নর্তকী
এত অবিচল
কী করে যে থাকো তুমি নাচের মুদ্রায়!
ওই দেখো বনভূমি
শিকড়ে প্রোথিত
তাদেরও তো বিহ্বলতা পায়
অভিমান ঝেড়ে ফেলে স্বীয় প্রস্বেদনে
আনমনে
বেড়ে ওঠে সেদিকেই যেখানে আলোক
এই চেনা সংযোগ
জারণের নিজস্ব ভূগোল
তুমি কি দেখো না সোনা?
পায়ে বাঁধা মল বুঝি জানেনি কখনো
ও ছন্দপতনে যদি অকস্মাৎ ভুল হয় কোনো
সে–ও এক যোগাযোগ
যেন তুমি আমাকেই নিয়েছিলে তুলে—
নাচের ভঙ্গিমাহীন; মুদ্রা নয়—নিজস্ব আঙুলে
মৃত্যুর পরে
একে একে ঝরা পাতা জড়ো হলো সব
বাস্তুচ্যুত; ছড়িয়ে–ছিটিয়ে পড়েছিল যারা
গ্রাম আর দূরের শহরে।
আবার এসেছ যদি এত দিন পরে
বসো তবে, এই নাও, লেবুপানি খাও
টের পাও? কচি কচি পাতার সুবাস!
কবেকার সেই ঘ্রাণ শুষে নিতে নিতে
আমরা কয়েকজন
বসলাম ধুলোলীন মলিন পিড়িতে
আর ফ্রেমের ভেতর থেকে চশমার কাচ
মুছে তিনি বললেন—
এত দিন পর!
মাতৃযোনীমুখঃ সদ্যখনিত কবর
ডাকে তাকে হাতছানি দিয়ে
তবু কী আশ্চর্য! দেখো, লোবান ছাপিয়ে
কাগজিলেবুর ঘ্রাণ গলা বেয়ে নামে।
অনেক দিনের পর মৃত্যু এল আমাদের গ্রামে।
অগ্রহায়ণ
এই তো আসন্ন শীত
আঁচলে অতীত বেঁধে হেঁটে যাবে তুমি
ভাতে ভাঁপ ওঠা নদী, ত্রস্ত বনভূমি
পার হয়ে আরও দূর কোনো এক দুপুরবাহিত
ঋতুঘুমে স্বপ্ন-প্রায়-মৃত
উপনীত পাতাদের প্রস্বেদের ভার
সাঙ্গ হলে
হালকা হাওয়ায় দেহ ভাসাবার আগে—
চেনা পৃথিবীর উপরিকাঠামোটাকে
জ্বাল দেয়া দুধ যেন লাগে
এত ঘন আর মর্মন্তুদ
হাত থেকে পড়ে গিয়ে সহসা আহত
কুসুমের মতো
ভাঙছে নরম রোদ হলদেটে আলো।
ক্রমে ছোট হতে হতে দিনগুলি কোথায় মেলাল
আততায়ী
ছুটে
বেরুনোর আগে ব্যারেলের ভেতর একাকী
আমিও তোমার মতো—
স্তব্ধ ও সংহত
থাকি
যেন বা যুদ্ধের আগে
শেষ দম নিচ্ছে দুই বিরোধী শিবির
ট্রিগারে পড়েছে চাপ—আসন্ন মুক্তির
ম্যাগজিন সেল ভেঙে বেরুনোর পর
আমূল নিবদ্ধ হব।
আমার ধাতব
দেহ ঢুকে যাবে তার দেহের ভেতর।
এহেন বিস্ময়কর
প্রাণহীন তবু
ইস্পাত অরণ্যে ফুটে রয়েছি নিরেট
এ মহাবিশ্বের দিকে
তাক করা রাখা কোনো
বন্দুকের নলে—
চুপচাপ শুয়ে থাকা নিরীহ বুলেট।
পুত্র
যেকোনো ফুলের মতো সহজাত, তাই
এহেন বিস্ময় আমি কোথায় লুকাই!
কত ব্যর্থ ঋতুদের ভিড়ে
জননীর জলপথ চিরে
কী করে যে তথাগত নেমে এলি ভবে
তোর আগমনে
সে ছিল মানুষ শুধু, নারী হলো তবে!
এই যে পুষ্পের রেণু ঘরভরা, এত মধুমাস
পয়সা ঘোরার মতো টলোমলো যখন তাকাস
মেঘচোখে, থমথমে মুখ।
কেমন আজব সুখ! মৃদু হাসিটাকে
এড়িয়ে কান্নাটা দেখি
ভালো লাগে, এত ভালো লাগে!
কেন যে কাঁদিস তুই দুই ঠোঁট ফুলিয়ে, বাজান?
দেহরূপে এসেছেন, বললেন খোদা
যাবৎকালের তোর যত অভিমান।