শূন্যগর্ভ ও অন্যান্য কবিতা
শূন্যগর্ভ
কেন্দ্রীয় কক্ষে কোনো দরজা নেই—
তবু কত ভিক্ষু ঢুকে যায় প্রতিদিন।
ইটের বুকে বসে থাকে
পুরোনো বৃষ্টির শব্দ;
পোড়ামাটির ফলক থেকে হঠাৎ
নেমে আসে একটি হরিণ।
আমি তাকে জিজ্ঞেস করি—
তোমার পথ কোন দিকে?
সে ঘাসের দিকে তাকিয়ে থাকে,
কোনো উত্তর দেয় না।
চত্বরের মাঝখানে বাতাস ঘুরে ঘুরে বলে—
যা পূর্ণ,
তারও একদিন শূন্য হতে হয়।
আমি নিজের বুক ছুঁয়ে দেখি—
সেখানে একটি বিহার
ধীরে ধীরে
নিঃশব্দ হচ্ছে।
প্রদক্ষিণ
ভিক্ষুরা চলে গেছে—
পথটি রয়ে গেছে।
ইটের শরীরে
আর নেই
তাদের পায়ের উষ্ণতা।
উত্তরের পঁয়তাল্লিশটি কক্ষ—
চুপ।
অন্য তিনদিকে
চুয়াল্লিশটি করে
নীরবতা।
আমি হাঁটি—
এক পা,
তারপর আরেক পা।
দেয়াল বেয়ে উঠে যায়
একটি টিকটিকি।
মনে হয়,
কোনো পুরোনো প্রার্থনা
ভুল করে
এখনো পড়ে যাচ্ছে।
আমি ঘুরি—
আবার ঘুরি—
কেন্দ্রে কিছুই নেই।
শুধু
আমার ছায়া
আমার সঙ্গে হাঁটে।
তখন বুঝি—
পথের শেষে
শূন্যতা নয়;
এই হাঁটা,
এই থামা,
এই ফিরে-ফিরে আসাই
ছিল মন্দির।
পোড়ামাটির প্রাণী
পোড়ামাটির ফলকে—
হাতি,
হরিণ,
মানুষ।
সবাই থেমে আছে।
শুধু বাতাস
থামে না।
একদিন
একটি সিংহের মুখ দিয়ে
জল নেমেছিল—
এখন সেখানে
দুপুরভর
ধুলো জমে থাকে।
যে হাত
ফলকটি বানিয়েছিল,
তার কোনো নাম নেই।
যে চোখ
তাকে দেখেছিল—
তারও নেই।
তবু
মাটির গায়ে
আঙুল রাখলে
কেন যেন
শরীরের ভিতর
অল্প আলো
জ্বলে ওঠে।
সম্ভবত জীবন এমনই—
নাম মুছে যায়,
স্পর্শ থেকে যায়।
দূরদেশের ভিক্ষু
তিব্বত থেকে
কেউ এসেছিল—
চীনের দিক থেকে কেউ
রেখে গিয়েছিল
নীরব জুতো।
মায়ানমারের বৃষ্টি
হয়তো শুকিয়ে আছে
এই ইটের গায়ে।
মালয়ের কোনো প্রার্থনা
মিশে আছে
সন্ধ্যার ধুলোয়।
তারা এসেছিল—
জ্ঞান খুঁজতে।
চত্বরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে
কেউ কি
জ্ঞান পায়?
এক বৃদ্ধ ভিক্ষু
শুধু একটি শুকনো পাতা তুলেছিলেন।
কিছুক্ষণ দেখলেন—
তারপর
আবার রেখে দিলেন
মাটির কাছে।
আমি বুঝিনি তখন।
আজও
বুঝি না।
তবু—
পাতাটিকে
মনে পড়ে।
ধ্বংসের পরে
রাজা বদলেছে—
ধর্মও।
সিঁড়ির গায়ে শুধু
বৃষ্টির ক্ষুদ্র ইতিহাস।
একদিন
এই কক্ষগুলো
মানুষে ভরা ছিল।
এখন—
সন্ধ্যার পাখিরা
এসে বসে।
আমি একটি ভাঙা ইট
তুলে নিই।
তার ভেতরে
কোনো রাজ্য নেই—
শুধু
মাটি,
আগুন,
আর মানুষের দুই হাত।
দূরে
ধানখেতে বাতাস ওঠে।
মনে হয়—
বিহারটি
আবার
শ্বাস নিচ্ছে।
ধ্বংস মানে
শেষ নয়।
কখনো কখনো
শূন্যতাই
পেয়ে যায়
দীর্ঘ জীবন।