লোককথার বনে গাজী ও বনবিবি

অলংকরণ : এস এম রাকিবুর রহমান। গ্রাফিকস: প্রথম আলো

পঞ্চদশ শতাব্দীর শেষভাগের কথা। বাংলায় তখন সুলতানি আমল। সুলতানি শাসনের সূচনা হয় ১২০৪ সালের দিকে, ইখতিয়ারউদ্দিন মুহাম্মদ বখতিয়ার খিলজি নদীয়া জয়ের মাধ্যমে। খিলজির এই বিজয়ের মাধ্যমেই বাংলায় শুরু হয় মুসলিম শাসন। তবে দিল্লির শাসকেরা দূর থেকে বাংলার শাসন পরিচালনা করতেন। মাঝখানে দিল্লি যখন নিজের ঘর সামলাতে ব্যস্ত, সেই বিশৃঙ্খলার সুযোগ নিলেন শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ। তিনি বাংলার ছোট ছোট রাজ্যকে একসুতোয় গেঁথে দিল্লির আনুগত্য অস্বীকার করলেন। এভাবেই ১৩৩৮ সাল থেকে শুরু হলো বাংলার এক গৌরবময় অধ্যায়—‘স্বাধীন সুলতানি আমল’। ১৫৩৮ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ২০০ বছর সুলতানরা এই স্বাধীন বাংলা শাসন করেছিলেন।

সে সময় ঝিনাইদহের বৈরাট নগরে রাজত্ব করতেন সুলতান সেকান্দর শাহ। এখন বৈরাট নগর বলে আর কিছু নেই, এর অস্তিত্ব এখন মাটির নিচে চাপা পড়ে আছে। সেকান্দর শাহর বড় ছেলের নাম বড় খাঁ গাজী। গাজীর মাতা অজিফা সুন্দরী ছিলেন বলি রাজার কন্যা। সুলতানের এক পালিত পুত্র ছিলেন, যাঁর নাম কালু।

গাজী ছোটবেলা থেকেই ছিলেন সংসার বিবাগী ও আধ্যাত্মিক ধ্যানধারণায় মগ্ন। রাজপ্রাসাদের ঐশ্বর্য তাঁকে টানল না। একদিন তিনি রাজকীয় পোশাক ও সিংহাসনের মোহ ত্যাগ করে ফকিরি বেশ নিলেন। ভাইয়ের অনুগত কালুও রাজসুখ ছেড়ে তাঁর সঙ্গী হলেন। তাঁরা চলে এলেন বিরাট নগরের অদূরে ছাপাইনগরের বারোবাজারে। পুঁথির ভাষায় তাঁদের সেই যাত্রার বর্ণনা ছিল এমন:

‘রাজ্যেশ্বর ত্যাজিয়া গাজী ফকিরি ধরিল,

কালু ভাই সঙ্গে লয়ে বনেতে চলিল।’

ফকির গাজী চম্পাবতীকে দেখে মুগ্ধ হলেন এবং বিবাহের প্রস্তাব দিয়ে কালুকে রাজার দরবারে পাঠালেন। কিন্তু রাজা মুকুট রায় একজন নিঃস্ব ফকিরের পক্ষ থেকে আসা এ প্রস্তাবকে নিজের আভিজাত্যের অবমাননা বলে মনে করলেন। তিনি ক্রোধে কালুকে বন্দী করলেন। ফলে গাজীর সঙ্গে মুকুট রায়ের যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে উঠল।

হাঁটতে হাঁটতে দুই ভাই পাড়ি জমালেন ভাটি অঞ্চলের সুন্দরবনের গহিনে। সেখানে গাজীর আধ্যাত্মিক প্রতাপে বনের হিংস্র বাঘ আর কুমিরেরা পর্যন্ত বশীভূত হয়ে গেল। ধারণা করা হয়, বাঘের চোখে চোখ রেখে এবং লাঠির সাহায্যে তিনি তাদের বশে আনতেন। কুমিরকেও একইভাবে সামলাতেন।

ছাপাইনগর এলাকায় কোনো মুসলমান বসতি ছিল না। সেখানে গাজী প্রথম ইসলাম ধর্ম প্রচার শুরু করেন। হাসিলবাগের এক দরিদ্র তাঁতি তাঁর অনুগ্রহে বিত্তশালী হলেন আর জামালগোদা নামের এক ব্যক্তির দুরারোগ্য ব্যাধি সেরে গেল। গাজীর এই অলৌকিক ক্ষমতার কথা চারদিকে বাতাসের মতো ছড়িয়ে পড়ল।

এরপর গাজী ও কালু উপস্থিত হলেন ব্রাহ্মণনগর এলাকায়। এখানকার সামন্ত রাজা মুকুট রায়ের এক পরম রূপবতী কন্যা ছিলেন, নাম তাঁর চম্পাবতী। পুঁথিতে তাঁর রূপের বর্ণনায় বলা হয়েছে:

‘চম্পাবতীর রূপ যেন বিজলী ঝিলিক,

চাঁদ–সুরুজ লজ্জা পায় দেখে এক তিলক।’

ফকির গাজী চম্পাবতীকে দেখে মুগ্ধ হলেন এবং বিবাহের প্রস্তাব দিয়ে কালুকে রাজার দরবারে পাঠালেন। কিন্তু রাজা মুকুট রায় একজন নিঃস্ব ফকিরের পক্ষ থেকে আসা এ প্রস্তাবকে নিজের আভিজাত্যের অবমাননা বলে মনে করলেন। তিনি ক্রোধে কালুকে বন্দী করলেন। ফলে গাজীর সঙ্গে মুকুট রায়ের যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে উঠল।

গাজীর ছিল এক অদ্ভুত বাহিনী—বনের অসংখ্য প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বাঘ। রণক্ষেত্রে গাজী যখন ডাক দিলেন, বাঘেরা রাজার বিশাল হস্তীবাহিনীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। পুঁথিতে সেই যুদ্ধের গর্জন আজও প্রতিধ্বনিত হয়:

‘গাজী বলে ওরে বাঘ শোন রে বচন,

মুকুট রায়ের সৈন্য তোরা কররে ভক্ষণ।’

গাজী ও দক্ষিণ রায়ের সেই আধ্যাত্মিক ও সামরিক সংঘাত থেকেই জন্ম নিল সুন্দরবনের আরেক বড় বিশ্বাস—বনবিবির আখ্যান। মুন্সী বয়ানউদ্দীনের পুঁথি অনুযায়ী, বনবিবি ও তাঁর ভাই শাহ জাঙ্গলী এসেছিলেন মক্কা থেকে। তখন বনে বাঘরূপী দক্ষিণ রায়ের অত্যাচারে মানুষের জীবন ছিল ওষ্ঠাগত।

রাজা মুকুট রায়ের প্রধান সেনাপতি দক্ষিণ রায় কুমির বাহিনী নিয়ে ডাঙার লড়াইয়ে নামলেন। কিন্তু ডাঙ্গায় কুমির বাঘের ক্ষিপ্রতার কাছে টিকতে পারল না। দীর্ঘ সাত দিনের লড়াইয়ের পর রাজা মুকুট রায় পরাস্ত হলেন।

হয়তো তাদের মধ্যে সাধারণ যুদ্ধই হয়েছিল। এত আগের ঘটনা যে মানুষ যুদ্ধের সেই ঘটনা ভুলে যাওয়ায় যুদ্ধকে কেন্দ্র করে কিছু গল্প মনে রাখতে শুরু করে। অর্থাৎ সম্ভবত বাস্তব কোনো যুদ্ধই পরবর্তীকালে লোককথার অলৌকিক রূপ পেয়েছে।

যাই হোক, পরাজয় নিশ্চিত দেখে রাজমহিষীরা ‘মৃত্যুঞ্জীব কূপে’ প্রাণ বিসর্জন দিলেন। অবশেষে চম্পাবতী ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করলেন এবং গাজীর সঙ্গে তাঁর পরিণয় সম্পন্ন হলো। আজও ঝিনাইদহের বারোবাজারের বাদুরগাছা মৌজায় পাশাপাশি পাথর বাঁধাই করা তিনটি কবর—গাজী, কালু ও চম্পাবতীর লোকস্মৃতির সাক্ষী হয়ে আছে।

গাজী ও দক্ষিণ রায়ের সেই আধ্যাত্মিক ও সামরিক সংঘাত থেকেই জন্ম নিল সুন্দরবনের আরেক বড় বিশ্বাস—বনবিবির আখ্যান। মুন্সী বয়ানউদ্দীনের পুঁথি অনুযায়ী, বনবিবি ও তাঁর ভাই শাহ জাঙ্গলী এসেছিলেন মক্কা থেকে। তখন বনে বাঘরূপী দক্ষিণ রায়ের অত্যাচারে মানুষের জীবন ছিল ওষ্ঠাগত।

সেই বনের ধারে থাকত এক পিতৃহীন বালক, নাম তার দুখু। দুখুর দুই ধূর্ত ও লোভী চাচা ছিল—ধনা আর মনা। তারা প্রচুর মধু আর মোমের লোভে দক্ষিণ রায়ের সঙ্গে এক পৈশাচিক চুক্তিতে লিপ্ত হলো। মধুর বিনিময়ে তারা অসহায় দুখুকে বাঘরূপী দক্ষিণ রায়ের হাতে তুলে দিল এবং মাঝরাতে একা ফেলে পালিয়ে গেল।

বনবিবি দুখুকে উদ্ধার করে সাত নৌকা মধু দিয়ে তাঁর মায়ের কোলে ফিরিয়ে দিলেন। সেই থেকে সুন্দরবনে হিন্দু-মুসলিম সব ধর্মের মানুষ গাজীর দোহাই আর বনবিবির আশীর্বাদ নিয়ে অরণ্যে প্রবেশ করে।

পুঁথিতে দুখুর সেই আর্তনাদ আজও করুণ:

‘চাচারা ফেলিয়া মোরে পলাইল তরাসে,

বাঘরূপী যম বুঝি আসিল মোর পাশে।’

দক্ষিণ রায় যখন দুখুকে ভক্ষণ করতে তেড়ে এল, তখন দুখু চিৎকার করে বনবিবির দোহাই দিল। সঙ্গে সঙ্গে বনবিবি ও শাহ জাঙ্গলী আবির্ভূত হলেন। শাহ জাঙ্গলী তাঁর জাদুকরি লাঠি দিয়ে দক্ষিণ রায়কে তাড়া করলেন। পরাজিত রায় পালিয়ে গিয়ে বড় খাঁ গাজীর পায়ে আশ্রয় নিলেন।

গাজীর মধ্যস্থতায় এবং শ্রীহরির অলৌকিক উপস্থিতিতে দুই পক্ষের মধ্যে এক ঐতিহাসিক সন্ধি হলো। স্থির হলো, মানুষ বন থেকে কেবল জীবনধারণের প্রয়োজনটুকু নেবে, কোনো লোভ করবে না। আর বাঘও কোনো নিরপরাধ মানুষের ক্ষতি করবে না। সেই সন্ধির মূল সুর ছিল সম্প্রীতি:

‘একহি অদ্বৈত রূপ নাম মাত্র ভেদ,

পুরাণ কোরান মতে নাহিক প্রভেদ।’

বনবিবি দুখুকে উদ্ধার করে সাত নৌকা মধু দিয়ে তাঁর মায়ের কোলে ফিরিয়ে দিলেন। সেই থেকে সুন্দরবনে হিন্দু-মুসলিম সব ধর্মের মানুষ গাজীর দোহাই আর বনবিবির আশীর্বাদ নিয়ে অরণ্যে প্রবেশ করে।