অ্যাভনের তীরে এক অ্যাঞ্জেল
কোনো এক বিকেলে, যখন আলো ঝিলমিল করে
স্ট্র্যাটফোর্ডের ঘাটে,
একটি ছায়া কাঁধে করে নেয় শব্দের জাল,
নদীর জলে ভাসে হ্যামলেটের দীর্ঘশ্বাস,
ওথেলোর প্রচ্ছায়া, আর এক রানির
পাগলামির গান।
জন্মভূমি শুধু মাটি নয়, এক চিরন্তন প্রশ্ন;
একটি বাড়ি, যার দরজায় টোকা শোনা যায়
চারশো বছর ধরে,
কোনো শিশুর কণ্ঠে ফুটে ওঠে সনেটের ছন্দ,
আর উইলোগাছের পাতা কাঁপে ‘কিং লিয়ার’-এর ঝড়ে।
ওয়েস্টমিনস্টারে যে পাথর চাপা দেয় এক জোড়া হাতে
যেখানে লিখে রাখা আছে অভিশাপ, কিংবা আশীর্বাদ,
সেখানে থামে না কথোপকথন, মৃত্যুও যেখানে নীরব দর্শকমাত্র
এক মহান নাটকের।
তিনি কি সত্যিই ঘুমিয়ে আছেন, নাকি
ভাষার জলে ডুব দিয়ে খুঁজে বেড়ান তাঁর
হারানো চোখ?
প্রতিটি প্রেমের কথায়, প্রতিটি ছুরির আঘাতে,
জেগে ওঠে সেই অ্যাঞ্জেল, যে বাসা বেঁধেছে শব্দের ভেতরে।
যেখানে শেষ হয় সব ট্র্যাজেডি, শুরু হয় সব কমেডি,
সেই চির রহস্যময় মঞ্চের পেছনে মিলিয়ে যায়,
তিনি—
কেবল রেখে যান একঝলক রোদ্দুর, এক বাক্স
গল্পের মহিমা আর এক চিরস্থায়ী নদী, যে বয়ে যায় কবির স্বপ্নে।
টেমস, জল ও টাওয়ার ব্রিজ
এটি নদী নয়, এটি ‘নদী’র একটি ধারণা,
ইট-লোহা-কংক্রিটের ভাষায় লেখা এক জিজ্ঞাসা।
টাওয়ার ব্রিজ, এক গাণিতিক সমীকরণ,
যার অঙ্গে জড়িয়ে আছে অস্তিত্বের অবসাদ।
এই জলে প্রতিফলিত হয় না চাঁদ,
প্রতিফলিত হয় চাঁদের এক ডিজিটাল ছায়া,
আর তার মুখ, যা
একটি ফিল্টার—চোখে দেখা না যাওয়া রূপকথা।
লাল বাসগুলো পিক্সেলের মতো ভেসে যায়,
পথচারীদের পায়ের শব্দ এমপিথ্রি ফরম্যাটে সেভ হয়ে থাকে।
ব্রিজের পাতে পাতে জমে থাকে
কম্পিউটার-জেনারেটেড-কুয়াশার বিভ্রম।
আলোকসজ্জায় ভেসে যায় জল
কখনো দুভাগ হয়ে যাওয়া টাওয়ার ব্রিজ জলযানে কাঁপে
অভূতপূর্ব সৌন্দর্যে ভেসে যায় টেমস, দুপারের বিভা।
স্ট্যালিয়নগুলো দৌড়াচ্ছে
আবারও একটি হ্রেষাধ্বনি শুনছি। স্ট্যালিয়নগুলো
বেরিয়ে পড়েছে। ঘাসজমি থেকে মুখ তুলে তারা ঊর্ধ্বমুখী।
অ্যাড্রেনালিন দৌড়াচ্ছে শরীরে। পেশিতে শক্তির দ্রুতি।
অভীষ্ট লক্ষ্যে দৌড়াচ্ছে তারা। পার হবে যোজন যোজন পথ।
প্রিজমের মতো একাধিক আলো দৌড়াচ্ছে সাথে সাথে
অদূরে স্মৃতির জীর্ণ উৎস
জীবিতকালে পরস্পর শত্রু দুই কবি শুয়ে আছে পাশাপাশি
স্ট্যালিয়নগুলো পার হয়ে যাচ্ছে কবরস্থান, বধ্যভূমি
পাতা ঝরছে হলুদ-লাল
উড়ে যাচ্ছে ক্লেদ, বিষাদ ও বিবমিষা
স্ট্যালিয়নগুলো দৌড়াচ্ছে মানুষের অভীপ্সা কিংবা আকাঙ্ক্ষার চেয়ে দ্রুত।
এই দৃশ্যে আমি পাঁচ বছরের
এই দৃশ্যে আমি পাঁচ বছরের
দাঁড়িয়ে আছি কুশিয়ারা নামক এক নদী সিকস্তির পারে
আমার হাত দুটি রাখা
একটি উজ্জ্বল কাশগুচ্ছের কোমরে
আমার আঙুলগুলো গেঁথে যায়
ভিজে পলির নরম শরীরে। রোদ্দুর বৃদ্ধ নয়, বালিকা যেন
উদয়ের ঘ্রাণ লেগে আছে;
ঢেউয়ের খেলায় ঝিকিমিকি খড়্গ নদীর।
মাছের পোনাগুলো আমার পায়ের কাছে ছুটে বেড়ায়
চমকায় ছুরির মতো
আমারই মতো নিঃশঙ্ক, নির্বিঘ্ন
তারা খেলে, ছুঁয়ে যায় আঙুলে, পায়ের পাতায়।
উইলোর নোনাজল
সবুজ আঙুলগুলো নুয়ে পড়ে জলের দিকে
অন্ধকারকে স্পর্শ করে;
প্রতিটি ডালপালা জিজ্ঞাসায় ভরা
যে প্রশ্নের উত্তর জোয়ার-ভাটায় হারিয়ে যায়।
বাতাস এখানে ধীর, ভারী
ভাঙা চাঁদের টুকরো বয়ে আনে
আমি দেখি—উইলোর নিচু হওয়া
একধরনের প্রার্থনা
যা কখনো আকাশে পৌঁছায় না।
পানিতে তার বিকৃতি
আরও সত্যি হয়ে ওঠে বাস্তবের চেয়ে
ম্রিয়মাণ এই ছায়াগুলো
হঠাৎ কাঁদে
আর নদী হয়ে ওঠে এক অবিরাম অশ্রু।
কে বলে সে নুয়ে পড়েছে?
সে তো শুনছে—মাটির গভীর থেকে
অন্ধ মূলের নিরন্তর কথোপকথন
আর সময়কে পরিমাপ করছে
নিজের পতিত ছায়ার দৈর্ঘ্যে।
সন্ধ্যা নেমে এলে
সে হয়ে ওঠে একখানা জলছবি
যার ফ্রেম ভাঙা
যার রং এলোমেলো
তবুও সে থাকে—
জলের ওপর, জলের নিচে
একই সাথে।