আজকের দিনে কেউ আসবে না তুমি কুমকুম মেখেছ কি না দেখতে!
তোমার চুলে ফুল না ঝরা পাতা, মুখে হাসি না কান্না,
আজকের দিনে তুষার পড়লে তোমাকে বাঁচাতে কেউ আসবে না!
না প্রিয় কুকুর, না প্রেমিক, না পেটুক বিড়াল!
আজকে শহর সব থেকে নিষ্ঠুর, বছরের নিষ্ঠুরতম দিন আজ,
দুঃখ পেলে পাবে, মরলে মরবে, তোমার কান্না মিশে যাবে
কার্জন হলের পুকুরে; আজকে দুপুরে জেনে নাও ভালোবাসা কাকে বলে,
তোমার তুচ্ছ জীবনে এসেছে শিক্ষার দিন, শিক্ষার্থিনী, শেখো,
আজকের দিনে কেউ আসবে না, তুমি নববধূ হতে চাও কি না জানতে!
তোমার আঙুলে আজ কাঁটা ফুটুক, ব্যথা দিক, কাল তুমি গোলাপের দিবাস্বপ্ন দেখো!
২.
আজ কোনো শীত নেই, মাশরেফা, আজ এক তুখোড় দিনের শেষে
অতীতের ভূতে-পাওয়া গল্পের মতন মৃদু সন্ধ্যা নেমে আসবে চরাচরে;
আজ এত বিপন্ন, তবু মনে হচ্ছে ফিরে ফিরে, কিছু একটা বুঝি নেমে এলো
গহন, অসহ, একঘেয়ে সমতায়; হয়তো একটা পাখি, হয়তোবা একটা পালকই মাত্র-
অথচ তাতেও খুশি আমি; টেবিলে ছড়ানো আগাছার মতো শত শত শত বই,
পাণ্ডুলিপি, তেলাপোকা, উঁই; বিকট শব্দে প্রিয়তম অস্তিত্বরা হাসছে হো হো করে,
হাসছে শয়তান, হাসছে মাংস, আর মাংসের খুপরিতে আত্মাও খুন হচ্ছে হেসে,
হাসছে গাঁড়ল আবহাওয়া, হাসছে কাগজে লুকিয়ে থাকা ম্লান,
একটা পালক এসে ঘুমিয়ে গিয়েছে অগোচর, পালকের নাম মাশরেফা, কিংবা,
হতে পারে, নামহীন, অনিশ্চিত; কিন্তু এসেছে তো! আসবে তো! হাসো, আরও হাসো,
হে অস্তিত্বমালা, হাসো; আজ বিপুল দিনের শেষে উড়ে আসবে সন্ধ্যা, আর সঙ্গে কিছু পাখি,
কিছু পাখি রতিশেষে পালকের ওম থুয়ে যাবে; আর আমি আমার অন্তরালে, আবডালে,
মাশরেফা, মাশরেফা বলে নিষ্পলক ডেকে যাব; আজ কোনো কিচিরমিচির নেই,
শীত নেই, অস্থিরতা নেই; আছে কেবলই সম্পন্ন এক চরাচর, স্বাভাবিক, মাশরেফাময়, মোলায়েম।
৩.
হাজার বছর ধরে ভালোবাসো, কেউ দেখুক, না দেখুক;
মনে করো তোমার পা সাপে কেটেছে, তুমি বুঝতে পারোনি,
বা হয়তো দংশনকে ভেবেছ আদর। নীল হলো সারা গা,
দুচোখে বাজল ধূসর বাঁশি, তুমি টানটান হয়ে রইলে,
তবু বুঝলে না, এটা প্রজাপতি নয়, এটা সাপ, এটা ঘাতক!
হঠাৎ তাবৎ রক্ত কেঁদে উঠল নবজাতকের মতো,
ভাবলে, মরেই যাচ্ছ, কিন্তু না; এ আসলে আনন্দ,
এই বিষ, বিষে বিষক্ষয়, বেঁচে থাকা, একরাশ বুদ্বুদ!
কেউ শুনুক, না শুনুক, ভালোবাসো হাজার বছর ধরে,
তোমাকে যে সাপে কেটেছে, এ কথা কেউ না জানলেও চলবে!
৪.
কিছুই না; আগামসি লেনের তন্দুরি
যেমন সকালবেলা উষ্ণ হয়ে ওঠে,
যেমন তিনটে খেলে ক্ষুধাই থাকে না;
তেমনই তোমার কোনো ছবি হয়তোবা,
(পুরান ঢাকার রোদে তোলা হয়তোবা)
শান্তি দেয়, মাশরেফা; কিছুই না, যেন
তুমিই মামুলি এই আগামসি লেন।
৫.
কোনো ব্যস্ততা নেই; পিস্তলের ট্রিগারে আঙুল রেখে
চেয়ে আছি জানালায় হতভম্ব প্রেমিকের মতো;
আগামসি লেনে আজ দল বেঁধে মেঘের ভেতরে
উড়ে যাচ্ছে শত শত অর্বাচীন কাক; ভাবি, ওদের দুর্দান্ত চপলতা
পেলে তো ভালোই হতো; হয়তোবা আমারই ভোতরে ঘন মেঘ আছে,
জায়গা আছে ঢের লুকানোর, কিন্তু আমিই জানি না;
সারাক্ষণ চোখ মেলে থাকি, দেখি রণে, বনে, জলে, জঙ্গলে
আমিই ব্যাপৃত শুধু, আমারই পাপের ভারে ঈশ্বরের কাঁধ ভেঙে গেছে;
আমারই সকাল শুধু সকালের মতন লাগে না;
হয়তোবা কিছুতে কিছুই হয় না, দরজা খোলে না
অস্তিত্বের; কেবল ধোঁয়ার মতো ভেন্টিলেটরের ছিদ্র দিয়ে
যেটুকু পালানো যায়, যেতে হবে স্রেফ সেটুকুই।
আজ এই সমাসন্ন শীতের সকালে বসে তাই নির্নিমেষ
চেয়ে আছি আগামসি লেনে; স্মৃতি নেই, প্রতিবাদ নেই,
বলবার কোনো দীক্ষা কিংবা অভিলাষও নেই, শুধু
ট্রিগারে আঙুল রেখে ব্যর্থ কল্পনায় ডুবে যেতে যেতে ভাবি,
যা হোক, শিকল ভালো, অন্তত নিঃসংকোচে বসে থাকা যায়;
সাঁতারের চেয়ে ভালো ঘটনাপ্রবাহে ভেসে যাওয়া।
৬.
দূর, দূর থেকে যত পাখি
উড়ে আসে, চোখ মেলে থাকি,
তাদেরই মধ্যে সে কি আছে?
ভিড়ের মধ্যে সে কি থাকে?
নাকি সে-ই ভিড়? সে-ই দেশ,
টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া;
মাশরেফা, শুধু মাশরেফা?
৭.
আজ বিচক্ষণ মনে হচ্ছে শুধু পাখিদের, যারা নাকি
রক্তের নির্দেশে আগুপিছু না ভেবেই উড়ে যায়
অচেনা হাওরে; যেতে যেতে, শত শত ডানার শীৎকারে
পাল্টে দেয় দৃশ্যপট; যেখানে কেবল নেতি ছিল, নির্ভাবনা ছিল,
সেখানেই কিছুটা ঝলক আনে সন্তানের, কিছু সম্ভাবনা
হুট করে জেগে ওঠে, মাশরেফা; আজ আমি কেবল তাদেরই মধ্যে
অসংখ্য নাটক ঘটে যেতে দেখি; মনে হয়, এই নীরবতা,
দুরূহ মূকাভিনয় তাদের অস্তিত্বে নেই, স্মৃতি নেই, বন্দোবস্ত নেই
আপসের; শুধু ডানা আছে, ডানায় পাতাল আছে লুকোনোর মতো;
আমিও তো লুকোতেই চাই; সরে যেতে চাই খল রঙ্গমঞ্চ থেকে
পরাভূত শয়তানের বেশে; বিভিন্ন মণ্ডল থেকে উৎসারিত প্রৌঢ় নক্ষত্রেরা
আমার কন্দরে নেমে খেলা করে, আমি খেলি, খেলনা ফেলে
উঠে আসি কখনোসখনো; ভাবি, ওই তো হাওরে জেগে আছে
শত শত পাখি; রংচঙে খেলনার চেয়েও আনন্দিত, প্রিয়, তৎপর;
আমি কি ওদেরই মতো একরত্তি অস্তিত্বের নাগপাশ ঠেলে উড়ে যাব
অন্য কোনো অস্তিত্বের নিগূঢ় প্রান্তরে, ধরো, তোমার প্রাণেরই কোনো
হাওরে-বাঁওড়ে, মাশরেফা? এই বিস্রস্ত গোল্লাছুট, এই আমরণ বালকতা
কখনো কি মুছে ফেলা যাবে না? আজকে শুধু পাখিদেরই মনে হচ্ছে
রাজ্যত্যাগী, জ্ঞানী, নিঃসংশয়; ইচ্ছে হয় তাদেরই ডানায় শুয়ে মিলেমিশে যেতে
অকাতর, বিচূর্ণ দৃশ্যের মতো, জায়মান, অপারগ, পরিসীমাবিহীন আকাশে।
৮.
প্রায়শই কিছুই লাগে না।
একটা দেয়াল ঠিকই আপন স্বভাবে ভেঙে পড়ে;
দেয়ালের এপারে–ওপারে
যারা ছিল, আশ্চর্যজনকভাবে যারা
দেয়ালে দুকান পেতে গড়ে তুলেছিল যোগাযোগ—
তারা হতভম্ব, খুব অন্ধ হয়ে যায়,
আনাগোনাহীন, প্রায় বোবা হয়ে যায়;
দেয়াল কিংবা দেয়ালের না থাকায়
আসলেই বড্ড যায় আসে।
৯.
আমি স্বপ্নের মধ্যে স্বপ্নে দেখেছি একটা স্বপ্ন
ধীরস্থিরভাবে উড়ে যাচ্ছে টিকাটুলির দিকে,
যেখানে তুমি ঘুমিয়ে আছ,
যদিও মুখভাব দেখে মনে হচ্ছে, মশকরা করছ ঘুমের সঙ্গে,
আর একটা ছুরি যেমন আয়েশ করে বুকের ভেতরে গেঁথে যায়,
তেমনি ওই স্বপ্নটা যখন প্রেতচ্ছায়ার মতো
তোমার ঘুমন্ত শত শত চোখের ভেতরে ঢুকে পড়বে,
তখন মুখভাব দেখে মনে হবে, তুমি মশকরা করছ স্বপ্নের সঙ্গে,
স্বপ্নের মতো, সেয়ানে সেয়ানে...
১০.
এই মাশরেফা যে-ই হোক, যে পালকই হোক, তাকে আমি
লুকিয়ে রেখেছি যত্ন করে;
পাখির বুকের গূঢ় পালকের মতো;
নদীর গহন পলি-মৃত্তিকার মতো;
এই নদী যে নদীই হোক, যে পলিই হোক, তাকে আমি
লোকচক্ষু, লোলচক্ষু থেকে,
সমূহ উন্মাদনা, বিশ্রম্ভালাপ থেকে দূরে
লুকিয়ে রেখেছি, তাকে সরিয়ে রেখেছি যত্ন করে।