স্ত্রীকে লেখা অন্তরঙ্গ চিঠি

এখানে ছাপা হওয়া চিঠিগুলো ১৯২৬ থেকে ১৯২৮—এই দুই বছরে সহধর্মিণী মরগুবা খাতুনকে লেখা। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ তখন উচ্চশিক্ষার জন্য গিয়েছিলেন ফ্রান্সের সরবোন বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখানে তিনি বৈদিক, প্রাচীন পারসি, তিব্বতি ও ভারতীয় আধুনিক ভাষাগুলো নিয়ে অধ্যয়ন করেন এবং পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। গবেষণার কাজে কিছুদিন তিনি ছিলেন জার্মানির ফ্রাইবুর্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে।

দূর দেশে বসে তাঁর মানসিক অবস্থা যেন মেঘদূত-এর যক্ষের মতো। মন পড়ে থাকে প্রিয় মানুষ মরগুবা খাতুনের কাছে। এখানে তিনি আবেগতাড়িত, প্রিয়তমের বিরহে কাতর, না পাওয়ার বেদনায় মুহ্যমান, মিলনের অপেক্ষায় অধীর। এসব চিঠিতে পণ্ডিতের কঠিন খোলস চিরে উঁকি দিচ্ছে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর মমতাময় হৃদয়।

গ্রাফিকস: প্রথম আলো

চিঠি : ১

মরগুবা খাতুন। ছবি: মুর্তজা বশীর

লোহিত সাগর
১৮/৯/২৬

জানের পেয়ারী,
রাতদিন তোমার মুখখানি মনে করি। সকল সময় তোমাদের জন্য আল্লার দরগায় দো’আ করিতেছি। তুমিও আমার লেগে দো’আ করিও। একটু পড়াশোনা করিও। সকল সময় আল্লাহতা’আলাকে ইয়াদ করিবে। তাহা হইলে কোন দুঃখ হইবে না। আমাকে পত্র লিখিও। খারাপ লেখার জন্য ভাবিও না। ভাল আছি। মজ্ঞু, সফী, গোলে, ওলী, যকী—সকলকে আমার বদলে চুমা দিও। বেশী আর কি লিখিব। আজ বিদায়।

একান্ত তোমারই
মুহম্মদ শহীদুল্লাহ

ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। প্রতিকৃতি: মুর্তজা বশীর, ৬ জুলাই ১৯৬৯

চিঠি : ২

প্যারিস
২৭/১/২৭

জানের পেয়ারী,
তোমার অসুখের খবরে মনে বড় ব্যথা পাইলাম। যখনই তোমার কথা মনে হয়, চোখে পানি আসে। বাবা তকী সুন্দর ও লম্বা-চওড়া হইয়াছে, তাহা আমি আগেই খাবে দেখিয়াছি। তাহাকে আমার হইয়া একশ চুমা দিও। মাদুলিতে যদি ফল না হয়, ডাক্তার দেখাইতে অবহেলা করিও না। তুমি ভাল থাকিলে আমিও ভাল থাকি। তোমার জন্য ভাবিত রহিলাম। ভাল আছি। আমার দো’আ ও চুমা লইও।

তোমারই—
শহীদ

চিঠি : ৩

ফ্রাইবুর্গ, জার্মানি
১৪/৯/২৭

প্রিয়তমে,
তুমি একেবারেই চুপচাপ। বলি, ব্যারাম ত চিরকালই আছে। একটু লেখাপড়া শিখিলে হয় না কি? দেখিতে দেখিতে এক বছর হইয়া গেল। বাকি সময়টাও এই রূপেই কাটিয়া যাইবে। নিজের শরীরটার দিকেও একটু নজর রাখিও। আমি তোমারই আছি। কোন ভয় নাই। ভালই আছি।

ইতি
একমাত্র তোমারই
মুহম্মদ শহীদুল্লাহ

মরগুবা খাতুন। প্রতিকৃতি: মুর্তজা বশীর, ৯ এপ্রিল ১৯৯২

চিঠি : ৪

ফ্রাইবুর্গ
১২/১০/২৭ ইং

জানী,
তোমার দুখানা চিঠি একসঙ্গেই পেয়েছি। কত খুশী হলুম! বেলাতকে নিয়ে ব্যস্ত আছ। ভাল কথা। কিন্তু বেলাতের বাপেরও তো একটু খোঁজ করতে হয়। চিঠি লেখবার ভার ষোল আনা পরের ঘাড়ে দিলে চলবে কেন? এই মাসের শেষে প্যারিসে যাচ্ছি। ভাল আছি। মন দিয়ে লেখাপড়া করছি। আর তোমাদের জন্য দো’আ করছি।

ইতি
একান্ত তোমারই
মুহম্মদ শহীদুল্লাহ

চিঠি : ৫

প্যারিস
২৯/১২/২৭

প্রিয়তমে,
তোমার হাতের চিঠি যেন তোমারই হাতের ছোঁয়া। পাইলে কত সুখী হই! তোমার হাতের লেখার বিচার করা চলে না। যেমনই লেখ, আমার চোখে সুন্দর, তোমারই মত।
মধ্যে খুব ঠান্ডা পড়িয়াছিল। এখন একটু গরম। পড়াশুনা লইয়া ভারী ব্যস্ত। কাজ শেষ করিতে পারিলেই বাড়ী রওনা হই। তুমি কেমন আছ? আমার জন্য ভাবিও না। দো’আ করিও। ভাল আছি। আমার হইয়া কচিদের চুমা দিও।

ইতি
একান্ত তোমারই
মুহম্মদ শহীদুল্লাহ

চিঠি : ৬

প্যারিস
২৩/২/২৮

প্রিয়তমে,
তুমি লিখিয়াছ বেলাত তোমাকে শান্ত করিয়াছে। কিন্তু বল তো বেলাতের বাবাকে কে শান্ত করে? যকী নাকি কাগজ লইয়া আমাকে চিঠি লিখিতে বসে। তার আঁচড় কাটা কাগজ আমাকে পাঠাইয়া দিও। আমি শরীরে ভালই আছি। আজ থেকে রোযা শুরু হইল। তোমার চিঠি পাইলে কত খুশী হইব!

ইতি
তোমারই একান্ত
মুহম্মদ শহীদুল্লাহ

মুর্তজা বশীরের আঁকা ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর তিনটি প্রতিকৃতি, ১৯৬৭, ১৯৬৯, ১৯৮৮

চিঠি : ৭

প্যারিস
২২/৩/২৮

প্রিয়তমে,
তুমি লিখিয়াছ আমি দাড়ি কামাইয়াছি, সিগারেট খাইতেছি। এ সব তুমি কি স্বপ্নে দেখিয়াছ? না, শয়তান তোমার কানে কানে বলিয়াছে? আজ ১০ দিন হইল এখানকার পাসপোর্টের জন্য যে ছবি তুলিয়াছি, তাহা পাঠাইতেছি। তুমি দেখিবে তোমার কচির বাপ যা ছিল, তাই আছে। যত দিন বাঁচিয়াছি, আর তত দিন বাঁচিব না। আর কি বাজে কাজ ভাল লাগে?
বেলাত বাবাজীকে ঘন ঘন খাবে দেখিতেছি। ছেলেমেয়েদের এবং তোমার সকলের এক সঙ্গের ছবি পাইলে বড় খুশী হইতাম। এখান হইতে রওনা হইবার আর চার মাস বাকি রহিল। দেখিতে দেখিতে দিন ফুরাইয়া যাইবে।
থিসিস লেখা শেষ হইয়াছে। ছাপাইতে দিয়াছি। পাশের খবর পাইতে এখনও তিন মাস দেরী। দিন পনের পরে আবার ফ্রাইবুর্গে যাইতে ইচ্ছা আছে।
কা’ল ঈদ। কত কথা মনে হইতেছে। আমার সত্য ঈদ পাঁচ মাস পরে হইবে, যখন তোমার চাঁদ-মুখ দেখিব। আল্লার মরযি। আমার পেয়ার জানিও। আমার হইয়া ছেলেমেয়েদের পেয়ার করিও। আমার শরীর গতিক ভাল আছে। তোমাদের জন্য হাজার হাজার দো’আ করিতেছি।

ইতি
তোমারই একান্ত
মুহম্মদ শহীদুল্লাহ

সাত পুত্রবধূর সঙ্গে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ও মরগুবা খাতুন, ১৯৬৬। ছবি: মুর্তজা বশীর

চিঠি : ৮

প্যারিস
৩০/৫/২৮

প্রিয়ে,
ঈদের দিনের অসংখ্য চুমা লইও। তোমার চিঠি পাইয়াছি। আমি পড়াশুনায় বড় ব্যস্ত বলিয়া প্রতি সপ্তাহে লিখিতে পারি নাই। কিন্তু তুমিও ত আমাকে লেখ নাই। তোমার চিঠি পড়িয়া বড় রাগ হইয়াছিল। বাড়ী গিয়া ঝগড়া করিব। এখন নয়। খালি এইটুকু বলি, তুমি আমাকে যাহা বলিয়াছ, কেহ যদি তোমাকে তাহা বলে, তবে তোমার মনে কেমন হয়। খোদাতা’লা সকল দেখিতেছেন ও জানিতেছেন।
আমি জাহাজ ঠিক করিয়াছি। আল্লাহ চাহেন ত আমি কলিকাতায় ১৯শে আগস্ট তারিখে পৌঁছিব। পরে দেশে মা ও অন্য সকলের সহিত দেখা-সাক্ষাৎ করিয়া ২৫শে আগস্ট ঢাকায় তোমার খেদমতে হাজির হইব। সেই দিন আমাদের ঈদ হইবে। আমি ভাল আছি। তোমার শরীরের জন্য চিন্তিত রহিয়াছি। আমার হইয়া ছেলেমেয়েদের পেয়ার করিও।

ইতি
একান্ত তোমারই
শহীদুল্লাহ

পৌত্রী মুনীরা বশীরের সঙ্গে মরগুবা খাতুন ও ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, ১৯৬৫। ছবি: মুর্তজা বশীর

চিঠি : ৯

লন্ডন
১৮/৭/২৮, বুধবার

প্রিয়তমে,
অনেক দিন কোন চিঠিপত্র লিখতে পারিনি নানা ঝঞ্ঝাটে। মাফ ক’রো। কাল সন্ধ্যার সময় প্যারিস ছেড়ে এই লন্ডনে এসেছি আজ সকালবেলা। লন্ডন খুব বড় শহর; কিন্তু প্যারিসের মতো সুন্দর নয়। জাহাজ শনিবার ছাড়বে। এখন কেবলই তোমার মুখখানি চোখের সামনে রাত-দিন ধ’রে ভাসছে। ডানা থাকলে জাহাজের অপেক্ষা করতুম না; এখনই উধাও হ’য়ে তোমার বুকে গিয়ে বসতুম। আমি ভাল আছি। এখন শুধু ক’বে বাড়ী পৌঁছব, তাই দিন গুনছি।

একান্ত তোমারই
মুহম্মদ শহীদুল্লাহ

অসুস্থ অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসাপাতালে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, পাশে স্ত্রী মরগুবা খাতুন, ১৯৬৭। ছবি: মুর্তজা বশীর

চিঠি : ১০

২৬শে জুলাই, ১৯২৮

প্রিয়তমে,
এতদিন পরে মুসাফির বাড়ির দিকে চলিল। আজ ছদিন জাহাজে। আরও পনের দিন পানির উপর থাকিতে হইবে। তার পর কলম্বো শহর। সেখান থেকে রেলে জাহাজে দুই রকমেই কলিকাতায় যাওয়া যায়। যদি সুবিধা হয়, তবে জাহাজেই যাইব। তাতে আট দিন লাগিবে। তারপর বাড়ী হইয়া ঢাকায় পৌঁছিতে আরও কয়েক দিন। যে রকমে হউক আল্লাহ চাহেন তো যেমন আগে বলিয়াছি ২৫শে আগস্ট শনিবার ঢাকায় তোমার দরবারে হাজির হইব। তুমি আমার জন্য ঘর সাজাইয়া রাখিবে না কি? এই কয়দিন ভালভাবেই গেল। আর কয়েকটা দিন এখন খোদার হাতে। তোমরা সকলে আমার দো’আ ও ভালবাসা জানিও।

ইতি
একান্ত তোমারই
মুহম্মদ শহীদুল্লাহ

ভূমিকা ও গ্রন্থনা: আনিসুর রহমান
প্রথম আলোর ‘ঈদসংখ্যা ২০২৩’ থেকে উদ্ধৃত