মহাদেব সাহার একগুচ্ছ কবিতা
মহাদেব সাহার এ কবিতাগুলো ১৯৯৮-৯৯ সালে প্রথম আলোর সাহিত্য সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়। ‘আদিশ্লোক’ ১৯৯৮ সালের ৪ ডিসেম্বর, ‘বৃষ্টি নামে’ ১৯৯৯ সালের ৯ জুলাই এবং একই বছর ২২ অক্টোবর মহাদেব সাহার কবিতা শিরোনামে ‘পাতাগুলি উড়ে যায়’, ‘হৃদয়কথা’ ও ‘শেফালিফুলের ঋতু’ নামে তিনটি কবিতা প্রকাশিত হয়। কবিতাগুলো এত দিন শুধু কাগজের পাতাজুড়ে ছিল। আজ ‘অন্য আলো’ অনলাইন পাঠকের জন্য মহাদেব সাহার এ পাঁচটি কবিতা তুলে ধরা হলো।
আদিশ্লোক
তোমার আলোতে খোলা বারান্দায় যখন একটি
চঞ্চল চড়ুই এসে বসে,
তার দুটি ছন্দময় পায়ে খেলে যায় প্রথম রোদ্দুর
তখন দেখতে পাই সূর্যোদয় হয় এই ঘরে, আকাশ
বুকের কাছে আসে।
তখন দেখতে পাই দুই চোখে অপরূপ আলো, কবিতার
জন্ম হয় মনে;
মাঝে মাঝে আমরা সবাই কবিতা খুঁজতে যাই
দূর চন্দনের বনে।
কেউ কেউ জীবন খুঁজতে যাই হয়তো মেঘনাপাড়ে
মধুপুরে সবুজ পাহাড়ে;
কিন্তু যখন বিষণ্ন বাবুই বৃষ্টি ভেজে,
উড়ে যায় নীল আকাশের কাছে
মেঘের মধুর গন্ধ গায়ে মাখে সেই ছোট
বাবুই পাখিটি,
তখন দেখতে পাই বৃষ্টি নামে এই শুষ্ক বুকে;
মনে হয় জলাশয় আমারই হৃদয়
তখন দেখতে পাই দুই চোখে অপরূপ আলো
কবিতার জন্ম হয়, ভালোবাসা জেগে ওঠে মনে।
বৃষ্টি নামে
এইখানে বৃষ্টি নামে, ভিজে যায় পাতা
সহস্র বছর কাঁদে কবিতার খাতা;
আমি এই বৃষ্টিজলে খুঁজি তার মুখ
একাকী চলেছি পথে বৌদ্ধ ভিক্ষুক।
এইখানে বৃষ্টি নামে, ভিজে যায় নদী
মন বলে তুমি আজ ফিরে আসো যদি;
আজ বুঝি এই মেঘে এই বরষায়
এখানে ধানের খেতে আকাশ ঘুমায়।
এইখানে বৃষ্টি নামে, ভিজে যায় ঘাস
তোমারই পথটি চেয়ে আছি বারোমাস;
আজ এই মেঘে মেঘে এই বরষায়
কে যেন পুরোনো গান গেয়ে চলে যায়।
এইখানে বৃষ্টি নামে, ভিজে যায় পাতা,
কমলাপুরের বাস যাবে কলকাতা।
হয়তোবা কেউ কবিতা খুঁজতে যাই হেমন্তের মাঠে,
শিশিরের জ্যোৎস্নায়
হয়তোবা কেউ জীবন খুঁজতে যাই পাহাড়ি ঝর্ণার ধারে,
নক্ষত্রের দেশে কেউবা বৃথাই খুঁজে মরি
এই ছন্দধ্বনি
কিন্তু যখন মায়ের কোলে একটি চঞ্চল শিশু হেসে ওঠে,
যখন দেখতে পাই শিশুর পরম শান্তি ঘুমন্ত মায়ের বুকে
তখন যথার্থই দুই চোখে ফুটে ওঠে জীবনের আলো,
কবিতার জন্ম হয় মনে, বিষাদের জন্ম হয়
তখন হয়তো মনে জেগে ওঠে আনন্দবিষাদ ভালোবাসা
আদিশ্লোকে।
পাতাগুলি উড়ে যায়
পাতাগুলি উড়ে যায় বলো কোন দিক
মধ্যরাতে বৃষ্টি যেন বিষণ্ন লিরিক।
জল কাঁপে, পাতা কাঁপে, কাঁপে সারা বুক,
দুয়ার রেখেছি খুলে তবু সে আসুক।
পথ দিয়ে হেঁটে যায় কে একজন
বিরহী পাখির মতো কাঁদে ঝাউবন,
পাতাগুলি উড়ে যায়, পড়ে থাকে পথ
নদীকে ডেকেছে কাছে দূরের পর্বত;
পাতাগুলি উড়ে যায় বলো কোন দিক
বিষণ্ন চোখের মতো বৃষ্টির লিরিক।
৯/১০/৯৯
হৃদয়কথা
হৃদয় তো দুঃখী বড়, সে তো বড় কাতর ভাঙন।
সে শুধু চোখের জল, সে তো এই বৈষ্ণব কবিতা।
সে তো এই গালিবের বিষণ্ন গজল, রুমীর মসনবি
হৃদয় তো এ রকমই কবি বা সন্ন্যাসী...
১০/১০/৯৯
শেফালি ফুলের ঋতু
শেফালি ফুলের ঋতু গন্ধময়, তাকে
শহরে শিউলি বলে ডাকে;
ইচ্ছে হয় শেফালি ফুলের জন্য ঘুরি সারা গ্রাম।
তার গন্ধে জেগে থাকি অন্ধ ভিখারির মতো
শিউলি জানে না তার আদি শুদ্ধ নাম,
শেফালি ফুলের ঋতু, তোমাকে প্রণাম।
একদিন শেফালি ফুলের ভোরবেলা
একদিন শেফালি ফুলের অন্ধকার,
সেই গন্ধ লেগে আছে সমুদ্রের ঘাসে;
চোখ মেলে দেখি সূর্য পশ্চিম আকাশে
কিছুদিন এইভাবে শেফালি ফুলের দুঃখে,
শেফালি ফুলের অন্ধকারে...
শহরে শিউলি বলে তাকে, কে জানে কী
তার জন্মনাম
শেফালি ফুলের ঋতু, তোমাকে প্রণাম।
২৮/৯/৯৯