অ্যান কারসনের একগুচ্ছ কবিতা: পেরেকগুলো যন্ত্রণায় কাতর

এস এম রাকিবুর রহমান। গ্রাফিকস: প্রথম আলো

অ্যান কারসন একাধারে কবি, প্রাবন্ধিক, ধ্রুপদি সাহিত্যের অধ্যাপক ও অনুবাদক। তাঁর কবিতায় ঐতিহ্য ও আধুনিকতা হাত-ধরাধরি করে চলে। বহুস্তর অর্থবাচক তাঁর কবিতা কোনো নির্দিষ্ট অর্থে স্থির থাকে না। কেননা, তিনি তাঁর কবিতার শব্দকে প্রচল অর্থের খাঁচা থেকে বের করে আনেন অবলীলায়। সে জন্য বেছে নেন অলংকারহীন এক নির্ভার-নিরাভরণ ভাষা ও রূপক। প্রায়ই ঘুচিয়ে দেন কবিতা ও গদ্যের ভেদরেখা; কবিতাকে ঠেলে দেন এক ব্যাখ্যাহীন অনিশ্চয়তার দিকে। তাঁর কবিতাকে বলা হয়, ‘সহজতম ভাষায় লেখা দুরূহতম কবিতা’। বিপুল পাঠকনন্দিত এই কবি বহু পুরস্কার ও সম্মাননায় ভূষিত; অথচ নিজেকে নিয়ে তাঁর রয়েছে ‘বৈষ্ণব-বিনয়’। নিজেকে লেখক বলে দাবি করতেও কুণ্ঠা তাঁর, ‘এখনো নিজেকে লেখক বলতে পারব কি না জানি না। শুধু জানি, আমাকে কিছু একটা তৈরি করতেই হয়।’ অ্যান কারসনের এ কবিতাগুলো অনুবাদ করেছেন জুয়েল মাজহার...

ভালোবাসার সুখানুভূতি নিয়ে সামান্য আলাপ

ঘুম থেকে জেগেই আমি তোমার কথা ভাবি, দিনের পর দিন;
বাতাসে রত্নের মতন কে যেন গুঁজে দিয়ে গেছে পাখির ডাক।

মৃত্যু

হাত দুটোকে বুকের ওপর আড়াআড়ি রেখে ঘুমাতে যাই
আমার হাত দুটোকে ঠিক এভাবেই সাজিয়ে রাখবে ওরা;
দেখে মনে হবে, উড়ে যাচ্ছি নিজের ভেতরে

কানাডীয় কবি, প্রাবন্ধিক ও ধ্রুপদি সাহিত্যের পণ্ডিত অ্যান কারসন
ফাইল ছবি: এএফপি

শুকনো-ডাল-ভেঙে-পড়া শব্দের শহর

ওদের মুখগুলোকে আমার মনে হতো ছুরি;
ওগুলো দিয়ে এভাবেই ওরা আমাকে নিশানা বানিয়ে
অপেক্ষা করত।
শিকারি সে-ই, যে কান পেতে শোনে;
শিকারের নেশায় বুঁদ হয়ে সে তার নিজের
অস্ত্রটি বের করে আনে আর বিদ্ধ করে
নিজেরই শরীরে

ভ্যান গঘকে নিয়ে দু-এক কথা

আমি মদ খাই হলদে-রং আকাশটাকে, হলদে-রং বিশাল আকাশটাকে বুঝতে চাই বলে—বলেছিলেন ভ্যান গঘ। পৃথিবীর দিকে যখন তিনি চোখ মেলে তাকাতেন, দেখতে পেতেন সেই পেরেকগুলোকে, যেগুলো বস্তুর গায়ে আটকে রাখে রং। আর তিনি দেখতে পেতেন, পেরেকগুলো যন্ত্রণায় কাতর।

পেছনপানে হাঁটার বিষয়ে

মা আমাদের পেছনপানে হাঁটতে বারণ করতেন। তিনি বলতেন,
মৃতেরাই ওভাবে হাঁটে। তিনি কোত্থেকে পেয়েছিলেন এমন ধারণা?
হয়তো-বা বাজে কোনো অনুবাদ থেকে। মৃতেরা তো আর পেছনপানে
হাঁটে না, তবে তারা হেঁটে চলে আমাদের পেছনে পেছনে।
তাদের ফুসফুস নেই, সে কারণে ডাকতে পারে না তবে তারা চায়
যেন আমরা তাদের দিকে ফিরে তাকাই। তারা, অনেকেই,
হয়েছিল প্রেমের শিকার।

বিমানের উড়ান শুরুর অনুভূতি নিয়ে

জানো তো, ভাবছি হয়তো একেই বলে প্রেম যা দুহাত তুলে ছুটে আসছে আমার
জীবনের দিকে চেঁচিয়ে বলছে, ‘চলো এটা কিনে ফেলি, কী সস্তা!’

অ্যান কার্সন

আশ্রয় বিষয়ে দু-এক কথা

দেয়ালে মাছের হৃৎপিণ্ড দিয়ে লেখা যায়, কেননা এতে রয়েছে ফসফরাস। এটা তারা খায়; নদীর ঢাল বরাবর এ রকম ঝুপড়িঘর আছে। এ কথা লিখছি, তোমার কাছে নিজেকে যতটা সম্ভব ভুলভাবে তুলে ধরার ছলে। তাতে লেখা—‘চলে যাবার সময় দরজাটা বদলে দিয়ে যেয়ো’ এবার তুমিই বলো, এ কথা কতটা ভুল। এটা কতক্ষণ ধরে জ্বলজ্বল করতে থাকে। বলো আমাকে।

কনে-দেখা শহর

দিনের আলোর কালোয় ঝুলছে
ভেতরে-মানুষহীন ঠান্ডা, ঝলমল ওভারকোটের মতো—
‘দাবিদার’ দুপুরটি আমারই পথ চেয়ে ছিল।

আত্মসুখবাদ বিষয়ে

সৌন্দর্য আমাকে আশাহত করে। কেন করে, তাতে আমার কিছু
যায় আসে না; আমি স্রেফ পালিয়ে যেতে চাই। প্যারিস শহরটির
দিকে তাকালেই ইচ্ছে করে, একে দু-পায়ে পেঁচিয়ে ধরে থাকি।
তোমাকে নাচ করতে দেখলে, নিথর সাগরে ভেসে চলা একলা
নাবিকের মতো মনে মমতাহীন বিশালতার অনুভব জাগে; গোল
পিচফলের মতো কামনারা সারা রাত ফলে ওঠে আমার ভেতরে;
যা কিছুই টুপ করে পড়ুক, আমি সেসব আর যাই না কুড়াতে।