আত্মমগ্ন বীজের প্রত্ন ধারাপাত

অলংকরণ: আরাফাত করিম

ফিরে ফিরে আসা বর্ষণের মতো
অনিঃশেষ জাদুকরের হাসি
বৃষ্টিতে একাকার হয়ে যাওয়ার পর
আমার বুকের ভেতরেও বৃষ্টি এল
পদ্মদিঘি থেকে তাই পালিয়ে গেল
পাঁজর ভাঙার গান

সে গান বৃষ্টির সুরের ভেতরে
ভালো লাগে খুব, অপেক্ষায় থাকি
নির্বাচিত নগ্ন বুকের ভেতরে
কোনো এক প্রজাপতি
লাগিয়ে দেবে সেই সাধকের ধান

পাখা নেই, তবুও উড়ে বেড়ায়
সেই প্রজাপতি অথবা ধান
ছোট ছোট পাখা নিয়ে
পাখার ভেতরে রহস্য নিয়ে
রহস্যের ভেতরে মনোচিত্র নিয়ে
ধান ও গান নিয়ে
ভেসে বেড়ায় জাদুকরের হাসি
যেন তা—
প্রজাপতির তিল
বৃষ্টির ফোঁটার ভেতর
কৃষকের চোখের ভেতর
কৃষাণীর বুকের ভেতর
নিমগ্ন বীজের ভেতর
গুপ্ত অঙ্কুর আর সুপ্ত স্বপ্নের ভেতর
বীজতলায় জমা কতিপয় ঘাসের ভেতর
দণ্ডায়মান আদি পুরুষের
দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখা অযুত সম্ভাবনার ভেতর

এভাবে
খুব সহজেই বুঝি ভেসে এল
একান্ত বেতারের কোলাহলহীন মেঘ-সুর
বৃষ্টিপত্রে সেই ব্রজ-বীণা
প্রায় অলৌকিক আদরের চুমু
মনে হয় না একটুও দূর

শুনে সেই গান একান্ত বেতারে
জাদুকরের কানে কানে
মাথাল থেকে খসে পড়া রোদের ভেতরে
ঘামের ভেতরে জমে থাকা ধুলার ভেতরে
কেউ—
দেখতে পায় না তারে
শুধু রিমঝিম রিমঝিম ডাকে
বুঝি, সেখানে এক
সিক্ত বসনা প্রাকৃত রমণী থাকে
সোনালি ধানের আভা তার দুই গালে
ভূমিপুত্রের হাত ধরে হাঁটে আইলে আইলে

সমস্ত সংহতিতে তার সবুজ
সমস্ত প্রবাহে তার নাড়ির রক্তের মতো বন্ধন
হাতের রেখার মতো তার প্রবাহিণী
নাকি হাতটাই তার নদী!
বয়ে চলে হাত থেকে হাতে
মাঠ থেকে মাঠে
একদম নিঃশব্দ একাকিনী
একান্তে দাঁড়িয়ে, একান্তে শুধু
তিনি শুদ্ধতম একাকিনী
আঁচল কোমরে গুঁজে দাঁড়িয়ে থাকেন মাঠে
সেই সবুজ কৃষাণী

আত্মমায়া ছেড়ে তিনি
কখনোই পাখির বিরুদ্ধে পাখি
পাতার বিরুদ্ধে পাতা
মাটির বিরুদ্ধে মাটি
জলের বিরুদ্ধে জল
না, কখনোই কোনো কিছুর বিরুদ্ধে তিনি নন
কিন্তু সব যেন আসেনি,
এই মাটির ওপরে,
সমস্ত সবুজের সামনে
ছায়াও ধ্রুপদি তার
আগলে রাখেন বুকের ভেতরে
গোপনে সঙ্গোপনে

কাঙ্ক্ষিত ছায়ার ভেতরে
শঙ্কিত ঢেউয়ের ভেতরে
মায়ের মাটি লেপা কাঁপা কাঁপা হাতের ভেতরে
বাপজানের ফোসকাপড়া হাতে
পবিত্র সেই লাঙলের দাগে
তাঁর পবিত্র আঙুলের কড়ায়
কখনো দ্রৌপদী দেবী হয়ে
হেঁটে হেঁটে যান তিনি
সাথে নিয়ে সংগ্রামের দিন
সাথে নিয়ে অষ্টপ্রহর
সাথে নিয়ে ঝাঁঝালো স্বর
কোনো শূন্যতায়, কোনো মধ্যদুপুরে
কোনো নগ্ন সকালের শিশিরে
কোনো কোমল দীর্ঘ ছায়ার বিকেলে
কোনো সন্ধেয় পেঁচার চোখে দেখা
সন্ধ্যার ছায়ার ভেতরে।

আলোও মরে যায়
আলোর বিরুদ্ধে আলো
তার মুত্যুর পর
কখনো
জিগানো হয় না তাহার কুশল
কত খেদ ও দুঃখ
কেমন ছিল এবারের ধান
তার ভেতরে কতভাগ হয়েছিল পাতান!
জীবনের ভেতরে ভেতরে!
কেমন জীবন ছিল তার!
জীবনসমরে কে আর জানবে এই কথা
আমারে কিংবা তাহারে
কে জিগাবে এই সব, এত সব!

তবুও সকল সূত্র ভুলে, সকল
চোখ রাঙানি আর নীল বেদনা ভুলে
তিনি আমাদের
কোলে নেন তুলে
ফেলে রেখে সকল সম্মান
যেমন করে তুলে নেন মাড়ানির ধান

ঝড়ের সমীকরণে
এভাবে, আমরা একে একে
কোমল হই, কঠোর হই
তারপর, প্রিয় নারীর জঙ্ঘায়
নিপতিত হই—
যেমন করে নরম মাটির ভেতরে
গেঁথে যায় বীজ
বীজের ভেতর থেকে যেমন করে
বেরিয়ে আসে সুবজ—
সকলে
যেমন করে একটু একটু ফুলে
প্রিয় রমণী কোলে নেয় তুলে
ওগো মাটি, ওগো প্রিয়তমা রমণী—
খুলে খুলে যায় গোলাপের পাপড়ি
খুলে যায় সাদা অঙ্কুর
গভীরে এমন সাদৃশ্য অঙ্কুর
তাকেই মানায়
এসবের বাহিরে
অন্য কিছু বহুদূর

তারপর একা একা একাকার
তারপর গভীরে যাবার হাহাকার
তারপর হঠাৎ আলোর ঝলকানি
তোমার হাসির মতো জেগে ওঠা সবুজ
তোমার জঙ্ঘা থেকে আমার চোখ
ছুঁয়ে ছুঁয়ে যায় তোমার বুকের গম্বুজ
জেগে ওঠে তারা, বাতাসের হালকা দুলুনি
হাতে লাঙল নিয়ে তখন স্বপ্ন দেখেন তিনি
সবুজের, রঙিন সোনার,
আর এত সব সম্ভাবনার!

দমকা বৃষ্টিতে নিভে গেল প্রায়
ভেজা ভেজা বাতাস, চোখ মেলে তাকাল
প্রিয় আলো কিংবা লগ্ন অন্ধকার

এমন হিমেল বাতাসে, কেবলই
আঁচল খসে খসে যায় তার
আমি কেমন তাকিয়ে থাকি লগ্ন অন্ধকারে!
সেই গলিতে!

যেখানে সূর্য উঠতে চেয়েছিল
তুমি অযথাই
লুকিয়ে ফেললে সেই সূর্য–অন্ধকার
নিভু নিভু বাতি নিভে যায়
আধেক মোড়ানো প্রজাপতি উড়ে আসে
আমাকে উড়াল করে নিয়ে যায়
তোমার সুবর্ণ গলিতে
তখন জ্বলে ওঠে কাশবন
সব ধান চলে গেছে
নিয়ে তার মন

পরিধি পরতে ঘেঁষে এমন তাল তাল
তন্দ্রামাতার গান, এমন ছন্দে বিহ্বল
এমন রঙিন নৈঃশব্দ্যের ভাষা, শুধু
একলা পথে একলা পথে গলি মাড়িয়ে
শুধু একলা পথে শুধু একলা পথে পথে—

একলা পথে প্রজাপতির তিলে
তাল তাল কোমলতার ভেতরে
পুনরায় অন্ধগলিতে, পুনরায়
দেখা হয়ে যায়—
নৃত্যরত যমজ ময়ূর
হেসে ওঠে পেখম মেলে

যেন তুমি অযথাই দুই ময়ূরের
ঢেউ খেলা পেখমে জড়িয়ে ধরো
জড়ানো আঁচল! কেবল বৃষ্টিবাহক জানে
সেই প্রজাপতির ময়ূর হয়ে উঠবার
উষ্ণ-জলজ-কামজ কাহিনি
তার ভেতরে ছিল কি ধান?
কেন তবে উঠল বেজে বরষার গান!

দেহাতীত পৃথিবীর গোপন ত্রিভুজে সে সময়
উড়াল পানির গোপন সাঁতার
নোনাঝাউ থেকে সুন্দরবনে
সুন্দরবন থেকে গোপন পুকুরে
গোপন পুকুর থেকে বাগানে বাগানে
আরও আরও ঘাসের বাগানে আর উঠোনে
গোপন গলির গোপন ময়ূরে
গোপন গলির তিল তিল প্রজাপতি
ভেসে আসে ভেসে আসে
তোমার কোমর-নদীর গোপন সাম্পানে
সে কি জানে এই বাড়ন্ত সবুজের মানে!
বাতাসে সবুজের ঢেউ, কৃষকের চোখে
নারী তুমি, কুহক কৃষাণী তুমি
নরম মাটির কাদা তুমি, ভূমি তুমি
দেশ তুমি, মাতা তুমি, দেবী তুমি, ঈশ্বর তুমি
তুমি ক্ষুধা নিবারণ
দুধ জমে, দুধ জমে প্রণয়বর্ষার কারণ

শুধু কি দুধ! ঘাসবনে ঘাস জমে
সকল ঘাসে দরকার আদরের নিড়ানি
তোমার ত্রিভুজেও তো জমেছে ঘাসের সিম্ফনি
সেই নিড়ানির কালে, ওগো কৃষাণী
আঙুল ভরে যায় মাটিতে, আঙুলে তখন
তোমার আমি তো তুমি, তোমার সকল তুমি
শত জীবন দিয়ে দাঁড়িয়েছি বঙ্গমাতাল ভূমি

এখানেও তো তুমি
জলজ কাদার উর্বর পথে
ফসলের ভূমি
রুয়ে দিতে দ্বিতীয় চিৎকার
এসেছি আমি স্বর্গের পথে
তাকিয়ে থাকো তুমি স্বর্গের পথে
দেখো সন্ধের ছায়া নিয়ে দাঁড়িয়েছি
হাঁটু মুড়ে, কুঁজো হয়ে, উপুড় হয়ে
বীজে আর বীজে
রুয়ে দিতে সবগুলো সোনালি মাছ
চোখের দিকে তাকাও, দেখবে
ভাসছ তুমি আর আমার
ফসলের সোনালি আকাশ

সেই পথে, দরজায় দাঁড়িয়ে
প্রলম্বিত সন্ধেয় শ্রাবণে,
ঘুমে ঘুমঘোরে তুমি লিখছ সন্ধে-স্বর
লেখার পর ভাবছ, আমি তো এক শুষ্ক নিরক্ষর
শব্দহীন সেই পোড়ানোর গন্ধে
কখন যে জেগে উঠেছে ফসলের বীজ
সুমিষ্ট দেহের ভাঁজে ভাঁজে রয়ে গেছে
দেখো শতসহস্র দ্বীজ
তাই পাশ ফিরতে ফিরতে
গলিতে, ময়ূরে, প্রজাপতিতে, অর্ধেক দাঁড়িয়ে
কী খোঁজো ঘুমিয়ে থেকে তিন মাস?
ভিখারি তুমি, ভিখারি আমি
করেছ তাই বীজের সর্বনাশ!
না, বুনেছি চোখ, বুনেছি মুখ
বুনেছি তোমার ভুরুর মতো চুলের মতো
তোমার মিহি ভালোবাসার মতো
তোমারই চুলের মতো অন্ধকারে
তোমার বুকের মতো গোপন গভীরে
এত তাল তাল নরম নাভিতে
আর ঢাল বেয়ে কোমরনদীর বাঁকে
ওগো কৃষাণী, দেখো,
ধানের সুবাস খালি এখানেই থাকে

এরপর পাড় বেয়ে এসে ঢালে
কত ছন্দ, কত রত্ন আর কাল ধরে
দেখা যায় ওগো ত্রিমোহিনী
ওগো ধান, ওগো গান
এত সবুজ স্বর্গ আগে দেখিনি
এভাবে উড়াল লিপ্ত পানিতে
সুডৌল হয়ে ওঠা বুকের মাঝে
কিসের যেন ঢেউ
জানে শুধু তুমি, আমি ও ধান
আর নয় কেউ

দুধ জমে গেছে তাই
এই প্রণয়বর্ষায়,
ফুলে উঠেছে রমণ-ভ্রমণ গতি,
আইলের ওপর দাঁড়িয়ে
সুখের মতো চলি তাই,
ছোট ছোট চুমুগুলো আজ
রাত্রির মতো উন্মাদ
আটকানো যায় না তাকে
কৃষাণী যতই দিতে থাকুক বাঁধ

তুমি ভেঙে ফেলো ফের পুরোনো স্তব্ধতা
মেঘের গুড়গুড় ভেঙে
তীব্র নরম রোদ
ঈশানকোণে কাকের ডিমের মতো
প্রীতি উপহার
ভেসে যাবি কি গো জলে
ভেসে যাবি কি গো স্থলে
তবে কেন এমন ম্লান চোখে
রাত্রিকালীন ভয়ার্ত আলাপের মতো
স্থির হয়ে যাও!
তার চেয়ে একটু ঝুঁকে
দুধেল ধানের মতো
আমার দিকে তাকাও

এসো, নীল হারমোনিয়াম নিয়ে
জীবনে এই মাটির আত্মকাহিনি লিখি
লিখি ওই বীজের ধারাপাত
লিখি ডোলের ভেতরে থাকা সোনালি স্বপ্নের কথা
লিখি তোমার সম্ভাবনার কথা
লিখি পানিতে ভিজে ভিজে শিকড়বর্তী হওয়ার কথা
লিখি বীজতলায় ভ্রমণের কথা,
লিখি শৈশবে দুটো আঙুলের আদরের কথা
যাব গো আমি এই ঘনসন্নিবেশ থেকে
ব্যাপ্ত বৃহত্তরে
এক–এক করে
যেমন করে
জড়িয়ে গেছি প্রহর থেকে প্রহরে
তারপর কৈশোর, তারপর সবুজ ঢেউ
তারপর নিড়ানি, তারপর প্রণয়বর্ষা
তারপর দুধ জমে ওঠা দুধের কাহিনি
তারপর তাল তার নরম পেলব ভেঙে
হয়ে ওঠা আদরের সোনা!
ওগো নারী, ওগো ধান, এ জন্যই
স্মারক হয়ে ওঠে একদার বীজ বোনা

হারিয়ে যাওয়া নিঃস্তব্ধতার মতো
আঁধারের মুদ্রা নিয়ে
যাই, বারবার যাই, বৃষ্টিতে—সবুজ পূর্ণতায়

আমার যা কিছু—ক্লান্তি অবগাহন
কিংবা একটা নিরক্ষর প্রেমের কবিতা
তোমার দেশে পাঠানোর পর
মনোরোম বিক্ষোভে ফেটে পড়া
উপচে পড়া তোমার ত্রিভুজে, জমিনে
ডাল ভেঙে ভিজে ঘাসে, পাতার বাতাস—
না না পাহাড়ে যাব না
যাব শুধু মেঘে
তোমার হঠাৎ না ভেজানো জমিতে

এতক্ষণে নিরুদ্দিষ্ট সে গলি, নিষিদ্ধ বিদায়
দূরের টেবিলে দেখো, স্বর্ণরাঙা জীবন
উঠেছে? উঠেছে গো সোনার মতোই এই সব দানা
এসো উড়ি তবে
তোমার বুকের ভেতরে রয়েছে যে
প্রণয়বর্ষার ডানা

মুখে তাই, বুকে তাই
তোমার মরুপ্রদীপের প্রার্থনা
সংকেত নেই, জলছবি নেই
আলো নেই, ভূমিশব্দহীন, আমাদের কথা নেই,
আমাদের শহর নেই, আমাদের কেউ নেই
আমাদের রাস্তা নেই, আমাদের প্রতিদিন নেই
আমাদের অনেক রাত নেই,
আমাদের অনেক এপিটাফ নেই, তবে
আমাদের আছে
সূর্যোদয়ের মতো হেমন্ত-কবিতা, অনিঃশেষ
ছয় ঋতুর বহুবর্ণিল বাংলাদেশ

জলের শতাব্দী শেষে ঝিনুকের মতো নীরবে সয়ে
দেখো কী এমন! প্রতিকৃতি?
তোমার মতো! আমার মতো!
আমাদের প্রেমের মতো, আমাদের বর্ষার মতো!
আমাদের চুপচাপ গাছের মতো!
আমাদের রিমঝিম প্রজাপতির মতো!
আমাদের বীজের মতো!
আমাদের কাটা ধানের সোনালি হাসির মতো!
আমাদের মাড়াইয়ের মতো!
আমাদের খড়ের মতো!
আমাদের খড়ের গম্বুজের মতো!
আমাদের ভূমির বিরাণ হয়ে ওঠার মতো!
আমাদের ভূমির নিঃসঙ্গতার মতো!
ফিরে এসে, পুনরায় কোলাহলের মতো!
ফিরে আসা বর্ষার মতো!
আমাদের—আমাদের মতো!
আমাদের প্রণয়ের মতো, আমাদের বর্ষার মতো!

আমাদের বর্ষা বেয়ে হেমন্ত-সম্ভাবনার মতো!