ভেনিস: যে শহর শিল্প উদ্যাপন করতে জানে
ভেনিস আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে আসার সবকিছু যখন চূড়ান্ত ঠিক সেই মুহূর্তে আমি জানতে পারি, এবারের ৮৩তম আসরে ওরিৎজন্তি (হরাইজন) বিভাগে স্থান পেয়েছে রুবাইয়াত হোসেনের ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’। যাকে বলে মণিকাঞ্চন যোগ হওয়া, সেটাই হলো। ভেনিসে এলাম, প্রথমবারের মতো সঙ্গে এল বাংলাদেশের একটি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র। আমারও ভেনিসের উৎসবে প্রথমবার আসা। সেপ্টেম্বরের ১ তারিখে আমি ভেনিসের মার্কো পোলো বিমানবন্দরে পা রাখি।
ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসব বিশ্বের সবচেয়ে পুরোনো উৎসব, তার পদাঙ্ক অনুসরণ করেই ইউরোপ, এরপর আমেরিকা, এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে চলচ্চিত্র উৎসব। উৎসব শুধু চলচ্চিত্র দেখানোই নয়, এর ভূরাজনৈতিক দিকও রয়েছে। আর সেটা এবার হাড়ে হাড়ে টের পাওয়া গেছে। উৎসবের পরিচালক আলবার্তো বারবারা এমন সব ছবি এবার বাছাই করেছেন, যেগুলো রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত জোরালো বক্তব্য ধারণ করে। পাশাপাশি তিনি অতর চলচ্চিত্রকারদের এককাট্টা করেছেন। বলা যেতে পারে, একটি সফল উৎসব করার জন্য তিনি সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন। সাড়ে চার হাজারের ওপর জমা পড়া ছবি থেকে ৮৮টি ছবি বাছাই করা চাট্টিখানি কথা নয়! তাদের নিরলস পরিশ্রম আর বিচক্ষণতার ফল হিসেবে আমরা দেখলাম, উৎসবের সাফল্যকে। গোল্ডেন লায়ন পেল এমন একটি ছবি, মে এল-তুখি পরিচালিত ‘উইম্যান আননোন’, যা ইউরোপে নাৎসিবাদের কথা বলে, আবার নাৎসিবাদকে প্রতিহত করতে গিয়ে কেউ কেউ যে ফ্যাসিবাদের খপ্পরে পড়ে গিয়েছিল, সেই কথাও বলে। নারীকেন্দ্রিক ছবিটি ভেনিসে প্রিমিয়ার হওয়ার পর থেকেই প্রশংসিত হচ্ছিল।
তথ্যচিত্র ‘নাজা’র কথা আর কী বলব! দখলকৃত গাজায় কতটা নির্মমভাবে, উচ্চ প্রযুক্তি ব্যবহার করে খেলাচ্ছলে ইসরায়েলি বাহিনী ফিলিস্তিনি আরবদের মারছে, ছবিটি সেই স্বীকারোক্তির দলিল হাজির করে। এই দলিল সাক্ষ্য দেয় ইসরায়েলিরা গণহত্যা চালাচ্ছে। ছবিটি স্পেশাল জুরি পুরস্কার পায়। এর কদিন আগে ছবিটি প্রদর্শিত হলে উপস্থিত দর্শকেরা দুই পরিচালক ইয়ুভাল আব্রাহাম ও র্যাচেল সোরকে অভিনন্দন জানায় তুমুল করতালির মাধ্যমে, টানা প্রায় ২৫ মিনিট। আমিও যখন ছবিটির ভিন্ন শো দেখি, তখন আমিও প্রচণ্ড ঝাঁকি খাই, সত্য জানার জন্য নয়, শয়তানের মুখ থেকে সত্য শুনছি সে জন্য।
বলা যেতে পারে ‘নাজা’ একাই ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবের সব আলো কেড়ে নিয়েছে। ‘নাজা’র মতো এমন সাহসী ছবি কিউরেট করলে যেকোনো চলচ্চিত্র উৎসবই বিশ্বের নজরে চলে আসে। আর এতে বিশ্বরাজনীতিতে কিছুটা হলেও অস্বস্তি উৎপাদন হয়। কারণ, ছবিগুলো নিয়ে পত্রপত্রিকায় লেখালেখি হয়। জনমত গড়ে ওঠে অন্যায়ের বিরুদ্ধে। কাজেই চলচ্চিত্র উৎসব “শুধু যাওয়া আসা, শুধু স্রোতে ভাসা” নয়। এটি কোমল কূটনীতির অংশও বটে। সেই বিবেচনায় ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে যখন ‘নাজা’র মতো ছবি পুরস্কার পায় তখন এত দিন ধরে ইসরায়েলি আগ্রাসনের পক্ষে যে বৈধতা উৎপাদন করা হচ্ছিল সেটি প্রশ্নবদ্ধ হয়।
শুধু রাজনৈতিক ছবি নয়, মানবিক ও দার্শনিক ধারণা-সংবলিত চমৎকার সব ছবির প্রিমিয়ার দেখতে পারাটাও তো অনেক আনন্দের। বাড়তি আনন্দের কথা তো আগেই বলেছিলাম, বাংলাদেশের ছবি স্থান পাওয়ার কথা। তো এবারের আসরে আমার আরও একটি প্রাপ্তি হলো বিশ্বখ্যাত অতর নির্মাতা, যাকে বলা হয় নিউ জার্মান সিনেমার একজন পুরোধা ব্যক্তি, সেই ভিম ভেন্ডার্সের সঙ্গে সাক্ষাৎ হওয়া এবং দুটো বাক্য বিনিময় করা। এবং একই ছাদের নিচে বসে তার অসাধারণ ত্রিমাত্রিক প্রামাণ্যচিত্র “ফ্রম ইনসাইড আউট: দ্য আর্কিটেকচার অব পিটার জুমথর” দেখার অভিজ্ঞতা অর্জন করা। মজার বিষয় গত বছর বার্লিনের পর এবারও ভারতের অত্যন্ত সুপরিচিত চলচ্চিত্র পরিচালক অনুরাগ কশ্যপের সঙ্গে সকাল-বিকেল বহুবার দেখা হয়েছে, টুকরো টুকরো আলাপও হয়েছে। এটাও কম প্রাপ্তি নয়।
আসলে ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসব থেকে পেয়েছি আরও অনেক কিছু। রুবাইয়াত হোসেনের সঙ্গে আমার আগে পরিচয় ছিল না, ওনার সঙ্গে পরিচিত হওয়া, এরপর নানা বিষয়ে মতামত ভাগাভাগি করা। ছবির অভিনয়শিল্পীদের সাক্ষাৎকার নেওয়া। সবচেয়ে আনন্দের বিষয় হলো ২৩টি বাছাইকৃত ছবি দেখা। কোনোটি মূল প্রতিযোগিতায় ছিল, কোনোটি প্রতিযোগিতার বাইরে। কোনোটি আবার ‘হরাইজন’ বিভাগের নিরীক্ষাধর্মী ছবি। সবগুলোরই প্রিমিয়ার হয়েছে এই ভেনিসে।
ভেনিস শহরটাকে দেখাও তো পরমানন্দের ব্যাপার। যে শহরে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর গিয়েছিলেন ১৯২৫ সালে। ভেনিসকে বলেছিলেন অ্যাড্রিয়াটিকের রানি। দেশটির সৌন্দর্যের টানে ও অসমাপ্ত কিছু কাজ সম্পন্ন করতে ১৯২৬ সালে দ্বিতীয় ও শেষবার ইতালিতে গিয়েছিলেন তিনি, সেবার অবশ্য ভেনিসে আর যাননি। তাঁর ইতালি সফরের ১০০ বছর পর ভেনিসে এসে আমি যেন রবীন্দ্রনাথের ইতালি সফরের দিনগুলোকেই উদ্যাপন করলাম।
উৎসব চলাকালে আমি পাগলের মতো একদিকে লিখে গেছি, অন্যদিকে ফাঁক পেলেই ঘুরে বেড়িয়েছি ভেনিসের ওলিগলি। বোঝার চেষ্টা করেছি তাদের কৃষ্টি ও সংস্কৃতি। বিখ্যাত সব চার্চ ও ব্যাসিলিকায় গিয়েছি। মুগ্ধ হয়ে রেনেসাঁ ও তার পরবর্তী যুগের বিখ্যাত সব চিত্রশিল্পীর কাজ দেখেছি মুগ্ধ হয়ে। সমসাময়িক শিল্পকর্ম দেখারও সুযোগ করে দিয়েছিল আমাকে বিয়েন্নালে কর্তৃপক্ষ। আমি সেসব কাজ দেখেও বিমোহিত হয়েছি। ভেবেছি মানুষের সৃজনক্ষমতা যখন শিল্পকে জড়িয়ে নিয়ে নিজেকে প্রকাশ করে, তখন তার সীমা কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়? অসীমে।
ভেনিসের এই বিয়েন্নালে সম্পর্কে বলা যায় ‘সীমার মাঝে, অসীম, তুমি বাজাও আপন সুর’। সেই সুরের সবটা আমার শোনা হয়নি। মানে আমি শুধু চলচ্চিত্র আর শিল্পকর্ম প্রদর্শনী দেখেছি। সব মিলিয়ে ভেনিসে থেকেছি ১ থেকে ১৪ সেপ্টেম্বর—১৪ দিন। শুনেছি মঞ্চনাটক চলছিল, সামনে সংগীতায়োজন আছে। তো তাদের এই বিপুল বিশাল শিল্প উদ্যাপন দেখতে হলে গোটা একটা বছরই থেকে যেতে হবে এখানে। সেটা তো আর সম্ভব নয়। তাই যতটুকু দেখা হলো, সেটুকু দিয়েই আন্দাজ করে নেওয়া যায় শিল্পচর্চার সীমা তারা নির্ধারণ করছে এক আকাশসমান। অথচ বাংলাদেশে শিল্পচর্চার গণ্ডি ছোট হতে হতে এখন ঘরের ভেতরেও কেউ গান গাইলে, অনুভূতিপ্রবণরা ছুটে এসে সেটাও বন্ধ করে দেয়। কবিগান বন্ধ, নাটক করা যাবে না, চলচ্চিত্র দেখা হারাম ইত্যাদি ইত্যাদি। কুয়োর ব্যাঙের পক্ষে আসলে মহাবিশ্বের সৌন্দর্য আর বিশালত্ব বোঝা অসম্ভব ব্যাপার। বোঝানোর চেষ্টা করাটাও বোকামি!
দুনিয়ার প্রতিটি উন্নত জাতি যেখানে সর্বজনের শিল্পকে উদ্যাপনের পাশাপাশি নিজেদের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরে, সেখানে আমরা স্বাধীনতার রূপকার, অবিসংবাদিত নেতাদের ছবি সরিয়ে সেখানে রাখছি বাংলাদেশ রাষ্ট্রের শত্রুর ছবি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো সর্বোচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এসব ঘটছে। অথচ ভেনিসের এই বিয়েন্নালেতে দেখলাম অন্য জাতিরাষ্ট্রের ভিড়ে নিজেদের স্বাতন্ত্র্য তুলে ধরার কী চমৎকার প্রচেষ্টা ইতালির। চলচ্চিত্র উৎসবের প্রতিটি শাখায় তারা মানসম্পন্ন ইতালীয় ছবিকে স্থান দিয়েছে। শিল্পকর্মের প্রদর্শনীতেও তা-ই। উন্নত জাতি এভাবেই মীমাংসিত বিষয় নিয়ে ফাতরামো না করে, নিজেদের ঔজ্জ্বল্য ছড়াতে থাকে। আর বর্বর-অসভ্য জাতি নিজেরাই নিজেদের মুখে আলকাতরা মেখে নর্দমায় ডুবে যেতে থাকে।
ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য তাই শুধু লিখে রেখে যাচ্ছি, সাক্ষ্য হিসেবে, পৃথিবী কোথায় কোন দিকে কত গতিতে চলছিল, তার তুলনায় আমার দেশ গভীর থেকে গভীরতর অন্ধকারে কত দূর তলিয়ে যাচ্ছিল। ধর্মান্ধতা, অশিক্ষা, দুর্নীতি আর লোভ-লালসার কারণে গোটা জাতি কেমন করে ধ্বংসের দিকে ধাবিত হয়, সেটাই আমি দেখাতে চেষ্টা করছি অন্যদের অগ্রগতি সামনে তুলে ধরার মাধ্যমে। এটা অনেকটা একটি খর্বকায় ভোঁতা পেনসিলের পাশে, চোখা লম্বা পেনসিল আলগোছে রেখে দেওয়ার মতো।