আলোর ঘাগরা খুলে চূড়ায় চূড়ায়

অলংকরণ: অশোক কর্মকার

কালো জাহাজের উপকথা

তুমি কোথায়? সে কোথায়, অথবা তারা, বজ্রআঁটা বুক নিয়ে মেঘে মেঘে যারা হয়েছি পারাপার? তাদের মুখ কখনো বন্ধু, কখনো শত্রুরূপে, আমাকে ঘিরে বসায় পাহারা নিরন্তর—এই দৃশ্য রেখা ভেঙে ছিটকে ছিটকে নামি প্রলয় সিংহাসনে।

অসুরচোখের পাশবিকতায় নির্মিত যাদের রক্তবসন, তাদের কাছে গচ্ছিত রাখি না বীজ, ভূমি—জলধারা। এই রোষে পাহাড়চূড়ায় ডুবে যাবে শিশু, পাহাড়চূড়ায় ডুবে যাবে আমাদের সন্তান? তাঁর শেষ ডাক; বাজে—বিদ্যুতে?

আঠারো হাজার বাসনায় নোঙর করেছি যত শ্যামা কাঞ্চন নীলা রৌদ্র রুপালি বন্দরে—আলোর ঘাগরা খুলে চূড়ায় চূড়ায় ডেকেছে ঝড়ে ঝাঁঝরা বাতিঘর।

নীমরোদের গম্বুজে মিনারে, শেওলায়, চোখে চিহ্ন চিনে তোমাকে শনাক্ত করেছি।

তোমার যত অশ্রুপিপাসা মিটিয়েছে পাপচক্ষু পিষে! তোমার যত অশ্রুপিপাসা মিটিয়েছ আমার পাপচক্ষু পিষে। তবু কোনো এবাদতলোভীর কাছে বাড়াইনি হাত। তার যত পুণ্য তিয়াসা আমার এই মজনু অঙ্গ পিষে মিটিয়েছে। পাহারায় রেখে—বীজ, ভূমি, জলধারা।

তোমাকে দেখব বলে—যতবার জন্ম দিয়েছ এই বর্ণিল কমল আয়তনে; গভীরে দণ্ডহাড় জড়িয়ে বলেছি, উপশম। নেমেছে স্রোত পৃথিবীর প্রথম প্লাবনের। আঠারো হাজার কামনায়, ডুবেছে, ভেসেছে, নেচেছে, ঢেউশীর্ষে উন্মাদ হয়েছে জাহাজ। গভীরে দণ্ডহাড় জড়িয়ে বলেছি, উপশম।

তোমাকে দেখব বলে গভীরে দণ্ডহাড় জড়িয়ে বলেছি, উপশম। নোঙর করেছি যত শ্যামা কাঞ্চন নীলা রৌদ্র রুপালি বন্দরে, আলোর ঘাগরা খুলে চূড়ায় চূড়ায় ডেকেছ ঝড়ে ঝাঁঝরা বাতিঘর—তুমি।

তোমার ঝরনাসম কেশদাম, যেন ঝড় শেষে নেতানো পাল, গোছাদড়ি ও বাদাম। যেন বলহীন, রগহীন, প্রাণহীন যিশু—তোমার এই দীর্ঘ কেশদাম—মেরুন কুমারীর মতো কোলে তুলে আঁকড়ে আছি সমুদ্রমন্দিরে। ধীরে ধীরে শরীর থেকে ধুয়ে নিচ্ছ বজ্র-বিদ্যুৎ, ঝড়ের চিহ্ন, শেওলা। তোমার প্রশান্ত চোখ দেবদূত দেখছে—যত দেবশিশু দেখছ তুমি আলোর সৈকতে, অনন্ত সূর্যের দিকে তুলে ধরেছ তোমার প্রশান্ত মুখ।

এই রূপ দেখব—কেঁদেছি কত খর ঝঞ্ঝায় প্লাবনে প্লাবনে। জন্মেছি ঝড়ের দিনে—অনন্তবার জন্মেছি।
দেখো—চিনবে সর্বাঙ্গে প্রলয়ের কারুকাজ! প্রভুর এই নীল রুধিরে ভেসে ভেসে রুপালি হয়েছে জাহাজ—
অসুর চোখের পাশবিকতা নির্মিত যাদের রক্তবসন, তাদের কাছে গচ্ছিত রাখি না বীজ, ভূমি, জলধারা তোমার প্রশান্ত মুখ।

আরও পরে নীমরোদের গম্বুজে, মিনারে, শেওলায়, চোখের চিহ্ন চিনে আমাকে শনাক্ত করো—প্রিয়তমা

রক্তগোলাপের গান

দ্রিম দ্রিম ফুটছে গোলাপ
হাড়হিম সাইরেন বেজে চলছে
খুলে বন্ধ দুয়ার দুহাতে
বুক উদাম করে চলছি

দ্রিম দ্রিম ফুটছে গোলাপ

লাশ বুনলেই পাওয়া যেত
যদি মানুষের অধিকার
আলো ঢালত চাঁদ আরও
সূর্য আরও ফকফকা

কাটত আঁধার, মেঘ কাটত

রক্তবৃষ্টিতে কাদা আরও থকথকে
পা চলছেই না, চলছে না
পেরোনো যাচ্ছে না পথ
পেরোনো যাচ্ছে না পথ

বাঁধা সিংহাসনের
ধাঁধা সিংহাসনের

দ্রিম দ্রিম ফুটছে গোলাপ

লাশের পাহাড় এত ভার
যাচ্ছে না ওলটানো ইতিহাসের পৃষ্ঠা
আমরা তবুও ‘মুক্তির মন্দির সোপানো তলে’
লাশ বুনতে বুনতে এ মাটি উর্বর করে চলেছি
‘লেখা আছে অশ্রুজলে’

পরিচয়

চান্দ নায়ে ভরা নদী
আমিও বাইছি
বৈঠায় বৈঠায়
বাইছি রে নৌকা
এই বাংলার জলে

যখন কেউ ডেকেছে
ডাকাত ডাকাত!
বলেছি না, আমি
ডাকাতিয়ার ছেলে

পদ্মা মেঘনা যমুনার সন্তান

বাইছি রে নৌকা
এই বাংলার জলে
আমি ডাকাতিয়ার ছেলে

বকুলগাছে
গর্জন হাসে
যখন আমার
সাত আসমানে ঘর

পদ্মা নদীর গভীর ইলিশ মাছে
ডুবিয়ে রাখি আমার গোপন স্বর

চরকায় কাটি
সুতায় বুনি
লাঙল ডাবাই
ফসল আনি
নাওভরা মাছ,
ধান–পাট বিছানি
দেখে হাসো তুমি
হাসে মেহেদি পাতা

অনন্ত ওই আকাশপথে
নীলিমায় পূর্ণিমায়
তুমি বুনছ নকশিকাঁথা

তোমার আর আমার প্রেমে
সারা জগৎ গাঁথা

মুখ

আহ্ হাওয়া, তুমি বহু দূর থেকে
ভাসিয়ে আনছ সেই মুখ

আহ্ হাওয়া,
থেকে থেকে নক্ষত্র–ইন্ধনে
আমার এই রাত্রি চুলা ফুঁসে উঠছে
উতরাচ্ছে তিমির

হাঁড়িতে চড়িয়েছি আস্ত চাঁদ

মাতালেরা আসবে
বাটিভর্তি খেতে দিব চাঁদ
আর মদ ঢালতে ঢালতে শুধাইব—

তোমরা কি দেখছ তাকে, যার
অর্ধেক পূর্ণিমা, অর্ধেক গোলাপবাগান

অন্য আলো–য় লিখতে পারেন আপনিও। গল্প, কবিতা, প্রবন্ধসহ আপনার সৃজনশীল ও মননশীল যেকোনো লেখা পাঠিয়ে দিন আমাদের ঠিকানায়।

ই–মেইল: [email protected]

অন্য আলো
প্রথম আলো ভবন (৭ম তলা)
১৯ কারওয়ান বাজার, ঢাকা ১২১৫