরাপত্তা বড় হয়ে ওঠে, কিন্তু বৃহত্তর মানবিকতা আড়ালে পড়ে যায়।
আমি নির্বাক হয়ে গেলাম। একজন রিকশাচালকের এই সরল জিজ্ঞাসা যেন আমাদের সুবিধাপ্রাপ্ত পুরো আধুনিক সমাজের সামনে একটা স্বচ্ছ আয়না ধরে দিল। আমরা তথাকথিত শিক্ষিতরা তথ্য জানি, কিন্তু তার সুদূরপ্রসারী সম্পর্ক দেখি না। আমরা ব্যক্তিগত স্বার্থ বুঝি, কিন্তু সমষ্টির ধস দেখি না। এটাই পোস্ট-ট্রুথের সামাজিক রূপ—যেখানে ব্যক্তি-আবেগ বা সাময়িক নিরাপত্তা বড় হয়ে ওঠে, কিন্তু বৃহত্তর মানবিকতা আড়ালে পড়ে যায়।
ইতিহাসবিদ ইউভাল নোয়া হারারি লিখেছিলেন—মানুষ মূলত কল্পকাহিনির প্রাণী। আমরা গল্প বানাই, গল্পে বিশ্বাস করি। সমস্যা তখন হয়, যখন এই গল্পের নেশা বাস্তবতাকে ঢেকে দেয়। জেন-জি তরুণ বলে, ‘সবই আপেক্ষিক’; বাড়ির গৃহিণী মনে করে, ‘ফেসবুকে যা শেয়ার হয় তা–ই সত্য’। এর মাঝখানে দাঁড়িয়ে আমি ভাবি—আমরা কি তবে এমন এক পৃথিবীতে ঢুকে পড়ছি যেখানে সত্যের মূল্য নির্ধারণ করবে অ্যালগরিদম?
আমাদের আবার প্রশ্ন করতে শিখতে হবে। মনে রাখতে হবে, প্রামাণিক তথ্যের বাইরে যা কিছু আবেগ দিয়ে গেলানো হচ্ছে, তা আসলে একধরনের আধিপত্য। পোস্ট-ট্রুথ নামক এই ডিলেমা আমাদের ক্রমাগত মোহগ্রস্ত করবে, কিন্তু বছির উদ্দিনের সেই স্বচ্ছ আয়নার সামনে আমাদের বারবার ফিরে আসতে হবে।
আজকের প্রশ্নটা খুব সরল—আমরা কি নিজেদের সুবিধামতো সত্যের ছাঁচ বানাব, নাকি বস্তুনিষ্ঠ প্রমাণের মুখোমুখি হওয়ার সাহস দেখাব? কারণ, শেষ পর্যন্ত একটা সমাজ টিকে থাকে কেবল পেশিশক্তিতে নয়, ন্যায় আর সত্যের নৈতিক ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে। আর যদি সেই ভিত্তিটাই হারিয়ে যায়, তবে একদিন আমরা দেখব—আমরা সবাই রঙিন গল্পের ভেতর বাস করছি ঠিকই, কিন্তু বাস্তবের মাটিটা পায়ের নিচ থেকে অনেক আগেই সরে গেছে।