মেঘদূতের মহল্লা

অলংকরণ: এস এম রাকিবুর রহমান

বৃষ্টি শেষ হয়ে আসছে
আকাশে অশেষ মেঘের ফোঁপানি।
প্রেমপচা পানিতে
বর্ষার কাফন-দাফন,
লক্ষ বছরের শুষ্ক আত্মার অন্ত্যেষ্টি।
আগুনের তরিতে ভেজা
ধান ও গান
কোথায়, কার কাছে যায়;
বেঁচে থেকে করি
সেই মৃত্যুর শুমারি।
ভাত খেয়ে থালা ধুয়ে রাখো,
গান গেয়ে
গলা থেকে ধুয়ে কি রাখো অ–সুরো আমারে?
ই ভাদর মাহ ভাদর
চলে যায় সব রিম আর ঝিম।
স্তব্ধ কাননে অন্ধ মালিনী
বাজবে কখন রতির রাগিণী
সবাই সেই আশায় আশায় থাকি।
কবে দমকা হাওয়ার তোড়ে
নুয়ে গেছে মন,
সে খবর জানে কোন
বুকের লবণ!
ছিটা ছিটা জল
এত তৃষ্ণার্ত তারা,
তবু অপেক্ষায় থাকে কারা
শুকনো ফুলেরা ফিরবে ঠিক
সুবাসি উজানে।
দৃষ্টির ঢলে, দৃশ্যের খরাতে
কোন গোপন সানাইয়ে
বিসমিল্লাহ খাঁ মরে গিয়েও বাজায়
তোমার তামাম জিন্দেগি!
হা বৃষ্টি, হুটহাট বৃষ্টি
জন্ম থেকে জ্বলছি
মল্লারের লাশ টানছি।
বৃষ্টিতে খান খান, জায়মান
অনেকগুলো আমাকে ছেড়ে
একটা বেড়াল ছুটে যাচ্ছে...
তার সিক্ত মিউমিউয়ে
আলোয় আঁচড় পড়ে,
অন্ধকার ঝেঁপে নামে
পৃথিবীর অ-লিখিত সব
প্রেমের কবিতায়।
জ্বলীয় ব্যথায় সমুদ্র তড়পায়
গার্সিয়া লোরকা মরে যায়
গুলিতে নাকি
করুণ কমলালেবুর কোয়ায়;
সে খোঁজ আছে
আমার অন্তরের অদূরে
নোয়ার নৌকায়
অনন্ত আন্দালুসিয়ায়।
রোজ রাতে বৃষ্টি আমার মুখোমুখি
তবু আমি এক আজিব আজনবি,
যে মেঘের কোলকে ভেবে ঘর
খুঁড়েছে তার মায়াবী কবর।
আমি পেলেপুষে বড় করি
আমার আবহমান আততায়ী।
প্রেম পুড়ে গেছে ঘৃণার ঘাসে
জীবনের জমানো জহরতে,
মরণের মাধুরীতে শুয়ে–বসে
পাতালের আলপনা এঁকে
পশুদের বিবাহসভাতে
শুভ শয়তানি জাগিয়ে-ঘুমিয়ে
এখনো জারি আছি
প্রিয় পরানের পাখি।
বেহেশতি হাভেলির তালাচাবি
ডুবে গেছে
ভূতভবিষ্যের প্রবল বন্যাতে।
রান্না হচ্ছে নরকের নিকুঞ্জে
এই বৃষ্টিতে ক্ষুধাপেটে
কোথায়, কোন ভুখায় যাবে?
আগে পেটে কিছু দাও
তারপর বৃষ্টিতে ভিজো দাউদাউ।
লিথির লেকে
যে গোলাপের ছায়া পড়ে আছে,
তার লালে নস্যাৎ হতে হতে
ফুটেছি শতধারে, পাপড়ির রক্তে
বুক ভেঙে যায় মিহি চার্চবেলে।
এখনো ঘুমায়নি উঁচুনিচু পাহাড়
আমাদের সরলসোজা অভিসার,
অপেক্ষায় আছি
অঝোর অগস্ত্যের কত দূর বাকি!
এই কুসুমের কারাগার
আর কতকাল?
রাতভর বৃষ্টি বুনে তুলি
আর তোমার নাচভেজা মজলিসে বসে
ময়লাবাহার গান শুনি।
উড়ে যায় কাক
মরচে পড়া হৃদয়ের ডাক।
মেঘদূত-মরা গন্ধে
তোমার গা ম ম করছে;
লোভে পড়ে
আমিও আসছি কাছে,
বৃষ্টিতে মিলেঝুলে
তোমার মৃত্যুতে বাঁচতে।