default-image

প্রথম বর্ষেই হুমায়ূনের সঙ্গে আমার ভাব জমে ওঠে। তখন থেকে খেয়াল করতাম, সবকিছু নিয়ে তার রয়েছে তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণ। সেই ছাত্রজীবনে আমরা যখন রিকশায় করে কার্জন হল থেকে মুহসীন হলে আসতাম, হুমায়ূন রিকশাওয়ালার সঙ্গে গল্প জুড়ে দিত। আশপাশের মানুষদের আচার–আচরণ, কথাবার্তা কাগজে লিখে রাখত নোট আকারে। এমন অনেকবারই হয়েছে যে আমরা তুমুল আড্ডা দিচ্ছি আর হুমায়ূন বসে বসে আমাদের অঙ্গভঙ্গি পর্যবেক্ষণ করছে এবং সেসব টুকটুক করে টুকে রাখছে।

কেন সে এমন করছে? জিজ্ঞেস করলে কিছু বলত না, কেবল মিটিমিটি হাসত। অনেক পরে তার গল্প–উপন্যাস পড়ে বুঝেছি, এগুলো সে করত লেখকজীবনের প্রস্তুতি হিসেবে। তবে আমরা তখন এগুলো ঘুণাক্ষরেও টের পাইনি।

ছাত্রজীবনে হুমায়ূনের মধ্যে মধ্যবিত্ত পরিবারের বড় ছেলের আদলটিই বারবার দেখতে পেতাম আমি। পড়াশোনার জন্য যে ছেলে বাড়ি থেকে কোনো টাকাপয়সা নেয় না, টিউশনি করে নিজের খরচ চালায়, ‘আর্লি টু বেড অ্যান্ড আর্লি টু রাইজ’–এর নিয়ম মেনে পড়ালেখা করে—হুমায়ূন ছিল এমন। সব বিষয়েই প্রচণ্ড দায়িত্বশীল।

বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে প্রায় প্রতি সপ্তাহেই গুলিস্তানের নাজ সিনেমা হলে একত্রে ইংরেজি ছবি দেখতে যেতাম আমি আর হুমায়ূন। সে সময় ভারতীয় বাংলা ছবি মুক্তি পেত গুলিস্তান হলে আর ইংরেজি ছবি আসত নাজে। আমরা দুজনই ইংরেজি ছবির ভক্ত ছিলাম। গ্রেগরি পেক আর অন্ড্রে হেপবার্নের রোমান হলিডে আমরা তিনবার দেখেছিলাম।

নাজে সিনেমা দেখে ফেরার পর ছবির চরিত্র, ঘটনা, সংলাপ নিয়ে আমরা কথা বলতাম। সে সময় দেখে আসা ছবিটি নিজের মতো করে ব্যাখ্যা করত হুমায়ূন। এসব সিনেমার সংলাপগুলো নিজের মতো করে নানাভাবে ওর গল্পের মধ্যে পরে ব্যবহার করতে দেখেছি। ওর একটা বিরাট গুণ ছিল এই, যেকোনো বিদেশি ছবি বা উপন্যাসকে নিজের দেশের আলোকে বুঝতে চাইত। আসলে সবকিছুকে বাংলাদেশের মাটি ও মানুষের দৃষ্টভঙ্গি দিয়ে দেখা ও বলার ওই চেষ্টা তার ছাত্রাবস্থা থেকেই ছিল।

হুমায়ূনের সঙ্গে চলাফেরার কিছুদিন পরই বুঝলাম, ও অন্য আর–দশজনের মতো নয়। সাহিত্য, ইতিহাস, দর্শন ও সমাজ নিয়ে তার পড়াশোনা বেশ ভালো ছিল। বিশেষ করে বাংলা অঞ্চলের মানুষ ও তাদের সংস্কৃতি–আচরণ—এসব নিয়ে তার ব্যাপক আগ্রহ লক্ষ করতাম তখনই। বইয়ের বাইরে গিয়ে এক নিজস্ব পদ্ধতিতে সে মানুষকে বোঝার চেষ্টা করত। ওর হাতের লেখা খুব ছোট ছোট অক্ষরে ছিল, তাই আমরা ঠিকমতো বুঝতে পারতাম না। কিন্তু ও যে সবকিছুর মধ্যে লেখার উপাদান ও সাহিত্যের চরিত্র খুঁজে বেড়াত, একসময় তা দিব্যি বোঝা যেত।

সে যখন তার প্রথম উপন্যাস শঙ্খনীল কারাগার লেখে, সে সময় এর বিষয়বস্তু নিয়ে ওর সঙ্গে আমার কথা হয়। আমি উপন্যাসটির নাম নিয়ে আপত্তি তুলেছিলাম। বলেছিলাম, এটা অনেক কঠিন নাম। সাধারণ পাঠকেরা এত কঠিন নামের উপন্যাস সহজে গ্রহণ করবে না। কিন্তু হুমায়ূন গোঁ ধরে বলল, এটাই হবে তার উপন্যাসের নাম। পরে যে সময় সে নন্দিত নরকে লেখে, সে সময়েও একই রকমের তর্ক হলো। ওর অদ্ভুত সব রসিকতার ধরন ছিল। একবার ওর সঙ্গে একটি বিষয় নিয়ে ব্যাপক তর্ক হলো, কথা–কাটাকাটি হলো। সপ্তাহখানেক পর হুমায়ূন এসে বলল, ‘আমার নতুন উপন্যাসে খারাপ লোকের চরিত্র হিসেবে আতিক নামের একজনকে রেখেছি।’ এই কথা শুনে হাসব, না রাগ করব, বুঝে উঠতে পারছিলাম না।

পড়াশোনা শেষ করে আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগে শিক্ষক হিসেবে যোগ দিই। আর হুমায়ূন ময়মনসিংহে অবস্থিত বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়নের শিক্ষক হিসেবে যোগ দিল। এ সময়ও আমাদের সম্পর্কে তেমন ছেদ পড়েনি। ছুটি পেলে কয়েকজন বন্ধু মিলে আমরা হুমায়ূনের ক্যাম্পাসে চলে যেতাম, মূলত তার সঙ্গে আড্ডা দেওয়ার জন্যই। পরে ১৯৭৪ সালে তো হুমায়ূন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগেই যোগ দেয়। মজার ব্যাপার হলো, এবারও আমাদের একই রুমে বসতে দেওয়া হলো। আমাদের কক্ষের পাশেই ছিল একটি জারুলগাছ। তখনো হুমায়ূন ততটা জনপ্রিয় হয়ে ওঠেনি। তবে আড্ডাবাজ হিসেবে আমাদের খ্যাতি থাকার কারণে আমাদের রুমে তখন অনেকেই আসত।

ক্লাসে কী পড়ানো হবে, কীভাবে বললে শিক্ষার্থীরা বুঝতে পারবে—এসব নিয়ে বিস্তর আলোচনা করতাম আমরা। আমি ক্লাস নিতাম বাংলা–ইংরেজি মিশিয়ে। আর হুমায়ূন সব সময় সহজ বাংলায় কথা বলার ব্যাপারে আগ্রহী ছিল। বাংলায় সুন্দর করে গুছিয়ে কথা বলার এক অসাধারণ ক্ষমতা ছিল তার। অপ্রয়োজনীয় কথা কম বলত, যখন যা বলত, তা সাহিত্যের মতো সুন্দর হয়ে উঠত। আর এসব কথার সঙ্গে বাড়তি হিসেবে ছিল তার অনন্য রসবোধ।

আমাদের সময়ে ক্লাস নেওয়ার জন্য চক, ডাস্টার আর বোর্ডই ছিল একমাত্র ভরসা। হুমায়ূন নিজেও পড়াশোনা করার সময় রসায়ন বিষয়টি বোঝার চেষ্টা করত, কখনো মুখস্থ করত না। ফলে শিক্ষক হিসেবে সে মুখস্থ নয়, শিক্ষার্থীদের বোঝানোর চেষ্টা করত।

আদতে অভ্যাস, আচার–আচরণ ও ব্যক্তিত্বের দিক দিয়ে হুমায়ূন আহমেদ ছিল সর্বান্তঃকরণে একজন বাংলাদেশের মানুষ—সেটা যেমন মানুষ হিসেবে, তেমনি ছাত্র ও শিক্ষক হিসেবে এবং লেখক হিসেবেও। বোধ করি এসব কারণেই এ দেশের মানুষের মনের গহিনে স্থান করে নিতে তার খুব বেগ পেতে হয়নি।

অন্যান্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন