বহু আগে একটা ধারী নদী বুকে বুনে ছিলাম। বহমান সে নদী—করুণ চিত্রা ফুলের মতো অথবা ট্যাপাশাকের মতো অভিমানী—রাত হলে কাঁদে আর বৃষ্টি মৌসুমে—নদী উত্তাল হলে, দুলে দুলে উঠি। চিঠির ভেতর চিঠি, তেমনই নদীর ভেতর নদী, মানুষের ভেতর মানুষ। বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত একবার বলেছিল, ‘ভালোবাসায় আসলে তুমি যেভাবে রিচ পাও, মানে যেখানে তোমাকে উজ্জীবিত করে, সেটাই প্রেম।’
না, প্রেমের আনুকূল্যে এ হাত আজীবন গতকাতুদার বাড়িটার মতো, যেন ভূত–প্রেতের, যেন বাদুড়ের কেন্দ্রস্থল। জানি ভাষার নছিয়ত আর কূলভাঙা সেই গয়া মাঝির কথা—গয়া একবার হয়তো মনে মনে হেরমান হেসের সেই সিদ্ধার্থ হতে চেয়েছিল—আর গাছের ভেতর কান পেতে গাছের গান শুনতে চেয়েছিল।
পৃথিবীতে শোনা যদি খুবই সহজ হতো, তাহলে আমরা কেউ তোমার নিকটে ফকিরের মতো নিজের ভেতরেই লুকিয়ে থাকা প্রেম চাইতাম না। এ এক ঘোর; নদী মরে তবে নদীর প্রেয়সী পানি; হয়তো মেঘ আর সাদা উত্তরণের মিলন শেখ, যাকে একদিন গয়ার ছোট বউকে আঁকতে বলা হয়েছিল। আর তাই এই শুনে পাখিগুলো গ্রাম ভুলে গিয়েছিল।
শরতের নরম বিড়াল—তোমাকে চেনে, ছায়া কেটে কেটে যে হিজলিবাদাম, যে গয়া মাঝি ভেঙে ফেলেছিল নৌকা, নদীটা তাকেই চেয়েছিলাম উপহার দিতে। কিন্তু নদী স্বার্থপর—যদি বলি তুমি, ও তোলে ঢেউ—যদি বলি আমি, ও বলে ফেউ।
এ আহত আরোহী আত্মা, এ গয়া মাঝি আর ছোট বউ—আর মিলন শেখ, আর নদী, মরে মরে—উঠোন করেছে ফুলের সভা। তোমাকে বলি, অঞ্জনের গান—সাবিত্রীর নাম, সাবিত্রী ছিল, পরেশের বউ—ধ্রুব এষ এই লিখে—এক বইয়ে আমার সঙ্গে ব্যাটার পরিচয় করিয়ে দিল। তারপর রাত, তারপর একা একা শূন্যতার মিছিলে যাই।
হে পলাতক পলাশ, এই নাও নবীন নদী, চলো ভাসি—ঈশ্বরের বাড়ি না, আমি কিনব সেই ঈশ্বরকে, যে নিয়েছে জোয়ারের মতো সব ভেঙে। এখন গয়া আসে রাতে—ছোট বউ আর মিলন শেখ, বারান্দায় বসে গীতবিতান পড়ে।
সেই সুফিয়া বাজার, ভোরে একটা সুবিতা পাখি কাঁদে, ব্যাগভর্তি সংসার নিয়ে ফেরা তোমার ভাই তোমার ভাবির কথা ভাবে। আর তখন মিলন, আর তখন গয়ার ছোট বউ, আর তখন একটা পচা শরীরের শিশু—ঘুম থেকে ওঠে।
বাড়ন্ত বয়সে নদীটা—হেঁটে যায় দূরে, তারপর পথ না খুঁজে পেয়ে, রাতের ভেতর ভীতু শিশাপাতার মতো আঁকে সেই বাড়ি। যেখানে সুফিয়া বাজারের সেই সুবিতা পাখিটির বাসা। যেখানে মিলন, গয়া আর ছোট বউ—রাত জন্মাতে জন্মাতে একদিন রাতকে গিলে খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ে।
তোমাকে এসবই বলি—এই চিঠি, তার ভেতর তুমি, তুমির ভেতর চিঠি, আর সেই চিঠিই আমি। আবদ্ধ এত সব আয়োজন থেকে—আমি কেবলই প্রতিকদমে প্রেমের ভাষা বলি।
ভাবো অহেতুক উদাহরণ, ভাবো, মধুপানের সেই নৌকা—যাতে পার হয়ে সিদ্ধার্থ গিয়েছিল অশোকের বনে; সেখানে হরিণ ছিল হয়তো, ছিল তোমার মা হরিণের রূপে। তারপর সেই গান কফিল ভাই একবার শাহবাগে শোনালেন, ‘হরিণেরা কি জানে, ভালোবাসি তোমারে!’
গান গাইতে গাইতে মিলন শেখ, গান শুনতে শুনতে গয়ার ছোট বউ একবার পর্নোগ্রাফি করেছিল। আমরা বহু পরে, এক ভিডিও আপলোডের পেজে দেখেছিলাম। তারপর ঘুম–অঘুমে, আমরা গয়ার কান্না শুনি—রেডিও, টেলিফোন, মুঠোফোন, টেলিভিশন—সবখানে গয়া; একটা নদী ভিক্ষা চায়।
এই ক্ষত নিয়ে প্রথমে মহাখালী কুমার সিদ্ধার্থের বাপ রোড ব্লকেড করে—তখন তোমার নাকফুল কেবলই যৌবনাবতী, আর অন্তর্বর্তী বাঘ, আর গয়া, একই গাছে ঝুলে পড়ে।
এক বোরো ধানের কালে, তোমার চর্চা দেখে মুগ্ধ নদী—আর সেই নদী আমি লোভে পড়ে কিনে ফেলি, এই কারণে ঈশ্বর আর হাটে এলেন না। সুফিয়া বাজার তন্ন তন্ন করে—গয়া একটা ঈশ্বর না পেয়ে প্রথমে ডাকঘর, পরে পাকঘর তোলে নিলামে। কিছুই না ঘটলে গয়া গড়িয়ে পড়ে গত জীবনের যৌবনের কাছে, যেখানে একটা মরা মরদ দেশলাই জ্বালিয়ে প্রতি রাতে নিজের কবর খোঁড়ে।
তোমাকে সেভাবেই পাওয়া। আর তোমার ভাই, আর তোমার ভাবি—আর গতকাতুদার বাড়ি আর অপুর স্মৃতি—অহর্নিশ চলনবিলের জলে ডুবিয়ে রাখে। ভাবি এই সংস্কৃতি এই গণ-অভ্যুত্থানেই শেষ—পরে এই ভাবতে ভাবতে এক মাষকলাইয়ের মাঠ, আরও মরেটা ভুট্টার খেত নিজের পিঠে নিয়ে ঘুরি। আর দেখি, ফ্যাসিস্টের ভাষা আমাদের সম্পর্কে, আমাদের মানুষে দশ ঘাঁ মেরে কানাঘুষা।
তখন পরোটার দোকানদার আর গয়া সুরের মজমা বসিয়েছিল সুফিয়া বাজারে। সেই ভাঙা ভাঙা রোদ, আর উত্তরণের মিলন শেখ, আর ছোট বউ—গয়ার সুরে মিলিত হয় গগার আঁকা চিত্র। সেখানে ছোট ছোট মাছ পিজির বেডরুমে শুয়ে শুনত সঞ্জীবের ‘কথা বলব না; আগের মতো কিছু নেই।’