চাঁদের আলোয় কাটা রাইফেল

অলংকরণ: এস এম রাকিবুর রহমান

তুমি কথা বলছ না

তুমি কথা বলছ না
একবারও বলছ না
নীরব হয়ে আছো
নীরবতা আজ কথা বলছে
নীরবতা আজ ভাষা পেয়েছে
হারানো দরজা এল-দরাদো
খুলে যাচ্ছে সব
সিংহদরজার ওই পাশে মসি হাতে নারী
এই পাশে অসি হাতে পুরুষ
সকলেই কবিতাভঞ্জন
সকলেই মিথুন রাশি
নীল নীল তারা
একটা–দুটো তারা ঝরছে এ রকম দিনে
নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে
ত্বকের ওপরে ছেনি-কাঁচি
ত্বক ত্বককে চাইছে
ঠোঁট উষ্ণ ঠোঁটকে
নিমেষে সব বদলে গেল
কুলা-কান-কাকাতুয়া
জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ডে পুড়ছে
ময়ূর-ময়ূরী-রাজহাঁস,
চোখ চোখকে দেখছে
বৃষ্টি অনাগত
তোমার শরীরে উল্কা
হাতে বাজুবন্দ
হাতে তলোয়ার
ফিরে যাচ্ছ কয়েক শতক আগে
তুমুল যুদ্ধ, সেনাপতি নিহত
আবাবিল পাখি সব পাথর ছুড়ছে
এই সব পাথর ধুলা ধুলা খেলা
এই সব স্মৃতি মধু মধু খেলা
মধুর কৌটায় লুকানো আছে প্রাণভোমরা
যদি পাও অষ্টরম্ভা
যদি না পাও কাঁটার মুকুট
খুঁজে খুঁজে হয়রান প্রতিটি আত্মা
সবকিছু মুছে দাও
চক দিয়ে ঘর কাটা
স্লেটের শরীর
আঁশ দিয়ে গাঁথা মাছ
লুসিফার, তুমি নীরবে ঘুমাও
তোমার জানালায় জোড়া ঘুঘু
তোমার শরীরে আলো
অন্ধকারের খোঁজে

কোনো দিন যাইনি বিরিশিরি

কোনো দিন যাইনি বিরিশিরি, গজনী, সিকিম
কোথাও না
শীতের রাতে দেখিনি ইগলুঘর
তুমি ছিলে সর্বক্ষণ রক্তের ভেতর
চনমনে বিকাল, দীর্ঘ রাত
শুয়ে শুয়ে পায়ের পাতায় পা
সারি সারি সেগুনের দণ্ডায়মানতা
এই সব বৃক্ষ-বৃক্ষা, নদী, ইট-পাথর
সবকিছু ঢুকে আছে মজ্জায়
তোমার উজ্জ্বল চোখ, নরম চুল
আমাকে আর্দ্র করে রাখে
লুসিফার, হয়ো না উচাটন
শুষে নিচ্ছি চর্ম ও চক্ষু
ওষ্ঠ ও জিহ্বা
যত ঝড় ওঠে, ঝঞ্ঝা
শরৎ ও বসন্ত
এইখানে একবিন্দু অমিয়জল
এইখানে একরাশ ফুলের শয্যা
যা ছিল স্বপ্নে, প্রতিবাস্তবে
জ্বলন্ত শিশ্নের আগুন তাকে জাগিয়ে তুলেছে
আমিরূপ তুমি আর তুমিরূপ আমি
একাকার হয়ে ধুন্ধুমার
এখানে অপর হয়ে ওঠে নিজ
অপরাপর সকলেই ঢুকে পড়ে কপাট খুলে
খিলানের এই পাশে মধুকূপি ফুল
গর্ভকেশর ছিঁড়ে থিরথির কাঁপছে
ছুরি দিয়ে কেটে কেটে লহমায়
শেওলায় ঢাকা পথ এঁকেবেঁকে চলে গেছে দূরদেশ কালকূট
তুমিও চলেছ পথ
সরবন, বেহেস্তের ওই পারে
এইপারে কালো দেশ, কালো কালো নেকাবে ঢাকা
বিরিশিরি যাইনি কখনো
গজনী, সিকিম কোথাও হয়নি যাওয়া

বাতাসে রক্তের গন্ধ

এখানে অনেক মাটির পাত্র
ওখানে তামাটে শরীর
আজ নিবিড় কোনো আলিঙ্গন তোমাকে টানছে না
ভোটের ব্যানার, অয়েল পেইন্টিং, চামচের ঠোঁট
এই সব পড়ে আছে মগজের কোণে
হৃৎস্পন্দনের উচ্চহার তোমাকে নুইয়ে রেখেছে
সারি সারি কৃষ্ণচূড়া, জারুল
রাজপথের দুপাশে
এখানেও বলাৎকার হয়
শিশ্নের ডগা ঢুকে পড়ে কোমল শরীরে
কোকিলের ডাক এখনো শোনা যায়
গ্রীষ্ম সমাগত, তবু তুমি ছায়া হারিয়েছ
গোলাপি শাল
বাতাসে রক্তের গন্ধ
এই হাত হত্যা করেছে সহস্র হাত
দুমড়ে-মুচড়ে ভেঙেছে স্পাইনাল কর্ড
রাষ্ট্রের যন্ত্র, যন্ত্র-মানুষ ছিঁড়ে নিয়েছে ফুলের গর্ভকেশর
হাত হাতকে বাঁধছে, চোখ চোখকে ঢাকছে
পাতাবাহারের গন্ধহীনতা খাবারের প্লেটে
হান্ডি বিরিয়ানি আর মাটন চাপ টিভি স্ক্রিনে
ওই চোখ তুমি খুলে নাও
ওই ঠোঁট তুমি স্পর্শ করো
রাখো হাতে হাত
তুমি কেউ নও
কখনো ছিলে না
তবু আছো খরা ও বর্ষণে
মারি ও মৃত্যুতে, জীবনে
তুমি নাই ভুল এবং শুদ্ধতে
ত্রিকালনাথ ছুঁয়ে আছে তোমার
ভ্রূযুগল

ফায়ার ফায়ার

রাতগুলো জেগে আছে
ফায়ার ফায়ার
রেলক্রসিং পার হয়ে বাঁশবন
চাঁদের আলোয় ঝলসে উঠছে কাটা রাইফেল
কার্তুজ, গুলির খোসা
গাছের আড়ালে লুকিয়ে মানুষ
ট্রেঞ্চে, জলে, স্থলে
মানুষের খুলি, ভগ্ন হাত
যুদ্ধের দামামা ছিল এখানে
কিছু থেমে গেছে
কিছু রয়ে গেছে
বিস্ফোরণের শব্দে তোমার ঘুম ভেঙে যায়
থেমে থেমে বোমার আর্তনাদ
ঝলসানো মুখ, বিস্ফোরিত স্তন
জঙ্ঘার হাড় বেঁকে ঢুকে গেছে মেরুদণ্ডে
রাতগুলো জেগে আছে

কিছু ফায়ার থেমে গেছে
কিছু রয়ে গেছে আগুনের ফুলকি...

তারকাঁটা

প্রিয়তম এইখানে মরুঘাস, লোবানের গন্ধ
শার্দূল, বৃষ, সুতানলি সাপ
কেটে কেটে বানাও মন্দির, মিনারের কঠিন শরীর
তারকাঁটায় গেঁথেছ কত কোমল চোখ
অথচ আমাদের কোনো তারকাঁটা ছিল না
পরস্পরকে বিদ্ধ করেছি জঙ্ঘা ও লিঙ্গের অস্থির উত্থানে
তারপর মেঘের শরীর
ভেসে ভেসে অজানার পথে
পায়ে কত কাদার ছোপ
জুতোয় রক্তের ধারা
প্রিয়তম, তোমাকে আজ কী নামে ডাকি?
জয়তুন, জারুল, মধুকূপি ঘাস
যে নামেই ডাকি না কেন
পথে মৃগনাভি, চোরকাঁটা সারি সারি
পায়ে বিঁধে রক্ত ঝরাল
বুকের বাঁপাশে করাতের দাগ
কেঁপে ওঠা আঙুলের ভাঁজে
একবিন্দু শর্ষের ভূত
এই ছিলে তুমি
আছো ভেতরে কালো ভূত হয়ে
জানি না কে সে ভূত তাড়াবে
নাকি কোনো ওঝা হয়ে এসেছিলে কাল
নিজেকে ছাড়াও নিজের দ্রোহে
আমি শুধু শীতে কাঁপি, রোদে পুড়ি
হিজলের লাল ফুল চোখে মেখে
বাজাই একতারে ঝাপটানো পাখা
অন্য তারে চাতকের চাওয়া
সেই সুর ওষ্ঠে মেখে
সেই সুর পান করে
আমি এক পা ধা নি সা
সা নি ধা পা মা গা রে সা